'জীবন চলার পথে মিথ্যাচার'

 

সংলাপ

 

গত ০২ জুলাই ২০১০ শুক্রবার সকাল ১০টায় মিরপুরস্থ জ্যোতি ভবনে সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপ আয়োজিত 'জীবন চলার পথে মিথ্যাচার' বিষয়ক গবেষণা ভিত্তিক বৈঠক হয়েছে বৈঠক পরিচালনা করেন গোলাম মাহমুদ মামুন মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ আবুল খায়ের প্রবন্ধের সারমর্ম হলোঃ

 

 

আবুল খায়ের

 

আবুল খায়ের বলেন, জীবনকে নিয়ে মানুষের আলোচনা চিরকালের বংশক্রমে, তারই জীবনকে ঘিরে আলোচনা চলে ক্রমবিকাশের পথে-ধর্মকথায়, সাহিত্যে, দর্শনে, ঘটনাগতভাবে তথা বিজ্ঞানে চলার পথে ধারাবাহিকতায় মাত্র, জন্ম, মৃত্যু ও বংশক্রম ও সময়ের সাথে একাত্ম হয়ে আলোচনার প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন আসবেই 'মিথ্যা' কী? এই বিষয়ে প্রশ্নের উত্তর সহজ নয় তবুও, মানুষের অনুভূতিতে স্পষ্ট, জীবনের ভূমিকায় যে বিষয়ের কোন অস্তিত্ব নেই অথচ, কৃত্রিমভাবে প্রকাশ বা ব্যক্ত করা হয় তাহাই 'মিথ্যা' মানবসমাজে চলছে অবিচার, অত্যাচার, শাসনের নামে শোষণ, মানুষের দুঃখের কারণ ক্ষমতার প্রভাবে মানবসমাজে এসেছে প্রতারণা, প্রবঞ্চনা, বৈষম্য, এই যেন মানবজাতির দুর্রাগ্য-ব্যাধি এই ব্যধিকে টিকিয়ে রাখার জন্য স্বার্থন্বেষী মানুষের চলে ষড়যন্ত্র, সভ্যতার নামে অসভ্যতা, জাতিভেদে সৃষ্টি করে জীবনের বৈষম্য বর্তমানে মানবসমাজে 'মিথ্যাচার' চলে ধর্মের নামে, রাজনীতিতে, সমাজনীতিতে, বাণিজ্যের কলাকৌশলে, এমন কি শিক্ষাক্ষেত্রেও সত্যের রূপটা কী তা মানুষ জানতেও চায় না, চলছে শুধু কৃত্রিমতা, চাতুরতা সাথে অন্যকে প্রতারণা, মঙ্গল চেয়ে অমঙ্গলই তাদের বেশি এককালে মানবসমাজ এমন ছিল না এখনো আমাদের দেশে অনেক মানুষ মিথ্যা বলতে পারে না'মিথ্যা' মানেই প্রতারণা, মনুষ্যত্ববোধ সে হারিয়ে ফেলে, জীবনকে হারিয়ে ফেলে বিশৃঙ্খলভাবে

প্রাণীজগতে মানুষ প্রাণী, এক ধরনের প্রজাতি, দৈহিক সংগঠনে ও জীবন প্রণালীতে মানুষ প্রাণী একই মৌল ভিত্তিতে গঠিত তবুও, মানুষের জীবন ব্যবস্থায় গড়ে ওঠেছে বিরাট পার্থক্য, জীবন যাপনে বৈচিত্র্যময় পরিবর্তন, জীবন ধারার পার্থক্য করার ক্ষমতা ও অভিজ্ঞতাকে স্মৃতিতে ধারণ করার সক্ষমতা, পেয়েছে তারই সাধনা করার ক্ষমতাবল, মানষিকতায় আবদ্ধ হয়েছে যা, অনুভূতির সমীকরণ জীবনমাত্র সংগ্রহবিত্তে আবদ্ধ, খাদ্য তাকে সংগ্রহ করতেই হবে জীবনের বিধি, স্বয়ংক্রিয়, অনিবার্য অর্থাৎ জঠরের যন্ত্রণায় জীবন চালিত অন্যান্য প্রাণীর মত আদি মানবজীবন কাহিনীতে বেঁচে থাকার তাগিদে, শিকার করার কলাকৌশল তাকে আয়ত্ত্ব করতে হয়েছিল, শিকারী জীবন মানুষের আদিপেশা শিকার করার জন্য প্রায় সকল জন্তুর জীবনই প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে-মানুষ তার ব্যতিক্রম ছিল না শিকার করার জন্য ফাঁদ পাঁতা, মুখোশ পরা, ধোঁকা দেয়া অর্থাৎ প্রতারণার আশ্রয় নেয়া তাতে জীবনযাত্রার পথ সহজ হয়েছিল বটে মানুষের প্রথম প্রযুক্তি পাথরে অস্ত্র তৈরি করেছিল, জীবনকে সহজ করার লক্ষ্যে তাতে শিকার করার জন্য কলাকৌশলকে বিদ্যা হিসাবেই গ্রহণ করেছিল আমাদের আদি পিতামহগণ এরই পরিপ্রেক্ষিতে শিকার করার নানা ক্রিয়াকৌশল মানুষের জীবনব্যাপী অনুষ্ঠানে পরিণত বিদ্যা কখনো জ্ঞান অর্জনের বিষয় ছিল না, মানুষ বিদ্যাকে সর্বদা অর্থ উপার্জনের উপায় হিসাবে দেখেছে, জীবিকার জন্যে এখানেই মিথ্যাচার মানবসমাজে প্রবেশ করার সুযোগ করে নিয়েছে জ্ঞান মানব জীবনে সর্বদায় স্বশিক্ষিতরাই আবিষ্কার করেছে, সেখানে বিদ্যার সহায়ক ভূমিকা খুবই সামান্য ছিল

'জীবন থেকে জীবন আসে', 'জীবন  জীবনকেই ভোগ করে' কৃষি বিকাশের পর মানষের জীবনে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে কৃষিপণ্যের উদ্ধৃত্বতে হিংস্র থাবা দিতে ভুল করেনি স্বার্থন্বেষী মানুষেরা উদ্ধৃত্ব কৃষিপণ্যকে ভিত্তি করে প্রথম রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েম ও মানব জীবনে অর্থনীতি চালু করে মুদ্রা ব্যবস্থা মানুষের শোষণ করার স্বার্থে-মানুষ মানুষে পার্থক্য এখানে শুরু রাষ্ট্র ব্যবস্থার পত্তনে স্বার্থন্বেষী মানুষেরা মিথ্যাচার আশ্রয়ে তথাকথিত সত্যের প্রলেপ দিয়ে মানব সমাজ এখনো চলছে ইতোমধ্যে মানুষ তার জীবনের 'ভাব' প্রকাশার্থে ভাষার ব্যাপক সমৃদ্ধ ঘটায়, জীবন চলার পথকে সহজ করার লক্ষ্যে

বাকচাতুরতা মধ্যেও মানুষ বিশেষ সুবিধাভোগী ও স্বার্থন্বেষীরা 'মিথ্যা'র জন্ম দিয়েছিল; অস্তিত্বহীন কিছু বক্তব্যের মাধ্যমে, জীবনক্ষমতা অপব্যবহারে করে

মানবসমাজে মিথ্যাচার চলছে অজ্ঞানেরই প্রশ্রয়ে জীবন ব্যবস্থায় সত্য-মিথ্যা একাকার হয়ে আছে মানুষের প্রয়োজন অফুরন্ত প্রয়োজন বোধটা মানুষকে দিয়েছে প্রেরণা মিথ্যা মানব জীবন ব্যবস্থায় অপ্রয়োজনীয়, জীবনের কোনই কাজে লাগে না বা সাময়িক ব্যবস্থামাত্র মানব জীবনে প্রয়োজন 'সত্য' সাধনা সত্য-মিথ্যার যাচাই করাই হলো প্রগতির পথ

'মিথ্যাচার' আলোচনা প্রসঙ্গে সত্যে' এর বিষয়টা আসবেই সত্যের সাথে মিথ্যার লড়াই চিরকালের সত্য মিথ্যার দ্বন্দ্ব আছে বলেই সচল জীবন কাহিনী'সত্য-মিথ্যা' যাচাই করাই হলো প্রগতির পথ-মানুষের ক্ষমতা সাধারণভাবে প্রশ্ন আসতে পারে মিথ্যাচার আলোচনায় সত্য' কী? সত্য সম্পর্কে আজও মানব সমাজের নিকট পরিপূর্ণ ব্যাখ্যা আসেনি তবুও, আমরা সত্যের প্রতি নিবেদিত, জীবনানুষ্ঠানে সমর্পিত সৃষ্টিকে জানা মানেই স্রষ্টাকে জানা, সত্যানুভূতি সঠিক জানা স্রষ্টার অন্য কোন পরিচয় নেই সৃষ্টির ধর্মকে জেনেই মানুষ 'জ্ঞানী' কল্যাণমুখী জীবনধারায় মানব 'নীতি'র জন্ম নীতিতে জন্ম দেয় নৈতিকতা, নীতিতে নৈতিকতা, চিন্তাকে ধরে রাখা, ক্রমবিকাশের ধারা, সহজ সরল পথ, একনিষ্ঠতা, সত্য আবিষ্কারের সাধনা নীতির প্রশ্নই আসে নেতৃত্ব সৃষ্টিমাত্র অস্তিত্বমান অস্তিত্ব তার রূপায়ন ঘটাবে চলমান হওয়ার ঘটনা থাকবে মানুষের মানসিকতায় জীবনের চাহিদার যে রূপদান করে তাকে আমরা 'আমি' বলে আখ্যা দান করি, কর্তাময় শক্তি আমি'ই হলো সত্যের প্রথম রূপ'আমি'তে আমিত্ব, সচেতন সত্ত্বা, জীবনের মৌলিক রূপ, দৃশ্যমান নয় তবে, সকল দৃশ্যকে দেখার ক্ষমতা

মানব জীবনের ভূমিকায় 'সত্য'ই আলো, রূপান্তর ঘটনায় এই আলোকধারা জীবনের জন্য ধন্য, পরমানন্দ ও সত্যিকারের জীবন চলার পথ সত্য এর প্রথম শর্ত সমগ্র সৃষ্টি কোন সৃষ্টিতে মিথ্যাচার নেই আমরা শুধু সৃষ্টি তথা বস্তুকেই চিনি সৃষ্টির মধ্যে কোন আপেক্ষিকতা নেই, সরল সত্য পথ সৃষ্টিকে জেনেই মানুষ মহামনীষী, সাধকদের সাধনার আশ্রয়'সত্য' তথা সৃষ্টি ব্যতিত আমাদের অবলোকনে অন্য কোন বিষয় নেই আমাদের সরল স্বীকৃতি-'আমি' সৃষ্টি তথা 'আমি সত্য', আমি থেকেই সত্য মিথ্যার কোন অস্তিত্ব নেই সমগ্র সৃষ্টি সচল জীবনও সচল এই মহাবিশ্বের কোন কিছু স্থির নয় তাই মহাবিশ্বের ঘটনাক্রম ঘটছেই জীবনানুভূতিতে ঘটনায় যা ঘটছে বা ঘটে তা বাস্তব মিথ্যার কোন বাস্তবতা নেই অতএব, 'মিথ্যা' অবাস্তব, অস্তিত্বহীন সকল জীবনই  ঘটনামান প্রবাহ সৃষ্টির প্রবাহে আলো বা জ্যোতি সৃষ্টির প্রবাহের ধর্ম ধারণ করেই আলোর জন্ম জীবনের উপলব্ধি শক্তির রূপান্তর ঘটনাই এই মহাবিশ্ব, সৃষ্টির ধর্ম জানার মধ্যে মিথ্যার কোন অবস্থান নেই জীবন চলার পথে-'মিথ্যাচার' মানব সমাজে আগাছা, জীবনের অসচেতনতায় লালিত সচেতনতাই মনুষ্যবোধে এসব জঞ্জাল দূর করবে, ইতিহাসের গতিধারা এর প্রমাণ করছে, জীবনের ক্রমবিকাশে

 

ড. এমদাদুল হক কাজল

 

মিথ্যাচার জীবন চলার পথে অনিবার্য  অংশ সাধারণত মিথ্যাচার বলতে সত্যকে বিকৃত করা বা সত্যকে গোপন করাকে বোঝায় প্রকৃত অর্থে মিথ্যাচারের পরিধি আরো অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত অধিকাংশ মানুষই মানুষই জানেই না যে সে অবিরাম মিথ্যাচার করে চলেছে মানুষ নিজের সাথে এবং অন্যের সাথে মিথ্যাচার করতে এতটাই অভ্যস্ত যে মানুষ মনেই করে না যে, সে মূলত মিথ্যাচারী

আমরা সত্যকে জানি না কিন্তু এমন ভান করতে পারি যে সত্যকে জানি মিথ্যাচারে আমাদের জীবন পূর্ণ মানুষ উদ্ভব, শেষ বিচারের দিন, বেহেস্ত, দোজখ, পুনর্জন্ম, পুনরুজ্জীবন, ভবিষ্যতে কি হতে যাচ্ছে ইত্যাদি মানুষ সব সময় এসব বিষয়ে এমন ভাবে কথা বলে যেন সে নিজের চোখে সব দেখে এসেছে, অথচ প্রকৃত অর্থে এসব সম্পর্কে সে কিছুই জানে না তাই সে মিথ্যাচার করে

একমাত্র সত্যাশ্রয়ী ব্যক্তি ব্যতিত কেউ মিথ্যাচার থেকে মুক্ত নয় মিথ্যাচারের পরিধি অনেক ব্যাপক দৈনন্দিন জীবনে মিথ্যাচার থেকে মুক্ত থাকা অসম্ভব ব্যাপার বলে মনে হয় নিজেকে জানার জন্য 'নিজে যখন কিভাবে কতভাবে নিজের সাথে এবং অন্যের সাথে মিথ্যাচার করে চলেছি' তা জানা অপরিহার্য

মানুষ মিথ্যা নিয়ে বসবাস করে তাই সত্য কথা শুনলেই ক্ষেপে যায় মানুষের ধর্মাচারে এমন সব মিথ্যাচার রয়েছে যেসব নিয়ে সত্য কথা বললে জীবন বিপর্যস্ত হবার সম্ভাবনা থাকে

 

আল্লামা মো: সাদেক নূরী

 

মিথ্যা+আচার=মিথ্যাচার

মূলতত্ত্বে মিথ্যা বলে কিছু নেই মিথ্যার জন্ম ব্যক্তির আচরণে এবং ব্যক্তির আচরণের ক্ষেত্রেই মিথ্যাচার শব্দটি প্রযোজ্য

মিথ্যাচার হতে পারে ব্যক্তির কথায ও কাজে স্বেচ্ছায়, অনিচ্ছায় অজ্ঞানে অসচেতন অবস্থায়

সাধারণ ও ব্যাপক অর্থে মিথ্যাচার বলতে বুঝায় সত্যের যে কোন রকম ব্যতিক্রম বা অন্যথা কথায় বা কাজে

যে কোন উদ্দেশ্যে যে কোন অবস্থায় মিথ্যাচার, অন্যায়, অপরাধ ও পাপ আর অজ্ঞানে ও অসচেতন অবস্থায় মিথ্যাচার এক নয় এ জন্য শিশু ও অপ্রকৃতস্থ ব্যক্তির বেলায় মিথ্যাচারের অভিযোগ প্রযোজ্য নয়

উল্লেখ্য যে, সাধারণ অর্থে ব্যবহৃত মিথ্যাচারকে যথেচ্ছাচারিতা, প্রবঞ্চনা, আত্মপ্রবঞ্চনা বা কথাও কর্মে কৃত্রিমতাও বলতে পারা যায়

 

শাহ্‌ মো: লিয়াকত আলী

 

ব্যক্তি যে সচল আচরণে চিন্তা, কথা ও কাজের মাঝে গরমিল করে ব্যক্তির সেই আচরণকেই আমি মিথ্যাচার বলে বুঝি পরিবেশের প্রভাব অনুভূত হলে ব্যক্তির সে বিষয়ে চিন্তা করার অবকাশ ঘটে পূর্বাভিজ্ঞতা থাকলে ব্যক্তি প্রয়োজন বুঝে সহজেই সে মোতাবেক কথা ও কাজের মিল রাখতে হবে, অন্যথায় অনুমান কিংবা ধারণাগত সম্ভাবনার উপর আশ্রয় নিয়ে কাজ করতে হয় এ অবস্থায় নিশ্চিতভাবে ব্যক্তির সত্যের উপর অবস্থান করার সুযোগ থাকে না অথচ এরূপ আস্থাহীন অবস্থায় ব্যক্তি তার চিন্তা কথা ও কাজকে সত্য বলে প্রচার প্রসার করতে উদ্যত থাকলে সেটিও আমার  কাছে মিথ্যাচার

 

শিব রঞ্জন দত্ত বলেন

 

শিব রঞ্জন দত্ত বলেন, যা, যা নয় সে রূপে তা প্রকাশ হল মিথ্যাচার আমার বোধ, আমার উপলব্ধি, জগৎ চলছে কোন এক অজানা লক্ষ্য পানে

মিথ্যাচারের ফলে যতটুকু সুবিধা হয়; তার ফলে যে হৃদ স্পন্দন হয় তার কুফল বড় বেশি অসুবিধাজনক

সরলতার আশ্রয় নিলে মিথ্যাচারের বেড়াজাল হতে মুক্ত হওয়া যায়

এ জগতে যা কিছু আছে যা কিছু দেখছি তা সত্যের একটি পর্যায় মাত্র

সাময়িক সুবিধা, আপাত লাভ, এসবই অর্জিত হয় কৃত্রিম আচরণ মিথ্যাচার

উন্মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণ করেনঃ শাহ্‌ ফাতেমা আফরোজ নাসরিন, শাহ্‌ ওয়াজউদ্দিন মোল্লা, এন.সি. রুদ্র, রিম্যান রুদ্র, সালমা আক্তার, ফরিদা খাতুন মনি, মাহমুদা আক্তার,আফরোজা রত্না,আশরিফা সুলতানা, প্রমূখ