রাজনৈতিক,
অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক সামাজিক, পারিবারিক, ব্যক্তিগত ইত্যাদি সব ধরনের
সম্পর্কের মধ্যেই হৃদ্যতা ও শান্তি জড়িত থাকে।
আবার
এটাও বলা চলে, শান্তির জন্যই সম্পর্ক তৈরি করা হয়।
আর
সম্পর্ক দেশে দেশে বা প্রতিবেশী দেশের সাথে হলে সেখানে সহ-অবস্থানের
কার্যক্রমের দিকগুলো আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।
বর্তমান মহাজোট সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেয়ার পর ভারতের সাথে বিশেষ
করে উত্তর-পূর্ব ভারতের ৭টি রাজ্যের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারের
প্রসঙ্গটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আলোচনায় উঠে এসেছে।
এই
সম্পর্ককে দু'দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজে
লাগানোর আজ সময় এসেছে।
ভারতের
উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর বিশেষ করে ত্রিপুরা-আসাম-মেঘালয়ের সাধারণ
মানুষ ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে বাংলাদেশের মানুষদের সহযোগিতায়
অকৃপণ হস্তে পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন।
বিশেষ
করে ত্রিপুরা রাজ্যের বাঙালি জনগোষ্ঠী যাদের অনেকের পৈত্রিক নিবাস এদেশের
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-কুমিল্লা-নোয়াখালি বা সিলেট।
তাদের
অবদানের কথা কখনো ভুলে যাওয়ার নয়।
কিন্তু
স্বাধীনতার ৪০ বছর পার হ'তে চললেও ত্রিপুরাবাসীর অবদানের কথা রাষ্ট্রীয়
পর্যায়ে খুব কমই স্বীকার বা স্মরণ করা হয়েছে।
অথচ
ভারতের অন্যান্য রাজ্যগুলোর তুলনায় কেন্দ্রীয় রাজধানী নয়াদিল্লি থেকে অনেক
দূরে অবস্থিত হওয়ার কারণেই হোক আর বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের
সীমান্তবর্তী রাজ্য হিসাবেই হোক ত্রিপুরা রাজ্য বড়বেশি অবহেলিত, অর্থনৈতিক
দিক দিয়েও অনেক পিছিয়ে।
এই
পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের আশুগঞ্জ-আখাউড়া হয়ে ত্রিপুরা রাজধানী আগরতলার সড়ক
ও রেল যোগাযোগ ত্রিপুরার অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে নতুন ধারা সৃষ্টি করতে পারে।
ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধে ত্রিপুরাবাসীর অবদানের কৃতজ্ঞতা স্বরূপ বাংলাদেশেরও
কিছুটা হলেও ভূমিকা রাখা দরকার বলে অভিজ্ঞ মহল বিবেচনা করেন।
এদেশের
শান্তিকামী ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের শক্তি আজ আশা করছে ভারতের
ক্ষমতাসীন কংগ্রেস দলের নেতা ও সাবেক মন্ত্রী মনিশংকর আয়ারের গেল সপ্তাহের
ঢাকা সফর ফলপ্রসু হবে এবং উত্তর পূর্ব ভারতের জনগণ, ব্যবসায়ী ও সরকারি
পর্যায়ও একটি সম্পর্ক তৈরি হ'বে সময়ের প্রয়োজনে।
মণিশংকর আয়ার
ভারতীয় ব্যবসায়ীদের একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন।
তারা
১৪ জুলাই পর্যন্ত অবস্থান করেন এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সরকারের
নীতিনির্ধারক ও ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের সঙ্গে বৈঠক
করেছেন।
এ সময়
ভারতীয় প্রতিনিধিদল স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেন, '৪৭ এর দেশ বিভাগের পর, এমনকি
'৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের সময়ও এ অঞ্চলের তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা
আজকের বাংলাদেশের ভালো ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল।
অথচ
স্বাধীনতার পর এ সম্পর্কের মধ্যে চিড় ধরেছে বিভিন্ন সময় এবং হিংসা, বিদ্বেষ
ও সাম্প্রদায়িকতার বীজ ছড়ানো হয়েছে।
ভারত
বিরোধী শক্তিগুলো যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা চায়নি, যারা এ অঞ্চলে
সাম্প্রদায়িকতার বীজ ছড়াতে চায়, ধর্মের নামে অধর্মের কাজ করে, সমাজের
শান্তি বিনষ্ট করতে চায় তারাই এ জন্য দায়ী।
আবার
ভারতের রাজনীতিতে যারা সাম্প্রদায়িক ও প্রতিক্রিয়াশীল, ক্ষমতায় শুধু টিকে
থাকতে চেয়েছে তারাও এক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করে গেছে।
সাধারণ
মানুষের প্রয়োজন আর বাস্তবতাকে কতদিন অস্বীকার করে চলা যায়? তাই সময়ের
প্রয়োজনেই ভারত ও বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন সরকারের পক্ষ থেকে সম্পর্কন্নোয়নের
উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিছুদিন আগে ভারত সফরে গিয়ে চারটি চুক্তি ও একটি
যৌথ ঘোষণার মধ্য দিয়ে দু'দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের ভিত গড়েছেন।
অপরদিকে, উত্তর-পূর্ব ভারতের একাধিক মুখ্যমন্ত্রী, মন্ত্রী ও ব্যবসায়ীরা
ঢাকায় এসে দু'দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
এছাড়া,
ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নে
রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের পরিমাণ ব্যাপকভাবে বাড়ানোর যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন তা
থেকেও বাংলাদেশ লাভবান হতে পারে।
উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোতে বাংলাদেশ যতবেশি বিনিয়োগ করতে পারে ততই
কমতে পারে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি।
ভারতের
ওই অঞ্চলটিতে বাংলাদেশের জন্য বাণিজ্যক সুবিধার নানা সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে
সেখানে পণ্য রপ্তানীর জন্য বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের সম্মুখীন হতে হয় নানা
সমস্যার।
ভারতের
এক একটি রাজ্যের আছে, একেক ধরনের শুল্ক কাঠামো।
সব
প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করেই দু-দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে সরকারের আন্তরিকতা ও
দক্ষতা প্রমাণ করতে হ'বে, - শুধুমাত্র দু'দেশের সাধারণ মানুষের কল্যাণের
কথা মাথায় রেখে।
ঘটনাক্রমে দু'দেশেই এখন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন রাজনৈতিক দল - আওয়ামী
লীগ ও ভারতীয় ইন্দিরা কংগ্রেস।
দু'দেশের
রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানগণ আন্তরিক হলে এক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে
পারে।
যত
প্রতিকূলতাই থাকুক না কেন দু'দেশের অভিন্ন অবস্থানে থাকার জন্য এ সম্পর্ক
জরুরি।
দু'দেশের আছে হাজারো কিলোমিটারের অভিন্ন সীমান্ত, কোটি কোটি বাঙালি-অবাঙালি
জনগোষ্ঠীর একই সংস্কৃতি, ইতিহাস ঐতিহ্য- বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ, নেতাজি
সুভাষ বোস, সাধক কাজী নজরুল ইসলাম, সাম্যবাদী সুকান্ত ভট্টাচার্য্যসহ এমনি
আরো কত কিছু।
দু'দেশের রাষ্ট্রীয় ও সরকারি কর্মকর্তাদের সদিচ্ছা ও আন্তরিকতাই শান্তি ও
সম্পর্কের পূর্ব শর্ত।
একবিংশ
শতাব্দীর আজকের এ লগ্নে যখন 'গ্লোবাল ভিলেজ' বা 'বিশ্বগ্রাম' এর ধারণা
সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে তখন উত্তর-পূর্ব ভারতীয় রাজ্যগুলোর সাথে সম্পর্ককে
নিশ্চয়ই কেউ অস্বীকার করতে পারেন না।
যারা
করেন তারা নিশ্চয়ই সাধারণ মানুষের বন্ধু বা শান্তির সৈনিক নয়, তারা আলোর
পথের যাত্রী নন বরং সংকীর্ণতার বেড়াজালে আবদ্ধ।