চির-উন্নত মম শীর

 

সংলাপ

 

বারোই ভাদ্র কাজী নজরুল ইসলামের তিরোধান দিবস এগারোই জ্যৈষ্ঠ ভারতের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহাকুমার চুরুলিয়া গ্রামে যাঁর আবির্ভাব, সেই তিনি বারোই ভাদ্র শায়িত হয়েছেন বাংলাদেশের রাজধানীস্থ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদের পাশে দেশ-কাল অতিক্রম করে তাঁর জীবনের আদি ও অন্ত ভেঙেছে সীমানা ভাঙনের এই দুর্দমনীয় সুর তাঁর সমগ্র জীবন স্রোতে অবিরত ধ্বনিত হয়েছে এ ভাঙন নিত্য নতুন সৃষ্টির উল্লাসে এ ভাঙন পুরাতনকে হটিয়ে দিয়ে নতুনের কেতন  উড়াবার অক্লান্ত প্রয়াসে এ ভাঙন মিথ্যাকে ধূলিস্যাত করে সত্যের উদ্বোধনে সত্য দ্রষ্টা নজরুল জীবন সাধনায় তাই অপ্রতিদ্বন্দ্বী এক সত্তা, যা অমর অক্ষয় শাশ্বত সেই সত্য সাধকের অরুনোদয়ে এই জরা-জীর্ণ পৃথিবী খুঁজে নিচ্ছে, নিবে জীবনের সফেদ ঠিকানা, মানবতার বিস্তীর্ণ দিগন্ত

চার আউলিয়ার গ্রাম চুরুলিয়া রুক্ষ আর উদার প্রকৃতির সৌন্দর্য-সম্ভারে শৈশবের নজরুলকে লালন করেছিল আপন সুষমায় ঐতিহ্যের শাশ্বত ধারাকে অক্ষুন্ন রেখে প্রকৃতির সন্তান নজরুলও কালের সাংঘর্ষিক চেতনায় পরিণত হয়েছিলেন সাধক পুরুষোত্তমে বংশ তালিকা হাতড়ে জানা যায় নজরুলের আদি পুরুষ ছিলেন হযরত গোলাম নকসবন্দ বাবা কাজী ফকির আহমদ ছিলেন চুরুলিয়ার প্রাচীন দরগাহ্‌ হাজী পাহলোয়ানের আস্তানার খাদেম তাই নজরুলের শেঁকড় সাধককূলের জমিনে প্রোথিত ধর্ম ভিরু দানশীল, সরলচিত্ত, আপন ভোলা, বাংলা-উর্দু-ফার্সি জানা বাবার সব গুণই তিনি আত্মস্থ করেছিলেন চির দুরন্ত-দুর্দম নজরুল শৈশব থেকে কৈশোর, কৈশোর থেকে যৌবন, জীবনের প্রতিটি স্তরে যত বৈচিত্র্যেরই সমাবেশ ঘটান না কেন অবশেষে তিনি সমাহিত হয়েছেন আপনাতেই আপন শেঁকড়ের সঞ্চারিত প্রাণ রসে তিনি প্রাণবন্ত সত্য-সত্তায় হয়ে উঠেছেন মহান সাধক বিচিত্র কর্মের বিন্যাসে জীবনের বৈচিত্র্যতায় লব্ধ সত্যে প্রতিষ্ঠিত থেকে তিনি হয়েছেন সত্য স্রষ্টা তাই কোন খন্ডিত চেতনায় তাঁকে খন্ডন করার প্রয়াস নিতান্তই ঔদ্ধত্য, অনুচিত কেবল কবি নয়, কেবল প্রাবন্ধিক নয়, কেবল সাংবাদিক নয়, কেবল উপন্যাসিক নয়, কেবল নাট্যকার নয়, কেবল সৈনিক নয়, কেবল বিদ্রোহী নয়, কেবল প্রেমিক নয়, কেবল গায়ক বা অভিনেতা নয়, সামগ্রিক জীবনের অবিমিশ্র শৈল্পিকতার সমন্বয়ে ঋদ্ধ তিনি এই ঋদ্ধতা কালিক বাস্তবতাজাত সাত্তিক চেতনায় সুগভীর জ্ঞানে এই ঋদ্ধতা নজরুলকে দিয়েছে পুরুষোত্তমের মর্যাদা

কর্মই ধর্ম - এ সত্য ধারণ করেই তিনি ছিলেন প্রকৃত ধার্মিক তাই কেবল ভাবালুতার মাঝে আত্মবিসর্জন না দিয়ে তিনি নিরবচ্ছিন্ন কর্ম সাধনায় ছিলেন আত্মনিবেদিত কর্মের সাত্তিকতায় তিনি ধর্মকে দিয়েছেন শুদ্ধত্ব বাংলার সন্তান তিনি বাংলা সাহিত্যকে হাতিয়ার করে নেমেছিলেন সেই শুদ্ধি অভিযানে

বাংলার যেখানেই অনিয়ম-অনাচার, বৈষম্য-বিভেদ, কুসংস্কার, আনুষ্ঠানিকতার আবরণ, শোষণ, তাঁর দৃষ্টিগোচর হয়েছে সেখানেই তিনি গর্জে উঠেছেন প্রতিবাদে প্রতিরোধে এই প্রতিবাদী কন্ঠস্বরই তাঁকে চিহ্নিত করেছে 'বিদ্রোহী' রূপে কিন্তু এটিও তাঁর সমগ্র সত্তার একটি খন্ডাংশ তবে এও সত্য যে, এই বিদ্রোহী সত্তাই তাঁকে রেখেছে আপোষহীন, পরিণত করেছে সত্যের পথের দুর্দমনীয় অবিচলিত পথিকে এই বিদ্রোহী সত্তাই তাঁকে করেছে সত্য সাধক প্রেমও অনিবার্য উপাদান এখানে প্রেম-রসে জারিত হৃদয়ে তিনি যে কোন বিষয় বা কর্মকেই গ্রহণ বা সম্পাদন করেছেন একান্ত নিবিড় ও নির্ভীক ভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার সত্য সাহসে তিনি যে বাঁধ ভাঙার গান গেয়েছেন সেখানেও প্রেমের প্রকাশ সতত সহস্র ধারায় বহমান প্রেমজ কর্মই তাঁকে সাধক পুরুষ তথা শান্তির পথ প্রদর্শকে পরিণত করেছে

'আমার কৈফিয়ৎ' কবিতার সূচনাতেই যদিও নজরুল বলেছেন - 'বর্তমানের কবি আমি ভাই, ভবিষ্যতের নই নবী কিন্তু ওই কবিতারই পরবর্তী স্তবকগুলোতে তিনি নিজেই নিজের যে পরিচয় তুলে ধরেছেন তাতে সুস্পষ্ট যে, তিনি যুগের 'হুজুগ' বা সকল বিতর্ককে তুচ্ছ জ্ঞান করে যুগাতীত এক সত্যকে ধারণ করে আছেন সেই সত্যের আলোয় তিনি উন্মোচিত করেছেন সেই 'বর্তমানের'ই প্রতারক, ভন্ড, শোষক শ্রেণীর মানুষের মুখোশ সমাজের প্রতিটি স্তরেই ওই মুখোশধারী মানুষেরা ছিল, আছে, থাকবে সাহিত্য-সংস্কৃতিতে, রাজনীতিতে, অর্থনীতিতে, ধর্মে, রাষ্ট্রীয় যন্ত্রে ওই নিপীড়ক শ্রেণী গ্রাস করে চলেছেন সবকিছু শোষণের নির্মমতা যেখানে শৃঙ্খল ছড়াতে ব্যস্ত, মুক্তির আর্তনাদ সেখানেই ধ্বনিত হয় শান্তির সুপথ রচনায় সেখানেই হাজির হন পথ প্রদর্শকগণ নজরুল ছিলেন তেমনি একজন পথ প্রদর্শক বিশিষ্ট সমালোচক মোহাম্মদ মাহ্‌ফুজ উল্লাহ্‌ বলেছেন - 'বাংলা সাহিত্যের অন্যতম যুগ স্রষ্টা এবং বিদ্রোহী ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন একজন ত্রিকালদর্শী লেখক এবং অসাধারণ সৃষ্টিধর্মী প্রতিভার অধিকারী, ইতিহাস ও কাল সচেতন,  বাস্তববাদী এবং দ্রষ্টা ও স্রষ্টা' এর সাথে আর একটু যোগ করে বলা যায় যে, নজরুল ছিলেন 'ত্রিকালদর্শী মহান সাধক' লেখক ও সাধক তবে 'সাধক' শব্দের মাঝে যে পূর্ণতা ও বিস্তৃতি আছে 'লেখক' শব্দের মাঝে তা কিছুটা খন্ডিত হয়

বেতার জগতের ১.২.১৯৪১ সংখ্যায় প্রকাশিত কুরআন সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য, 'কোরান শরিফে স্পষ্ট ইঙ্গিত আছে যে, যিনি বিভূতি বা যোগৈশ্বর্য লাভ করেছেন কোরান পাঠ ক'রে তার অর্থ হৃদয়ঙ্গম করার তিনিই অধিকারী হয়েছেন কোরান আরম্ভ হয়েছে 'সুরা বকরা' দিয়ে এই বকরা পার্থিব ও অপার্থিব ঐশ্বর্যের প্রতীক কোরানে আল্লাহকে একমেবাদ্বিতীয়ম অভেদম, পরম পূর্ণম, পরম নিত্যম বলা হলেও তিনি নিত্য পরম প্রেমময়, পরম ক্ষমাসুন্দর, পরম করুণাময় - এই আশার কথাই বিশেষ জোর দিয়ে বলা হয়েছে কোরানে সাধনার সহজতম পথের ইঙ্গিত আছে যে পথে অতি সহজে ব্রহ্মজ্ঞান প্রাপ্তি হয়, তার অপূর্ব সহজ উপায় ও তৎসম্বন্ধে উপদেশ ও তত্ত্ব বর্ণিত আছে তবে অতি উচ্চ স্তরের সাধক ব্যতীত সে ইঙ্গিত ধরতে পারবে না সকল ধর্মের লোক কোরানের এই আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা শুনে উপকৃত হবেন বিশেষ করে যাঁরা সাধক পথের পথিক, তাঁরা অনেক গুপ্ত পথের হদিস পাবেন এতে'

আমরা বিশ্বাস করি 'ইসলাম' মানেই 'বর্তমান' অতীতচারিতা বা ভবিতব্যের বলয়ে বন্দি হয়ে অকর্মন্য জীবনের পথ থেকে মুক্তি দিতেই বর্তমানকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে ইসলামে বর্তমান সুন্দর হলেই জীবন সুন্দর বর্তমান সত্য হলেই জীবন সত্য বর্তমান শান্তিময় হলেই জীবন শান্তিময় তাই কাল সচেতন নজরুল যখন বলেন তিনি 'বর্তমানের কবি' তখনই তাঁর আসল স্বরূপ উন্মোচিত হয়ে যায় শব্দের আড়ালে তিনি আর নিজেকে আড়াল করে রাখতে পারেন না নমনীয় শব্দ গুচ্ছের মধ্যেই সত্য-সন্ধানীরা খুঁজে নেন তাঁকে

বর্তমানের নবজাগরণের তুর্যবাদক, সংগ্রামী চেতনার ধারক, মুসলিম পুনঃজাগরণের কান্ডারী, মানবতার পূজারী সাধক নজরুল এক প্রাণোচ্ছল, শুদ্ধ আদর্শের ধারক তাঁর সেই আদর্শ শান্তি ও মানবতার পথযাত্রায় চিরস্মরণীয় তথাপি স্বার্থবাদী সামাজিক বলয়ে আজো তিনি উপেক্ষিত নয় কি? নজরুল গবেষণা কেন্দ্রগুলো কি আজো সমগ্র  নজরুলকে আবিষ্কার করতে পেরেছে? নজরুলের আদর্শকে কি আমরা সমগ্র জাতির মাঝে ছড়িয়ে দিতে পেরেছি? পূর্ণ মর্যাদায় সুরক্ষিত করেছি নজরুলের সমাধি সৌধ? তথ্য-প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে নজরুলের ওপর কি সঠিক তথ্য নির্ভর কোন ওয়েবসাইট খুলতে পেরেছি? নজরুল চর্চার উদাসীনতা কেন বাঙালি   শিক্ষিত সমাজে? 'শাশ্বত বর্তমানের নজরুল' কে উপেক্ষা করে আমরা কোন্‌ বর্তমানকে রচনা করছি বা করতে পারবো? এ প্রশ্ন সমগ্র জাতির কাছে