পড়শী দেশে বাধা পেরোলো মহিলা বিল

 

 

সংলাপ

 

প্রথম বাধা টপকাতেই পেরিয়ে গেল ভারতের ১৪ বছর রাজ্যসভার অনুমোদন অন্তত পেল মহিলা বিল গত ৯ মার্চ মঙ্গলবার রাজ্যসভার ইতিহাসে এক স্মরণীয় দিন হিসাবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে দীর্ঘদিনের টালবাহানার পর এবারেও নানা বাধা-বিপত্তি,   ঘাত-প্রতিঘাত, নাটক, ইউ পি এ জোটেই বিভাজন, তৃণমূল কংগ্রেসের দ্বিচারিতা, সংসদদের অভব্য আচরণ, সাত সংসদকে গোটা বাজেট অধিবেশনের জন্যই সাসপেণ্ড, মার্শাল ডাকা - এতসব ঘটনার পরেও ১৮৬-১ ভোটে জিতে গেল মহিলা বিল তবে আইনে পরিণত হতে এখন প্রয়োজন লোকসভার অনুমোদন মহিলা বিলকে ঘিরে রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত যেদিকে মোড় নিচ্ছে বা ইউপিএ-র মধ্যেই যেভাবে কোন্দল শুরু হয়ে গেছে তাতে লোকসভায় বিলটি আনতে সরকারপক্ষ আদৌ উদ্যোগী হবে কিনা সে ব্যাপারে সংশয় থেকেই যাচ্ছে

মহিলা বিল প্রসঙ্গে এদিন রাজ্যসভায় সিপিআই(এম) সদস্য বৃন্দা কারাতই সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি বলেছেন আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি জোর দিয়েই বলেন, কারোর একার নয়, এই জয়ের স্বীকৃতি দীর্ঘদিন ধরে লড়াইয়ে থাকা মহিলা সংগঠনগুলিরই প্রাপ্য ১৯৮৬ সালে সরকারের তরফে মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ মনোনয়নের সুযোগ করে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হলেও মানতে চায়নি তারা উলটো প্রতিবাদী সুরে তারা জানিয়ে দিয়েছিলো, সংরক্ষণের ভিত্তিতে নির্বাচিত হয়েই আসতে চান মহিলারা তাদের সম্মিলিত চাপেরই ফলশ্রুতি এই মহিলা বিল সুযোগ পেলে মহিলারা যে অনেক কিছুই করতে পারেন সে কথা উদাহরণ সহকারে তুলে ধরেন বৃন্দা কারাত

ভোটের ব্যবধান বিশাল হলেও জয় এত সহজে আসেনি উলটো ঘটনার পর ঘটনা ঘরে গেছে, হেনস্তা হতে হয়েছে রাজ্যসভার চেয়ারম্যান তথা উপ-রাষ্ট্রপতি হামিদ আনসারিকেও ৮ মার্চ সোমবার সেই ন্যকারজনক ঘটনাটি ঘটে মহিলা বিলের বিরোধিতা করতে গিয়ে আর জে ডি এবং সমাজবাদী পার্টির সংসদরা অধ্যক্ষের আসনের দিকে তেড়ে যান, মাইক ভেঙে দেন, বিলের প্রতিলিপি ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ছুঁড়ে মারেন আনসারির দিকে, দু'একজন আবার রাজ্যসভার রিপোর্টারদের জন্য নির্দিষ্ট টেবিলের ওপর চড়ে নাচানাচিও করেন বিল পেশ হলেও পাস হয় না, বারবার মুলতবি হয়ে যায় সভার কাজ পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বিক্ষুব্ধদের পাশাপাশি বিরোধীদের সঙ্গেও আলোচনায় বসে সমাধানের    রাস্তা খোঁজেন সেই বৈঠকে সিপিআই(এম) সংসদ সীতারাম ইয়েচুরি পরিষ্কারই বলেছিলেন যে, আলোচনা করুন আপত্তি নেই কিন্তু বিলটি পাসের তৎপরতা দেখান দ্বিধাগ্রস্ত সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে ৯ মার্চ মঙ্গলবার অধিবেশনের শুরুতেই আনা হবে মহিলা বিল

গত ৮ মার্চ সোমবার ঘটনার দায়ে এদিন চেয়ারম্যান হামিদ আনসারি সাসপেণ্ড করে দেন সাত সংসদকে এরা হলেন, আরজেডি-র সুভাষ যাদব, সমাজবাদী পার্টির নন্দকিশোর যাদব, আমির আলম খান ও কমল আখতার, এলজেপি-র সাবির আলি এবং এখন কোনো দলের সঙ্গে যুক্ত   নন ইজাজ আলি এদের সাসপেণ্ডের প্রস্তাব আনেন সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী পৃথ্বীরাজ চৌহান এবং ধ্বনিভোটে তা গৃহীত হয়ে যায় এদের বিরুদ্ধে ২৫৬ ধারায় শাস্তির ব্যবস্থা নেয়া হয় তা সত্ত্বেও তারা সভাকক্ষ ছেড়ে যেতে চান না, উলটো মহিলা বিল বিরোধী স্লোগান দিতে থাকেন, ফের তেড়ে যান চেয়ারম্যানের আসনের দিকে শেষে মার্শাল ডাকতে হয়, তারাই টেনে বাইরে নিয়ে যান ওই সাত সংসদকে এরপর দুটো পর্যন্ত সভার কাজ মুলতবি ঘোষণা করে দেন আনসারি এদিন তার আগেও ১২টা পর্যন্ত সভা মুলতবি হয়েছিলো দুটো থেকে ৫৫ মিনিট বন্ধ থাকার পর সভার কাজ শুরু হলে চিৎকার-চেঁচামেচি জুড়ে দেন সমাজবাদী পার্টি এবং আরজেডি সদস্যরা শুরু হয় আলোচনা, চলে ভোটাভুটি পর্ব

বিলটি যখন পাস হলো ঘড়িতে তখন সন্ধ্যা ৬টা ৪৮ মিনিট মনমোহন সিংদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েও স্বভাব সিদ্ধভঙ্গিতেই ভোটদানে অনুপস্থিত থাকেন তৃণমূলের দুই সংসদ বি এস পি ভোটদানে বিরত থাকে এমনকি সভাকক্ষ ছেড়ে চলেও যায় আর জে ডি এবং সমাজবাদী পার্টির সদস্যরা কার্যত তাণ্ডব চালালেও অনুমোদন মিলে গেল লোকসভা এবং রাজ্য বিধানসভায় ৩৩ শতাংশ মহিলাদের জন্য আসন সংরক্ষণ সংক্রান্ত সংবিধান সংশোধনী বিলটি কংগ্রেস ছাড়াও বি জে পি, বামপন্থীরা, এ ডি এম কে এবং জে ডি (ইউ) বিলের পক্ষেই বক্তব্য রাখে এদিনও কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী মুলায়াম সিং যাদব এবং লালুপ্রসাদ যাদবকে বোঝানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হন উলটো তাদের সঙ্গে জুটে যান মমতা ব্যানার্জিও

সমাজবাদী পার্টি এবং আর জে ডি সদস্যরা যে অভিযোগ তুলে মহিলা বিলের বিরোধিতা করেন তার পাল্টা যুক্তি দেন বৃন্দা কারাত তিনি বলেন, প্রথমে পঞ্চায়েতে মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণের ব্যবস্থা হয় অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গেই সেই স্তরে কাজ করছেন মহিলারা এজন্যই লোকসভা এবং বিধানসভায় মহিলাদের জন্য আসন সংরক্ষণের বিষয়টি জোর পায় তার আরো যুক্তি, বিহার বিধানসভায় নির্বাচিত মহিলাদের মধ্যে ৬৫ শতাংশই পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের উত্তর প্রদেশে তেমনই জয়ী মহিলা বিধায়কদের ৭০ শতাংশই পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায় থেকে আসা অথবা তফসিলী জাতি ও আদিবাসী মুসলিম মেয়েদের এগিয়ে আসার নমুনা দিতে গিয়ে তিনি হায়দরাবাদ কর্পোরেশনের কথা বলেন সেখানে মহিলাদের জন্য ৫০টি আসন সংরক্ষিত তার মধ্যে মুসলিম মহিলা পৌর প্রতিনিধির সংখ্যা ১০ পরিশেষে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেন, এই বিলের পাসের জন্য মহিলা সংগঠনগুলিকে যেন অভিনন্দন জানানো হয় পাশাপাশি বিলটি লোকসভাতেও যাতে পাস হয় সে ব্যাপারে তার হস্তক্ষেপ দাবি করেন বৃন্দা কারাত

প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে বলেন, মহিলাদের ক্ষমতায়নের প্রশ্নে মহিলা বিলের রাজ্যসভায় অনুমোদন এক বৃহত্তম পদক্ষেপ এই বিল মোটেই মুসলিম বা তফসিলী জাতি-আদিবাসী বিরোধী নয় একইসঙ্গে তিনি হামিদ আনসারির ওপর হামলার জন্য ক্ষমা চেয়ে নেন

 

সংরক্ষণে

 

কটি আসন সংরক্ষণের আওতায় পড়বে? কোথায় হবে, কোথায় না?

আইন সভায় স্পষ্টভাবেই এক তৃতীয়াংশ বা ৩৩% সংরক্ষণ লোকসভার ৫৪এ আসনের মধ্যে মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে ১৮১টি আর ২৮টি রাজ্য বিধানসভার ৪,১০৯টি আসনের মধ্যে এই সংরক্ষণের আওতায় পড়বে ১৩৭০টি রাজ্যসভার আসনের ক্ষেত্রে এই সংরক্ষণ কার্যকরী হবে না

ইতোমধ্যেই সংরক্ষিত আসনেও কি তা কার্যকরী হবে?

অবশ্যই হবে যেমন তফসিলী জাতি ও আদিবাসীদের জন্য সংরক্ষিত আসনেও এক-তৃতীয়াংশ মহিলার নিয়ম কার্যকরী হবে অর্থাৎ তফসিলী জাতি ও আদিবাসীদের জন্য এখন সংরক্ষিত ১২২টি আসন মহিলা বিল কার্যকরী হলে এর মধ্যে ৪১টি সংরক্ষিত থাকবে মহিলাদের জন্য একই নিয়ম রাজ্য বিধানসভাগুলিতেও

সাংবিধানিক স্বীকৃতি কোন পথে?

সংবিধানের ৩৩০ ধারার পর যুক্ত হবে'৩৩০-এ' ধারা, তাতেই লোকসভায় মহিলাদের আসন সংরক্ষণের কথা থাকবে।   বিধানসভায় এই সংরক্ষণ করতে সংবিধানে যুক্ত হবে'৩৩১-এ' ধারা

অসংরক্ষিত আসনে মহিলারা কি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন?

পারবেন ৫৪৩টি আসনের সব কটিতেই দাঁড়াতে পারবেন মহিলারা যদিও সব কটিতেই পুরুষরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না

সংরক্ষিত আসন বাছাই হবে কী করে?

পর্যায়ক্রমে

যে রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে তিনের কম লোকসভার আসন রয়েছে সেখানে কী হবে?

একটি আসন থাকলে বিল পাসের পর প্রথম সাধারণ নির্বাচনে আসনটি মহিলা সংরক্ষিত হবে পরে প্রতি তৃতীয় সাধারণ নির্বাচনে এই সংরক্ষণ নিয়ম কাজ করবে যদি আসন দুটি হবে পর্যায়ক্রমে প্রতি তিনটি জোটে এই নিয়ম কাজ করবে

তাহলে লোকসভায় মোট সংরক্ষিত আসন কত হবে?

মহিলাদের জন্য ৩৩%, তফসিলী জাতি ও আদিবাসীদের জন্য সংরক্ষিত ২২% যদিও এই ২২% এর মধ্যেও থাকছে মহিলাদের সংরক্ষণ, তাই মহিলা বাদে সংরক্ষণটা দাঁড়াচ্ছে ১৫%-এর মতো অর্থাৎ সবমিলিয়ে সংরক্ষণ দাঁড়ালো ৪৮%-এর কাছাকাছি

 

যার শেষ ভালো তার সব ভালো

 

১৪ বছর অপেক্ষার পর রাজ্যসভার অনুমোদন পেল মহিলা বিল এই আইন বলে লোকসভা ও রাজ্য বিধানসভাগুলির ৩৩ শতাংশ আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত হবে তবে রাজ্যসভার অনুমোদন মানেই আইন হিসাবে কার্যকর হওয়া নয় প্রথম বাধা পেরোলেও এখনও বাকি রয়েছে আসল অনুমোদন আইন হিসাবে কার্যকর করতে হলে বিল পাস করাতে হবে সংসদের দুই কক্ষেই সংবিধান সংশোধন বিলের জন্য প্রয়োজন হবে দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতার লোকসভার অনুমোদন ছাড়াও অন্তত অর্ধেক সংখ্যক রাজ্যে বিল পাস করাতে হবে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত অনুমোদন নিতে হবে রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে সংরক্ষিত আসন নির্বাচনের জন্য আর একটা বিল পাস করাতে হবে এরপর নির্বাচন কমিশনকে আসনগুলিকে নির্দিষ্ট করে বিজ্ঞপ্তি জারি করতে হবে এই ধাপগুলি পেরিয়ে দেশের আইনসভার কাঠামো সংক্রান্ত এই ঐতিহাসিক পরিবর্তন করা সম্ভব হবে বামপন্থী মহিলা সংগঠনগুলি দীর্ঘদিন ধরে এই দাবি জানিয়ে আসছিল এবারের অধিবেশনে অনেক টানাপোড়েনের পর রাজ্যসভার বিলটি পাস করানো সম্ভব হয়েছে কিন্তু রাজ্যসভার অনুমোদনের পরেও লোকসভার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা রয়েছে এই অনিশ্চয়তার অন্যতম কারণ ইউ পি এ জোটের মধ্যেই মতবিরোধ

ইউ পি এ জোটের বড় শরিক তৃণমূল কংগ্রেসের নির্দেশে তাদের দুই সংসদ রাজ্যসভার ভোটাভুটিতে অনুপস্থিত থেকে তৃণমূল কংগ্রেস পরিষ্কার করে দিয়েছে তারা মহিলাদের জন্য আসন সংরক্ষণ চায় না প্রকাশ্য যুক্তি হিসেবে অবশ্য তৃণমূল নেত্রী বলেছেন, শরিক দলের সঙ্গে কোনরকম পরামর্শ ছাড়াই, বিলটিকে ভোটাভুটিতে নেয়া হয়েছে এই পদ্ধতি অত্যন্ত অগণতান্ত্রিক সে কারণেই তারা ভোটে যোগ দিচ্ছেন না কিন্তু অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি যখন সব রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে আলোচনা করেছিলেন তখন রাজ্যসভার তৃণমূল সংসদ এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মুকুল রায় উপস্থিত ছিলেন ফলে আলোচনা ছাড়া বিলটি ভোটে দেয়া হয়েছে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে তৃণমূলের এই অভিযোগ প্রযোজ্য নয় তৃণমূলের এই আচমকা অবস্থান বদলে বিস্মিত সোনিয়া গান্ধী বলেছেন, মমতা ব্যানার্জির আচরণ শিষ্টাচার বিরোধী সোনিয়া গান্ধী যতই বিস্মিত হোন না কেন তৃণমূল কংগ্রেসের এই ভোল বদলের কারণ হলো তার দেউলিয়া রাজনীতি তৃণমূলের কোনো নির্দিষ্ট দলীয় নীতি বা আদর্শ নেই নেই কোনো বলিষ্ঠ রাজনৈতিক অবস্থান কোনো দলের সঙ্গে জোটবাঁধা অথবা রাজনৈতিক অবস্থান, সব কিছুতেই তৃণমূল সুবিধাবাদী পথ খোঁজে এই মুহূর্তে তারা ওপার বাংলার সংখ্যালঘুদের বিভ্রান্ত করে ভোটে চমক সৃষ্টি করার জন্যই মহিলা বিল থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তৃণমূলের সঙ্গে রয়েছে ইউ পি এ'র অন্য শরিক ডি এম কে সরকারের দুই সমর্থক সমাজবাদী পার্টি এবং আর জে ডি এই বিলের সম্পূর্ণ বিরোধী এই বাধা সত্ত্বেও রাজ্যসভাতে বিল এবার পাশ করা সম্ভব হয়েছে বামপন্থী ও অন্যান্য দলের সমর্থনের জন্য রাজ্যসভার মত ঝুঁকি নিয়ে কংগ্রেস লোকসভাতে এই বিল পেশ করবে কি না তাই নিয়ে সন্দেহ রয়েছে

মহিলা সংরক্ষণ বিল প্রথম পেশ করা হয় ১৯৯৬ সালে দেবেগৌড়া সরকারের সময় কিন্তু বিলটি পাস করাতে পারেনি ওই সরকার তারপরেও বেশ কয়েকবার বিলটি পাস করানোর চেষ্টা হয়েছে কিন্তু প্রকৃত সদিচ্ছার অভাবে কোনো সরকারই সে কাজে সফল হয়নি এই সময়ের মধ্যে বামপন্থীদের উদ্যোগে গোটা দেশে বিলটির সমর্থনের জনভিত্তি গড়ে উঠেছে সেই ভিত্তিকে ধরেই কংগ্রেস রাজ্যসভা পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছে কিন্তু শেষ পর্যন্ত আইনে পরিণত করার ক্ষেত্রে কংগ্রেস কতটা সদিচ্ছার পরিচয় দেবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে নাকি শরিক ও অন্য কয়েকটি রাজনৈতিক দলের চাপে লোকসভার ক্ষেত্রে পিছিয়ে যাবে কংগ্রেস?

অর্ধেক কাজ সারা বাকি অর্ধেক কবে? রাজ্যসভার পর এবার লোকসভায় মহিলা বিল পাস করানোর পালা সংসদের বাজেট অধিবেশনের চলতি পর্যায় চলেছে মঙ্গলবার, ১৬ মার্চ পর্যন্ত তার পর লম্বা বিরতি এপ্রিলের ১২ তারিখ থেকে অধিবেশনের পরের পর্যায় তখনই সম্ভবত লোকসভায় এই ঐতিহাসিক বিল পাস করানোর উদ্যোগ নেবে সরকার সংসদীয় দপ্তরের মন্ত্রী পবনকুমার বনশলের কথায় সেরকমই ইঙ্গিত মেলে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে আইনমন্ত্রী বীরাপ্পা মইলি অবশ্য এমন কথাও বলেন, এ মাসের ১৫ বা ১৬ মার্চ তারিখও বিলটি আনা অসম্ভব নয় কিন্তু সরকার এবং কংগ্রেসের নেতাদের কথাবার্তায় যেটি বেরিয়ে আসে, তা হল, তাড়াহুড়োর কিছু নেই বনশলের ভাষায়, পরিবেশ-পরিস্থিতি একটু ঠান্ডা হোক অর্থ সংক্রান্ত বিল পাস করানোর ব্যাপারও আছে তাছাড়া রাজ্যসভায় যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা না হওয়াই কাম্য আমরা সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলতে চাই ৭ মে পর্যন্ত চলবে বাজেট অধিবেশন তার মধ্যেই বিল লোকসভায় আসবে, আশ্বাস বনশলের আসলে, লোকসভায় মহিলা বিল পেশ করার আগে অর্থ বিল পাস করিয়ে নেয়ার ভাবনা চলছে মহিলা বিল পাস হয়ে গেলে লালু-মুলায়মদের সমর্থন প্রত্যাহারের সুযোগ নিয়ে বি জে পি অর্থ বিল নিয়ে সরকারকে বিপাকে ফেলার চেষ্টা করবে না, এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই কোনও রকম ঝুঁকি নেয়া ঠিক হবে না, এরকমই ভাবছেন কংগ্রেসের শীর্ষনেতারা উদ্যোগ আয়োজনও শুরু হয়ে গেছে এর মধ্যেই ইঙ্গিত, লালু-মুলায়মরা সমর্থন প্রত্যাহারের ব্যাপারে আর তাড়াহুড়ো করছেন না অনাস্থা প্রস্তাব আনার ব্যাপারে এক পা এগিয়েও আজ আবার পিছিয়ে গেছেন বলছেন, সংখ্যার ঘাটতি কিন্তু গোলমেলে সম্পত্তির মামলায় সুপ্রিম কোর্টে আজ সি বি আই লালু-রাবড়ির পক্ষে দাঁড়ানোয় রাজনৈতিক মহলে অন্য সন্দেহও উঁকি দিচ্ছে লালুর সঙ্গে কোনও বোঝাপড়ায় আসছে কংগ্রেস? তিক্ততার মাঝেও বোঝাপড়ার প্রক্রিয়া চলছে তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে সোনিয়া গান্ধী চান না, রাজ্যসভার  পরিস্থিতি তৈরি হোক লোকসভায় কবে লোকসভায় বিল পেশ হবে এ নিয়ে মুখ খুলতে রাজি হননি কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী জানিয়েছেন এ কথাও, অনেক  ঝুঁকি নিয়েই তিনি এগিয়েছেন মহিলা বিল পাস করানোর ব্যাপারে দলের শীর্ষনেতাদের সঙ্গে সেই ঝুঁকির মাপজোক সেরে সন্তর্পণেই ইতিহাস রচনার বাকি কাজটা সারতে চান তিনি আর বামেরা  যে এই লক্ষ্যে  অঙ্গীকারবদ্ধ তা স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন সি পি এম সাধারণ সম্পাদক প্রকাশ কারাত তিনি বলেন, আমরা বিলে সমর্থন দিয়েই যাব রাজ্যসভায় কাল পুরোদস্তুর আলোচনা হয়েছে লোকসভাতেও আলোচনার পরই বিল পাস করা উচিত আইনমন্ত্রী মইলি নিশ্চিত, ২০১৪-র লোকসভা ভোটেই সংরক্ষিত আসনের সুযোগ পাবেন মহিলারা

 

নারী-সমতা-নারী দিবস ভাবনা

 

 

 

 

সংলাপ

 

একশো বছর আগে, ১৯১০ সালের ২৭শে আগস্ট কোপেনহেগেনে বসেছিল আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক মহিলা সম্মেলন সেই সম্মেলনে বিপ্লবী নেত্রী ক্লারা জেটকিন, আলেকজান্ড্রা কোলান্তাই এবং অন্যান্যরা মিলে'আন্তর্জাতিক নারী দিবস' পালনের প্রস্তাব নিয়েছিলেন

 

ঐতিহাসিক প্রস্তাব

 

সেই প্রস্তাবে বলা হয়েছিল,'প্রত্যেকটি দেশের সর্বহারাদের শ্রেণী সচেতন, রাজনৈতিক এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সমস্ত দেশের সমাজতান্ত্রিক মহিলারা প্রতি বছর একটি দিন নারী দিবস হিসেবে পালন করবেন এর মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মহিলা ভোটাধিকার অর্জন করা সমাজতান্ত্রিক ধ্যানধারণার সঙ্গে সামগ্রিকভাবে মহিলাদের প্রশ্নটি মিলিয়ে এই দাবিকে তুলে ধরতে হবে অবশ্যই নারী দিবসের একটি আন্তর্জাতিক চরিত্র থাকতে হবে এবং খুব সচেতনভাবে তা তৈরি করতে হবে' যে শ্লোগানটি গ্রহণ করা হয়েছিল, তা হলো,'মহিলাদের জন্য ভোটাধিকারই সমাজতন্ত্রের জন্য লড়াইয়ে আমাদের শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করবে' এই দিবস পালনের জন্য সে সময় কোনো নির্দিষ্ট দিন ঠিক করা হয়নি

 

প্রথম নারী দিবস পালন

 

১৭টি দেশের প্রতিনিধিত্বকারী শ্রমিক সংগঠন, সমাজতান্ত্রিক দল, কর্মরত মহিলাদের ক্লাব এবং ফিনল্যাণ্ডের সংসদে নির্বাচিত প্রথম তিনজন মহিলা সাংসদ সহ মহিলাদের ১০০ জন প্রতিনিধির মতামতের ভিত্তিতে ঐকমত্যভাবে প্রস্তাবটি গ্রহণ করা হয় কোপেনহেগেনের উদ্যোগের ফল হিসেবে তার পরের বছর, ১৯১১ সালে লক্ষ লক্ষ নারী পুরুষের মিছিল হয় জার্মানি, অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, সুইজারল্যাণ্ড এবং অন্যান্য ইউরোপীয় দেশে ১৮৪৮ সালে প্রুশিয়ার রাজার বিরুদ্ধে যে সশস্ত্র অভ্যুত্থান হয়েছিল, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ১৯শে মার্চ দিন ধার্য করা হয় পরে বলশেভিক পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিতে নির্বাচিত প্রথম মহিলা আলেকজান্ড্রা কোলান্তাই সেই মিছিলের বর্ণনা দিয়ে লিখেছিলেন,'... বিক্ষোভ সমস্ত প্রত্যাশাকে ছাপিয়ে গিয়েছিল জার্মানি এবং অস্ট্রিয়া ... মহিলাদের কম্পমান সমুদ্রের মতো লাগছিল সব জায়গায় সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল ... ছোট শহর এমনকি গ্রামেও হলগুলো এতোটাই কানায় কানায় ভরে গিয়েছিল যে, তারা বাধ্য হন আসন করতে সবচেয়ে বড় যে বিক্ষোভ হয়েছিল, তাতে অংশ নিয়েছিলেন ৩০ হাজার জন পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ব্যানারগুলো সরিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কিন্তু তাতে মহিলারা প্রতিবাদে ফেটে পড়েন সেই সংঘর্ষে রক্তপাত এড়ানো সম্ভব হয়েছিল একমাত্র সমাজতান্ত্রিক নেতৃত্বের হস্তক্ষেপে

জারের রাশিয়ায় মহিলারা এই দিনটি পালন করতেন ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ রবিবার (পালন করা হতো জুলিয়ান ক্যালেণ্ডার অনুযায়ী, কিন্তু বিশ্বের বাকি অন্য দেশে গ্রেগোরিয়ান ক্যালেণ্ডার অনুযায়ী দিনটি ছিল ৮ই মার্চ) আমেরিকায় এরই মধ্যে ১৯০৮ সালে জাতীয় নারী দিবস পালন করা হয়ে গিয়েছিল এমন দিন পালন বিশ্বের মধ্যে সে-ই ছিল প্রথম আমেরিকায় বিক্ষোভ সমাবেশে বিপুল মহিলার অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই দিন পালন করা হয়েছিল মহিলাদের আর্থিক এবং ভোটাধিকারের দাবিতে বস্ত্র কারখানা মহিলা শ্রমিকরা জঙ্গী ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিলেন তাদের উপর চলছিল পুলিশী দমন এই বস্ত্র শ্রমিকদের দাবিও জুড়ে যায় মহিলা দিবস পালনের সঙ্গে যুদ্ধের জন্য সাম্রাজ্যবাদীদের প্রস্তুতি দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক দিবস পালনে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিল প্রতিটি দেশের মহিলারা যুদ্ধের বিরুদ্ধে শান্তির জন্য ডাক দিয়েছিলেন ১৯১৩ সালেই এই আন্তর্জাতিক মহিলা দিবসকে ৮ই মার্চে নিয়ে যাওয়া হয়

কিন্তু তার পরের বছরই বিশ্ব যুদ্ধ শুরু হয় তবে ১৯১৫ এবং ১৯১৬ সালে এই দিন পালনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, কিন্তু সব দেশের যুদ্ধবাজরা শান্তিকর্মীদের পিছনে তাড়া করে বেড়িয়েছিল এবং সব দেশেই জনসমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল কোলান্তাই জানিয়েছেন, এই সময়কালে একমাত্র নরওয়েতেই প্রকাশ্যে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা সম্ভব হয় এবং একত্রিত হয়ে সাহসের সঙ্গে শান্তির সপক্ষে প্রস্তাব নিয়েছিলেন

 

মহিলা দিবস, ১৯৯৭

 

এরপর এলো ১৯১৭ সালের সেই বছর রাশিয়ায় মহিলা শ্রমিকরা যখন পেট্রোগ্রাডে ৮ই মার্চের জন্য সমবেত হতে শুরু করেছিলেন, সে সময়ই জারের ঘৃণিত শাসনের বিরুদ্ধে ঝড় শুরু হয়েছিল পেট্রোগ্রাডের রাস্তায় নেমে এসেছিলেন মহিলা শ্রমিক, সেনাদের স্ত্রীরা, শ্রমজীবী অংশের বাড়ির স্ত্রীরা, ক্ষুধার শিকার এবং বিচারাধীন যুদ্ধবন্দীরা তারা যুদ্ধকে অস্বীকার করেছিলেন তারা দাবি করেছিলেন তাদের যন্ত্রণার অবসানের, তারা ডাক দিয়েছিলেন শান্তির জন্য এবং ক্ষুধা মেটানোর জন্য শ্রমিক এবং সেনাবাহিনীর যোগদানের মধ্য দিয়ে শক্তি এবং প্রত্যয় সঞ্চয় করে তারা ভাসিয়ে দিয়েছিলেন পথঘাট ৮ই মার্চে মহিলাদের সেই বিক্ষোভ ঐতিহাসিক ভাবে মানুষের ক্ষোভকে উসকে দিয়েছিল তুমুল এবং বিপ্লবী ঘটনা যার মধ্য দিয়েই প্রতিষ্ঠা হয়েছিল বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক দেশের পেট্রোগ্রাড এবং জারের রাশিয়ার অন্যান্য জায়গার মহিলারা তাদের লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে কার্ল মার্কসের একটি বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছিলেন ১৮৬৮ সালের ১২ই ডিসেম্বর লুডইউগ কুডেলোমানকে এক চিঠিতে কার্ল মার্কস লিখেছিলেন,'যারাই ইতিহাসের কিছু জানে, তারা এও জানেন যে, মহিলাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া বিশাল কোনো সামাজিক বিপ্লব সম্ভব নয়'

 

পরবর্তী উন্নয়ন

 

শ্রমিক শ্রেণীর রাষ্ট্র প্রথম ১৯২২ সালে নারী দিবস পালনের জন্য ৮ই মার্চ ছুটি ঘোষণা করে সেই বছরই আবার চীনেও প্রথম নারী দিবস পালিত হয় নারী দিবস পালন একটা গতি পেয়ে যায় ভারতে নারী দিবস প্রথম পালিত হয় ১৯৩১ সালে সে বছর লাহোরে ছিল সাম্যের দাবিতে এশীয় মহিলাদের সম্মেলন ওই সম্মেলন থেকে মহিলাদের জন্য সাম্যের দাবিতে প্রস্তাব নেয়ার পাশাপাশি এর সঙ্গে এক করে দেয়া হয়েছিল দেশের স্বাধীনতার দাবিতে নেয়া প্রস্তাবটিকেও গৃহীত হয়েছিল দু'টি প্রস্তাবই

অবশ্য বামপন্থী মহিলা সংগঠনগুলো সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর সঙ্গে ঐতিহ্য মেনে নারী দিবস পালন করে আসছিল গত শতাব্দীর ৬০'র দশক থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের অধিকাংশ দেশে'নারীবাদী জোয়ার' ছড়িয়ে পড়ে আরো বেশি বেশি দেশে পালিত হতে থাকে নারী দিবস ফলে ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘ বাধ্য হয় একটি প্রস্তাব গ্রহণ করতে

মহিলাদের আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক ফেডারেশন (ডব্লিউআইডিএফ)'র সভানেত্রীর প্রস্তাব মতো জাতিসংঘ ৮ই মার্চকে সরকারিভাবে ঘোষণা করে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে এই ঘোষণা স্বাগত হলেও ৮ই মার্চের সমাজতান্ত্রিক উৎস লঘু হয়ে যাওয়ার ভিত্তি তৈরি করে মহিলাদের লড়াই বিশেষত ধনতান্ত্রিক পরিকাঠামোয় শ্রমজীবী মহিলাদের শোষণের বিরুদ্ধে মহিলাদের লড়াইয়ের ইতিহাস লঘু হয়ে পড়ে ৮ই মার্চের সমাজতান্ত্রিক উৎসকে মনে রাখা অত্যন্ত জরুরি এবং একইসঙ্গে বাজার নিয়ন্ত্রিত মেয়েলি উৎসবের অঙ্গ যাতে এই দিনটি না হয়ে পড়ে, সেদিকেও নজর রাখা খুবই প্রয়োজন

 

দু'টি অভিমুখ

 

৮ই মার্চের দু'টি দিক এখনও বাংলার বাঙালির কাছে খুবই প্রাসঙ্গিক প্রথম এবং সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ধনতান্ত্রিক শোষণের অবসান ঘটাতে এবং সমাজতান্ত্রিক বিকল্প গড়ে তোলার জন্য বিশেষত শ্রমজীবী মহিলা এবং শ্রমিক শ্রেণীর মহিলাদের যত দ্রুত সম্ভব সংগঠিত করার গুরুত্ব বুঝতে পারা মহিলাদের ক্ষমতায়নের লড়াইকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সর্বহারা মহিলাদের অনস্বীকার্য ভূমিকার ভিত্তি ছিল ইউরোপ, রাশিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শ্রমজীবী মহিলাদের জঙ্গী আন্দোলন কারখানার সবচেয়ে খারাপ পরিবেশে কাজ করা মহিলা এবং শিশু শ্রমিকরাই সবচেয়ে বেশি লাভ এনে দেয় ক্যাপিটাল'-এর প্রথম খণ্ডে মার্কস লিখেছেন,'যন্ত্রের ব্যবহারকারী ধনতন্ত্রীরা সেই কারণে সবার আগে মহিলা এবং শিশু শ্রমিকদের খোঁজ করতো। ...'শ্রমজীবী মহিলাদের শোষণের বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রচেষ্টার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন সমাজতান্ত্রিক মহিলা কর্মীরা মার্কস এবং এঙ্গেলসের নেতৃত্বে প্রথম আন্তর্জাতিক ভাবে এর সঙ্গে যুক্ত সমস্ত শাখাকে শ্রমজীবী মহিলা সহ সমস্ত শ্রমজীবী অংশের জন্য আন্দোলন করার স্পষ্ট নির্দেশ দেয়া হয়েছিল এই দাবি তৈরির লক্ষ্যে সঠিক তথ্য সংগ্রহের জন্য আন্তর্জাতিক একটি বিস্তারিত প্রশ্নপত্রও দেয়া হয়েছিল এর মধ্যে ছিল দাসশ্রমিকদের মতো কাজ করে যাওয়া মহিলা এবং শিশু শ্রমিকদের জন্য দিনে ৮ঘণ্টা কাজের দাবিতে সংস্কার পূর্ব লন্ডনের কারখানাগুলোতে শ্রমজীবী মহিলাদের সংগঠিত করার কাজে মার্কসের মেয়ে ইলিয়নের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন ১৮৮৮ সালে লন্ডনে কারখানাগুলোর অধিকাংশ শ্রমশক্তি-কিশোরী থেকে শুরু করে বৃদ্ধা সকলেই কাজ বন্ধ করে দিয়েছিলেন তাদের এই আন্দোলনকে সমর্থন জানানো লেখকদের সামনে একটা পর্বত প্রমাণ কাজ ছিল কারণ এই পৃথক দিবস পালনকে অনেকেই মনে করতেন, এই পদক্ষেপের ফলে শ্রমিক শ্রেণীর লড়াই বিভক্ত হয়ে পড়বে এই বোঝানোর কাজে সফলও হয়েছিলেন তারা পরে ১৯২০ সালে লেনিনের সঙ্গে জেটকিনের বিখ্যাত সেই আলাপচারিতায় শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে সমাজতান্ত্রিক সংগঠনে এবং শ্রমিক সংগঠনে যারা মহিলাদের মহিলা হিসেবে বিবেচনা করার গুরুত্ব বুঝতেন না, তাদের কড়া সমালোচনা করেছিলেন লেনিন বর্তমান সময়েও সেই শিক্ষা একইরকমভাবে প্রাসঙ্গিক

বর্তমান নয়া-উদারবাদী কাঠামোয়  শ্রমজীবী মহিলা, শ্রমজীবী দরিদ্র অংশই যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, তা আমরা জানি সমাজকল্যাণের ভূমিকা থেকে ধর্মের নামে রাষ্ট্রের সরে যাওয়ার নীতি এবং বাজারের উপর অনেক বেশি মাত্রায় নির্ভর করার ফলে চড় চড় করে বেড়ে চলেছে মুদ্রস্ফীতির হার, বেকারী, ছাঁটাই এবং কমছে বেতন-মজুরি এই সব কারণই সবচেয়ে মারাত্মকভাবে প্রভাব ফেলেছে বাংলার মহিলাদের উপর এই প্রভাবের খারাপ প্রতিফলন বোঝা যাচ্ছে মহিলা এবং কন্যাশিশুদের মধ্যে অপুষ্টির উচ্চ হার মহিলারা নিজেদের সংগঠিত করতে পারছেন না সেখানে প্রতিরোধ বাড়ছে না নির্যাতন চলছে দরিদ্র মানুষের বিভিন্ন লড়াইয়ে যথার্থই মহিলারা বিরাট সংখ্যায় উপস্থিত থাকতে পারছেন না এর জন্য প্রয়োজন আরো সংহত এবং সুনির্দিষ্ট প্রচেষ্টা

তৎকালীন সময়ে আরো একটি সমান গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা স্মরণীয় উদার বুর্জোয়া মহিলা সংগঠন এবং গোষ্ঠিগুলোর নেতৃত্বে জঙ্গী মহিলা আন্দোলনে জোরালো হচ্ছিল মহিলাদের রাজনৈতিক ভোটাধিকারের দাবি এই দাবি ভাসিয়ে দিচ্ছিলো ব্রিটেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশকে ভোটাধিকারের আন্দোলনের নামে পরিচিত এই আন্দোলনে ভোটাধিকারের দাবিতে রাস্তায় নেমে জঙ্গী লড়াই করেছিলেন বুর্জোয়া শ্রেণীর শিক্ষিত মহিলারা এই লড়াইয়ের প্রতি সমাজতান্ত্রিক মহিলাদের দৃষ্টিভঙ্গী কী হওয়া উচিত? একশো বছর পর এর উত্তর নিশ্চিত বলা সম্ভব কিন্তু সে সময় ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক মহিলাদেরও একটা লড়াই লড়তে হয়েছিল পুরুষদের সঙ্গে সমান শর্তে মহিলাদেরও ভোটাধিকার দেয়ার দাবিতে সংগঠিত আন্দোলনকে তাদেরও যে সমর্থন করা উচিত, তা সমাজতান্ত্রিকদেরকেও বোঝাতে এবং তার সমর্থনে প্রস্তাব গ্রহণ করতে লড়তে হয়েছিল তাদের দ্বিতীয়: আন্তর্জাতিক ভাবে এর বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠেছিল তাদের বক্তব্য ছিল, গির্জাগুলো এর জোরালো বিরোধিতা করবে এবং ভোটাধিকারের  দাবিতে শ্রমিকদের আন্দোলনে এর ফলে অহেতুক বাধা তৈরি হবে কারণ সে সময় অধিকাংশ দেশে শুধুমাত্র জমিদারদেরই ভোটাধিকার ছিল অন্যরা প্রশ্ন তুলেছিলেন, মহিলাদের ভোটাধিকারের দাবিতে আন্দোলনের সেটাই উপযুক্ত সময় ছিল কিনা কারণ তাদের আশঙ্কা ছিল, এই দাবির যৌক্তিকতা শ্রমিকদের বোঝাতে অনেক সময় লাগবে এবং তার ফলে বিভক্ত হয়ে পড়বেন শ্রমিকরাও অন্যরা এও মনে করেছিলেন, মহিলাদের ভোটাধিকারের দাবি বিভেদ ডেকে আনবে এবং শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলনকে বিভ্রান্ত করার লক্ষ্যে এটা শাসক শ্রেণীর একটা চাল এই সমস্ত মতবিরোধই প্রকাশ্যে চলে এসেছিল ১৯০৭ সালে সে সময় স্টুটগার্ডে চলছিল সমাজতান্ত্রিক মহিলাদের প্রথম বৈঠকের প্রস্তুতি এই বৈঠক ছিল ১৯০৭ সালে স্টুটগার্ডের বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন ৫৮ জন মহিলা তাদের কাছ থেকে প্রত্যাশা করা হয়েছিল যে, তারা একটি প্রস্তাব গ্রহণ করবে এবং তা দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের মতো বৃহত্তর বৈঠকে পেশ করবেন এই বৈঠকও ওই একই সময়ে হয়েছিল এবং তাতে অংশ নিয়েছিলেন ৯০০ জন প্রতিনিধি তারই পরিপ্রেক্ষিতে ক্লারা জেটকিনের মতো নেত্রীরা হস্তক্ষেপ করেন এবং পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করে বলেন, শ্রেণী সংগ্রাম এবং তাকে ভোটাধিকারের মাধ্যমে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জনগণের সঙ্গে মহিলাদের সরাসরি অংশগ্রহণের যোগ্যসূত্র রয়েছে তারা এর গুরুত্বও তুলে ধরেন শুধুমাত্র কয়েকজন অভিজাত মহিলা এই দাবি তুলেছেন বলে তার মানে এই নয় যে, এই দাবির সঙ্গে শ্রমিক শ্রেণীর কোনো যোগাযোগ নেই বরং ঠিক তার বিপরীত সমাজ সচেতন মহিলাদের অবশ্যই এই আন্দোলনে হস্তক্ষেপ করা উচিত

মহিলাদের জন্য ভোটাধিকার সমাজতন্ত্রের জন্য আমাদের লড়াইয়ের শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করবে' ঠিক তার ১০ বছর পর, অন্যতম প্রথম যে পদক্ষেপটি জারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর ক্ষমতা গ্রহণ করা কনস্টিটুয়েন্ট অ্যাসেম্বলি নিয়েছিল, তাতে রাশিয়াই প্রথম দেশ, যারা কোনোরকম শর্ত ছাড়াই মহিলাদের ভোটাধিকার দিয়েছিল বর্তমান সময়ে আমাদের দেশে মহিলা সংরক্ষণ বিল এবং পঞ্চায়েত ও পৌরসভাগুলোতে মহিলাদের জন্য সংরক্ষণ বাড়ানো নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে মহিলাদের কি করতে হবে

৮ই মার্চ পালনে দু'টি দিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক দিক এক হয়ে আন্দোলনের একটা শক্ত ভিত তৈরি করেছিল কোপেনহেগেনে যে ১০০ জন মহিলা ছিলেন, তারা হয়তো কল্পনাও করেননি যে সময়ের সাথে তা এতো বড় আকার নেবে এবং ১০০ বছর পরেও তা পালন করা হবে এর প্রাসঙ্গিকতার প্রকৃতি ১০০ বছর আগেও যেমন ছিলো, এখনও সেরকমই রয়ে গেছে

 

পরবর্তী সময়ের গুরুত্ব

 

নয়া-উদারবাদী কাঠামোয় ক্রমাগত বিপুল পরিমাণ মুনাফার দিকে ধনতন্ত্রের ঝুঁকে পড়া ধনতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াইকে আগের থেকে আরো বেশি জরুরি করে দিয়েছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সাময়িকীকরণ, যুদ্ধের হিংসা এবং আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের সময়ে মহিলাদের বিরোচিত জমায়েতের মতো আবার ধর্মের নামে বেড়ী ভেঙ্গে এগিয়ে আসার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে দুঃখজনক এবং অনুতাপের বিষয় হলো, পরবর্তী সময়ে মহিলাদের আন্দোলনে নীতিহীনতা দেখা দিয়েছে এবং বিভিন্ন দেশে'নারীবাদী' গোষ্ঠিগুলো ধনতান্ত্রিক সংস্কৃতি দ্বারা পরিচালিত হয়েছে, যার ফলে মহিলাদের সংগঠিত প্রতিরোধ কোথাও কোথাও পিছিয়ে পড়েছে এক সময় কানাডার মহিলাদের একটি সংগঠন বিশ্বায়ন এবং সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ১০০টি মহিলা সংগঠনকে সংগঠিত করে, যাকে বলা হতো ওয়ার্ল্ড মার্চ অব্‌ উইমেন কিন্তু পরে এই আন্দোলন দূর্বল হয়ে পড়ে কারণ, তারা মূল দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সরে যায়।  শ্রেণী শক্তিকে দেখতে চান না, যারা মহিলাদের নতুন পদ্ধতিতে দমিয়ে রাখতে চায় সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের যুগে মহিলাদের নতুনভাবে দমন, নির্যাতন এবং শোষণ করা হচ্ছে মারাত্মকভাবে বিশ্বজুড়ে নারী পাচার বেড়ে গেছে, তারসঙ্গে শিশুদের বেঁচে দেয়া, যুদ্ধের জন্য জোর করে মহিলাদের যৌন ব্যবসায় নিয়ে আসা, বাস্তুচ্যুত করা, দারিদ্র্য - এই সবই বেড়ে গেছে অস্বাভাবিক হারে চলতে থাকা ধর্মীয় ফতোয়া অত্যন্ত মধ্যযুগীয় কায়দায়'পরিবারের সম্মান রক্ষা'র নামে নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা বাড়াচ্ছে মহিলাদের ক্ষমতায়নের জন্যও এবং যে কোন পদ্ধতিতে মহিলাদের'সম্মান রক্ষা'র জন্য ধর্মীয় উগ্রবাদের বিরুদ্ধে মহিলা সংগঠনগুলোকে লড়তে হবে দুঃখজনক ঘটনা হলো, যারা মহিলাদের স্বশাসনের বিষয়ে নিজেদের অগ্রণী বলে দাবি করেন, তারা এই গুরত্বপূর্ণ যোগ্যসূত্রটি দেখতে চান না

পরিশেষে বলা যায়, আন্তর্জাতিক নারী দিবস হলো মহিলাদের ক্ষমতায়নের দাবিতে এবং ধনতান্ত্রিক ও পিতৃতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একটি প্রতীক আমরা জানি, বাংলায় গণতন্ত্রের উন্নতির জন্য এবং অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের জন্য মহিলাদের একই মঞ্চে এনে দাঁড় করাতে সমতার দাবিকে সামনে রেখে বৃহৎ অংশের মহিলাদের একই জায়গায় নিয়ে আসতে হবে একই সময়ে আমরা এও জানি, দেশের একটি বিরাট অংশ শ্রমজীবী মহিলা গ্রাম এবং শহরের অসংগঠিত মহিলা শ্রমিকদের মূল দাবি এবং তাদের কথা তুলে ধরতে পারলে তবেই বাংলায় সফল হবে এই লড়াই মহিলারাই পারবেন দেশের বর্তমান পরিস্থিতির পরিবর্তন করতে

 

অস্ত্র ব্যবসায় ভারত-রাশিয়া কাছাকাছি হচ্ছে

সংলাপ

 

২০১০ সালে আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবস একশত বছর পূর্ণ করলো শ্রমজীবী নারী আন্দোলনের দাবির প্রেক্ষিতে সমাজতান্ত্রিক নারী সম্মেলনের পক্ষ থেকে এই দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় শিল্প বিপ্লবের সূচনা লগ্ন থেকেই শ্রমজীবী নারীদের উপর পুঁজিবাদী শোষণ শুরু হয় পুরুষ শ্রমিকদের থেকেও বেশি মাত্রায় ধনতান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থায় নারী ও শিশু শ্রমিকদের অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে শোষণের শিকার হতে হয় এই কথা কনডিশন অব ওয়ার্কিং ক্লাস ইন ইংল্যান্ড বইতে কার্ল মার্কস বিশদভাবে তুলে ধরেছিলেন এই শোষণের বিরুদ্ধে পুরুষদের সাথে নারী শ্রমিকরাও ঐক্যবদ্ধভাবে সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছে প্রথম থেকেই'প্রথম আন্তর্জাতিক সংগঠন' তৈরি করার সময় থেকে নারীপুরুষ উভয়কেই এক সংগঠনে যুক্ত করা হয় শ্রমজীবী নারীরাও তাদের বিভিন্ন দাবি নিয়ে সংগ্রামে অবতীর্ণ হয় ১৮৫৭ সালে নিউইয়র্কের দরজি শ্রমিক মেয়েরা মজুরি ও কাজের ঘণ্টা কমানোর দাবিতে মার্চ মাসব্যাপী আন্দোলন গড়ে তোলেন প্রায় সমসাময়িক সময়ে জার্মানের সুতাকল শ্রমিক মেয়েরাও আন্দোলনে নামে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স প্রভৃতি দেশের শ্রমিক নারীরা আন্দোলনে যুক্ত হয়

১৮৭১ সালের প্যারি কমিউনে নারী শ্রমিকরা উল্লেখযোগ্যভাবে অংশগ্রহণ করে তাদের সেই বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামকে উদ্দেশ্য করে কালমার্কস লিখেছেন, ''....... প্রকৃত প্যারি মহিলারা ব্যারিকেড ও বধ্যভূমিতে প্রফুল্ল মনে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন,'' বীর প্যারি নারী যোদ্ধাদের মধ্যে লুই মিচেল এবং এলিজাবেথ ডেভিডের নাম উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক বিচারের সময় মিচেল গর্বভরে ঘোষণা করেছিলেন, ''....... আমি সর্বতোভাবে বিপ্লবের সাথে যুক্ত এবং যা করেছি তার দায়িত্ব নিতে সম্পূর্ণ রাজি''

১৮৮৯ সালে ক্লারা জেন্টকিন প্যারি শহরে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে সর্বপ্রথম নারীপুরুষের সর্বক্ষেত্রে সমঅধিকারের দাবিটি উত্থাপন করেন, যা দেশে দেশে শ্রমজীবী নারীদের মধ্যে দারুণ উদ্দীপনা তৈরি করে ১৯০৭ সালে জার্মানির স্টুটগার্টে প্রথম আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে অন্যান্য দাবির সঙ্গে নারীর ভোটাধিকারের দাবিটিও উত্থাপিত হয় তারই প্রভাবে ১৯০৮ সালে নিউইয়র্ক দরজি শ্রমিক মেয়েরা সমমজুরি, ৮ ঘণ্টা কাজসহ ভোটাধিকারের দাবিটি গৃহীত হয়

১৯১০ সালে আন্তর্জাতিক নারী সংগঠনের দ্বিতীয় সম্মেলনে ভোটাধিকারের দাবিতে প্রতি বৎসর একটি দিন নারী দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় সেই অনুযায়ী পরবর্তী বছরগুলোতে মার্চ মাসের যে কোন একটি দিন আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবস পালন করা হয় ১৯১৪ সালে আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক নারী সম্মেলন মঞ্চ থেকে সিদ্ধান্ত হয় যে নিউইয়র্ক দরজি শ্রমিকদের ঐতিহাসিক ধর্মঘটকে স্মরণ করে ৮ই মার্চ প্রতি বছর আন্তর্জাতিক শ্রমদিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয় এই প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন সংগঠনের সম্পাদিকা ক্লারা জেটকিন নারীর ভোটাধিকারের আন্দোলন তৎকালীন প্রেক্ষিতে ছিল একটি বিশেষ বৈপ্লবিক আন্দোলন কারণ তখন পর্যন্ত কেবল মাত্র কয়েকটি দেশে সীমাবদ্ধভাবে নারীর ভোটাধিকার স্বীকৃতি লাভ করেছিল বুর্জোয়া নারীরাও ভোটাধিকারের দাবিতে সরব ছিলো, কিন্তু তারা শুধুমাত্র তাদের শ্রেণীর মেয়েদের জন্যই ভোটাধিকারের দাবিত তুলতে আগ্রহী ক্লারা জেটকিন তাই এই দাবিসহ নারী দিবস পালনের বিষয়টি খুব সুস্পষ্টভাবেই সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই বিশ্লেষণ করেছেন এবং একে আন্তর্জাতিক চরিত্র দিতেও সক্রিয় থেকেছেন

আজকের দিনে ৮ই মার্চ আমরা অবশ্যই স্মরণ করব এই দিনটির ঐতিহাসিক তাৎপর্যকে সূচনা লগ্ন থেকেই সমাজতান্ত্রিক নারী সংগঠন এই দিনটিকে নারী সমানাধিকার দিবস হিসাবে চিহ্নিত করে এসেছে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ বিরোধী আন্দোলনের মঞ্চ হিসাবেও দিবসটিকে ব্যবহার করা হয়েছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে ১৯১৩ সালের ৮ই মার্চ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সমাজতন্ত্রী নারী সংগঠনের উদ্যোগে যুদ্ধবিরোধী দিবস হিসাবে এটি প্রতিপালিত হয় ১৯১৭ সালে ৮ই মার্চ রাশিয়ার যুদ্ধের ও জারতন্ত্রের অবসানের দাবিতে কয়েক সহস্র মেয়ে রাশিয়ার তৎকালীন পেট্রোগাদে সমবেত হয়ে সভা করেন ১৯৩৬ সালে স্পেনের বিপ্লবী নেত্রী লা পাশিওনারার ডেলোরাম ইবারুরীর নেতৃত্বে ৮ই মার্চ আশি হাজার শ্রমজীবী নারী ফ্যাসিস্ত ফ্রাঙ্কো সরকারের বিরুদ্ধে শোভাযাত্রা ও পথ অবরোধ মাদ্রিদ শহরকে কাঁপিয়ে দিয়েছিলো ১৯৫০ সালের ৮ই মার্চ পশ্চিম জার্মানির তিন লক্ষ নারী চ্যান্সেলর আদিনুরকে নিরস্ত্রীকরণে দাবি জানিয়ে স্বাক্ষর পাঠিয়েছিলেন ইরানের সুতাকলের শ্রমজীবী নারীরা শান্তি ও খাদ্যের দাবিতে শোভাযাত্রা করে পাশাপাশি পঞ্চাশ হাজারের উপর মহিলা তৈলক্ষেত্র জাতীয়করণের দাবিতেও ৮ই মার্চ পথে নামে

যে দাবিগুলোর ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদ্‌যাপিত হয়েছে প্রারম্ভ থেকে সেগুলো আজও প্রাসঙ্গিক বিশেষ করে সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিপর্যয়ের পরে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বে বিশ্বব্যাপী যে যুদ্ধোন্মদনা তার বিরুদ্ধে নারী সমাজকে অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে ইরাক ও আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতায় আমরা লক্ষ্য করেছি যে সাম্রাজ্যবাদী এই যুদ্ধে অসামরিক জনগণের মধ্যে সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নারী ও শিশুরা যুদ্ধবিধ্বস্ত বিভিন্ন দেশে সামাজিক নিপীড়নও মেয়েদের উপর বৃদ্ধি পেয়েছে সামাজিক সুরক্ষার যে দাবি বারংবার উত্থাপিত হয়েছে আন্তর্জাতিক নারী দিবসে, বিশ্বায়নের অর্থনীতির কুপ্রভাবে সেইসব সামাজিক সুরক্ষার সিংহভাগই আজ উপেক্ষিত পুঁজিবাদী দুনিয়াসহ তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিভিন্ন দেশের নারী আন্দোলন আজ নারীদের অধিকারের দাবিতে সংগঠিত হচ্ছে আজকের দিনে জরুরি কাজ হচ্ছে ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও হিংসার বিরুদ্ধে শোষিত ও নিপীড়িত নারী সমাজকে সংগঠিত করা

শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষার প্রশ্নে নারীদের অবস্থান সারা পৃথিবী জুড়েই আজও বিপন্ন উদার অর্থনীতির ফলে মেয়েরা ক্রমশ প্রান্তবাসিনী হচ্ছে বিশ্বে নারী জনসংখ্যাও আজ হ্রাসমান তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কন্যা ভ্রুণহত্যার মতো লজ্জাজনক ঘটনাও ক্রমবর্ধমান পুত্র লালসাই এর অন্যতম মূল কারণ সাম্প্রতিক কালের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে প্রায় ৯ কোটি নারী বিশ্ব জনসংখ্যা থেকে নিখোঁজ এক ভারতবর্ষেই নারী জনসংখ্যার তুলনায় পুরুষের সংখ্যা ২৫০ কোটি বেশি বিশ্বের নিরক্ষর জনসংখ্যার দুই তৃতীয়াংশই নারী

বিশ্বে ক্ষুধা ক্লিষ্ট মানুষের ৭০ ভাগই হচ্ছে নারী এবং শিশু আমাদের দেশও এর ব্যতিক্রম নয় এর অন্যতম মূল কারণ অস্বাভাবিক হারে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি রাষ্ট্রসঙ্ঘের শাখা হিসাবে ফেয়ো (ফুড এন্ড এগ্রিকালচারাল অর্গানাইজেশন ) - এর মতো ২০০৭ সাল থেকে বিশ্ব বাজারে গমের দামই বেড়েছে ৭৭%, চালের দাম বেড়েছে ৩০ শতাংশের মতো এবং এই দাম কমার কোন লক্ষণ নেই উন্নয়নশীল দেশে খাদ্যশস্য উৎপাদনেও ঘাটতি দেখা যাচ্ছে

মূল্যবৃদ্ধি স্বল্প আয়ের কোটি কোটি মানুষকে আরো দারিদ্র্যের মধ্যে নামিয়ে আনবে বলে ধরে নেয়া হচ্ছে সর্বজনীন গণবণ্টন ব্যবস্থা কার্যকরী করতে হবে ক্ষুধা মুক্তির লড়াইয়ে শামিল করতে হবে ব্যাপক নারী সমাজকে উদার অর্থনীতির ফলে অন্য দেশগুলোর মতই আমাদের দেশেও দ্রুত বেড়ে চলেছে ধনী-দরিদ্রে ব্যবধান আর দরিদ্রের মধ্যে দরিদ্রতম অংশ মহিলারা বঞ্চিত হচ্ছে খাদ্য নিরাপত্তা থেকে খাদ্যের অধিকারকে বাঁচার অধিকারের মতই মৌলিক অধিকার হিসাবে স্বীকৃতি দিতে হবে

দারিদ্র্য বৃদ্ধির কারণে নারীদের প্রতিহিংসা বৃদ্ধি পাচ্ছে উত্তরোত্তর বিশ্বজুড়েই প্রতি দশ জন মেয়ের মধ্যে ছয় জন মেয়ে তাদের জীবদ্দশায় শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার হন এই হিংসাগুলো হচ্ছে পারিবারিক হিংসা, ধর্ষণ, যৌন হিংস্রতা, যৌন নিপীড়ন, বাধ্যতামূলক বিয়ে, সম্মান রক্ষার নামে অপরাধ, নারী পাচারসহ আরো বিভিন্ন ধরনের পৃথিবীর ৮৯টি দেশে পারিবারিক হিংসা রোধে কতিপয় আইনের ব্যবস্থা থাকলেও ১০২টি দেশে এই বিষয়ে কোন সুনির্দিষ্ট আইনই নেই

সন্ত্রাসবাদী বা জঙ্গী সংগঠনগুলো অস্ত্রের মুখে জোর করে মেয়েদের ব্যবহার করছে তাদের কাজে বিশেষ উগ্রপন্থী ধর্মীয় সংগঠন আমাদের বেশ কয়েকটি জেলায় দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে গুপ্ত হত্যা, নাশকতামূলক কাজে লিপ্ত করাচ্ছে উগ্রপন্থী বিভিন্ন সংগঠন মেয়েদের ড্রেস কোড, বা আচরণ বিধি প্রচলন করার নামেও তাদের উপর হিংসাত্মক আক্রমণ নামিয়ে আনছে

বিশ্বজুড়েই নারী পাচারের হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে বিশেষত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো থেকে দারিদ্র্যের কারণে ব্যাপক সংখ্যক নারী পাচার হচ্ছে প্রতিনিয়ত ভারতবর্ষে নারী পাচার চলছে রমরমিয়ে অথচ পাচার বিরোধী তেমন কোন আইন না থাকার ফলে পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভবপর হচ্ছে না নারী বা শিশু পাচার বন্ধে সরকারকে কঠোর আইন প্রণয়ন করতে হবে এই দাবি আন্তর্জাতিক নারী দিবসের সরকারকে আরো সুনির্দিষ্টভাবে দারিদ্র্যদূরীকরণ কর্মসূচী রূপায়ণে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে প্রান্তিক এবং দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাসকারী নারীদের বাজেটে আর্থিক বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে কর্মসংস্থানের প্রশ্নেও বিশ্বব্যাপী নারীদের অবস্থান অত্যন্ত করুণ বিশ্বায়নে উদার অর্থনীতির প্রভাবে কর্মসঙ্কোচনের বড় একটা আঘাত মেয়েদের উপর নেমে এসেছে গত দশক থেকে বর্তমান দশকে কর্মরত মেয়েদের সংখ্যা ২০ কোটি হ্রাস পেয়েছে অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরত মেয়েদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও তাদের জীবিকা স্থায়ী নয় বর্তমানে কাজের সন্ধানে পুরুষদের মতো বহুসংখ্যক মেয়ে স্থানান্তরে যেতে বাধ্য হচ্ছে এই পরিযায়ী নারী শ্রমিকদের জীবন অত্যন্ত সমস্যাসঙ্কুল স্বল্প মজুরিতে অত্যাধিক পরিশ্রম করতে বাধ্য হন অসংগঠিত ক্ষেত্রের নারী শ্রমিকরা বিশ্ব শ্রমসংস্থার হিসাব অনুযায়ী কর্মরত মেয়েদের বেশিরভাগ কৃষি কাজ ও খাদ্য উৎপাদনের কাজে নিযুক্ত অথচ প্রদীপের নিচেই অন্ধকার কারণ এই সমস্ত ক্ষেত্রে কর্মরত মেয়েরা মজুরি বৈষম্যের যেমন শিকার তেমনি বুভুক্ষা আর ক্ষুধারও শিকার

নারীর ক্ষমতায়নের প্রশ্নে আজ বিশ্ব আলোড়িত ১৯৯৫-এ বেজিং বিশ্বনারী সম্মেলনে নারীর হাতে আরো বেশি প্রশাসনিক দায়িত্ব তুলে দেবার কথা আলোচিত হয়েছে প্রায় পনেরো বছর অতিক্রান্ত একটি শতাব্দী পার করে নতুন শতাব্দীর এক দশকও পার হতে চলেছে বিশ্বজুড়ে খুব বেশি অগ্রগতি হয়নি যদিও এর মধ্যে কয়েকটি দেশে আইন সভায় নারীদের জন্য আসন সংরক্ষণ আইন পাস করার ফলে নারী প্রতিনিধির সংখ্যা আইন সভায় বৃদ্ধি পেয়েছে তা সত্ত্বেও পৃথিবীর পাঁচটি দেশে এখনও নারীরা ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ভোটাধিকারের যে দাবি নিয়ে শ্রমজীবী নারী আন্দোলন তাদের সংগ্রামের সূচনা করেছিল যা আজ পৃথিবীর প্রায় সমস্ত দেশেই স্বীকৃত তা আরো বৃহত্তরভাবে আত্মপ্রকাশ করেছে নারীদের জন্য আরো ক্ষমতায়নের স্বীকৃতির মাধ্যমে সামন্তবাদী, পুরুষ প্রধান মানসিকতাকে অতিক্রম করে এক ব্যাপক অংশের মেয়েরা প্রকৃত অর্থেই পারিবারিক ও সামাজিক বাধাকে উপেক্ষা করে প্রশাসনের কাজে তাদের দায়বদ্ধতা ও দক্ষতা প্রমাণ করেছে

আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রকৃত তাৎপর্য নারী পুরুষের বৈষম্য দূর করে সর্ব অর্থে নারীর সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করা সমাজ ব্যবস্থায় উত্তরণের পরই এটা বাস্তবায়িত হওয়া সম্ভব তবুও বিগত এক দশক ধরে সারা বিশ্ব জুড়েই নারী সমাজের এক বৃহৎ অংশ ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও হিংসার বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী উদার অর্থনীতির বিরুদ্ধে, যুদ্ধের বিরুদ্ধে, শান্তির সপক্ষে সংগ্রামরত শতবর্ষে এই আন্দোলনকে আরো তীব্র করে তুলে এগিয়ে যাবার শপথ গ্রহণ করতে হবে

 

 

আত্মদর্শনঃ পথের বাঁকে বাঁকে (১)

 

সংলাপ

 

গুরুর শাসন যেন শিষ্যকে কাতর না করে শিষ্য অন্য কোন উদ্দেশ্য সাধন বা আরাম বা সুখের প্রত্যাশা না করে আধ্যাত্মিক জীবনপথকে যদি বরণ করে তাহলে শিষ্যের শক্তি ও সহনশীলতা কতটা, তা প্রমাণ করবার জন্যই পরীক্ষাদায়ক সংকট ও কঠোরতা শিষ্যের জন্যে আসবে তুমি শিষ্য হলে বিপদে বা আপদে বিমুখ হবে না বোঝার লাঘব হোক এ প্রার্থনা কখনও করোনা, বরঞ্চ বোঝা বহন করতে পার এমন সুবুদ্ধি যেন গুরু তোমাকে দেন এমন চিন্তা ও কর্ম শ্রেয়

দৃঢ়সংকল্প হয়ে যখন শিষ্য অবিচলিত, নিষ্ঠাপরায়ণ হয়ে থাকে তখনই শিষ্য পূর্ণতার আস্বাদন পায় বহুক্ষণ স্থিরসংকল্প হয়ে থাকা শিষ্যের স্থিরতার প্রমাণ নিষ্ঠার সঙ্গে শিষ্য নিজের কর্মস্থলে দাঁড়িয়ে থাকলে, এক ঘন্টা বা দুই ঘন্টা চলে গেলে, তাতে কি ক্ষতি? সহ্যগুণ আয়ত্ত করতে পারলেই শিষ্যের আত্মনুভূতি লাভ সাধনার পথে বিশেষ স্থিরতা ও সহনশীলতার প্রয়োজন

কোন বিষয়ে শিষ্যের এমন জ্ঞান অর্জন করতে হবে যা অচল, অটল মতির স্থিরতা প্রয়োজন খামখেয়ালি ও অস্থিরচিত্ত শিষ্য নিজে দুঃখ পায়, অপরকেও দুঃখ দেয় আলো যদি নিভে যায়, জানবে যে সে একটা আকস্মিক ঘটনা নয় কোন কিছুকেই অবহেলা করা উচিত নয়, স্থির ও সাবধান হয়ে শিষ্যকে সর্বদা চলতে হয় এবং সজাগ থাকতে হয় স্থিরতা এবং নিত্যবস্তুতে নিজেকে নিবিষ্ট করতে পারলেই দৃঢ়তা আসে এই দৃঢ়তাই শিষ্যের বিশেষ প্রয়োজন সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য

সংগ্রাম ও বাধার সম্মুক্ষীন হওয়ার সুযোগ পাওয়া এক মহাআশীর্বাদ শিষ্যের ভিতরে যতটুকু তেজ আছে, তা ঘর্ষণে জ্বলে উঠে জীবনযাত্রায় সাধনার পথে বিনা বাধায় সহজে অগ্রসর হলে জীবনে প্রাণবন্ত কোন কাজ করা যায় না কঠোরতা ও দুঃখ শিষ্যকে বলীয়ান করে এবং  শিষ্যের ভিতরে ভাল যা কিছু আছে তা বাহিরে প্রকাশিত হয় যিনি সুখে-দুঃখে সমভাবাপন্ন, স্থির, অবিচলিত, তিনিই একমাত্র শিষ্য যিনি সাধনার পথে জীবনে সফলতা লাভ করতে পারেন

শিষ্যের অন্তর্ভাগ থাকে গুরুর সত্তার মধ্যে সেই কথা যদি শিষ্য ভুলে যায় তবেই শিষ্যের জীবনে আসে চরম ব্যর্থতা ভুলভ্রান্তি কোন পাপ নয় শিষ্য সৎ কাজের মধ্য দিয়ে যেমন শেখে, ভুলভ্রান্তির ভিতর দিয়েও তেমনি শেখে ভুল করা শিষ্যের দুর্ভাগ্য নয়, কিন্তু যখন সেই ভুলের কথা ভেবে অন্য পথে চলে  সেটাই হয় শিষ্যের দুর্ভাগ্য

স্বগৃহেই জীবনের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় নিজের বাড়ি এবং গুরুগৃহের মতো আর একটি বাড়ি খুঁজে পাওয়া ভার কিন্তু একটা ইট-কাঠ-সিমেন্টের তৈরি বাড়ি কি করে'গৃহ' হয়ে ওঠে? তার উত্তরঃ ভালবাসা, চিন্তার মিল এবং পরস্পরের প্রতি আস্থা ও সংযোগ শৈশবের স্মৃতি, বাবা-মার স্নেহ, যৌবনের উজ্জ্বল স্বপ্ন, বোনের মান-অভিমান, ভাইয়ের সহানুভূতি ও সাহায্য, পারস্পারিক আস্থা ও নির্ভরতা, একই ধরনের আশা-আকাঙ্খা ও আগ্রহ, ছোটখাট স্বার্থত্যাগ-এইসব গুণেই গৃহ গড়ে ওঠে, এইসব বৈশিষ্ট্যই স্বগৃহ-গুরুগৃহ হতে শুরু হয় নিঃস্বার্থতা, অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা, প্রফুল্লতা এবং পরোপকারের মতো নৈতিক সদগুণগুলো মানুষ সর্বপ্রথম পরিবারের মধ্যে শেখে বাবা, মা, ভাই-বোন এবং পরিবারের অন্যদের সঙ্গে সুন্দর, সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক ব্যক্তির উন্নত হওয়ার চাবিকাঠি অতএব সাধনার পথের যাত্রীরা বাবা-মা এবং জ্যেষ্ঠদের কথা মেনে চলবে এবং তাঁদের সম্মান করবে তাঁরা ওই যাত্রীদের সুখী করার জন্য কতই না পরিশ্রম করেন, কত না স্বার্থত্যাগ করেন সে কথা মনে রেখে কাজে তাঁদের সর্বদা সাহায্য করবে বাবা-মা এবং ভাই-বোনের কাজকর্ম ও কৃতিত্বে গৌরববোধ, পরিবারের সকলের প্রতি প্রীতি ও সভানুভূতির ভাব এবং বাড়ির পরিবেশ আরো সুন্দর ও মনোরম করে তোলা সাধনার পথের যাত্রীদের দায়িত্ব ও কর্তব্য বাড়ির কারও জন্মদিনে বা অন্যান্য উৎসব-অনুষ্ঠানে সানন্দে যোগ দেয়া, বাড়ির মধ্যে এই দেয়া-নেয়া অভ্যাসটি একবার গড়ে উঠলে বাড়ির বাইরে সকলের সঙ্গে মানিয়ে চলতে কোনও অসুবিধাই হয় না সহযোগিতা গৃহেই শুরু হয় এবং পরিপূর্ণতা পায় গুরুগৃহে তারপর আসে সমাজে।  তাই বলা হয়, স্বগৃহ এবং গুরুগৃহই সাধনা এবং আধ্যাত্মিক সমাজ ও জগতের ভিত্তি একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করলে যেমন পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় হয়, তেমনি এক আদর্শে একসঙ্গে কাজ করার মানসিকতা  পারস্পারিক সম্পর্ককে মধুরতর করারও সূবর্ণ সুযোগ নির্দিষ্ট সময়ে যেমন খেতে আসা একান্ত জরুরি, তেমনি নিজের খাওয়া হয়ে গেলেও যতক্ষণ না সকলের খাওয়া শেষ হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত খাওয়ার জায়গা ছেড়ে উঠে যাওয়া আদবের বরখেলাপ গুরুগৃহে খাওয়ার সময় সকলের সঙ্গে ভাব বিনিময়ের আদর্শ স্থান

বাবা-মার কাছে এবং গুরুর কাছে কিছু গোপন করা সাধনার পথের যাত্রীর জন্য অন্যায় কখনও ভেবো না তুমি সব জানো বা সর্বদা তুমি যা করছ তা ঠিক করছ তোমার ছোটখাট অভিজ্ঞতাগুলো তাঁদের বললে তুমি যে কেবল তাঁদের আস্থাভাজন হবে তাই নয়, তাঁদের মানসিক দুশ্চিন্তাও বহুলাংশে দুরীভূত করতে পারবে যা যাত্রা পথে সহায়ক চিৎকার-চেঁচামেচি করে কথা না বলে খোলাখুলি অথচ সম্ভ্রম রেখে কথা বললে সকলের সঙ্গে সম্পর্ক মধুর হয়'দয়া করে','ধন্যবাদ','দুঃখিত' - এই জাতীয় সৌজন্যমূলক শব্দ প্রয়োজনবোধে কথা বার্তার মধ্যে জুড়ে দেয়া সাধনার পথের যাত্রীর জন্য শ্রেয়

প্রতিটি কাজের শুরুতে গুরুনাম করলে দেহমন শুদ্ধ হয়ে যায় তাঁর নামে এমনি শক্তি যাতে জীবন চলার পথে আর ভয় থাকে না, বন্ধনও থাকে না তাঁর নাম করেই শিষ্য অমর হয় এই জানা এবং শপথ করে সাধন শুরু করতে হয়

ভজন বারবার করার উদ্দেশ্য, তাঁকে জানা, তাঁর কৃপা লাভ করা যুগে যুগে জন্ম থেকে ময়লা পড়ে পড়ে চিন্তা জগতে বেজায় ময়লা ধরে রয়েছে, তাকে ধুয়ে সাফ করতে অর্থাৎ একরৈখিক না করতে পারলে হাজার চেষ্টা করে কিছুই হবে না চিত্তশুদ্ধি না হলে গুরুর কৃপালাভ করা যায় না

স্মরণ রাখতে হবে, ছুঁচ কাদা মাটি ঢাকা থাকলে চুম্বকে টানে না, কাদা মাটি ধুয়ে ফেললে তখন চু্‌ম্বক টানে তেমনি গুরুর নিকট প্রার্থনা করলে বা ক্ষমা চাইলে, নির্দেশের বাহিরে এমন কাজ আর করব না বলে অনুতাপ করলে বা খুব ব্যাকুল হলে চিন্তাজগতের ময়লা সব ধুয়ে যায়, তখন গুরুরূপ চুম্বক শিষ্যরূপ ছুঁচকে টেনে নেন শুদ্ধচিত্ত হলেই গুরুর কৃপা হয়- কৃপা হলেই দর্শন হয় গুরুর কৃপা পেতে হলে, তাঁর দর্শন লাভ করতে হলে নিবেদিত প্রাণে তাঁর কাছে নিজের ইচ্ছাকে ধীরে ধীরে সমর্পণ করতে হয় তিনি জ্ঞানসূর্য তাঁর আলো কৃপা করে যখন একবার তিনি নিজে শিষ্যের মুখের উপর ধরেন তখন দর্শন লাভ হয়

যতক্ষণ ভোগ বাসনা থাকে, ততক্ষণ গুরুকে জানতে বা দর্শন করতে অন্তরে ব্যাকুলতা কাজ করে না শিষ্যের ভোগ-বাসনা শেষ হলে গুরুর জন্য ব্যাকুলতা শুরু হয়, তখন কি করে গুরুকে পাবে এই চিন্তা সবসময় শিষ্যকে মগ্ন রাখতে সহায়তা করে

গুরু ইচ্ছে করলে সমাধিতে ডুবে থাকতে পারেন আবার ইচ্ছে করলেই সংসারে থাকতে পারেন উভয় ক্ষেত্রে এই যে তাঁর আনাগোনা, এই হলো গুরুর বৈশিষ্ট্য দ্বৈত আর অদ্বৈত অবস্থার মধ্যে এই যে যাতায়াত, একমাত্র গুরু ছাড়া আর কেউ তা পারেন না

গুরু ইচ্ছা করলে অখণ্ডের ভিতর নিজেকে লয় করে দিতে পারেন, আবার ইচ্ছে করলেই সেই অখণ্ড থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন গুরু সবসময় তাঁর উপর একটা আচ্ছাদন রাখেন আচ্ছাদনের মধ্যে নিজেকে রেখে সকলের বোধগম্য রূপে নিজেকে প্রকাশ করেন

গুরু ধরা না দিলে শিষ্যের পক্ষে তাঁর অনেক ব্যাপার ধারণা করা সম্ভব হলেও কিন্তু গুরুকে চিনতে পারবে না আশেক, ভক্ত, মকসুদি এবং পার্থিব ভোগলিপ্সুদের মধ্যে একমাত্র শিষ্যই গুরুর ভিতরের আলোর সন্ধান পায় শিষ্যের দৃষ্টি স্বচ্ছ হতে হতে ক্রমশ আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠে

গুরুর স্বচ্ছ আবরণের ভিতর দিয়ে শিষ্য তার গুরুর অবস্থানের খবর জানতে পারে- কখন গুরু স্বেচ্ছায়  অখণ্ডের ঘরে গিয়ে সমাধিস্থ হয়ে থাকেন আবার কখন অখণ্ডের কাছ থেকে খণ্ড হয়ে আসেন

সাধনার পথের যাত্রীর অর্থাৎ শিষ্যের সিদ্ধিলাভ কষ্টার্জিত, কিন্তু গুরুর সিদ্ধি সহজাত গুরু যে সাধন করেছেন তা অজ্ঞানের ওপারে যাবার জন্য আবার পৃথিবীতে দৃষ্টান্ত দেখাবার জন্যও।     

 

শান্তির অন্বেষায় সূফীতত্ত্ব (১২)

 

(পূর্ব প্রকাশের পর)

তুমি তরবারী দ্বারা তাকে আঘাত করতে যাও/সাবধান সেই আঘাত তোমার উপরে এসে পড়বে।/সে তো বিলীন হয়ে নিরাপদ ও সুরক্ষিত জায়গায় গেছে,/সে আর সে নাই, দর্পণ হয়ে পড়েছে/তার (দর্পণের) মধ্যে তাকে যায় না দেখা/অন্য জনের ছবি ভাসে, থুথু তাতে দিলে পরে লাগবে এসে নিজের গালে/হানলে আঘাত দর্পণেতে, লাগবে এস তোমার পরে/যদি দেখ কুৎসিত রূপ যেনো তা তোমারি

পারশীয়ান সাধক আবুল হাসান খুরকানীর জীবনী আমাদেরকে প্রাচ্যের সূফীতত্ত্ব সম্পর্কে বিশদ ধারণা দেয় তাঁর জীবনীতে আমরা অহমিকা এবং মহানুভবতার সংমিশ্রণ দেখতে পাই

কোনো একদিন খুরকানী বলেন যে অদ্য রাতে অমুক মরুভূমিতে দস্যুরা অনেক যাত্রীকে আহত করবে খোঁজ নিয়ে দেখা গেলো যে তার বক্তব্য সঠিক ছিলো আশ্চর্যের বিষয়'ওই দিন রাতে স্বীয় পুত্রের কর্তিত মস্তক ঘরের চৌকাঠের উপর পাওয়া গেলো কিন্তু এ ব্যাপারে তিনি কোনো কিছু জানতেন না' তার স্ত্রী চিৎকার করে বলতে লাগলেন,'তুমি কি রকম মানুষ? শত মাইল দূরে কি হচ্ছে তা তুমি বলতে পারো কিন্তু নিজ পুত্রের মাথা কেটে ঘরের দরজায় রেখে দেয়া হয়েছে তা দেখতে পাও না?' সাধক বললেন,'সত্যি কথা প্রথমটা যখন ঘটেছিলো তখন আমার সামনে কোনো পর্দা ছিলো না কিন্তু্তু পুত্রকে যখন হত্যা করা হয় সে সময় আমার সামনে পর্দা দেয়া ছিলো

আর একদিন খুরকানী মুষ্টিবদ্ধ অবস্থায় কনিষ্ঠ আঙ্গুল তুলে ধরে বললেন,'এই হচ্ছে কাবা পবিত্র হতে চাইলে একে দেখো' এই কথা তাঁর মুরশিদের কাছে বলা হলে তিনি দুই কাবার অবস্থানকে তৌহীদের জন্য অবমাননাকর মনে করে বলেন যে,'যেহেতু দ্বিতীয় কাবার অধিষ্ঠান হয়েছে তাই প্রথম কাবার আর প্রয়োজন নেই আমি প্রথম কাবা ধ্বংস করে দিলাম ফলে ওই বছর কোনো হজ্জ্ব যাত্রী মক্কায় পৌছাতে পারে নাই যাত্রীদের অনেকে পথিমধ্যে মারা যান অনেকে দস্যুদের হাতে সর্বস্ব্ব হারান আবার অনেকে নানবিধ কারণে যাত্রা স্থগিত করে ফিরে আসেন পরের বছর জনৈক দরবেশ তাকে জিজ্ঞাসা করেন যে, এইভাবে লোকদেরকে আল্লাহ্‌র ঘরে যাওয়া হতে বিরত রাখার কি অর্থ হতে পারে? দরবেশের এই কথায় তিনি ইশারা করে কাবার পথ পুনঃ চালু করে দেন দরবেশ পুনঃ জিজ্ঞাসা করলেন যে, কিসের জন্য এতোগুলো জীবন বিনষ্ট হলো? দুই মত্ত হাতির যুদ্ধের সময় তাদের পদতলে অনেক পাখী ও গাছ পিষ্ট হয়ে যায়, তার প্রতি কি কেউ খেয়াল রাখে? মুরশিদ উত্তর দিলেন

কিছু হজ্জ্ব যাত্রী খুরকানীকে এমন একটি দোয়া শিখিয়ে দেয়ার জন্য বললেন যা পড়লে তারা বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা পাবেন যে কোনো বিপদে তিনি তাদেরকে তাঁর নাম স্মরণ করার জন্য বললেন উত্তরটা তাদের জন্য মনপুতঃ হলো না তারা যাত্রা শুরু করলো এবং পথিমধ্যে তাদেরকে দস্যু আক্রমণ করলো যাত্রীদের মধ্যে একজন সাধকের নাম স্মরণ করার সাথে সাথে তার সমস্ত মালামাল সহ অদৃশ্য হয়ে গেলো দস্যুরা তার উট, মালামাল কোনো কিছুই পেলো না তবে অন্যদের সকল মালামাল দস্যুরা লুঠ করে নিয়েছিল যাত্রীরা ফেরৎ এসে এই ঘটনা তাঁকে জানিয়ে জিজ্ঞাসা করেন যে ঘটনার সময় আমরা আল্লাহ্‌কে ডেকেছিলাম কিন্তু কোনো ফল লাভ হয় নি কিন্তু ও তোমাকে ডাকার সাথে সাথে কিভাবে অদৃশ্য হয়ে গেলো যে ডাকাতেরা তাকে দেখতে পেলো না তিনি বললেন,'তোমরা আল্লাহ্‌র সাহায্য প্রার্থনা করেছো প্রচলিত নিয়মে আর সে আমাকে ডেকেছিলো অন্তর দিয়ে তোমরা যদি আমার সাহায্য প্রার্থনা করতে তবে তোমাদের পক্ষ হয়ে আমি আল্লাহ্‌র নিকট সাহায্য প্রার্থনা করতাম এবং তোমাদের প্রার্থনা মঞ্জুর হয়ে যেতো প্রচলিত প্রথায় আল্লাহ্‌কে ডাকায় তোমাদের কোনো উপকার হয় নি'

একদিন রাতে তিনি প্রার্থনারত অবস্থায় শুনতে পেলেন যে কেউ তার নাম ধরে চিৎকার করে বলছে,'হে বন্ধু আবুল হাসান, আমি তোমার সম্পর্কে যা জানি তা যদি লোক সম্মুখে প্রকাশ করে দেই তবে তারা তোমাকে পাথর মেরে হত্যা করবে' তিনি উত্তরে বললেন,'হে বন্ধু আমি তোমার দয়া ও বদ্যানতা সম্বন্ধে যা জানি, তা প্রকাশ করে দিলে কেউ তোমার নিকট প্রার্থনা করবে না' সাথে সাথে উত্তর আসলো, তুমিও গোপন রাখো, আমিও গোপন রাখছি

- তিনি বলেন,'হে প্রভু, মৃত্যুদূতকে আমার নিকট প্রেরণ করো না আমার জীবন তার হাতে আমি দিব না আমি যা তার নিকট হতে পাইনি তা তার কাছে কিভাবে দিবো জীবন তোমার কাছ থেকে পেয়েছি তুমি ছাড়া অন্য কারও কাছে দিবো না'

- তিনি বলেন,'আমার মৃত্যুর পর মৃত্যুদূত আমার এক অনুসারীর জীবন নিতে এসে খুব রূঢ় কথা বলতে থাকবে সে সময় আমি কবরের মধ্যে থেকে হাত বের করে আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ বাণী তার ঠোঁটে আটকে দেবো'

- তিনি বলেন,'যদি আমি স্বর্গকে আদেশ করি তবে সে চলা শুরু করবে সূর্যকে থামতে বললে সে ঘোরা বন্ধ করে দেবে'

- তিনি বলেন,‘আমি ভক্ত বা সাধক নই আমি ধর্মতত্ত্ববিদ বা সূফী নই হে প্রভু, তুমি একক, তোমার এককের জন্য আমিও একক'

- তিনি বলেন,'আমার মাথা স্বর্গে, আমার পা পৃথিবীর মধ্যে এবং দুই হাত হচ্ছে পূর্ব ও পশ্চিম'

- তিনি বলেন,'যদি কেউ বিশ্বাস না করে যে হাশরের দিন আমি আসবো এবং আমি না নেয়া পর্যন্ত সে স্বর্গে যেতে পারবে না, তবে সে যেনো এখানে আমাকে সম্মান দেখাতে না আসে'

- তিনি বলেন,'খোদা আমাকে আমা হতে এনেছেন স্বর্গ আমাকে খুঁজে ফিরছে, নরক আমার ভয়ে ভীত আমি যেখানে বর্তমানে দাঁড়িয়ে আছি সেখান দিয়ে স্বর্গ ও নরক যেতে চাইলে উভয়ে আমার মধ্যে বিলীন হয়ে যাবে'

- তিনি বলেন,'আমি চিৎ হয়ে শুয়ে ছিলাম আল্লাহ্‌র তরফ হতে কিছু একটা ছিটকে এসে আমার মুখে চলে গেলে আমি ভিতরে মিষ্টতা অনুভব করলাম'

- তিনি বলেন,'সেই মিষ্টতার কয়েক ফোটা যদি ঠোঁটের আগায় চলে আসে তবে স্বর্গ ও মর্ত্যের সকল জীব বিহ্বল হয়ে পড়বে'

- তিনি বলেন,'সাধক ইচ্ছা করলে  মাছের সাঁতার বন্ধ করে দিতে পারেন বা পৃথিবীকে এমনভাবে কাঁপাতে পারেন যাতে লোকে মনে করবে ভূমিকম্প হচ্ছে'

- তিনি বলেন,'খোদার বন্ধুদের হৃদয়ে খোদার যে প্রেম বর্তমান তা প্রকাশ হলে সারা পৃথিবীতে বন্যা হয়ে যেতো বা আগুন ধরে যেতো'

- তিনি বলেন,'যে আল্লাহ্‌র সাথে বাস করে সে সব কিছুই দেখতে পায়, শুনতে পায়, সব কিছু করতে পারে বা সব কিছু জানতে পারে'

- তিনি বলেন,'আমি সব কিছু আমার মধ্যে ধারণ করে আছি শুধু আমাকে ছাড়া'

- তিনি বলেন,'খোদার পথে অগ্রসর হওয়ার হাজার ধাপের একটা ধাপ হচ্ছে অলৌকিকতা'

- তিনি বলেন,'কোন কিছুই চেয়ো না যতক্ষণ তোমাকে না দেয়া হয় যদি তুমি চাও তবে তা তোমার মতোই হবে'

- তিনি বলেন,'প্রতিদিন হাজার বার মরতে ও বাঁচতে পারলে অমরত্ব পাবে'

- তিনি বলেন,'তোমার কিছু নাই যদি আল্লাহ্‌কে দেও, তিনি তার সব তোমাকে দিয়ে দেবেন'

সাধকদের জীবনের অলৌকিক কাজ সমূহ বর্ণনা খুবই কঠিন যেমন পানির উপর চলা, বাতাসে উড়া, বৃষ্টি ঘটানো, একই সময় বিভিন্ন জায়গায় উপস্থিত হওয়া,'ফু' দিয়ে রোগমুক্ত করা, মৃতদেহে জীবন দেয়া, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জ্ঞান ও ভবিষ্যৎ বাণী করা, চিন্তা পাঠ, অবশ করা, মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করা (দুষ্ট লোকের), পশু ও বৃক্ষের সাথে কথা বলা, মাটিকে স্বর্ণ বা দামী পাথরে রূপান্তরিত করা, খাবার বা পানীয় তৈরি করা ইত্যাদি যাদের প্রাকৃতিক নিয়ম সম্পর্কে জ্ঞান নেই তারা এই রকম প্রাকৃতিক নিয়ম ভঙ্গ করাকে সম্মানের চোখে দেখে থাকেন কিন্তু অন্যরা এই সব বিষয়কে অসম্ভব ও অযৌক্তিক মনে করে কারণ এই সকল কর্মকান্ডের কোনো স্বাভাবিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না

অধ্যাত্মবাদের প্রশিক্ষণার্থীকে সর্বক্ষণ তার মুর্শিদকে স্মরণ রাখতে হয় এবং সংযোগের মাধ্যমে তার মধ্যে ডুবে থাকতে হয় সকল চিন্তা বা স্বভাবে  মুর্শিদ ঢাল স্বরূপ কাজ করে মুর্শিদের শক্তি ভক্তের সকল কাজে তাকে সহায়তা করে এবং সব সময় অভিভাবকের মতো তাকে অনুসরণ করে শেষে এমন হয় যে এরকম করতে করতে সে তার মুর্শিদকে সকল মানুষ ও বস্তুর মধ্যে চুম্ব্বক যেমন সকল বস্তুকে তার দিকে আকর্ষণ করে ঠিক সেরকম দেখতে পায় এই অবস্থাকে মুর্শিদের মধ্যে নিজকে বিলীন করা বলা হয়

দ্বিতীয় পর্যায়ে মুর্শিদ তাকে তার চেয়ে উন্নতর শক্তি বা এই শক্তির মূল জনকের নিকট হস্তান্তর করেন এবং  দূর থেকে তাকে অবলোকন করেন একে বলা হয় মুরশিদের মধ্যে নিজকে সমর্পণ করা এ    স্তরে সে মুরশিদের অংশ হয়ে যায় এবং মুরশিদের সকল ক্ষমতা সে বহন করে থাকে এখানে সে স্রষ্টার সাথে মিলিত হয়ে সব কিছুতেই স্রষ্টাকে দেখে থাকে

উপরে যে সব প্রক্রিয়ার কথা বলা হলো তার বিশদ বিবরণ তাওয়াক্কুল তত্ত্বে পাওয়া যায়

সাধক জামী কর্তৃক বর্ণিত আর একটি উদ্ধৃতি নিম্নে দেয়া হলোঃ

কাশগরের সাদউদ্দীন কিছুক্ষণ ধ্যান করার পর অচেতন হয়ে পড়তেন তাঁর এই অবস্থার কথা যে জানতো না সে মনে করতো যে তাঁর ঘুম আসছে আমি যখন প্রথম তাঁর সান্নিধ্যে যাই, তখন একদিন মসজিদে তাঁর সামনে বসেছিলাম তিনি তাঁর অভ্যাসবশতঃ সমাধিতে চলে গেলেন আমার কাছে মনে হলো তিনি ঘুমাতে চাচ্ছেন আমি তাঁকে স্বল্প সময়ের জন্য বিশ্রাম নিতে বললে তিনি স্মিত হেসে বললেন,'তুমি জানো না যে এটা ঘুম হতে সম্পূর্ণ পৃথক ব্যাপার'  (চলবে)

 

সূফী সাধক আনোয়ারুল হক্‌ এঁর বাণী তাৎপর্য অন্বেষণে -

 

'' কৃতিত্ব সেখানে যেখানে মুখের ভাষাকে আয়ত্বে রাখা যায়''

 

 

ড. এমদাদুল হক কাজল 

 

(পূর্ব প্রকাশের পর)

৩. অতীত ও ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলাঃ  আমাদের আলোচনার একটা মূল বিষয় হচ্ছে অতীত ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা অতীতে যা ঘটবার ছিল তা ঘটে গেছে অতীতকে কোনভাবেই আমরা আর পরিবর্তন করতে পারি না যে সময় পার হয়ে যায় তা আর ফিরে আসে না ভবিষ্যত একেবারেই অনিশ্চিত ভবিষ্যতে কি হবে আমরা তার কিছুই জানি না তাই আমাদের হাতে একটাই সময় আছে আর তা হচ্ছে বর্তমান আমরা যদি বর্তমান নিয়ে থাকি তবে শতকরা ৮০ ভাগ কথা বলা কমে যাবে

৪. ঝগড়াঃ ঝগড়া কি? ঝগড়া হচ্ছে উত্তপ্ত কথার বিনিময় ঝগড়ার সৃষ্টি হয় প্রতিবাদ থেকে'কৃতিত্ব সেখানে, যেখানে মুখের ভাষাকে আয়ত্বে রাখা যায়' এই বাণীর অর্থ হচ্ছে ন্যায় জেনেও যে প্রতিবাদ করা থেকে বিরত থাকতে পারে সেই কৃতিত্বের দাবীদার

ঝগড়া বিবাদে মনুষ্যত্ব লোপ পায়, পারস্পরিক সম্পর্ক নষ্ট হয় এবং ইসলাম (শান্তি) চলে যায় অন্যের কথায় দোষ ধরলেও ঝগড়ার সৃষ্টি হয় নিজের গৌরব প্রকাশ করা যেমন দোষের অন্যের দোষ ধরাও তেমনি দোষের ঝগড়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রতিপক্ষকে দোষারূপ করা এবং নিজের গৌরব প্রতিষ্ঠা করা এ দুটিই ইসলামে গর্হিত কাজ

রূঢ় বাক্যে অন্যকে কষ্ট দেয়, ক্রোধ উৎপন্ন করে এবং বিবাদ ও শত্রুতার সৃষ্টি করে এমন কোন সত্য কথাও বলা যাবে না যা অন্যের মনোবেদনার কারণ হতে পারে, বা ঝগড়া বিবাদ সৃষ্টি করতে পারে কারণ সত্য বলা উদ্দেশ্য নয়, উদ্দেশ্য হচ্ছে শান্তি

বুদ্ধ বলেন, ''কাকেও কর্কশ বাক্য বলবে না, যাকে বলবে প্রত্যুত্তরে সেও কর্কশ বাক্য বলতে পারে ক্রোধপূর্ণ বাক্য দুঃখদায়ক দন্ডের প্রতিদন্ড তোমাকে ভোগ করতে হবে''

৫. তর্ক : নানা বিষয় নিয়ে মানুষ অনর্থক তর্ক-বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে কিন্তু ইসলামের দিক থেকে তা মোটেও পছন্দনীয় নয় জ্ঞানী বা মূর্খ কারো সাথেই তর্ক করা ঠিক নয় কারণ জ্ঞানীর সাথে তর্ক করলে তাকে ক্রোধান্বিত করা হয় আর মূর্খের সাথে তর্ক করলে অযথা কষ্ট পেতে হয় মোহাম্মদ সা. বলেছেন - তর্কের সময় নিজের মতকে অভ্রান্ত জেনেও যে ব্যক্তি তর্ক ত্যাগ করে সে-ই ঈমানের পরিচয় দেয়

সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে - যে বিষয়টা সঠিক বলে আজ আমি তর্ক করছি আমি নিজে কি সে বিষয়কে ৫ বৎসর পরেও সঠিক বলেই মনে করবো না-কি আমি আমার বর্তমান বিশ্বাসকে পাল্টিয়ে ফেলবো? আমার নিজের জীবন থেকেই শিখেছি যে, যেসব বিষয় সত্য বলে একসময় মানুষের সাথে তর্ক করেছি কালের প্রবাহে সেসব বিষয় আজ আমার কাছেই মিথ্যে হয়ে গেছে আজো আমি যেসব বিষয় নিয়ে তর্ক করছি আগামী ৫ বৎসর পর তাও আমার কাছে মিথ্যা হয়ে যেতে পারে সুতরাং তর্ক-বিতর্ক  ত্যাগ করাই উত্তম নয় কি?

৬. গালাগালি দেয়াঃ ইসলাম প্রত্যেককেই অশ্লীল কথা পরিহার করার নির্দেশ দেয়''মন্দ কথার প্রচারণা আল্লাহ্‌ ভালোবাসেন না'' (সূরা নিসা : ১৪৮)

কথার দ্বারা যে আঘাত দেয়া হয় তা তরবারীর আঘাতের চেয়েও বেশি কষ্টদায়ক কারণ, তরবারীর আঘাত শরীর আহত করে আর কথার আঘাত মানুষের হৃদয় রক্তাক্ত করে মুসলমানের সম্মান নষ্ট করার উদ্দেশ্যে একটি কথা বলাও কবীরাহ গুনার শামিল এবং গালির বদলে গালি দেয়াও কবীরাহ গুনাহ

হযরত ঈসা আ. জেরুজালেমের এক গলি দিয়ে যাবার সময় এক ব্যক্তি তাঁকে অশ্লীল গালি দিতে শুরু করল তিনি তখন সেখানে দাঁড়িয়ে লোকটির কল্যাণের জন্য দোয়া করলেন একজন ভক্ত জিজ্ঞেস করলেন, হুজুর! লোকটা আপনাকে গালি দিল আর আপনি তাকে দোয়া দিলেন! জবাবে হযরত ঈসা আ. বললেন - ''দেখ, যার তহবিলে যা আছে সে তো তাই অপরকে দান করবে''

কেউ সুন্দর কথা বললে তার সাথে সুন্দর কথা বলা কর্তব্য কিন্তু কেউ গালি দিলে তার সাথে সুন্দর করে কথা বলা শান্তিকামীদের (মুসলমানদের) জন্য অপরিহার্য

৭. অশ্লীল বাক্য ব্যবহার করাঃ  ইসলামে আশ্লীল কথা বলাকে ফাসেকী কাজ বলা হয় যে ব্যক্তি অশ্লীল কথা বলে ইসলামের (শান্তির) দরজা তার জন্য অবরুদ্ধ হয়ে যায়

অনেকেই কথা বলার সময় সঙ্গম ও যৌনাঙ্গ সম্পর্কিত নানান শব্দ ব্যবহার করে এসব শব্দের ব্যবহার অমার্জিত ও অশালীন

প্রয়োজন হলেও এসব শব্দ সরাসরি ব্যবহার না করে একটু ঘুরিয়ে বললেও অন্যের বোধগম্য হয়

৮. অপবাদ দেয়াঃ  ''কেউ কোনো দোষ বা পাপ করে পরে তা কোনো নির্দোষ ব্যক্তির উপর আরোপ করলে, সে মিথ্যা অপবাদ ও স্পষ্ট পাপের বোঝা বহন করে'' (সূরা নিসা : ১১২)''যে ব্যক্তি নিজে কোন অন্যায় বা পাপ করে, অতঃপর কোন নির্দোষ ব্যক্তির উপর তার দোষ চাপিয়ে দেয় সে তো নিজের মাথায় বহন করে জঘন্য মিথ্যা ও প্রকাশ্য গোনাহ'' (নিসা : ১১২)

৯. উপহাস করাঃ কোনো পুরুষ যেন অপর পুরুষকে উপহাস না করে, কেননা যাকে উপহাস করা হয় সে উপহাসকারীর চেয়ে ভালো হতে পারে; আর কোনো নারীও অপর নারীকে যেন উপহাস না করে; কেননা যাকে উপহাস করা হয় সে উপহাসকারিনীর চেয়ে ভালো হতে পারে। (সূরা হুজুরাতঃ ১১) উপহাস অন্যের মনোবেদনার কারণ হতে পারে তাই কাউকে নিয়ে উপহাস করা কুরআন পরিপন্থী উপহাসের মাধ্যমে অন্যকে অবজ্ঞা ও হেয় করা হয় উপহাসের পাত্রটি যদি অনুপস্থিত থাকে তাহলে তা পরনিন্দা হয়

১০. গোপন কথা প্রকাশ করে দেয়াঃ অসংযত ভাষার বড় অপরাধ কারো গোপন কথা প্রকাশ করে দেয়া কোন লোক কোন কথা বলে তা গোপন রাখতে বললে তা আমানত তুল্য আমানতের খেয়ানত করা ইসলামের দৃষ্টিতে একটা বড় পাপ

১১. অভিশাপ দেয়াঃ কথা দিয়ে অভিশাপ দেয়া যায় কাউকে অভিশাপ দেয়া নিন্দনীয় যাকে অভিশাপ দেয়া হয় সে অভিশাপ যদি তার প্রাপ্য না হয় তবে তা ঘুরতে ঘুরতে নিজের কাছেই ফিরে আসে

১২. ঠাট্টা-বিদ্রূপ করাঃ অনেক সময়ই মানুষ ঠাট্টার ছলে মিথ্যা কথা বলে এবং মিথ্যাকে মিথ্যা বলে মনেই করে না মুহাম্মদ সা. তাদেরকে ধিক্কার দিয়ে বলেছেন, ''ধিক্কার ওই ব্যক্তির প্রতি যে লোককে হাসাবার উদ্দেশ্যে মিথ্যা কথা বলে, পরিতাপ তার প্রতি, পরিতাপ তার প্রতি'' হযরত আলী রা. বলেন, ''মানুষ তার ঈমানের স্বাদ তখনই আস্বাদন করতে পারে, যখন সে ঠাট্টার ছলে হলেও মিথ্যা বলা পরিত্যাগ করে''

১৩. মিথ্যে বলাঃ যারা মিথ্যাবাদী তারাও একথা অস্বীকার করে না যে, মিথ্যা বলা অন্যায় মানুষ যে শুধু আপন স্বার্থ সিদ্ধির জন্য মিথ্যা বলে তা নয়, কোন ধরনের স্বার্থ ছাড়াও অহেতুকই মানুষ বেশি মিথ্যা কথা বলে মিথ্যার প্রতি মানুষ যেভাবে আকর্ষিত হয় সত্যের প্রতি সেভাবে আকর্ষিত হয় না, তাই প্রায়সই মিথ্যা দিয়ে মানুষ - মানুষকে আকর্ষণ করতে চায়

মিথ্যা কথনকে কুরআনে অত্যন্ত নিন্দনীয় কাজ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে কুরআন বলে - মিথ্যা কথন থেকে দূরে থাক (সূরা হজ : ৩০); আল্লাহ্‌ মিথ্যাবাদী ও অকৃতজ্ঞকে হেদায়েত দান করেন না (সূরা আজ যুমা : ৩); যে মিথ্যাবাদী, তার উপর আল্লাহ্‌র অভিশাপ বর্ষিত হয় (সূরা আলে ইমরান : ৬১); আল্লাহ্‌র লা'নত তার উপর যদি সে মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হয় (সূরা নূর : ৭)

মুহাম্মদ সা.- এঁর নিকট মিথ্যার চেয়ে নিন্দনীয় এবং ঘৃণিত আর কিছুই ছিল না কেউ যখন সত্যের আলোতে উদ্ধুদ্ধ হয়ে মিথ্যাকে নিজের মন হতে মনেপ্রাণে বর্জন করতো, হযরত সা. মনে করতেন যে, সে সমস্ত গুনাহ্‌ হতে সর্বান্তকরণে তওবা করেছে

একবার হযরত সা.-কে জিজ্ঞেস করা হলো -'মুসলমান কি কৃপণ ও সংকীর্ণ হৃদয়েরও হতে পারে?' তিনি বললেন,'হ্যাঁ', আবার প্রশ্ন করা হলো'মুসলমান কি মিথ্যাবাদীও হতে পারে?' তিনি বললেন,'না' হযরত সা. বলেন, ''মোমেন ব্যক্তির মধ্যে যে কোন স্বভাব থাকতে পারে কিন্তু মিথ্যা এবং খেয়ানত থাকতে পারে না

হযরত আলীকে উদ্দেশ্য করে মুহাম্মদ সা. বলেন, ''আলী, তুমি নিজেকে মিথ্যা থেকে দূরে রাখবে, কেননা, এ হলো মুনাফিকের চরিত্র''

আমাদের জীবন মিথ্যায় পরিপূর্ণ কারণ, মিথ্যা শুধু প্রকৃত অবস্থা বা বাস্তবতাকে অস্বীকার করা কিংবা সত্য ঘটনাকে বিকৃত করা নয় আমরা যে বিষয়ে জানি না সে বিষয়ে কথা বলাও মিথ্যাচার অথচ আমরা সেসব বিষয়েই বেশি কথা বলি যেসব বিষয় সম্পর্কে আমরা কিছুই জানিনা

১৪. মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়াঃ কুরআনের দৃষ্টিতে একটা বড় পাপ হচ্ছে মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া কারণ, মিথ্যাসাক্ষ্যদাতা খুব কম দামে আল্লাহ্‌ ও তাঁর রসূলকে বিক্রি করে দেয় কুরআন বলে - আর তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না প্রকৃতপক্ষে যে তা গোপন করে তার অন্তর তো অপরাধ করে (সূরা বাকারা : ২৮৩) হে বিশ্বাসীগণ! উচিত সাক্ষ্য দেবার ব্যাপারে তোমরা অবিচল থাকবে। (সূরা মায়িদা : ৮)

১৫. মিথ্যে শপথ করাঃ মিথ্যাবাদী মানুষের আস্থা হারিয়ে ফেলে তাই মানুষকে আস্থায় আনার জন্য সে ঘন ঘন কসম কাটতে থাকে কিন্তু মিথ্যাবাদীর কসমেও এক সময় মানুষ আস্থা রাখতে পারে না

কুরআনে তাদেরকে উদ্দেশ্য করেই বলা হয়েছে - যারা নিজেদের কসমকে স্বল্প মূল্যে বিক্রয় করে পরকালে তাদের কোন অংশ নাই কিয়ামতের দিন আল্লাহ্‌ তাদের সাথে কথা বলবেন না এবং তাদের দিকে চেয়ে দেখবেন না এবং তাদের পরিশুদ্ধ করবেন না এবং তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি (আলে ইমরান : ৭৭)

অনেক সময়ই কোন চিন্তা-ভাবনা না করেই তাড়াহুড়া করে আমরা এমন সব অঙ্গীকার করে ফেলি যা রক্ষা করা হয়ে উঠে না অথচ কারো কাছে কোন অঙ্গীকার করে ফেললে যদি তা পূরণ করা না হয় তবে তা মুনাফেকী

১৬. পরনিন্দাঃ দুর্ভোগ প্রত্যেকের যে পেছনে বা সামনে লোকের নিন্দা করে। (সূরা হুমাজা : ১) পর-নিন্দার পাপ সম্পর্কে কুরআনের অনেক সতর্কবাণী রয়েছে অসংযত ভাষার কারণে খুব কম লোকই এই পাপ থেকে মুক্ত থাকতে পারে কুরআন পরনিন্দাকে ব্যভিচার থেকে মারাত্মক পাপ বলেছে এবং পরনিন্দাকে মৃত ভাইয়ের মাংস ভক্ষণের সাথে তুলনা করেছে

কারো শরীর, স্বাস্থ্য, বংশ মর্যাদা, বর্ণ, কর্ম, ধর্ম, পোষক-পরিচ্ছদ ইত্যাদি কোন কিছু নিয়েই সামনে বা পেছনে এমন কোন কথা বলাকে ইসলাম অনুমোদন দেয় না যাতে লোকের মনোবেদনার কারণ হয় যে কোন ধরনের সমালোচনায় লোকে কষ্ট পেলে তা পরনিন্দা হবে

১৭. চোগলখোরীঃ একজনের কথা অন্যজনের কাছে লাগানো হচ্ছে চোগলখোরী কুরআন বলছে - তোমরা তার কথা অনুসরণ করো না যে একের কথা অপরের নিকট লাগিয়ে বেড়ায় (সূরা ক্বালাম : ১০-১১) যে ব্যক্তি একের কথা অন্যের কানে লাগায় মুহাম্মদ সা. তাকে সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানুষ বলেছেন তিনি চোগলখোরকে তাঁর উম্মত হিসেবে অস্বীকার করেছেন

হযরত আলী রা. এর নিকট একবার এক ব্যক্তি অন্য এক ব্যক্তির  কূটনামী করেছিল হযরত আলী রা. তাকে বললেন,'ভাই! তুমি যা বললে তা আমি অনুসন্ধান করব যদি তুমি সত্য কথা বলে থাক, তোমাকে আমরা ঘৃণা করব আর যদি মিথ্যা কথা বলে থাক, তবে তোমাকে শাস্তি দেব যদি তুমি ক্ষমা চাও, তোমাকে ক্ষমা করে দেব' লোকটি বলল,'হে আমিরুল মু'মিনীন! আমাকে ক্ষমা করে দিন অর্থাৎ চোগলখোর যদি সত্য কথাও বলে তবু তা ঘৃণার যোগ্য কেননা সে  অন্যের গোপন কথা ফাঁস করে দেয় এবং পরস্পরের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদের সৃষ্টি করে

১৮. গুজব রটানোঃ কুরআন বলছে - যারা শহরে গুজব রটিয়ে বেড়ায় তারা বিরত না হলে আমি নিশ্চয়ই তাদের বিরুদ্ধে তোমাকে প্রবল করব  (সুরা আহজাব : ৬০-৬১) গুজব হচ্ছে মিথ্যাকে প্রচার করা, যারা মিথ্যাকে প্রচার করে আল্লাহ্‌ তাদের বিরুদ্ধে মুহাম্মদ সা. কে যুদ্ধ করার বলেছেন

কুরআনের সুস্পষ্ট নির্দেশ - আল্লাহ্‌কে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল ( সূরা আহজাব : ৭০-৭১)

উপরের এতগুলো কথা বলা হলো শুধু এই জন্যই যে, আমরা যত জ্ঞানীই হই না কেন কথা বলতে গেলে আমাদের উল্লেখিত যে কোন একটা ভুল হয়ে যেতে পারে আমাদের কথিত কথাগুলো পরনিন্দা, মিথ্যা, গুজব বা কূটনামী হয়ে যেতে পারে, আমাদের কথিত কথাগুলো মিথ্যা অঙ্গীকার, ঠাট্টা-বিদ্রোপ, উপহাস বা অপবাদ হয়ে যেতে পারে, আমাদের কথায় কেউ কষ্ট পেতে পারে, অসাবধানতা বসত আমরা কারো গোপন কথা প্রকাশ করে ফেলতে পারি কিংবা কারো সাথে অনর্থক তর্কে জড়িয়ে পরতে পারি অর্থাৎ আমরা যত বেশি কথা বলবো তত বেশি ভুল হবার সম্ভাবনা বেড়ে  যাবে কথা বলায় এত বিপদ তবু কথাই যেন আমাদের জীবন, কথা দিয়ে আমরা আমাদের পাঠাগার পূর্ণ করি, প্রতিদিন অসংখ্য দৈনিক, সাপ্তাহিক আর মাসিক সংবাদত্র কথা বলে যাচ্ছে, অবিরাম কথা বলে যাচ্ছে দূরদর্শনের শতাধিক চ্যানেল, রেডিও, মোবাইল, ওয়াজ-মাহ্‌ফিল, রাজনৈতিক নেতাদের বক্তৃতা, সেমিনার - সর্বত্রই কথার অবিরাম কেনা-বেচা চলছে কথা নিয়েই আমরা বেঁচে আছি সুন্দর সুন্দর কথা শুনে আমরা মুগ্ধ হয়ে যাই আমরা আল্লাহ্‌কে চাই না - চাই আল্লাহ্‌র সংজ্ঞা, আমরা সত্য বলি না, খুঁজে বেড়াই সত্যের তাৎপর্য বিশ্লেষণ এমন কোন তৃষ্ণার্ত কি আছে যে পানির সংজ্ঞা, ধর্ম, বিশুদ্ধ পানির গুণাগুণ শুনে তার তৃষ্ণা মিটায়?

কথা যদি বলতেই হয় তবে খুব সাবধানে শুধু প্রয়োজনীয় কথাই বলতে হবে আল্লাহ্‌ সাবধানীদের ভালোবাসেন (সূরা তওবা : ৪,৭); আল্লাহ্‌ সাবধানীদের সঙ্গে আছেন (সূরা তওবা : ৩৬, ১২৩) সে-ই আল্লাহ্‌র কাছে বেশি মর্যাদাসম্পন্ন যে বেশি সাবধানী (সূরা হুজুরাত : ১৩); সুতরাং কৃতিত্ব তারই যে কথা বলতে সাবধানতা অবলম্বন করে জবানের উপর পূর্ণ সাবধানতা ও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ একজন মানুষকে আল্লাহ্‌র সঙ্গে একীভূত করে দিতে পারে তাই কয়েদখানায় বন্দী করে রাখার মতো জিহ্বার চেয়ে উত্তম অঙ্গ আর দ্বিতীয়টি নেই

ভাষা দিয়ে আমরা এক-কে বহুতে র পরিণত করি ভাষা থেকেই জন্ম নেয় দ্বৈতভাবের তাই আমরা জীবনকে দেখি খন্ডিতভাবে ভাষা নিয়ে অদ্বৈতকে পাওয়া যায় না কৃতিত্ব তার অর্থাৎ অদ্বৈতকে সেই ছুঁতে পারে যে ভাষাকে সংযত করতে পেরেছে

সাধকদের ক্ষেত্রে আমরা'মুনি' শব্দটা ব্যবহার করি মুনি শব্দটা এসেছে মৌনতা থেকে মৌন থেকে মৌনী আর মৌনী থেকে মুনি যিনি মৌনাবলম্বন করেন তিনিই মুনি, ঋষি, তপস্বী বা সূফী সাধক কোন কোন সূফী সাধকের কাছে সাধনার একমাত্র পথই হচ্ছে মৌন থাকা মুনিরা অন্য সবকিছুই করেন শুধু কথা বলেন না অনেক মুনিরাই সাধনার শুরুতে কথা বলা বন্ধ করার জন্য মুখের ভিতর পাথরের টুকরো রেখে দেন তাঁদের কাছে সত্য কথা মূল্যবান কিন্তু নীরবতা অমূল্য

ধর্মের মর্ম হচ্ছে যবানের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নীরবতা মূর্খের জন্য বর্ম জ্ঞানীর জন্য অলঙ্কার মূর্খের জন্য বর্ম কারণ, মূর্খ যদি নীরব থাকে তবে তার মূর্খতা প্রকাশিত হবে না জ্ঞানীর জন্য অলঙ্কার কারণ, জ্ঞানী যদি নীরব থাকেন তবে উলু বনে মুক্তা ছড়াবে না

মানুষ তার ভাষা দিয়ে দুনিয়াদারীর হালকা কাজ কর্ম চালাতে পারে কিন্তু কোন গভীর অনুভবই প্রকাশ করতে পারে না জগতে এমন কোন শব্দ নেই যা দিয়ে গুরুর প্রতি ভক্তি নিবেদন করা যায় বা প্রেমিকার প্রতি প্রেম নিবেদন করা যায় তাই মানুষের অনুভূতি যতো গভীর হতে থাকে ভাষা ততো কমতে থাকে অধিক ভাষা হালকা অনুভূতির পরিচায়ক মানুষ অল্প শোকে বিলাপ করে কিন্তু অধিক শোকে পাথর হয়ে যায় অল্প আনন্দে মানুষ লাফিয়ে উঠে কিন্তু পরমানন্দ লোকে মানুষ নির্বাক হয়ে যায়

মুরগী যখন একটা ডিম দেয় তখন 'কক কক' করে লোকদের জানান দেয় কিন্তু অনেকগুলো ডিম নিয়ে বাচ্ছা ফুটানোর জন্য ২১ দিন সে নীরবে অপেক্ষায় থাকে রামকৃষ্ণ বলতেন -'যোগীর মন সর্বদাই ঈশ্বরেতে আত্মস্থ চক্ষু ফ্যালফ্যালে, দেখলেই বুঝা যায় যেমন পাখী ডিমে তা দিচ্ছে - সব মনটাই সেই ডিমের দিকে, উপরে নামমাত্র চেয়ে রয়েছে আচ্ছা, আমায় সেই ছবি দেখাতে পার?' সব সূফী সাধকেরাই এরকম পাখির মত নীরবে ডিমে তা দেয়, চক্ষু ফ্যালফ্যালে, দেখলেই বুঝা যায় আমি এমন কোন সূফী সাধকের কথা শুনিনি যারা ২১ দিন, ৪০ দিন, বা কোন নির্দিষ্ট সময় নীরবতায় যাপন করেননি

নীরবতা হচ্ছে সেই অমৃত যার দিকে প্রতিটি আত্মা ধাববান আমরা কখন আল্লাহ্‌র কথা শুনতে পাবো? যখন নীরব থাকতে পারবো মোহাম্মদ সা. তখনই আল্লাহ্‌র কথা শুনতে পেয়েছিলেন যখন হেরা পর্বতের গুহায় নীরব ছিলেন বুদ্ধ বলেন,'যদি ভাঙ্গা কাঁসার ন্যায় নিজেকে নীরব-নিশ্চল রাখতে পার, তবেই তুমি নির্বানপ্রাপ্ত' অর্থাৎ, কথাই আমাদের বন্ধন আর নীরবতাই মুক্তি

অধিক কথা স্বাস্থ্যের জন্যও ক্ষতিকর কথা বলতে প্রচুর শক্তির অপচয় হয় মানুষের স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস ব্যাহত হয় অস্থির মানুষ বেশি কথা বলে না, বেশি কথা বলাই মানুষকে অস্থির করে তোলে নীরব থাকলে শক্তির এই অপচয় রোধ হয় বলেই মুনিরা শক্তিমান হয়ে উঠেন মৌনতা শরীরকে সুদৃঢ় করে, মনকে একরৈখিক করে, আত্মাকে শান্ত করে, জীবনকে ঐশ্বর্যে মন্ডিত করে নীরবতা হচ্ছে মন ও শরীরের বিশ্রাম নীরবতা শরীরকে সতেজ রাখে, চিন্তাকে কেন্দ্রীভূত করে, মনকে শান্ত করে

মানুষের জীবনটা পানিতে ভাসমান একটা নৌকার মতো যা ঢেউয়ের সাথে দুলছে আর বাতাসের সাথে গতিপ্রাপ্ত হচ্ছে ঢেউ হচ্ছে ইমোশান, সেন্টিমেন্ট, টেনশান, একসাইটমেন্ট আর বাতাস হচ্ছে পরিবেশ এমতাবস্থায় নৌকাটিকে স্থির রাখতে হলে একটা নঙ্গর চাই এই নঙ্গরটি অন্তরে যতই শক্তভাবে বিদ্ধ হবে নৌকাটা ততই স্থির হবে নৌকাটা যতই স্থির হবে ততই শান্ত হবে যতই শান্ত হবে ততই শান্তিতে (ইসলামে) থাকবে।  

আর এই নঙ্গরটির সাথে প্রেম যতো গভীর হবে ভাষা ততো আয়ত্বে থাকবে (সমাপ্ত)       

 

যক্ষবিলাস (৩৮)

খালেদ মতিন

 

(পূর্ব প্রকাশের পর)

কর্মহীন, চিন্ত্তাহীন, দিনরাত্রি যাপনের ভাগ্য তো আর্মান আলীর নয় আর্মান আলীর নিজের কোনো আরমান বা আকাঙ্খা আছে কিনা, তা নির্ণয় দুরূহ কিন্তু যার নিজের কোনো ইচ্ছে নেই, জগতের অজস্র মানুষের অজস্র ইচ্ছের প্রতিফলন যে তার মধ্যে যার নিজের কোনো অর্থ নেই পরার্থ তো তারই এ পরার্থ সাধনে সে যখন যেখানে গিয়েছে, ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্ব্বার্থান্ধ কূপমন্ডুকতা তাকে আচ্ছন্ন করতে পারেনি সে যা করেছে, সমষ্টির স্বার্থকে সামনে রেখে করেছে তা করতে গিয়ে মনে প্রাণে যাকে অন্যায় বলে জেনেছে, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়েছে সে প্রতিবাদের কন্ঠ কোথাও উচ্চ, কোথাও অনুচ্ছ তবু যাই হোক না কেন, সে তো প্রতিবাদই এর ফলে ক্ষমতাসীনতার সঙ্গে আঁতাত, তথা লিয়াজুবৃত্তির আশীর্বাদে সুখাাস্বাদের সুযোগ তার কখনো হয়ে ওঠেনি কিছুদিন আগে কলেজের অধ্যক্ষ মহোদয়ের সুদৃষ্টির স্নিগ্ধচ্ছায়ায় এলেও, তা অচিরেই প্রতিবাদী উষ্ণতার তাতে তেতে ওঠে, সে ছায়া নিমেষে গায়েব হয়ে গেল

কলেজে শিক্ষকদের মধ্যে দুটি গ্রুপ বাহ্যত: তা কেউই স্বীকার না করলেও কার্যত: তা ছিল ছোট গ্রুপটি এক তৃতীয়াংশ এবং বড়টি প্রায় দুই তৃতীয়াংশ শিক্ষক সমন্বয়ে গঠিত এর ছোটটিকে রক্ষণশীল বললে, বড়টিকে প্রগতিবাদী বলা যায় রক্ষণশীল গ্রুপটি সর্বদাই পশ্চাদমুখী চিন্তা ভাবনায় আচ্ছন্ন

ভূতের পা যেমন পেছনে, ওদের    চিন্তাচেতনাও তেমনি প্রিন্সিপাল সাহেবের সঙ্গে ওদের গাঁটছড়া ডিভাইড এন্ড রুল পলিসি গ্রহণের সুবিধার্থে, প্রিন্সিপাল সাহেব স্বয়ং হয়ত ক্ষদ্রতর গ্রুপটিকে স্বেচ্ছায় হাতে নেন এক্ষেত্রে বড় গ্রুপটির সঙ্গে বাহ্যত: যেমন মতবিরোধ, তেমনি সেটিকে হাতে নিলে, ক্ষুদ্রটি তো এমনি তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারবে না তাই তিনি তার উচিত কর্ম করেছেন ক্ষুদ্রতর গ্রুপটির সমর্থনে শক্তি যোগান আর যে কোন প্রতিষ্ঠানে প্রধান তো একাই একশ তার হাতে মূল ক্ষমতার চাবিকাঠি তিনি যার গোড়ায় জল ঢালবেন, সে লিকলিকে চারা হলেও মহীরূহ কে পারে তার সঙ্গে এভাবে কলেজে সার্বক্ষণিক একটা উত্তপ্ত পরিবেশ বজায় থাকে তাতে লাভ এটুকু যে, কলেজ মেসে প্রবাস যাপনকারী ব্যাচেলর ও বিবাহিত ব্যাচেলরদের নিরামিষ মুহূর্তগুলি জেদ, ঈর্ষা, উষ্মার ঝাল মশলায় উত্তেজনাকর আমিষযুক্ত হয় অতিরিক্ত কোন ফলোদয়ের প্রমাণ, এর আগে, অধ্যক্ষ মহোদয়ের একযুগ প্রশাসনে নেই তিনি বহাল তবিয়তেই, এ দীর্ঘ সময়, প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করে এসেছেন অধ্যাপক বা ছাত্র, কোন তরফ থেকে কালবোশে খীর সবভাঙ্গা ঝড়ের মত কোন বিপ্লবের আলামত নাজিল হয়নি বিক্ষোভটা হয়তো শিক্ষকদের মানসবিলাসেরই একটা বিভ্রান্তিকর রূপ যারা ডোরা হয়ে, কোবরার ছদ্মবেশে, মাঝে মাঝে, চক্র তোলার ভান করে, পরোক্ষ নই মাথা মাটিতে মিশিয়ে ফেলে,   শান্ত স্থিত অবস্থায় ফিরে যায়

এ সময় পদার্থবিজ্ঞানের একজন অধ্যাপক, যিনি অন্যত্র সিনিয়র ছিলেন, এখানে জুনিয়র হিসেবে যোগদান করেন বেসরকারি চাকরি পরিবর্তন মানেই, ফের বিসমিল্লাতে শুরু ইদানীং বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পূর্বপ্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা যোগ করার একটা নির্দেশনামা সরকারের থাকলেও, প্রতিষ্ঠান সরকারী করণের সময় সরকার নিজেই তা পালন করেন না সুতরাং প্রতিষ্ঠান এ নিয়ম মানবে কেন? যার যে অভিজ্ঞতাই থাক, শর্ত, তারা বিসমিল্লাহর অতিরিক্ত আলহামদুলিল্লাতে আরো পুরান আগে এসব কোন নিয়মই ছিল না আলমওদুদ নামধারী এ অধ্যাপক, ছাগ রূপে ঢুকে, অচিরেই একেবারে হালুম বাঘে পরিণত হন প্রগতিবাদী দলের অন্যতম লিডার সেজে বসেন রক্ষণশীল দলের সঙ্গে, বিবাদ বিসম্বাদ কয়েকগুণ বেড়ে যায় আগেকার মনের রেশ, এখন বিদ্বেষে পরিণত হয় আগেও কমবেশি আপত্তি বাকবিতন্ডা হত কিন্তু এখন পারস্পরিক বচসা নিরসনের জন্য, স্বয়ং অধ্যক্ষকেই, মাঝে মাঝে শিক্ষকদের নিয়ে জরুরি মিটিং করতে হয় মিটিংএ বিরোধ বচসা তো নয়, প্রায় বিস্ফোরণ কথা কাটাকাটি ধমকি, পাল্টা ধমকি থেকে, চেয়ার টানাটানির উপক্রম

এসব বিস্ফোরনোন্মুখ পরিস্থিতির পেছনে যে খুব একটা মহাকরণ নিহিত থাকত, তা নয় আসল কথা, এ সবই ছিল কথার সংঘর্ষ বন্দুক, কামান, বোমা, মহাবোমা জগতে, বোধ হয়, কোনটাই বিস্ফোরক নয় বিস্ফোরক কথা যতক্ষণ শক্তিধর মহাবাগিশদের ক্রোধান্ধ মহাবাক্যের মহাবিস্ফোরণ না ঘটে, ততক্ষণ বোমা, মহাবোমা কোনটাই ফাটে না অধ্যক্ষ আয়োজিত মিটিংএ পারস্পরিক বিদ্বেষাশ্রিত দুদলের বাগবিতন্ডার প্রচন্ড বিস্ফোরণ ঘটত (চলবে)