|
যাকাত
কি শতকরা আড়াই ভাগ?
সংলাপ
॥
''লোকে
তোমাকে জিজ্ঞেস করে কী তারা ব্যয় করবে?
বলে
দাও - উদ্বৃত্তের সমুদয়''।
(আল
কোরআন ২:
২১৯)।
কোরআনিক নির্দেশনাঃ
* ''সালাত
কায়েম কর এবং যাকাত আদায় কর।''
(সূরা
বাকারা : ৪৩,
১১০)।
* ''খরচ
কর আল্লাহর পথে,
নিজের হাতে নিজেকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিও না।''
(বাকারা
: ১৯৫)।
* ''তোমরা
কিছুতেই প্রকৃত কল্যাণ লাভ করতে পারবে না,
যে
পর্যন্ত না তোমাদের প্রিয় বস্তুগুলোকে আল্লাহর পথে ব্যয় করবে।''
(আল-ইমরান
: ৯২)।
* ''আমি
তোমাদের যে জীবনোপকরণ দিয়েছি তোমরা প্রত্যেকে মৃত্যু আসার পূর্বেই তা হতে
ব্যয় করো,
অন্যথায় মৃত্যু এলে সে বলবে,
হে
আমার প্রতিপালক ! আমাকে আরও কিছু কালের জন্য অবকাশ দিলে দান-খয়রাত করতাম
এবং সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত হতাম।''
(সূরা
মুনাফিকুন : ১০)।
* ''যারা
স্বর্ণ ও রৌপ্য পুঞ্জিভূত করে এবং তা আল্লাহ্র পথে ব্যয় করে না ওদের
মর্মন্তুদ শাস্তির সংবাদ দাও,
জাহান্নামের আগুনে তা উত্তপ্ত করা হবে এবং তা দিয়ে তাদের ললাটে,
পার্শ্বদেশে ও পৃষ্ঠদেশে দাগ দেয়া হবে।
সেদিন বলা হবে,
এতো-তাই যা তোমরা নিজেদের জন্য পুঞ্জিভূত করেছিলে।
সুতরাং যা তোমরা পুঞ্জিভূত করেছিলে তার স্বাদ গ্রহণ কর।''
(সূরা
তওবা : ৩৪-৩৫)।
কোরআন বলছে -
'লোকে
তোমাকে জিজ্ঞেস করে কী তারা ব্যয় করবে?
বলে
দাও - উদ্বৃত্তের সমুদয়।'
উদ্বৃত্ত কি?
প্রচলিত সংজ্ঞা হচ্ছে - বৎসর শেষে আয় থেকে ব্যয় বাদ দিলে যা থাকে তা-ই
উদ্বৃত্ত।
কোরআন নির্দেশ দিচ্ছে -
'উদ্বৃত্তের
সমুদয় আল্লাহর পথে ব্যয় কর'।
তাই
প্রশ্ন জাগে - সম্পদের আড়াই ভাগ যাকাত দিতে হবে এই সিদ্ধান্তটা আসল
কোত্থেকে?
এই
সিদ্ধান্তটা কি কোরআনের?
কোরআনের কোথাও কি শতকরা আড়াই ভাগের কথা উল্লেখ আছে?
মোহাম্মদ (সা.) কি শতকরা আড়াইভাগ যাকাত প্রদানের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন?
তিনি নিজেও কি শতকরা আড়াই ভাগই যাকাত দিতেন?
প্রশ্নগুলো নিঃসন্দেহে আলোচনার দাবি রাখে।
কোরআন সিদ্ধান্ত দিয়েছে -
''যারা
স্বর্ণ ও রৌপ্য পুঞ্জিভূত করে এবং তা আল্লাহ্র পথে ব্যয় করে না ওদের
মর্মন্তুদ শাস্তির সংবাদ দাও''।
কোরআনের তাগিদ হচ্ছে -'সম্পদ
পুঞ্জিভূত করো না।
অপ্রয়োজনীয় সম্পদ অভাবী ও দরিদ্রদের মধ্যে বিলিয়ে দাও'।
কোরআনের উদ্দেশ্য হচ্ছে - অর্থনৈতিক বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা।
লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে - কোরআনের কোথাও সম্পদের কত অংশ যাকাত দিতে হবে তার
উল্লেখ নেই।
কোরআন উদ্বৃত্ত নির্ণয়ের কোন ফর্মূলাও দেয়নি।
কোরআন বলছে -
'উদ্বৃত্তের
সমুদয় দিয়ে দাও।'
কিন্তু কোরআন একথা বলে দেয়নি যে,
কতটুকু অর্থ-সম্পদ থাকলে তা উদ্বৃত্ত হিসেবে গণ্য হবে।
আয়
থেকে ব্যয় বাদ দিলে উদ্বৃত্ত হয় এটাকে সংজ্ঞা হিসেবে ধরে নিলেও অস্পষ্টতা
থেকে যায়।
কারণ আয়-ব্যয়ের সীমানা নির্ধারিত নেই।
কেউ
ব্যয়ের খাতে প্রাইভেট এয়ার ক্রাফট রাখতে চাইলে কিংবা গলফ খেলার মাঠ রাখতে
চাইলে এমনি উৎপানকে অব্যাহত রাখার জন্য চলতি মূলধনের পরিমাণ ক্রমাগত বাড়াতে
থাকলে তার উদ্বৃত্ত আসবে কোত্থেকে একথা কোরআন পরিষ্কার ভাবে বলে দেয়নি।
কিন্তু কোরআন সুস্পষ্ট ভাবে সুরা নিসার ৭ থেকে ১৪ নং আয়াতের মধ্যে বলে
দিয়েছে সম্পত্তির কত অংশ ছেলে সন্তান এবং কত অংশ মেয়ে সন্তান পাবে,
কত
অংশ স্ত্রী ও অন্যান্যরা পাবে।
অথচ
ইসলামের মূলভিত্তি -''যাকাত''
কত
অংশ দিতে হবে তা নির্দিষ্ট করে দেয়নি কেন?
এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
কোরআন উদ্বৃত্ত নির্ণয়ের ফমূলা কিংবা যাকাতের অংশ নির্ধারণ করে দেয়নি।
কে
কিভাবে উদ্বৃত্ত নির্ণয় করবে,
সম্পত্তির কতটুকু ত্যাগ করবে তা ব্যক্তির ইচ্ছার স্বাধীনতার উপর ছেড়ে
দিয়েছে।
কারণ কি?
কারণ,
কে
কিভাবে উদ্বৃত্তের সংজ্ঞা দিচ্ছে এর ভিত্তিতেই আল্লাহ নির্ধারণ করবেন তাঁর
প্রতি কার কতটুকু টান।
সম্পত্তির কতটুকু পর্যন্ত ত্যাগ করলে আল্লাহর সান্নিধ্যে আসা যায়,
আল্লাহর নির্দেশ যথাযথ ভাবে পালন করা হয়,
তার
উদাহরণ হচ্ছেন মোহাম্মদ (সা.)।
মোহাম্মদ (সা.) -এঁর যাপিত জীবন।
মোহাম্মদ (সা.) -এঁর উম্মত হিসেবে তাঁর উম্মতদের দায়িত্ব হচ্ছে রসূলকে
অনুসরণ করা।
তিনি কিভাবে উদ্বৃত্তের সংজ্ঞা নির্ধারণ করতেন?
তিনি কি তাঁর সম্পত্তির শতকরা আড়াই ভাগ যাকাত দিতেন?
তাঁর সম্পত্তি বলতে কিছু অবশিষ্ট ছিল কি?
তাঁর উদ্বৃত্ত কতটুকু ছিল?
ওফাতের সময় তাঁর ঘরে আর এক বেলা খাওয়ার মতো সামান্য ছাতু ছাড়া আর কিছুই
পাওয়া যায় নি।
মোহাম্মদ (সা.) বিত্তবানদের কোরআনের আয়াত স্মরণ করিয়ে দিতেন।
বলতেন
''তোমরা
কিছুতেই প্রকৃত কল্যাণ লাভ করতে পারবে না,
যে
পর্যন্ত না তোমাদের প্রিয় বস্তুগুলোকে আল্লাহ্র পথে ব্যয় করবে।''
বলতেন -
''আল্লাহ্
তোমাদের যে জীবনোপকরণ দিয়েছে তোমরা প্রত্যেকে মৃত্যু আসার পূর্বেই তা হতে
ব্যয় করো।''
এইভাবে পথ প্রদর্শন করে তিনি বিত্তবানদেরকে উদ্ভুত করতেন তাদের পুঞ্জিভূত
সম্পত্তি অভাবীদের মধ্যে বিলিয়ে দেয়ার জন্য।
মোহাম্মদ (সা.) যথা সম্ভব প্রত্যেক দরিদ্রের খোঁজ খবর নিতেন এবং
বিত্তবানদের কাছ থেকে সম্পদ এনে বিত্তহীনদের মধ্যে তা বিলিয়ে দিতেন।
তাঁর এসব উদ্যোগের ফলে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই ইসলামের বিজয় ঝান্ডা উড্ডিন
হয়েছিলো দেশ থেকে দেশান্তরে।
দেশে দেশে দরিদ্র ও নিপীড়িত মানুষ সমবেত হয়েছিল ইসলামের (শান্তির) পতাকা
তলে।
এইভাবে মোহাম্মদ (সা.) সমাজ থেকে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য কমিয়ে কমিয়ে প্রায়
শূন্যের কোঠায় নিয়ে এসেছিলেন।
মোহাম্মদ (সা.) বার বার বলতেন -
'তোমরা
সালাত কায়েম কর এবং যাকাত দাও।'
তিনি বলতেন - ত্যাগই হচ্ছে
'মনযিলে
মকসূদে'
পৌঁছার পথ।
মুসলমানদের আদর্শ কি মোহাম্মদ (সা.) এর যাপিত জীবন,
নাকি শতকরা আড়াই ভাগের সিদ্ধান্ত দাতাগণ?
আমরা কাকে অনুসরণ করবো?
কোরআনকে?
মোহাম্মদ (সা.) এর জীবনকে না-কি সিদ্ধান্ত দাতাদের?
এটা
ভাববার বিষয়।
আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে যার কাছে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপা কিংবা
সাড়ে সাত তোলা সোনা অথবা সমমূল্যের দ্রব্য সামগ্রী রয়েছে তাকে শতকরা আড়াই
ভাগ যাকাত দিতে হবে।
সহজেই অনুমান করা যায় যে,
এই
সিদ্ধান্তটা এসেছে এমন একটা সময়ে যখন বিত্তবানেরা তাদের সম্পত্তির এতটুকু
অংশও অভাবীদেরকে দেবার জন্য আগ্রহ বোধ করতো না।
তাই
সম্পত্তির কমপক্ষে আড়াই ভাগ যাকাত দেয়াটা ইসলামী আইন হিসেবে প্রবর্তিত
হয়েছে।
এবং
বাস্তবতার নিরিখে এই আইনটা এখনো পর্যন্ত এ কারণেই যুক্তিসঙ্গত হিসেবেই
প্রতিয়মান হয় যে,
যারা কিছুই দিতো না তারাও এই আইনের ফলে কিছু না কিছু দিচ্ছে এটা নিঃসন্দেহে
আইনটির ভাল দিক।
শতকরা আড়াইভাগ যাকাত দেয়া ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা বা আনুষ্ঠানিক যাকাতে পরিণত
হয়েছে।
এটা
এখন ধর্মীয় রীতি-নীতির অন্তর্ভূক্ত।
সর্ব স্তরের সকল মানুষের বিবেচনায় আনুষ্ঠানিকতারও একটা গুরুত্ব আছে।
আনুষ্ঠানিকতা বজায় রাখতে হলে কমপক্ষে এতটুকু যাকাত দেয়া অবশ্য কর্তব্য।
কিন্তু এই নির্ধারিত সীমানা বা অবশ্য কর্তব্যও কি এখন পালন করা হচ্ছে?
যাকাত প্রদানে মুসলিম অধ্যূষিত বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা কোন পর্যায়ে আছে?
একটু পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে।
আনুষ্ঠানিক যাকাত প্রদানে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা ঃ
ইসলামী আইনের ব্যাখ্যাদাতারা বলে থাকেন -
'যাকাত
যার উপর ফরজ সে যদি তা আদায় না করে তবে তা
'কুফর
ও শিরকের আলামত'।
'যাকাত
আদায় না করলে সালাত-রোজা ইত্যাদি কোন কাজই আল্লাহ্র কাছে গৃহীত হবে না,
আর
এরূপ ব্যক্তির ঈমানদার হওয়ার দাবী করার আদৌ কোন মূল্য নেই।'
'মানুষ
যদি কালেমায়ে তাইয়্যেবা পড়ে কিন্তু তার সত্যতা প্রমাণের জন্য সালাত কায়েম
এবং যাকাত আদায় না করে,
তাহলে কোরআনের দৃষ্টিতে তার এ কালেমা পড়া একেবারেই অর্থহীন।'
'যাকাত
দানে অস্বীকৃতিকারী ব্যক্তি আর মুসলমান থাকে না'।
এখন
আমরা বলতে শুনি,
ইসলামের মূল ভিত্তি হচ্চে পাঁচটি -
'ঈমান,
নামাজ,
রোজা,
হজ্জ,
যাকাত'।
কথাগুলো এই ক্রমানুযায়ীই লিখা হয়,
বলা
হয়।
এভাবে বলা হয় কেন?
কোরআনে যতবার সালাতের কথা বলা হয়েছে প্রায় ততবারই সালাতের সাথে সাথে
যাকাতের কথা বলা হয়েছে।
'আকিমুস
সালাতা ওয়া তুজ যাকাতা'
এই
কথাগুলো এমনভাবে বলা হয়েছে যেন একটার সাথে আর একটা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
'সালাত
কায়েম কর এবং যাকাত দাও'
-
কোরআন এভাবে বলছে যেন একটাকে বাদ দিয়ে অন্যটা পূর্ণ হবার সুযোগই নেই।
অথচ
এখন বলা হচ্ছে - যাকাত ইসলামের চতুর্থ স্তম্ভ।
সালাতের সাথে যাকাত যুক্ত না থেকে,
সালাত থেকে পৃথক হয়ে যাকাত শেষের দিকে চলে গেছে।
কেন?
এটা
কি ছন্দের মিলের কারণে?
ছন্দ কি আল্লাহ্ তায়ালা মানুষের চেয়ে কম বুঝেন?
না-কি এটা কালের বিবর্তনে লোকায়ত বিকৃতি?
বর্তমানে যাকাত শুধু বুনীয়াদী ইবাদতের গণনায় শেষের দিকে চলে যায়নি,
গুরুত্বের দিক দিয়েও শেষে চলে গেছে।
যাকাত যেন দাড়ি রাখার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে।
কারণ কি?
কারণ তো একটাই হতে পারে যে,
দাঁড়ি রাখলে স্বার্থে আঘাত লাগে না কিন্তু যাকাত দিলে স্বার্থে আঘাত লাগে।
নামাজ পড়তে কষ্ট লাগে না কিন্তু সালাতে প্রতিষ্ঠিত হওয়া কষ্টকর।
কারণ তো একটাই হতে পারে যে,
একবেলা না খেয়ে থাকলে স্বার্থে আঘাত লাগে না কিন্তু যাকাত দিলে স্বার্থে
আঘাত লাগে।
হজ্জ করতে স্বার্থে আঘাত লাগে না (লোকে
'হাজী
সাহেব'
বলে
ডাকে,
সৌদী আরব থেকে কিছু কেনা-কাটা করা যায় আর দেশভ্রমনের আনন্দ তো আছেই!)
কিন্তু যাকাত দিলে স্বার্থে আঘাত লাগে।
সম্ভবত,
এসব
কারণেই যাকাতকে শেষের দিকে ঠেলে দিয়ে তৈরি হয়েছে এই লোকায়ত ছন্দ।
যাকাত কতটুকু গুরুত্বহীন হয়েছে তা অনুমান করা যাবে একটা হিসেব থেকে।
বেসরকারি হিসাব মতে বাংলাদেশে কমপক্ষে ১০০ জন রয়েছে যারা ১০০ কোটিরও বেশি
টাকার মালিক।
তাদের প্রতিজন আড়াই ভাগ যাকাত দিলে ২ লাখ ৫০ হাজার হিসাবে ১০০ জনের কাছ
থেকে ২৫০ কোটি টাকা যাকাত আদায় হতো।
দেশে মেয়াদী সঞ্চয়ের উপর যাকাতের অর্থ দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি
টাকা।
এবং দেশের উৎপাদিত ফসলের যাকাত হবে ৭০০ কোটি টাকারও বেশি।
সহজেই অনুমান করা যায় যে,
যদি সঠিক ভাবে যাকাত আদায় করা হতো এবং এই আদায়কৃত অর্থ সঠিকভাবে বিতরণ
করা হতো তবে এদেশে এত দরিদ্র থাকার কথা নয়।
বাংলাদেশে একেবারেই যাকত দেয় না অথচ নিজেকে ঈমানদার মুসলমান বলেই মনে করে,
এমন মুসলমানের সংখ্যাও কিন্তু কম নয়।
অনেকেই আছেন যারা স্বল্প পরিমাণে যাকাত দেয় এবং তাতেই এমন আত্মতৃপ্তি লাভ
করে যে,
কোরআনের বিধানের উপর সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে।
আমাদের দেশের বেশিরভাগ বিত্তবানদের যাকাতই প্রদর্শন মূলক।
অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রদর্শন মূলক যাকাতের মূল উদ্দেশ্য থাকে পার্থিব কোন
উদ্দেশ্য হাসিল করা।
তা হতে পারে আসন্ন নির্বাচনে ভোট প্রাপ্তির আশা,
হতে পারে সম্পদের সামাজিক প্রদর্শনী কিংবা সামাজিক নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ত্ব
লাভের দূরভিসন্ধি।
আর এ কারণেই যাকাত বিতরণের সংবাদ বিস্তীর্ণ এলাকায় মাইক দিয়ে প্রচার করা
হয়।
আমরা এমন হৃদয় বিদারক এবং মর্মান্তিক ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছি যেখানে
যাকাতের সবচেয়ে নিম্নমানের একখন্ড কাপড়ের আশায় প্রাণ দিয়েছে অবুঝ শিশু,
অসুস্থ বৃদ্ধ,
ক্ষুধার্ত নারী।
'লাল
পিরানের'
মর্মান্তিক গল্প বারবার আমাদেরকে বিদীর্ণ করেছে।
যাকাতের নামে যেন একটা প্রহসন চলছে।
আল্লাহর নির্দেশনার সুস্পষ্ট বিরোধিতা চলছে।
আল্লাহ্ বলেন,
'হে
মুমিনগণ! দানের কথা প্রচার করে এবং কষ্ট দিয়ে তোমরা তোমাদের দানকে ঐ
ব্যক্তির মতো নিস্ফল করো না,
যে নিজের ধন লোক-দেখানোর জন্য ব্যয় করে থাকে এবং আল্লাহ্ ও পরকালে
বিশ্বাস করে না।'
(সূরা
বাকারা : ২৬৪)।
আল্লাহ্ তায়ালা প্রদর্শনকারীদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন,
''তোমরা
আল্লাহ্র পথে যা কিছু খরচ করবে তা তোমাদেরই কল্যাণ সাধন করবে - অবশ্য
যদি তোমরা সেই খরচের ব্যাপারে আল্লাহ্ ছাড়া আর কারো সন্তুষ্টি পেতে না
চাও।''
(সূরা
আল বাকারা : ২৭২)।
অথচ এই আয়াতের বিরোধিতা করে দানকে প্রচার করে ফায়দা লুটতে চায় বিত্তবান
মুসলমানেরা।
যে যাকাতের লক্ষ্য ছিল দারিদ্র্য বিমোচন ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিলুপ্তি -
সে যাকাতকে এখন প্রদর্শন ও প্রহসনের বিষয়ে পরিণত করা হচ্ছে।
আমাদের দেশে কিছু কিছু টেক্সটাইল মিল রয়েছে,
যারা বিশেষ সতর্কতার সাথে সর্বনিম্নমানের এবং সবচেয়ে কমমূল্যের কিছু
'যাকাতের
কাপড়'
সরবরাহ করে থাকে।
যা কিনা অধিক সংখ্যায় বিতরণ করে অধিক সংখ্যক যাকাত প্রার্থীকে প্রতারিত
করার শামিল।
অথচ কোরআন বলছে -
''হে
ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেরা যে ধন-সম্পত্তি উপার্জন করেছ এবং আমি তোমাদের
জন্য জমিন থেকে যে রিযিক দিয়েছি তা থেকে ভাল ভাল সামগ্রী (আল্লাহ্র পথে)
ব্যয় কর।
খারাপ দ্রব্য থেকে কিছু সেই পথে খরচ করো না।''
(সূরা
আল বাকারা : ২৬৭)।
কোরআনের নীতিটি হচ্ছে -
'যা
আমরা নিজেরা গ্রহণ করবো না তা অন্যকে দেয়া যাবে না।'
যে নিম্নমানের কাপড় আমি পরিধান করতে পারি না সেই নিম্ন মানের কাপড়
আল্লাহর উদ্দেশে উপহার দেবার মতো ধৃষ্টতা আর কিছু আছে কি?
তবে এটাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে,
যত নগণ্যই হোক না কেন এমন মানুষও আছেন যাঁরা সঠিক ভাবে আনুষ্ঠানিক যাকাত
আদায় করছেন।
আনুষ্ঠানিক যাকাতের উদ্দেশ্যটাও উপলব্ধিতে আসা দরকার।
উদ্দেশ্য হচ্ছে -
''অর্থ-সম্পদ
যেন তোমাদের মধ্যে কেবল ধনী লোকদেরই কুক্ষিগত হয়ে কেবল ধনীদের মধ্যেই
আবর্তিত হতে না থাকে।''
(হাশর
: ৭)।
উদ্দেশ্য হচ্ছে - সম্পদের সুষম বন্টন।
কোরআন ঘোষণা করে -
''পৃথিবীর
সব কিছু মানব জাতির জন্যে নিয়ামত।''
(সূরা
বাকারা : ২৯)।
অতএব,
কিছুসংখ্যক মানুষের হাতে সম্পদ পুঞ্জিভূত থাকুক ইসলাম কিছুতেই তা অনুমোদন
করে না।
কোরআনের দৃষ্টিভঙ্গিটা হচ্ছে - ধন-সম্পদ সঞ্চিত করে রাখলে মানুষের মধ্যে
কৃপণতা ও স্বার্থপরতার জন্ম নেবে।
সম্পদের প্রতি অনিয়ন্ত্রিত লোভ থেকে সৃষ্টি হবে দুর্নীতি,
ফেৎনা-ফ্যাসাদ ও অকল্যাণ।
অতিরিক্ত সম্পদ মানুষকে অহঙ্কার আর দম্ভে কলুষিত করবে।
পক্ষান্তরে,
যাকাত মানুষকে মানুষের সাথে সংযুক্ত করে তাকে আল্লাহর সাথে সংযোগ
স্থাপনের পথটি বাৎলে দেবে।
যাকাত দানের মাধ্যমে মানুষের প্রতি মানুষের সহমর্মিতা জাগবে।
আনুষ্ঠানিক যাকাত দেয়ার ক্ষেত্রেও কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ শর্ত যুক্ত আছে।
প্রথমত,
হারাম পন্থায় উপার্জিত সম্পদ থেকে যাকাত দেয়া যায় না।
রক্ত দিয়ে রক্ত পরিষ্কার করা যায় না।
আল্লাহ্ তায়ালা কখনোই মন্দকে মন্দ দ্বারা দূর করেন না।
অতএব আনুষ্ঠানিক যাকাত প্রদানেরও একটা পূর্বশর্ত আছে।
উপার্জিত সম্পদ আল্লাহর নির্ধারিত পথে হতে হবে।
হারাম উপার্জন থেকে যাকাত দিলে হারাম উপার্জন হালাল হয়ে যায় না।
সম্পদের ২.৫% অভাবীদেরকে দিয়ে দিলে অপবিত্র সম্পদ পবিত্র হয়ে যায় এমন
ধারণা করা ঠিক নয়।
যাকাত কালো টাকা সাদা করার মতো কোন ধর্মীয় নীতি-রীতি নয়।
যাকাত দিতে হয় প্রসন্ন চিত্তে।
মনে কষ্ট নিয়ে যাকাত দেয়া যায় না।
যাকাত দিতে হয় এমন একটা উপলব্ধি থেকে যে,
এটা ধনীদের সম্পদে গরিবের ন্যায্য অধিকার।
যাকাত - গরিবের প্রতি ধনীদের করুণা নয়,
বরঞ্চ গরিবের প্রাপ্য মিটিয়ে দেয়া।
তাই মনে কষ্ট নিয়ে নয়,
প্রসন্ন চিত্তে যার প্রাপ্য তাকে মিটিয়ে-দেয়াই আইন সিদ্ধ।
আর অনিচ্ছা সহকারে মনে কষ্ট নিয়ে যাকাত দিলে আল্লাহ্ তায়ালার কাছ থেকে
এর জন্য কোন প্রতিদানের আশা করা যায় না।
আল্লাহ্ সুস্পষ্ট ভাবেই বলে দিয়েছেন -
''অনিচ্ছায়
অর্থ সাহায্য করে বলেই ওদের অর্থ সাহায্য গ্রহণ করা নিষিদ্ধ হয়েছে।''
(সূরা
তওবা : ৫৪)।
যাকাতের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য ঃ
১. আধ্যাত্মিকতায় যাকাত বলতে শুধু বস্তুগত দানকে বুঝায় না।
পূর্বেই বলা হয়েছে যে বস্তুগত দান - ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা।
তবে এটাও ঠিক যে,
কোরআনে বস্তুগত দানের কথাও বহুবার উল্লেখিত হয়েছে।
বলা হয়েছে - উদ্বৃত্তের সমুদয় বিলিয়ে দেয়ার কথা।
আাধ্যাত্মিকতায়ও আনুষ্ঠানিকতা আছে।
সূফী সাধকদের কাছে
''উদ্বৃত্তের
সমুদয়''-ই
হচ্ছে যাকাতের চূড়ান্ত মানদ
।
বিচার সভায় মনসুর আল হাল্লাজ -এঁর ধর্মীয় নিয়ম রীতি সম্পর্কে কোন জ্ঞান
আছে কি-না এটা যাচাই করার জন্য এক কাজী তাঁকে প্রশ্ন করলেন -
'বলোতো
২০ দিনারের যাকাত কত'?
মুনসুর আল হাল্লাজ উত্তর দিলেন -
'বিশ
দিনারের যাকাত সাড়ে বিশ দিনার।'
কাজীর কাছে এই উত্তর দুর্বোধ্য।
তাই কাজী মুনসুর আল হাল্লাজের কাছ থেকে এই উত্তরের ব্যাখ্যা চাইলেন।
মুনসুর আল হাল্লাজ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বললেন - বিশ দিনার জমিয়ে রাখার
শাস্তি হিসেবে আধা দিনার জরিমানা দেয়া তাঁর দৃষ্টিতে শরীয়ত।
উদ্বৃত্তের সাড়ে সাতানব্বই ভাগ নিজের জন্য রেখে আড়াই ভাগ দরিদ্রদের মধ্যে
দিয়ে দেওয়া হচ্ছে প্রচলিত আনুষ্ঠানিক যাকাত।
খাজা মুঈনুদ্দীন হাসান চিশতির দৃষ্টিতে - আড়াই ভাগ নিজের জন্য রেখে সাড়ে
সাতানব্বই ভাগ আল্লাহর উদ্দেশ্যে ব্যয় করার নাম যাকাত।
২. অভাবীকে দান করার অধিকার তারই থাকতে পারে যে অভাবমুক্ত।
অঢেল সম্পদের মালিক হলেই কেউ অভাবমুক্ত হয়ে যায় না।
অঢেল সম্পত্তির মালিক হয়েও যে ব্যক্তি আরো সম্পত্তি চায় সে তো এখনো অভাবী,
অভাবী নাহলে সে আর চাইবে কেন?
একজন অভাবী কি অন্য একজন অভাবীকে সত্যিকার অর্থে কিছু দিতে পারে?
অভাবী আসলে স্বত্ত্ব্বত্যাগ করে কিছু দিতে পারে না।
সে এটা দিয়ে ওটা কিনতে চায়।
২.৫% যাকাত দিয়ে বেহেস্তে বালাখানা বানাতে চায়।
যিনি অভাবমুক্ত তিনিই অন্যকে অভাবমুক্ত করার অধিকার রাখেন।
নিজে অভাবমুক্ত হওয়া আধ্যাত্মিকতায় যাকাত দানের যোগ্যতা অর্জন করা।
৩. যাকাত শব্দের আভিধানিক অর্থ পবিত্রতা।
পবিত্রতার সর্বনিম্ন স্তর হচ্ছে দেহ ও পরিধেয় বস্ত্রের পবিত্রতা।
লোকে মানুষের বাহ্যিক পবিত্রতা দেখেই কে কতটুকু ধার্মিক তা বিচার করে,
তাই বেশির ভাগ মানুষই পবিত্রতা বলতে বাহ্যিক পবিত্রতাকে বুঝে থাকে।
প্রকৃত পবিত্রতা হচ্ছে ক্বলবের পবিত্রতা।
ক্বলব পবিত্র হয়
'এক'
এর অবস্থানে।
যার ক্বলব পবিত্র হয়েছে অর্থাৎ যার মধ্যে এক আল্লাহ ছাড়া অন্যকিছুর
অবস্থান নাই তাকেই আল্লাহ ভালোবাসেন।
পবিত্রতা অর্জন করাই আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস আনা।
পবিত্রতাই ধর্মের মূল ভিত্তি।
আধ্যাত্মিক পরিভাষায় পবিত্রতা হচ্ছে আল্লাহ ছাড়া আর সকল বিষয়ের চিন্তা
থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা।
কলেমার প্রকৃত তাৎপর্য হচ্ছে - যখনই
'লা
ইলাহা ইল্লালাহু'
বলা হবে তখনই এক আল্লাহ ছাড়া অন্য সকল চিন্তা থেকে নিজেকে পবিত্র রাখতে
হবে।
সহজ ভাষায় এক চিন্তায় থাকাই ক্বলবের পবিত্রতা।
৪. মুক্ত মানুষেরই যাকাত দেবার অধিকার আছে।
যে ব্যক্তি মুক্ত নয় তার আবার যাকাত কি?
সুতরাং যাকাত দানের পূর্বশর্ত হচ্ছে - মুক্ত হওয়া।
যাকাত দাতা মুক্ত না আবদ্ধ এটাই বিচার্য বিষয়।
যে ব্যক্তি তার প্রবৃত্তির বন্ধনে আবদ্ধ তার প্রথম যাকাত হচ্ছে
প্রবৃত্তিকে স্বীয় নিয়ন্ত্রণে আনা।
প্রবৃত্তির খেয়ালকে ইচ্ছাশক্তির নিয়ন্ত্রণে রাখাই যাকাত।
কাম,
লোভ,
মোহ,
অহংকার,
হিংসা ও পরশ্রীকাতরতা ইত্যাদি সবই প্রবৃত্তির খেয়াল।
এই সমস্ত বিষয় সমূহের স্থলে বিনয়,
সন্তুষ্টি,
কৃতজ্ঞতা,
ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি প্রেমকে প্রতিস্থাপন করার নাম যাকাত।
৫. যাকাত দিতে পারে সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ।
উন্মাদের উপর যাকাত দেয়ার কর্তব্য বর্তায় না।
যে ব্যক্তি অনাবশ্যক বাক্য ব্যয় করে,
জীবনীশক্তিগুলোর অপচয় করে,
সকালে এক কথা আর বিকালে অন্য কথা বলে,
মিথ্যাচার ও আত্মপ্রঞ্চনা করে,
নিজের জিহ্বার উপর যার কোন নিয়ন্ত্রন নেই তাকে কি সুস্থ মানুষ বলা যায়?
একজন সুস্থ মানুষ হচ্ছে যে জানে সে কি চায়,
যে জানে কেন সে জীবন যাপন করছে।
একজন সুস্থ মানুষের জীবন কর্মবৃত্তের একটা কেন্দ্র থাকবে।
একটা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকবে।
লক্ষ্যহীন জীবন,
লক্ষ্যহীন জীবন হচ্ছে
'ন'
ছাড়া জীবন অর্থাৎ জীবের জীবন,
জীবের জীবন সুস্থ মানুষের জীবন হয় কি করে?
তাই জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্যকে স্থির করা এবং সেই লক্ষ্যে উপনীত হবার জন্য
কর্ম ও চিন্তার সমন্বয় এনে লক্ষ্যকেন্দ্রিক একাগ্রচিত্তের অধিকারী
ব্যক্তিই সুস্থ।
এই যোগ্যতা অর্জন করার নাম যাকাত।
৬. নাবালকের কোন যাকাত নাই।
সাবালকের যাকাত আছে।
নাবালক আর সাবালকের মধ্যে পার্থক্য কি?
মানুষের নাবালকত্ব আর সাবালকত্ব কি বয়সের উপর নির্ভর করে?
বয়স বাড়লেই কি মানুষ সাবালক হয়ে যায়?
নাবালকত্ব কি?
নাবালকত্ব হচ্ছে নিজেকে রক্ষা করার জন্য অন্যের উপর নির্ভরতা।
একটা শিশু নিজের খাদ্য নিজে যোগার করতে পারে না,
নিজের ভাল-মন্দ বুঝে না,
তাই সে তার জীবন রক্ষার জন্য পিতা-মাতার উপর নির্ভরশীল থাকে।
পিতা-মাতাই ঠিক করে দেন শিশুরা কি ধরনের পোশাক পরিধান করবে,
কি খাবে ইত্যাদি।
মানুষ আল্লাহ ছাড়া যতক্ষণ পর্যন্ত অন্যের উপর নির্ভরশীল থাকে ততক্ষণ
পর্যন্ত সে নাবালক।
এমনকি যে ব্যক্তির পোশাক পর্যন্ত হলিউড,
বলিউডের তারকারা নির্ধারণ করে দেয় বয়স যতই হোক সে কি সাবালকত্বের দাবিদার
হতে পার?
যে ব্যক্তি তার প্রতিটি কর্মের জন্য
'পাছে
লোকে কিছু বলে'
অর্থাৎ মানুষের গ্রহণশীলতার উপর নির্ভরশীল থাকে সে কি সাবালক হয়েছে?
যে এখনো সাবালকই হয়নি সে যাকাত দেবে কিভাবে?
সাবালকত্ব হচ্ছে
'অনেষ্টি
টু দ্যা পারপাস,
সিনসিয়ারিটি টু দ্যা পারপাস'।
সাবালকত্ব হচ্ছে দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের যোগ্যতা।
মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত নিজের পরিপূর্র্ণ দায়িত্ব নিজে নিতে না পারে,
যতক্ষণ পর্যন্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে তার নিষ্ঠা,
সততা ও একাগ্রতা প্রতিষ্ঠিত না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত কাউকে সাবালক বলা যায়
না।
৭. ''উদ্বৃত্তের
সমুদয়''
বলতে কি বুঝায়?
উদ্বৃত্ত কি শুধু ধন সম্পত্তি?
ধন সম্পত্তি তো বাহ্যিক উদ্বৃত্ত।
আয় থেকে ব্যায় বাদ দিলে যা থাকে তাতো আর্থিক উদ্বৃত্ত।
আর কোন উদ্বৃত্ত কি মানুষের নেই?
সন্তান জন্ম দেয়া ব্যতিত মানুষের কাম শক্তির সবটাই কি উদ্বৃত্ত নয়?
এই উদ্বৃত্তের সমুদয় আল্লাহর উদ্দেশে উৎসর্গ করার নাম যাকাত।
সময় কি উদ্বৃত্ত হয় না?
উদ্বৃত্ত সময় যাকে আমরা অবসর সময় বলি এই সময়টাকে আল্লাহর পথে ব্যয় করার
নাম যাকাত।
একইভাবে,
মেধা,
বুদ্ধি,
শারিরীক ও মানসিক শক্তির কি উদ্বৃত্ত নেই?
আছে।
কার কোথায় কতটুকু উদ্বৃত্ত আছে তা তাকেই খুঁজে বের করতে হয়।
এবং এই উদ্বৃত্তের সমুদয় আল্লাহর পথে ব্যয় করার নাম যাকাত।
বিশ্বে
বেকারত্ব বাড়ছে
সংলাপ
॥
২০০৭ সালে বিশ্বে কর্মক্ষম বেকার তরুণের সংখ্যা ছিল প্রায় ১১.৯ শতাংশ।
আর
২০০৯ সালে তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ১৩ শতাংশ।
আরও
আশংকার বিষয় হল,
চলতি বছরের শেষনাগাদ সারা বিশ্বের ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী শ্রমিকের ১৩
শতাংশেরও বেশি বেকার হয়ে যাবে।
সম্প্র্রতি এ তথ্য জানিয়েছে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে,
চলতি বছর বিশ্বে বেকারত্বের হার (যুবকদের) রেকর্ড গড়তে পারে।
এতে
করে আশংকাজনক হারে বেড়ে যেতে পারে সামাজিক অস্থিরতা,
অপরাধ,
সহিংসতা ইত্যাদি।
'আইএলও
গোবাল অ্যাপয়েনমেন্ট ট্রেন্ডস ফর ইয়ুথ-২০১০'
শীর্ষক একটি প্রতিবেদনের মাধ্যমে জানানো হয়েছে,
২০১০ সালের শেষনাগাদ কাজ করার জন্য উপযুক্ত বা কর্মক্ষম প্রায় ৮ কোটি ১০
লাখ মানুষ বেকার হয়ে পড়বে।
এ
অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে বিগত দুই বছরের বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকটের কারণে।
কোনও কোনও বিশেষক এ অবস্থা দেখে বর্তমান তরুণ প্রজন্মকে একটি
'হারানো
প্রজন্ম'
হিসেবে অভিহিত করেছেন।
উল্লেখিত প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়েছে,
২০০৯ সালে বিশ্বে তরুণ কর্মীর (১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী) সংখ্যা বা পরিমাণ ছিল
প্রায় ৬২০ কোটি।
বিগত দুই দশকে রেকর্ড করল বেকারত্ব।
এদিকে প্রায় ৭ কোটি ৩০ লাখ তরুণ কাজ হারিয়ে বা চাকরিচ্যুত হয়ে বেকারত্বের
তালিকায় স্থান পেয়েছে গত ২০০৭ সালের বিশ্বমন্দাকালে।
আগামী বছর অর্থাৎ ২০১১ সালে কর্মসংস্থানের পরিমাণ কিছুটা বাড়তে পারে বলে
আশার বাণী শোনানো হয়েছে।
তবে
তরুণরা এ সুযোগ তেমনভাবে কাজে লাগাতে পারবে না পরিণত বয়স্ক মানুষের চাপে।
এ
প্রসঙ্গে আইএলও পরিচালক জেনারেল জুয়ান সোমাভিয়া মন্তব্য করেন,
এতে
করে হুমকির মুখে পড়বে সামাজিক নিরাপত্তা।
কারণ উন্নয়নের মূল শক্তি তরুণরা।
তারা কাজের সুযোগ না পেলে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বিশ্ব অর্থনীতি।
এ
প্রসঙ্গে গোবাল আনএমপয়মেন্ট ট্রেডের লেখক সারাহ এলডার মন্তব্য করেন,
আইএলও এ সংক্রান্ত যে তথ্য দিয়েছে তাতে বোঝা যাচ্ছে,
বর্তমানে কর্মী তরুণদের বেকারত্বের রেকর্ড করেছে।
এ
সংখ্যা বা পরিমাণ ক্রমে বেড়েই যাচ্ছে।
সারাহ আরও মন্তব্য করেন,
তরুণরা কাজ বা চাকরির আশায় পড়ালেখা করছে,
কারিগরি শিক্ষা ইত্যাদি গ্রহণ করছে।
তারপরও তারা দেখছে কাজ বা চাকরির কোনও সুযোগ বা সম্ভাবনা নেই।
এ
দেখে তারা হতাশ হয়ে পড়ছে।
এদিকে সরকারি হিসাব মতে,
চলতি ২০১০ সালের জুলাইয়ের শেষভাবে অস্ট্রেলিয়ায় বেকারত্বের হার বেড়েছে ৫.৩
শতাংশ।
সম্প্রতি এ তথ্য জানায় অস্ট্রেরিয়ার ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিকস।
এ
সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনের মাধ্যমে জানানো হয়েছে,
এক
মাসে (জুন মাসে) দেশটিতে কাজ বা চাকরি হারিয়েছে প্রায় ২৪ হাজার ৬শ'
মানুষ।
এর
নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় নির্বাচনসহ আরও অনেক ক্ষেত্রে।
অবশ্য অস্ট্রেলিয়ার বেকারত্বের এ হার স্বাভাবিক বলে জানিয়েছেন অস্ট্রেলিয়া
সরকারের এক মুখপাত্র ওয়ানি মান।
তিনি বলেন,
সাম্প্রতিক বিশ্বমন্দার কারণে অস্ট্রেলিয়ায় বেকারত্বের হার যে হারে বেড়েছে
তার চেয়েও বেকারত্বের হার তুলনামূলক বেশি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের
দেশগুলোতে।
আইএলও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,
২০০৯ সালে বেকারত্বের বৃদ্ধির হার কিছুটা বেশি হলেও তা ২০০৭ সালের তুলনায়
অনেক বেশি।
২০০৭ সালের শেষের দিকে বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিলে এর প্রভাবে ২০০৯
সালের শেষের দিকে বেকার যুবকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৭০ লাখ ৮০ হাজার।
ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের কারণে অল্পবয়সীদের মধ্যে অলসতা,
মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা,
মাদক গ্রহণ ইত্যাদি প্রবণতা বেড়ে যাচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।
আইএলও জানিয়েছে,
উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কাজ করে প্রায় ৯০ শতাংশ তরুণ।
তারপরও তাদের বেশির ভাগই দরিদ্র।
বিশ্বে বর্তমানে কর্মরত আছে প্রায় ১৫ কোটি ২০ লাখ তরুণ।
তাদের প্রায় ২৮ শতাংশ কাজ বা চাকরি করেও দারিদ্র্যের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে
আসতে পারছে না।
'আইএলও
গ্লোবাল অ্যাপয়েনমেন্ট ট্রেন্ডস ফর ইয়ুথ-২০১০'
শীর্ষক প্রতিবেদনের মাধ্যমে আরও জানানো হয়েছে,
বৈশ্বিক মন্দার দুই বছরে উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে বেকারত্ব বৃদ্ধির হার
(তরুণদের) ছিল প্রায় ৪৫ শতাংশ।
মিথ্যাচারের প্রচারই আধিপত্যবাদী হাতিয়ার
সংলাপ
॥
আধিপত্যবাদী প্রচারের পদ্ধতি যে অনেক ফলপ্রসূ সেটি স্বীকার করে নেয়ার
মধ্যে লজ্জার ও দোষের কিছু নেই বরং সত্যটা অন্বেষণ করা যায় তারমধ্যে।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পুঁজিবাদী মিথ্যাচার ও শোষণের ধরন যেমন পাল্টে
পাল্টে অব্যাহত থেকেছে,
ঠিক তেমনিভাবে পুঁজিবাদী প্রচার পদ্ধতিও পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে
গিয়ে আধিপত্যবাদী প্রচার হয়েছে।
যদিও এই প্রচারের উদ্দেশ্য একই থেকেছে এবং আছে।
একবিংশ শতকের প্রচারের পদ্ধতিটা তো আর পুরনো দিনের মতো হতে পারে না।
উদ্দেশ্যর সহজ কথাটা লুকিয়ে রেখে বলার কথাটি জটিল করে উপস্থাপিত না করলে
আজকের পোস্ট মডার্ন যুগের মানুষের কাছে আধিপত্যবাদী মিথ্যা প্রচারের
আকর্ষণ যে থাকবে না সে কথা আজকের বিশ্বায়িত পুঁজিবাদ ভাল করেই জানে।
অনেক শতাব্দী পিছিয়ে গিয়ে পুঁজিবাদী প্রচারের এই ক্রমপরিবর্তনের ধারাটিকে
চিহ্নিত করা যায়,
কিন্তু তাতে পাঠকের ধৈর্যচ্যুতির আশঙ্কা থাকে।
তার চেয়ে বরং ঊনবিংশ শতকের এমন অনেক প্রচারের একটি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ
করা যেতে পারে।
আমাদের দেশের নবাব সিরাজদ্দৌলার মতো আফ্রিকার আজকের জিম্বাবোয়ের শেষ
স্বাধীন রাজা ছিল লোবেঙ্গুলা।
ঊনবিংশ শতকের শেষ পর্যায়ে অসমসাহসী ম্যাটাবেলে-ম্যাশোনা (জুলু) উপজাতিদের
সেই রাজ্য দখল করতে ব্রিটিশ ও দক্ষিণ আফ্রিকার বুয়ররা খ্যাপা কুকুরের মতো
কামড়াকামড়ি করছিল।
সে এক করুণ কাহিনী।
ম্যাটাবেলের রাজত্ব শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ উপনিবেশে পরিণত হয়েছিল।
রাজ্য হারানো এবং সুনিশ্চিত সেই সময় ম্যাটাবেলেদের রাজা লোবেঙ্গুলা এক
শ্বেতাঙ্গ মিশনারির কাছে চূড়ান্ত হতাশা আর বিরক্তিতে বলেছিল,
'শ্বেতাঙ্গদের
সঙ্গে পরিচিত হওয়ার আগে মিথ্যা কথা কিভাবে গুছিয়ে বলতে হয় আমি জানতাম না।'
বেচারা লোবেঙ্গুলা! তার কাছে যেগুলো ছিল মিথ্যে কথা,
শ্বেতাঙ্গদের কাছে সেগুলোই ছিল প্রোপাগান্ডা-ডিপ্লোম্যাসি।
যাই হোক,
ঊনবিংশ শতাব্দীতে
'মিথ্যে
কথা গুছিয়ে বলাটাই'
ছিল আধিপত্যবাদী প্রচারের মূল কায়দা যার ছোঁয়ায় বাংলাদেশ অসুস্থ।
বিংশ শতকের প্রথমার্ধের পুঁজিবাদী প্রচার পদ্ধতির প্রধান পুরোহিত ছিল
গোয়েবলস।
তার বক্তব্য ছিল,
মিথ্যে কথা শুধু গুছিয়ে বললেই হবে না,
সেটি বারে বারে বলতে হবে - বলে যেতেই হবে - বলে যেতেই হবে।
গোয়েবলস এর কথা লোকে কেন যে এত বলে কে জানে! আমাদের রাজনৈতিক কথামালায়
জনগণের নামে মিথ্যাকে সত্য বলে তুলে ধরার (যেমন ভারত বিদ্বেষ) বানানোর
গল্পগুলো এমন কিছু খারাপ নয়।
ক্রমাগত অসত্য কথা বলার জন্য বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো কেন যে বস্তাপঁচা
গোয়েবলসীয় পদ্ধতি অনুসরণ করে! জলজ্যান্ত মিথ্যে কথা অথচ একেবারে আবে
জমজমের পানিতে ধোয়া সত্য কথার মতো শোনাবে এখন আরও কত নতুন টেকনিক
বেরিয়েছে।
সেগুলো এখনও জেনে নিতে না পারার দায়টা অবশ্যই শিক্ষাবিস্তারের খামতি ও
বর্তমান রাজনীতিকদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া যেতেই পারে।
বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে প্রচারের বিষয়টি কর্পোরেট সংস্থাগুলির
বিশেষজ্ঞদের হাতে চলে যায়।
এই বিশেষজ্ঞদের মতে প্রচারের বিষয়টি,
ওপর থেকে মানুষের ওপর চাপিয়ে দিলে আর চলবে না।
তাদের মতে মিথ্যা প্রচারের বিষয়টি গণ মানুষকে জড়িয়ে নিয়ে মানুষের ভেতর
থেকে তুলে আনতে হবে।
তাই আর প্রোপাগান্ডা বা পাবলিসিটি নয়,
যা করতে হবে তার নাম মার্কেটিং।
পণ্যদ্রব্যসহ বিভিন্ন ধ্যানধারণারও মার্কেটিং।
এ
সম্পর্কে হাজার কাহিনী কাছে।
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এক জুতোর কোম্পানি তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে
ব্যাপক প্রচারও চালিয়েও যখন জুতোর ব্যবসা বাড়াতে পারছিল না তখন তারা
তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশে একজন মার্কেটিং ম্যানেজার পাঠাল।
দায়িত্ব নিয়েই মার্কেটিং ম্যানেজার প্রথমে জুতোর যত অ্যাডভার্টাইজমেন্ট
আর পাবলিসিটি মেটিরিয়াল ছিল সব বাজার থেকে তুলে নিল।
তার তরফ থেকে নির্দেশ দেয়া হল কোম্পানির জুতোর প্রচারে আর একটিও কথা নয়।
পরিবর্তে তৃতীয় বিশ্বের অস্বাস্থ্যকর দেশগুলিতে মানুষের কেন সব সময় জুতো
পরে থাকা উচিত,
জুতো না পরলে স্বাস্থ্যের,
সৌন্দর্যের কি কি হানি হতে পারে ইত্যাদি নিয়ে সেমিনার,
গ্রুপ মিটিং,
ছোট-বড় জনসভা শুরু করে দিল।
এর কিছুদিনের মধ্যে উক্ত কোম্পানির জুতো বিক্রির বহর আকাশছোঁয়া হয়ে গেল।
তা এই হল গণমানুষকে জড়িয়ে নিয়ে মানুষের মধ্যে থেকে উঠে আসা মিথ্যা
প্রচারের মাহাত্ম্য।
বাংলাদেশে সার্বিক দুর্দশা ও দুর্গতি নিরসনের ও সর্ববিধ উন্নতির জন্য
'পরিবর্তনের'
বর্তমান ধারাটি ভারতমুখী বলে বিরোধী দলের পন্ডিত তথা তথাকথিত
বুদ্ধিজীবীদের এবং রাজনীতিকদের একটি বিশেষ
'ধারণা'-র
মার্কেটিং।
এর জন্য বিভিন্ন চ্যানেলে টকশো,
সেমিনার আর বহুল প্রচারিত পত্রপত্রিকার লেখালেখি কম হচ্ছে না।
যাই হোক,
এই প্রচার পদ্ধতিগুলোও পুরনো হয়ে যাচ্ছে বা গেছেই বলা যায়।
সাধারণ মানুষ এখন এই ধরনের প্রচারে ক্লান্ত বোধ করে,
বিরক্ত হয়।
একবিংশ শতকে বিশ্বায়িত পুঁজিবাদের প্রচারে তাই নতুন পদ্ধতির আবির্ভাব
ঘটেছে।
বহুবিধ উপাদানের মিশ্রণে প্রচারের বিষয়বস্তুটি তৈরি।
তবে এটি কখনও সম্পূর্ণভাবে একসঙ্গে লিখিত-পড়িত আকারে কোথাও পাওয়া যাবে না।
এর বিভিন্ন উপকরণের সঙ্গে পরিচিত হতে শুরু করলেই শরীরে-মনে কেমন যেন
শিহরন জাগে! প্রচারের বিষয়টির মধ্যে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের সওয়াল আছে,
সমাজের সকলের উন্নয়নের দাবি আছে,
সামাজিক অচলায়তন ভেঙে ফেলার কথা আছে,
দৈনন্দিন জীবনের চলে আসা রীতিনীতি,
অনুশাসন অগ্রাহ্য করার পরামর্শ আছে,
আছে ব্যাপক গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা,
এমনকি মানব মুক্তির কথাও।
'না
পড়লে,
না দেখলে পিছিয়ে পড়তে হয়'
এমন সব প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাহায্য নিয়ে এই বিষয়গুলি থেকে থেকে,
কিছুদিন বাদে বাদে উপস্থাপিত করা হয়।
ব্যাপক সাধারণ মানুষকে কখনও জানানো হয় যে ইচ্ছে করলেই প্রতিটি মানুষ এখন
পৃথিবীর যাবতীয় খোঁজখবর জ্ঞানগম্যি উন্নততর নানাধরনের প্রযুক্তির মাধ্যমে
জোগাড় করে সমৃদ্ধ হতে পারে,
পরিচয়ের পরিধি বাড়িয়ে অন্য মানুষদের সঙ্গে,
বিভিন্ন চিন্তাভাবনার সঙ্গে একাত্ম হতে পারে এবং এইভাবে হয়ে উঠতে পারে
বিশ্ব নাগরিক (এই কথাগুলো নিয়ে অবশ্য দ্বিমতের কোনও সুযোগ নেই)।
আবার একইভাবে অন্য কোনও সময় বলা হয় যে পরিপূর্ণ হওয়ার জন্য প্রত্যেককে
তার পারিবারিক বা গোষ্ঠীগত এবং সর্বোপরি শ্রেণীগত পরিচয় গ্রাহ্য করে
নিরপেক্ষ একক মানুষ হিসাবে বাইরে বেরিয়ে আসতে হবে।
একমাত্র তা হলেই রাজনীতির কলুষমুক্ত দলহীন গণতন্ত্রের নাগরিক সমাজ
প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হবে।
একইভাবে গণমাধ্যমের সাহায্য নিয়ে আবার কখনও কোথাও ব্যবস্থাপত্র দেয়া
হচ্ছে যে,
কি কি খাবার খেলে,
কি ধরনের পরিধেয় পরলে,
কি প্রসাধনী মাখলে,
কিভাবে ঘরবাড়ি সাজালে,
কি ভাবে চুল-দাড়ি কাটলে,
কি ধরনের গাড়িতে চড়লে নিজের আলাদা পরিচিতি ও ব্যক্তিত্ব মুসলমানের মতো
প্রকাশ পাবে।
কখনও জানানো হয় যে মূল্যবোধ দিয়ে কিছু হয় না।
জীবনে সবই ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার বিনিময় মূল্য দিয়ে নির্ধারিত হয়।
কখনও ফিসফিসিয়ে শোনানো হয় ব্যক্তি জীবনে নরনারীর কামনা-বাসনা যেহেতু
ক্ষুধাতৃষ্ণার মতোই স্বাভাবিক সেই হেতু তাকে সারা জীবনের জন্য পবিত্রতার
পূর্বশর্তে জড়িয়ে ফেলার প্রবণতা।
এমন আরও অনেক বক্তব্য,
উদাহরণ হিসেবে দেয়া যায়।
কিন্তু তার প্রয়োজন নেই।
এখন মানুষের মস্তিষ্ক বিভিন্ন সূত্র থেকে আহৃত,
সাদৃশ্য আছে এমন বা অনুরূপ,
তথ্য নিজের মতো করে সংশ্লেষ ঘটিয়ে একটা চেতনার জন্ম দেয়।
আহৃত উপাদানগুলো যেখানে যে রকম,
সংশ্লেষিত চেতনা সেখানে সে রকম হতে পারে সেটি সহজেই অনুমেয়।
এমন চেতনায় সমৃদ্ধ হয়ে মানুষ হয়ে ওঠে নিরালম্ব,
অসংবেদনশীল,
উগ্র,
স্বার্থপর ও নিষ্ঠুর।
বিশ্বায়িত আধিপত্যবাদ মুনাফা এবং একমাত্র মুনাফার স্বার্থে ঠিক এটাই চায়।
একবিংশ শতকের আধিপত্যবাদী মিথ্যা প্রচার এই লক্ষ্য নিয়েই ঘোরাফেরা করে
চলেছে বিশ্বজুড়ে।
বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশক পর্যন্ত গণমাধ্যম বলতে বোঝাত সংবাদপত্র ও
বিভিন্ন গোত্রের পত্রপত্রিকা (তখনও টেলিভিশন ও আনুষঙ্গিক প্রযুক্তির এত
প্রসার ঘটেনি)।
সে সময় পর্যন্ত বড় বড় সংবাদপত্র (ফোর্থ স্টেট হিসাবে) সাধারণ মানুষের
কাছে সম্ভ্রম আদায় করতে সক্ষম হত।
তখনও পর্যন্ত অনুসন্ধানী,
সাংবাদিকতা,
সংবাদভাষ্য ইত্যাদির আলাদা একটা মর্যাদা ছিল - সেগুলিকে সাধারণ মানুষের
সচেতনতা বৃদ্ধির সহায়ক বলে মনে করা হত।
তার পরে হঠাৎ করেই সবকিছু পাল্টে গেল।
বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকের শেষে বিশ্বব্যাপী লগ্নিপুঁজির দৌরাত্ম্য শুরু
হল।
আর পাঁচটা দেশের মতো আমাদের দেশের বেশিরভাগ বড় বড় সংবাদপত্র ও আনুষঙ্গিক
পত্রপত্রিকা স্বকীয়তা,
স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা বিসর্জন দিয়ে নির্দিষ্ট লগ্নিপুঁজির
স্বার্থরক্ষায় মিথ্যাচারে নিজেদের নিয়োজিত করে ফেলল।
এতদিন পর্যন্ত যেগুলি ছিল প্রচারের মাধ্যম,
এ
বারে সেগুলিই বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলোর ও অর্থনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর
মুখপত্রের ভূমিকায় আসরে অবতীর্ণ হল।
প্রচার মাধ্যমের আদর্শ ভূমিকা থেকে সরে গিয়ে শুরু হল মাধ্যমের প্রচার -
কিছু পরে ইলেকট্রনিক মিডিয়া তার সঙ্গে যুক্ত হল।
সেই প্রচারের তীব্রতা ও ব্যাপকতা আজ এমনি যে বহুল প্রচারিত সংবাদপত্র ও
চ্যানেল কোন কোন রাজনৈতিক দলের হয়ে প্রচার চালাচ্ছে সেটি বুঝতে কারো
অসুবিধা হয় না।
প্রচারিত বক্তব্যের ক্ষেত্রে সত্য,
অর্ধসত্য ও মিথ্যা সংবাদ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।
সবচেয়ে বিপদের কথা হল এই যে,
আধিপত্যবাদী প্রচার পদ্ধতি এই কাজ করতে গিয়ে গণ-মানুষের বিশ্বাস করার
স্বাভাবিক প্রবণতাটি নষ্ট করে দিয়েছে এবং দিচ্ছে।
মানুষ আজ কী বিশ্বাস করবে আর কোনটা করবে না তার ভিত্তিটাকে নড়বড়ে করে
দিয়েছে।
বিচার বিবেচনার জন্য ব্যাপক মানুষকে কিছু জানানোর প্রক্রিয়াটিকেই অবাস্তব
করে তুলেছে।
প্রচার পদ্ধতি আজ শুধুমাত্র ক্ষমতা দখলের সমর্থনে সহমত গড়ে তোলার একটি
আধিপত্যবাদী হাতিয়ার মাত্র।
ব্যাপক সাধারণ মানুষের কাছে বর্তমান সরকারের সার্বিক বক্তব্য আজকের
প্রেক্ষিতে নিয়ে যাওয়া কতখানি দুরূহ করে তুলেছে বিরোধীদলগুলো সেটা
দেখানোর উদ্দেশ্যেই প্রচার পদ্ধতির এই আলোচনা।
বর্তমান সরকারের তরফে অবশ্য পাল্টা প্রচারের এই কাজটি সুসম্পন্ন করার
কোনও গত্যন্তর নেই বলে দূরদর্শী চিন্তাবিদদের অভিমত।
পেনশন ভাতা
(৪)
খালেদ মতিন
॥
(পূর্ব প্রকাশের পর)
এমন
সঙ্গীন মুহূর্তে অধ্যক্ষ মহোদয় এগিয়ে এলেন বৃদ্ধ ওহিদের সাহায্যার্থে।
তার
ভাষ্য - বিগত প্রায় তিরিশ বছর যাবৎ এখানে চাকরি করছেন।
অত্যন্ত সুন্দর,
সফল
রেকর্ড নিয়ে চাকরি সমাপ্ত করেছেন,
সহজ
স্বতস্ফূর্ত নিয়মে আপনার পেনশন ভাতা পাওয়ার কথা ছিল।
অত্যন্ত দুঃখজনক।
এ
ব্যাপারে আমাদেরও কমবেশি দায়িত্ব আছে।
একা
না যেতে পারেন।
আমিই আপনাকে সঙ্গে নিয়ে যাব।
ওহিদ অধ্যক্ষ মহোদয়কে সঙ্গে নিয়ে রওয়ানা দেয়।
যথাসম্ভব কাগজপত্রও সঙ্গে নেয়।
বিকেল আড়াইটার বাসে তাদের যাত্রা।
টঙ্গী পযৃন্ত গিয়ে,
এক
হোটেলে রাত যাপন।
পরদিন সকালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যক্ষের অফিস সংক্রান্ত কিছু কাজ সেরে,
রাজধানীর যানজটের অবরোধ ঠেলে,
বেলা একটায় তারা শিক্ষা অফিসে পৌঁছে।
সেখানেও ব্যারিকেড।
অনুমতিপত্র দেখিয়ে,
ভিতরে ঢুকতে হয়।
অবশ্য অনুমতিপত্র আগে থেকেই উভয়ের সঙ্গে ছিল।
রূপকথার রাজকুমারের মতো অনেক তেপান্তর,
অনেক সমুদ্র পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত ওহিদরা এসে পৌঁছল সেই সরোবরে যেখান থেকে
কালো গোলাপ আহরণ করা যায়।
তবে
সবে তো সরোবরের তীরে।
মধ্য সরোবরে কালো গোলাপ।
তা
আহরণ এখনো দিল্লী হনুজ দুরন্ত।
নির্দিষ্ট অফিসার অর্থাৎ ডিডি।
এরা
সাধারণত সরকারি কলেজের এসোসিয়েট প্রফেসার অথবা প্রফেসার।
ডেপুটেশনে এখানে আসে।
এখানে যিনি বসেছিলেন,
তার
পদপদবী সম্বন্ধে ওহিদের কিছু জানা নেই।
বেশ
কিছু যুবক তার পাশে বসা।
তার
মুখোমুখী এক স্লিমদেহ মহিলা।
ওকে
মহিলা না বলে,
মেয়ে বললেও চলে।
তার
বয়স পঁচিশেরও কম।
তারা ঢুকা মাত্র ডিডি মহোদয়ের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়।
তবে
সেটি সুদৃষ্টি না কুদৃষ্টি বুঝতে একটু সময় লাগে,
এই
যা।
তাদের আর্জি শুনে,
রাজদরবারে প্রজার আর্জি যথা,
একবাক্যে নাকচ হয়ে যায়।
ডিডি মহোদয় বললেন,
---
চাকরি চলাকালে শুদ্ধ করেননি কেন?
প্রায় দেড় বছর হল রিটায়ার করছেন।
আগেও বেশ কয়েক বছর ভুল নাম এসেছে।
এখন
তো আপনি আমাদের এমপিওর বাইরে।
কোথায় শুদ্ধ করব?
আর
হবে না,
যান।
হয়ত
উত্তরে দেখাতে পারত,
তার
নামের ভুল এমপিওতে,
আরো
বেশ কয়েকজন বিভিন্ন প্রকার ভুল রয়েছে।
সে
ভুলগুলোর কোন কোনটি তারও আগে থেকে চলে এসেছে।
আসলে তাদের অনীহা,
অবহেলা ও দুর্বোধ্য অবান্তর নিয়ম-কানুনের জন্য সেগুলো শুদ্ধ হচ্ছে না।
কিন্তু রাজার দ্বারে প্রজা।
তার
কি এত কথা সাজে?
রাজার কোন ভুল নেই।
অপরাধ নেই।
এখন
তারই হাতে তার জীবন মরণের সোয়াল।
সে
বিনীত করজোড়ে আব্দার জানায়।
---
স্যার এমপিওর প্রশ্ন নয়,
তারা চায় শুধু নামের সংশোধনী।
না,
এমপিও ছাড়া কোন সংশোধনীর নিয়ম এখানে নেই।
ডিডি অতপর সামনে বাস লোকদের প্রতি তাকিয়ে বলেন,
--
বাদ
দেন বাজে পাচালে সময় নষ্ট করার সময় নেই।
আমাদের কাজে আসি।
হাঁ
বাজে প্যাচালই বটে।
তারা না হয় শুদ্ধ করতে পারেনি।
চেষ্টা করেছে।
শুদ্ধ করার মালিক তো তারা যারা ভুল করেছে।
যতক্ষণ প্রয়োজন ততক্ষণই তাকে শুদ্ধ করতে হবে।
যেহেতু ভুলটি তারই কৃত।
আর
এজন্যই একজন দরিদ্র শিক্ষক তার প্রাপ্য পেনশন ভাতা,
যা
তার বৃদ্ধ বয়সের একমাত্র সম্বল।
সরকার যা তার জন্য অনুমোদন করেছে,
যদি
তার চাকরি ভুয়া প্রমাণিত না হয়,
তা
হলে তা প্রদানে যথাসম্ভব সহযোগিতা দান তার আইনগত শুধু নয়,
মানবিক দায়িত্বও।
অথচ
প্রথম শ্রেণীর একজন অফিসার।
তিনি বলেন কিনা,
যেহেতু এমপিও নেই,
সুতরাং এমপিও ছাড়া,
সংশোধনীর বিধান এখানে নেই।
তাতে ওহিদের পেনশন আটকে পড়লেই বা তার কি করার আছে?
চমৎকার বটে! এমন বিধান আর কোথাও না থাকলেও,
ডিডি মহোদয়ের সংবিধানে অবশ্য লেখা আছে।
অথচ
এতটুকুও বুঝতে তিনি অক্ষম,
নামটি সংশোধন করে দিলে,
তার
জেল ফাঁস কিচ্ছু হবে না।
কেউ
তাকে জিজ্ঞেসও করবে না।
বরং
একজন দরিদ্র শিক্ষকের বাকি জীবন দিন গুজরানের পথ প্রশস্ত হবে।
ডিডির সাফ জবাবে,
ওহিদের দুচোখ অন্ধকার হয়ে আসে।
তার
সামনে যে আর কোন পথই খোলা নেই।
এখন
সে কোথায় যাবে,
কার
কাছে যাবে?
কোথায় অভিযোগ জানাবে?
কিন্তু পাথরে মাথা কুটে তো কোন লাভই হবে না।
ফিরে চলা ছাড়া গত্যন্তরই কি?
প্রিন্সিপালকে নিয়ে সে পা বাড়ায়।
প্রিন্সিপালও হতভম্ব।
তিনিও এতটা ভাবেননি।
এ
সময় পেছন থেকে মেয়েলি কন্ঠের আওয়াজ।
দেখি তো আপনার কাগজগুলো।
যে
সব কাগজপত্র পেনশনের জন্য পাঠিয়েছিল,
সেগুলোর ফটোকপির জটিল ফাইলটি না দেখিয়ে,
ওহিদ দেখায় অতীতের আশির দশক থেকে দুহাজারের পর পর্যন্ত শুদ্ধ এমপিওর কপি।
সর্বশেষ যুক্ত করে দুটি ভুল নামের এমপিও,
যেগুলোতে আব্দুল ওহিদের জায়গায়,
কম্পিউটারের ভুলে,
আব্দুল মোহিত লেখা হয়েছে।
বিষয়টি বোঝা কঠিন কিছুই নয়।
ম্যাডাম নাম সংশোধনীর আবেদনপত্রটি দেখে বলেন,
--
এটিতে এমপি সাহেবের সুপারিশ নিয়ে আসুন।
ম্যাডাম যখন ওহিদের সঙ্গে এসব বাক্যালাপ করছিলেন,
তখন ডিডি সাহেব,
অন্যান্যদের নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।
তিনি হয়ত এ দিকে খেয়াল করেননি।
অথবা করে থাকলেও গুরুত্ব দেননি।
এমপিও সাহেব ঢাকায়ই অবস্থান করেন।
উপার সুপারিশ নিয়ে পরদিনই একটার পর ওহিদ ডিডি সাহেবের কক্ষে পৌঁছে।
সৌভাগ্যই বলা যায়,
কক্ষে তখন ম্যাডাম ছাড়া দ্বিতীয় কোন অফিসার নেই।
তবে একটি যুবক তার পাশে দাঁড়িয়ে।
ওহিদের হাত থেকে কাগজগুলো নিয়ে,
যুবকটিকে লক্ষ্য করে বলেন,
--
এই তোমার আরেক কেস।
যুবকটি ওহিদের হাত থেকে কাগজগুলো নিয়ে দেখে,
বলে --
এ
তো হবে না।
উনি কখন রিটায়ার করে চলে গেছেন।
এতদিন পর নামের সংশোধনী আবার কি?
দাও আমার কাছে।
এ
জন্য উনি পেনশনের টাকাটা পাচ্ছেন না।
আর তুমি বলছ নামের সংশোধনী আবার কি?
বললেই হল?
(চলবে)
সূফী সাধক
আনোয়ারুল হক্ এঁর বাণী তাৎপর্য অন্বেষণে
''আল্লাহ্র
স্বভাব মোতাবেক নিজের স্বভাব তৈরি করলে আল্লাহ্র পরিচয় লাভ হবেই হবে!''
(২)
শাহ্ সূফী
ড.এমদাদুল হক কাজল
॥
(পূর্ব প্রকাশের পর)
মুসা বললেন,
'আল্লাহ্
চাহে তো আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন এবং আপনার আদেশ পালনে আমি কখনো অবাধ্য
হবো না।'
তিনি বললেন,
'আচ্ছা,
যদি আমার অনুসরণ করতেই চান তবে আমাকে কোন বিষয়ে প্রশ্ন করবেন না,
যে পর্যন্ত না নিজে থেকেই আমি আপনাকে সে বিষয়ে জ্ঞাত করবো।'
অতপর উভয়ে চলতে লাগলেন।
পরে তাঁরা এক নৌকায় আরোহণ করলেন।
তিনি নৌকা বিদীর্ণ করে দিলেন।
মুসা বললেন,
'আপনি
কি নৌকার আরোহীগণকে নিমজ্জিত করার জন্য তা বিদীর্ণ করলেন?
আপনি তো এক গুরুতর অন্যায় কাজ করলেন'।
তিনি বললেন,
'আমার
ভুলের জন্য আমাকে অপরাধী করবেন না এবং আমার কাজের জন্য আমার প্রতি কঠোরতা
প্রয়োগ করবেন না'।
এরপর উভয়ে চলতে লাগলেন,
চলতে চলতে তাঁদের সাথে একটা বালকের সাক্ষাৎ হলো।
তিনি বালকটাকে হত্যা করলেন।
মুসা বললেন,
'কোন
প্রকার হত্যার অপরাধ ছাড়াই আপনি একটা নিষ্পাপ জীবন নাশ করলেন।
নিশ্চয় আপনি একটা গুরুতর অন্যায় কাজ করলেন।'
তিনি বললেন,
'আমি
কি বলিনি যে,
আপনি আমার সাথে ধৈর্য ধারণ করতে পারবেন না।'
মুসা বললেন,
'এরপর
যদি আমি আপনাকে কোন বিষয়ে জিজ্ঞেস করি তবে আমাকে সাথে রাখবেন না;
আমার সকল ওজর চূড়ান্ত হয়ে গেছে।'
এরপর উভয়ে চলতে লাগলেন।
তাঁরা এক জনপদের অধিবাসীর কাছে পৌঁছে খাদ্য চেয়েছিলেন;
কিন্তু তারা মেহমানদারি করতে অস্বীকৃতি জানালো।
সেখানে তাঁরা এক পতনোন্মুখ প্রাচীর দেখতে পেলেন এবং তা সুদৃঢ় করে দিলেন।
মুসা বললেন,
'আপনি
ইচ্ছা করলে এ কাজের জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ করতে পারতেন।'
তিনি বললেন,
'এখানেই
আপনার এবং আমার মাঝে সম্পর্কচ্ছেদ হলো;
যে বিষয়গুলোতে আপনি ধৈর্য ধারণ করতে পারেন নি আমি তার তাৎপর্য ব্যাখ্যা
করছি।
নৌকাটির ব্যাপার হলো - এটা ছিল কতিপয় দরিদ্র লোকের যারা এটা দ্বারা
সমুদ্রে জীবিকা অন্বেষণ করতো;
আমি নৌকাটিকে ত্রুটিযুক্ত করতে ইচ্ছা করলাম,
কারণ তাদের পশ্চাতে ছিল এক বাদশাহ যে বল প্রয়োগে ভালো নৌকা ছিনিয়ে নিত।
বালকের বিষয় হলো - তার পিতামাতা ছিল মোমিন।
আমি আশংকা করলাম যে,
সে উভয়কে বাধ্য করবে ধর্মদ্রোহীতা ও কুফরি করতে।
অতএব আমি ইচ্ছা করলাম যেন তাদের রব এর বদলে এক সন্তান দান করেন,
যে হবে পবিত্রতায় মহত্তর ও ভক্তি ভালোবাসায় ঘনিষ্টতর।
ওই প্রাচীরের ব্যাপার হলো - ওটা ছিল নগরবাসী দুটি এতিম বালকের।
প্রাচীরের নিচে ছিল তাদের গুপ্তধন।
তাদের পিতা ছিলো সৎপরায়ণ।
সুতরাং আপনার রব ইচ্ছা করলেন যে,
তারা বয়ঃপ্রাপ্ত হোক এবং তারা তাদের ধনভান্ডার উদ্ধার করুক।
এটা আপনার রবের একটা রহমত,
আমি নিজ থেকে কিছু করি নি।
এ
হলো ওটার ব্যাখ্যা যাতে আপনি ধৈর্যধারণ করতে পারেন নি।'
মানুষের বিচারে একটা শিশুকে অকারণে হত্যা করা নিশ্চয়ই মন্দ কাজ।
আল্লাহ্ই জীবন ও মৃত্যুদাতা।
তিনি কেন একটা শিশুর জীবন দিলেন আবার কেনইবা তার মৃত্যু দিলেন তা
আল্লাহ্ই ভাল জানেন।
মানুষ ভাল-মন্দের বিচার করে স্থান ও কালের পরিধির মধ্যে থেকে কিন্তু
আল্লাহ্র বিচার স্থান-কালের অতীত।
আল্লাহ্ সম্পর্কে মানুষের বিচার বিশ্লেষণ একটা ছোট বাচ্চার মতো।
একটা ছোট বাচ্চাকে আইসক্রীম দিলে খুশি হয়,
সে মনে করে বাবা খুব ভাল কাজ করছে।
কিন্তু যখন তাকে টীকা দেয়া হয় তখন সে কাঁদতে থাকে,
মনে করে যে বাবা মন্দ কাজ করছে।
বাবা যা জানে শিশুটা তা জানে না।
শিশুটির কাছে ভাল-মন্দের সংজ্ঞা এক রকম বাবার কাছে তা ভিন্ন রকম।
শিশুটি খেলতে চায় কিন্তু বাবা তাকে জোড় করে স্কুলে পাঠিয়ে দেন।
শিশুটি বাবাকে কটু কথা বলে,
কষ্ট পায় আর ভাবতে থাকে যে তার বাবা মন্দ কাজ করছে।
কারণ কোন্টা ভাল কোন্টা মন্দ তা সে এখনো বুঝে না।
আল্লাহ্র কাছে সমগ্র মানবজাতিই একটা বাচ্চার মতো।
তাই মানুষ যাকে অমঙ্গল মনে করছে হয়তো তার মধ্যেও নিহিত আছে মঙ্গল।
আবার মানুষ যাকে মঙ্গল বলে মনে করছে হয়তো তার মধ্যে কোন মঙ্গল নেই।
আল্লাহ্ হচ্ছেন রাব্বুল আলামিন অর্থাৎ জগৎসমূহের পালনকর্তা।
পিতা যেভাবে তার সন্তানকে পালন করেন তিনিও সেভাবেই জগৎসমূহকে পালন করেন।
আল্লাহ্র একটি নাম হচ্ছে কাইউম বা নিরপেক্ষ।
তার কোন কাজে ভাল বা মন্দের পক্ষপাতিত্ব নেই।
অদ্বৈতবেদান্ত মতে পরব্রহ্ম সচ্ছিদানন্দস্বরূপ কিন্তু মানুষ তার অবিদ্যার
কারণে তার স্বরূপকে বুঝতে পারে না তাই সে জগতে ভাল-মন্দ,
মঙ্গল-অমঙ্গল ও শুভ-অশুভ দেখতে পায়।
মানুষ যখন পরব্রহ্মের জ্ঞান লাভ করে তখন সমগ্র জগতেই সে পরব্রহ্মকে দেখতে
পায়।
তখন ভাল ও মন্দের আলাদা কোন অস্তিত্ব থাকে না।
কোন কোন চিন্তাবিদ মনে করেন,
জগতে শুভ ও অশুভ এই দুইটি পরস্পর বিরোধী শক্তি ক্রিয়াশীল।
শুভ শক্তিটি আল্লাহ্র আর অশুভ শক্তিটি শয়তানের।
আল্লাহ্ শুধু মঙ্গল করেন আর শয়তান অমঙ্গল করে।
কিন্তু দুইটি পরস্পর বিরোধী শক্তির অস্তিত্ব স্বীকার করে নিলে আল্লাহ্
সর্বশক্তিমান গুণের তাৎপর্য অনুধাবন করা যায় না।
আল্লাহ্ সর্বশক্তিমান তাই শুভ এবং অশুভ সব শক্তিই তাঁর।
এটা হতে পারে না যে আল্লাহ্ গোলাপ সৃষ্টি করেছেন আর শয়তান কাঁটা সৃষ্টি
করেছে।
কাঁটা এবং গোলাপ সব আল্লাহ্রই সৃষ্টি।
শুভ এবং অশুভ দুইটি পরস্পরবিরোধী শক্তি নয় একই শক্তির ভিন্ন প্রকাশ।
আগুন ছাড়া মানুষের একদিনও চলে না কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে গেলে এই আগুনই
পুড়িয়ে সবকিছু ছাই করে দিতে পারে।
বিষয়সমূহকে খন্ডিতভাবে দেখা নিম্ন বিশ্লেষণমূলক জ্ঞান।
আল্লাহ্ সর্বত্রই বিরাজমান।
জগতের প্রত্যেকটা বিষয়ে,
প্রত্যেকটা বস্তু ও প্রাণীতে,
প্রত্যেকটা ঘটনায় সেই আল্লাহ্কে দেখাই সূফী সাধনা।
অমঙ্গলই জগৎকে পূর্ণতা দিয়েছে।
অমঙ্গল আছে বলেই আমরা চিনতে পারি মঙ্গল কি।
রাত না থাকলে দিনের মর্ম মানুষ বুঝত না,
দিন না থাকলে বুঝতো না রাতের মর্ম।
দুঃখ না থাকলে মানুষ সুখ চাইতো না,
তৃষ্ণা না থাকলে পান করতো না,
যন্ত্রণা না থাকলে স্বস্তি থাকতো না।
রিপুর অদম্য ভোগেচ্ছা না থাকলে আত্মসংযম,
আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং সাধনা বলে কিছু থাকতো না।
লাদেন সিআইএ'র
এজেন্ট : ফিদেল ক্যাস্ট্রো
সংলাপ
॥
আল কায়দার শীর্ষ নেতা ওসামা বিন লাদেন মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ'র
বেতনভুক এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডবিউ বুশ যখনই বিশ্বে
আতংক ছড়াতে চাইতেন,
তখনই তিনি লাদেনকে তলব করতেন।
লিথুয়ানিয়ান বংশোদ্ভূত লেখক দানিয়েল এস্তুলিনের সঙ্গে আলোচনার সময় কিউবার
সাবেক শাসক ফিদেল ক্যাস্ট্রো এ মন্তব্য করেন।
ক্যাস্ট্রো বলেন,
বুশ যখনই বিশ্ববাসীকে ভয় দেখাতে চাইত এবং সুযোগ বুঝে বড় বড় ভাষণ দিতে
চাইত,
তখনই লাদেন একটি গল্প নিয়ে হাজির হতো এবং সন্ত্রাসী হুমকি দিত।
এতেই বোঝা যায়,
লাদেন ছিল বুশেরই অধস্তন এবং বুশ তাকে পুরো সমর্থন দিত।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আফগান যুদ্ধবিষয়ক গোপন নথিপত্র জনসমক্ষে তুলে
ধরা হয়েছে উইকিলিকস ডটঅর্গস নামের একটি ওয়েবসাইটে।
ক্যাস্ট্রো বলেন,
উইকিলিকসের প্রকাশিত হাজার হাজার গোপন নথিপত্রই প্রমাণ করে,
লাদেন ছিল মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ'র
এজেন্ট।
কথা প্রসঙ্গে দানিয়েল বলেন,
২০০১ সালেই সর্বশেষ লাদেনের প্রকৃত গলার আওয়াজ পাওয়া গেছে।
এরপর যতবারই তার কণ্ঠ শোনা গেছে,
সেগুলোর একটিও তার নিজের কণ্ঠ নয়।
বলাবাহুল্য,
কিউবার সাবেক শাসক ক্যাস্ট্রোকে তাদের এক নম্বর শত্রু মনে করে
যুক্তরাষ্ট্র।
ধারণা করা হয়,
সিআইএ তাকে একাধিকবার হত্যা করতে চেয়েও ব্যর্থ হয়েছে।
অন্যদিকে লেখক দানিয়েল এস্তুলিন অ্যাডভান্সিং কন্সপিরেসি থিওরির প্রবক্তা
হিসেবে পরিচিত।
বিশ্বকে প্রভাবিত করার জন্য কোন কোন রাষ্ট্র ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে থাকে।
এ
বিষয়ে তিনি যে তত্ত্ব তুলে ধরেছেন তাকেই বলা হয় অ্যাডভান্সিং কন্সপিরেসি
থিওরি।
ডিমেও বিষ
সংলাপ
॥
ট্যানারীর
বিষাক্ত বর্জ্য দিয়ে তৈরি পোল্ট্রি ও ফিশ ফিড দেশে আশংকাজনক হারে
ক্যান্সারসহ নানা জটিল ও কঠিন রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
জনস্বাস্থ্যের উপর এর ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে।
এসব খাবারের কারণে মুরগীর ডিমে অস্বাভাবিক মাত্রায় ডাই-অক্সিন মিশে
যাচ্ছে-যার কারণে ভবিষ্যৎ বংশধররা জন্ম নিতে পারে পঙ্গুত্ব নিয়ে।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন,
ট্যানারীতে পশুর চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণে ক্যাডমিয়াম,
ক্রোমি-য়াম,
আর্সেনিক জিংকসহ ২৫০ ধরনের বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হয়।
পরিত্যক্ত চামড়ায় উপস্থিত বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের মধ্যে শুধু
ক্রোমিয়াম জাত ক্রোমিক এসিটেট নামক রাসায়নিক যৌগেই মানবদেহে ফুসফুস
ক্যান্সারসহ নানা জটিল রোগ সৃষ্টিকারী কার্সিনোজেনিক পদার্থ,
খাদ্য শৃংখল বিনষ্টকারী পদার্থ ও আলসার সৃষ্টিকারী ক্ষতিকর রাসায়নিক
পদার্থ থাকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. আবু জাফর মাহমুদ বলেন,
পোল্ট্রি ফিড তৈরিতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ট্যানারী শিল্প মালিকরা
বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অথবা পরিশোধন নীতিমালা মানছেন না।
পোল্ট্রি ফিড তৈরিতে ব্যবহূত ট্যানারী বর্জ্য কোন প্রকার পরিশোধন বা
জীবাণুমুক্তকরণ ছাড়াই সরাসরি প্রক্রিয়াজাত করা হয়।
এ
ধরনের অপরিশোধিত বর্জ্য একাধারে পোল্ট্রি মুরগী এবং ডিম ও মাংসের ভোক্তার
স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।
যার প্রত্যক্ষ কারণে স্বাভাবিকভাবেই মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে মরণব্যাধি
ক্যান্সারসহ নানা রোগে।
বর্তমানে চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যবহূত হচ্ছে ক্ষতিকর লেড সালফাইট-যাতে
উপস্থিত লেড ধাতু ট্যানারী বর্জ্য দিয়ে তৈরি ফিডের মাধ্যমে মিশে যাচ্ছে
মুরগীর শরীরে।
এর ফলে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী শিশুর জন্মহার বেড়ে যাওয়ায় আশংকা রয়েছে।
যেহেতু বর্তমানে পোল্ট্রি শিল্প জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান
রাখছে এবং মানুষের খাদ্য চাহিদার বিপরীতে যোগানও দিতে পারছে।
তাই এই সম্ভাবনাময় খাতটির উপর নির্ভরশীল ভোক্তার জনস্বাস্থ্যের কথা
বিবেচনা করেই ট্যানারীর বিষাক্ত বর্জ্য দিয়ে পোল্ট্রি ফিড তৈরি বন্ধ করতে
হবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ বলেন,
হাজারীবাগের ট্যানারী শিল্প রাজধানীর ও আশপাশ এলাকার পরিবেশ ভয়াবহ দূষণ
করছে।
হাজারীবাগ ট্যানারীর চামড়ার উচ্ছিষ্ট অংশ প্রক্রিয়াজাত করে মাছ ও মুরগীর
খাবার তৈরি করা হচ্ছে।
যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এসব মাছ ও মাংস খেয়ে মানুষ ক্যান্সারসহ নানা কঠিন রোগে ভুগছে।
মুরগীর ডিমও বিষক্রিয়ার আক্রান্ত হচ্ছে।
এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার শিকার হয়ে শিশুরা বিকলাঙ্গ হচ্ছে।
তিনি অবিলম্বে এ বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে সরকারকে প্রয়োজনীয়
ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান।
একইসঙ্গে তিনি সরকারের প্রতি হাজারীবাগ ট্যানারীটি দ্রুত স্থানান্তরের
দাবি জানান।
সত্য
(৫)
সংলাপ
॥
(পূর্ব প্রকাশের পর)
সত্যের প্রতি ভালোবাসা আগে সাধনা করিতে হইবে,
ভালোবাসার দ্বারা সত্যকে বশ করিতে হইবে,
সংসারের সহস্র কুটিলতার মধ্যে হৃদয়কে সরল রাখিতে হইবে তার পরে সত্য বলা
সহজ হইবে।
কেবল যদি লোভ,
ক্রোধ প্রভৃতি কুপ্র বৃত্তি-সকল
আমাদের সত্যপথের বাধা হইত তাহা হইলেও আমাদের তত ভাবনার কারণ ছিল না।
কিন্তু আমাদের অনেক সুপ্রবৃত্তিও আমাদিগকে সত্যপথ হইতে বিচলিত করিবার
জন্য আমাদিগকে আকর্ষণ করিতে থাকে।
আমাদের আত্মানুরাগ,
দেশানুরাগ,
লোকানুরাগ অনেক সময়ে আমাদিগকে সত্যভ্রষ্ট করিতে চেষ্টা করিতে থাকে;
এই জন্যই সত্যানুরাগকে এই-সকল অনুরাগের উপরে শিরোধার্য করা আবশ্যক।
আমার আর সকল কথা লোকের বিরক্তিজনক পুরাতন ঠেকিতে পারে কিন্তু আমার একটি
কথা পুরাতন হইলেও বোধ করি অনেকের কর্ণে অত্যন্ত নূতন ঠেকিতেছে।
আমি বলিতেছি,
সত্যকথা বললো,
সত্যাচরণ করো,
কারণ দেশের উন্নতি তাহাতেই হইবে।
এ
কথা সচরাচর শুনা যায় না।
কথাটা এত অল,
এত শীঘ্র ফুরাইয়া যায়,
এবং এমন প্রাচীন ফ্যাশনের যে,
কাহারো বলিয়া সুখ হয় না,
শুনিতে প্রবৃত্তি হয় না,
ইহাতে সুগভীর চিন্তাশীলতা বা গবেষণার পরিচয় পাওয়া যায় না,
ইহাতে এমন উদ্দীপনা উত্তেজনা নাই যাহাতে করতালি আকর্ষণ করিতে পারে।
দেশহিতৈষীরা কেহ বলেন,
দেশের উন্নতির জন্য জিমন্যাস্টিক করো,
কেহ বলেন সভা করো,
আন্দোলন করো,
ভারত সংগীত গান করো,
কেহ বলেন মিথ্যা বলো,
মিথ্যা প্রচার করো,
কিন্তু কেহ বলিতেছেন না সত্যকথা বলো,
ও
সত্যানুষ্ঠান করো।
উপরি-উক্ত সকল কঞ্চটার মধ্যে এইটেই সকলের চেয়ে বলা সহজ এবং সকলের চেয়ে
করা শক্ত,
এইটেই সকলের চেয়ে আবশ্যক বেশি,
এবং সকলের চেয়ে অধিক উপেক্ষিত।
সত্য সকলের গোড়ায় এবং সত্য সকলের শেষে,
আরম্ভে সত্যবীজ রোপণ করিলে শেষে সত্যফল পাওয়া যায়;
মিথ্যায় যাহার আরম্ভ মিথ্যায় তাহার শেষ।
আমরা যে ভীত সংকুচিত সংশয়গ্রস্ত ক্ষুদ্র ধূলিবিহারী কীটাণু হইয়াছি
ইংরেজের মিথ্যা নিন্দা করিলে আমরা বড়ো হইব না,
আপনাদের মিথ্যা প্রশংসা করিলেও আমরা মস্ত হইব না।
আমরা যে পরস্পরকে ক্রমাগত সন্দেহ করি,
অবিশ্বাস করি,
দ্বেষ করি,
মিলিয়া কাজ করিতে পারি না,
পরের স্তুতি পাইবার জন্য হাঁ করিয়া থাকি,
কথায় কথায় আমাদের দল ভাঙিয়া যায়,
কাজ আরম্ভ করিতে সংশয় হয়,
কাজ চালাইতে উৎসাহ থাকে না,
আমরা যে ক্ষুদ্রতা লইয়া থাকি,
খুঁটিনাটি লইয়া মান অভিমান করি,
মুখ্য ভুলিয়া গিয়া গৌণ লইয়া অশিক্ষিতা মুখরার ন্যায় বিবাদ করিতে থাকি,
আড়ালে পরস্পরের নিন্দা করি,
সম্মুখে দোষারোপ করিতে অত্যন্ত চক্ষুলজ্জা হয়,
তাহার কারণ আমরা মিথ্যাচারী,
সত্যের প্রভাবে সরল ও সবল নহি,
উদার উৎসাহী ও বিশ্বাসপরায়ণ নহি।
আমরা যে আগাটায় জল ঢালিতেছি,
তাহার গোড়া নাই,
নানাবিধ অনুষ্ঠান করিতেছি কিন্তু তাহার মূলে সত্য নাই,
এইজন্য ফললাভ হইতেছে না।
যেমন,
যে রাগিণীতে যে গান গাও-না-কেন,
একটা বাঁধা সুর অবলম্বন করিতে হইবে,
সেই এক সুরের প্রভাবে গানের সকল সুরের মধ্যে ঐক্য হয়,
নানা বিভিন্ন সুর এক উদ্দেশ্য সাধন করিতে থাকে,
কেহ কাহাকেও অতিক্রম করে না,
তেমনি আমরা যে কাজ করি-না- কেন সত্যকে তাহার মূল সুর ধরিতে হইবে।
আমরা সেই মূল সুর ভুলিয়াছি বলিয়াই এত কলরব হইতেছে,
ঐক্য ও শৃঙ্খলার এত অভাব দেখা যাইতেছে।
এত বিশৃঙ্খলা সত্ত্বেও সকলে কোলাহলই উত্তেজিত করিতেছেন,
কেহ মূল সুরের প্রতি লক্ষ করিতে বলিতেছেন না,
তাহার কারণ ইহার প্রতি সকলের তেমন দৃঢ় আস্থা নাই,
ইহাকে তাঁহারা অলংকারের হিসাবে দেখেন,
নিতান্ত আবশ্যকের হিসাবে দেখেন না।
পেট্রিয়টেরা দেশের উন্নতির জন্য নানা উপায় দেখিতেছেন,
নানা কৌশল খেলিতেছেন।
এদিকে মিথ্যা নীরবে আপনার কার্য করিতেছে,
সে ধীরে ধীরে আমাদের চরিত্রের মূল শিথিল করিয়া দিতেছে,
সে আমাদের পেট্রিয়টদিগের কোলাহলময় ব্যস্ততাকে কিছুমাত্র খাতির করিতেছে না।
পেট্রিয়টেরা পদার তীরে দুর্গ নির্মাণে মত্ত হইয়াছেন,
কিন্তু মায়াবিনী পর্দা তাহার অবিশ্রাম খরস্রোতে তলে তলে তটভূমি জীর্ণ
করিতেছে।
তাই মাঝে মাঝে দেখিতে পাই আমাদের পেট্রিয়টদিগের বিস্তৃত আয়োজন-সকল সহসা
একরাত্রের মধ্যে স্বপ্নের মতো অন্তর্ধান করে।
যেখানে জাতীয় চরিত্রের মূল শিথিল হইয়া গিয়াছে,
সেখানে যে পাঁচজন পেট্রিয়টে মিলিয়া জোড়াতাড়া,
তালি ঠেকো প্রভৃতি অবলম্বন করিয়া কৌশল খেলাইয়া স্থায়ী কিছু করিয়া উঠিতে
পারিবেন এমন আমার বিশ্বাস হয় না।
অনন্তের অমোঘ নিয়মকে কৌশলের দ্বারা ঠেলিবে কে?
যেখানে সত্য সিংহাসনচ্যুত হওয়াতে অরাজকতা ঘটিয়াছে,
সেখানে চাতুরী আসিয়া কী করিবে! হায়,
দেশ উদ্ধারের জন্য সত্যকে কেহই আবশ্যক বিবেচনা করিতেছেন না।
(চলবে)
চীন
বাংলাদেশের উন্নয়নে সার্বিক সহযোগিতা দেবে
মো: রুবেল
॥
বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচনসহ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে চীন সার্বিক
সহযোগিতা দেবে।
সফররত চীনের দারিদ্র্য বিমোচন ও উন্নয়ন (সিপিএডি) সংক্রান্ত স্টেট
কাউন্সিল লিডিং গ্রুপ অফিসের পরিচালক (মন্ত্রী পর্যায়ের) ফান জিয়াওজিয়ান
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আলোচনাকালে এ কথা বলেন।
বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা সত্ত্বেও চীনের উন্নয়নের ভূয়সী প্রশংসা করে
প্রধানমন্ত্রী বলেন,
চীনের এই উন্নয়ন বিভিন্ন দেশের জন্য অনুসরণীয়।
তিনি বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে তাঁর সরকারের নেয়া বিভিন্ন প্রকল্প
বাস্তবায়নে চীনের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন।
জিয়াওজিয়ান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে
বলেন,
দারিদ্র্য বিমোচন,
নারীর ক্ষমতায়ন ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বর্তমান সরকার যেসব কার্যক্রম
গ্রহণ করেছে তা অবশ্যই বাংলাদেশের দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা
রাখবে।
এ
প্রসঙ্গে তিনি দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে বর্তমান সরকারের নেয়া
ভিশন-২০২১কে অত্যন্ত সময়োপযোগী বলে আখ্যায়িত করেন এবং এ ব্যাপারে
বাংলাদেশ সরকারকে চীনের পক্ষ থেকে সকল প্রকার সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
শেখ হাসিনা বলেন,
তাঁর দল ও সরকারের মূল লক্ষ্য হচ্ছে দারিদ্র্য বিমোচন করে জনগণের উন্নত
জীবন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
এ
প্রসঙ্গে তিনি
'একটি
বাড়ী একটি খামার'
কর্মসূচিসহ বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্পের কথা উল্লেখ করে বলেন,
ইতিমধ্যেই দেশের মানুষ এই প্রকল্পগুলো থেকে সুফল পেতে শুরু করেছে।
দেশের জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও দারিদ্র্য দূরীকরণের লক্ষ্যে তাঁর
সরকারের নেয়া ক্ষুদ্র ঋণ কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন,
'আমাদের
দেশের এনজিওগুলো দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে ঋণ বিতরণ করে থাকে।
কিন্তু তাদের ঋণের সুদের হার খুবই বেশি।
পাশাপাশি সরকারের ঋণের সুদের হার খুব কম এবং কোনো প্রকার কো-লেটারেল
ছাড়াই কৃষক তা গ্রহণ করতে পারে।'
প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগের কথা তুলে ধরে বলেন,
এ
দেশের মানুষ অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে এই দুর্যোগ মোকাবেলা করে থাকে।
বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রেক্ষিতে সৃষ্ট জলবায়- সমস্যা সমাধানে তাঁর সরকার
ইতোমধ্যেই নিজস্ব অর্থায়নে ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
বৈঠকে এ্যাম্বাসেডর এ্যাট লার্জ এম জিয়াউদ্দিন,
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব মোল্লা ওয়াহিদুজ্জামান এবং চীনের
রাষ্ট্রদূত জাং শিয়াংই উপস্থিত ছিলেন।
উত্তর কোরিয়া পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ আলোচনায় আগ্রহী
মাসুদুর
রহমান
॥
উত্তর কোরিয়ার দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা কিম ইয়ং নাম সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট
জিমি কার্টারের কাছে পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ আলোচনা পুনরায় শুরু করার বিষয়ে
আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
শুক্রবার সকালে কার্টার উত্তর কোরিয়া ত্যাগ করেন।
কার্টার সেন্টারের পক্ষ থেকে দেয়া এক বিবৃতির উদ্ধৃতি দিয়ে কেসিএনএ জানায়,
উত্তর কোরিয়ায় অবৈধভাবে অনুপ্রবেশের দায়ে দন্ডিত
এক মার্কিনীকে নিয়ে কার্টার পিয়ংইয়ং ত্যাগ করছেন।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়,
ডিপিআরকে (ডেমোক্রেটিক পিপলস রিপাবলিক অব কোরিয়া) সরকারের পক্ষ থেকে কিম
ইয়ং নাম কোরীয় উপদ্বীপে পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের ব্যাপারে ইচ্ছা প্রকাশ
করেছেন।
সেই সঙ্গে ৬ পক্ষের আলোচনা পুনরায় শুরু করার ব্যাপারেও তিনি আগ্রহ
দেখিয়েছেন।
প্রসঙ্গত,
মার্চে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি যুদ্ধজাহাজ টর্পেডোর আঘাতে ডুবে যায়।
এ
ঘটনায় দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা অনেক রাষ্ট্র উত্তর
কোরিয়াকে দায়ী করে আসছে।
এতে তখন দক্ষিণ কোরিয়ার ৪৬ জন নাবিকের প্রাণহানি ঘটে।
তারপর থেকে কোরীয় উপদ্বীপে উত্তেজনা বিরাজ করছে।
উত্তর কোরিয়া একের পর এক হুমকি দিয়ে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রও দেশটির ওপর নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ বাড়িয়ে দেয়।
কার্টার উত্তর কোরিয়া পৌঁছানোর পরপরই দেশটির সর্বোচ্চ নেতা কিম জং ইল তার
একমাত্র শক্তিশালী মিত্র চীন সফর করেন।
বিশ্লেষকদের ধারণা দেশটির নেতৃত্বে নিজের ছেলেকে উত্তরাধিকারী হিসাবে
বসানোর লক্ষ্যেই তার এই আকস্মিক চীন গমন।
হিটলার ইহুদি ছিলেন!
রুবেল
॥
সংলাপ
॥
নাৎসি নেতা অ্যাডলফ হিটলার ইহুদি ছিলেন।
নতুন
এক ডিএনএ পরীক্ষায় এ তথ্য আবিষ্কৃত হয়।
এছাড়া এই পরীক্ষায় আরও জানা যায় হিটলার ছিলেন আফ্রিকান বংশোদ্ভূত।
ডেইলি এক্সপ্রেস এক প্রতিবেদনে জানায়,
ডিএনএ
পরীক্ষার জন্য নমুনা নেয়া হয় তার অত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে এমন ইহুদি
সম্প্রদায় এবং উত্তর আফ্রিকার লোকজনের কাছ থেকে।
হিটলারের ডিএনএ পরীক্ষা সফল করতে সাংবাদিক জ্যা পল মুলডাস হিটলারের
ভাতিজা অলেক্সান্ডার স্টুয়ার্ট হাউসটনের কাছ থেকে হিটলারের ব্যবহূত এক
টুকরো চার কোণা কাপড় সংগ্রহ করেন।
খাওয়ার সময় খাবার পড়ে যাতে পোশাক নোংরা না হয় সে জন্য এ ন্যাপকিন জাতীয়
কাপড়ের টুকরাটি ব্যবহার করতেন হিটলার।
এটি
দিয়ে তিনি সময় সময় হাত-মুখও মুছেছেন।
হাউসস্টোন নিউয়র্কে বাস করেন।
এছাড়া মুলডারস দ্বিতীয় নমুনা সংগ্রহ করেন হিটলারের চাচাতো ভাই নোরধাট
এইচের কাছ থেকে।
তিনি
অস্ট্রিয়ার নাগরিক।
পেশায় কৃষক।
ডিএনএ পরীক্ষায় ওয়াই ক্রোমোজমের গঠন প্রকাশিত হয়।
জার্মানসহ পশ্চিম ইউরোপের বাকি অংশে বিরল।
তবে
এটি ইহুদি এবং উত্তর আফ্রিকান দলের মধ্যে খুবই সাধারণ।
বিশেষজ্ঞরা
এখন মনে করছেন,
হিটলারের
অভিবাসী আত্মীয় ছিল যারা এখনও স্বদেশে বসবাস করছেন।
মুলডুরিস বলেন,
উভয় নমুনার
পরীক্ষায় একটি জেনেটিক উপাদানের গঠন হ্যাপলোপ গ্রুপ।
ই১বি১বির উপস্থিতি পাওয়া যায়।
আর
এটিই প্রমাণ করে হিটলার ইহুদি ছিলেন।
কাণ্ডারী হুঁশিয়ার.....
নস্যাৎ করতে
হবে সব ষড়যন্ত্র মুক্ত করতে হবে বাংলাকে
সংলাপ
॥
*
আর যারা মন্দ কাজের ষড়যন্ত্র করে তাদের জন্য আছে কঠিন শাস্তি।
তাদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হবেই।
-
সূরা ফাতির ঃ ১০
*
তারা পৃথিবীতে ঔদ্ধত্য দেখাতো ও কূট ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল।
যারা ষড়যন্ত্র করে,
ষড়যন্ত্র তাদেরকেই ঘিরে ফেলে।
-
সূরা ফাতির ঃ ৪৩
*
যারা অপরাধ করেছে ষড়যন্ত্র করার জন্য,
আল্লাহ্র কাছ থেকে তাদের উপর লাঞ্ছনা ও কঠোর শাস্তি পড়বে।
-
সূরা আনআম ঃ ১২৪
*
ওদের পূর্ববর্তীরাও ষড়যন্ত্র করেছিল,
আল্লাহ্ ওদের ষড়যন্ত্রের কাঠামোর ভিত্তিমূলে আঘাত করেছিলেন
(আর সেই) কাঠামোর ছাদ ওদের উপর ধসে পড়েছিল।
আর ওদের ওপর এমন দিক থেকে শাস্তি এলো যা ছিল ওদের ধারণাতীত।
-
সূরা নাহল ঃ ২৬
নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা নাটকের একটি বিখ্যাত সংলাপ এক সময় মানুষের মুখে মুখে
ছিলো।
নাটকে নবাবের মুখ নিঃসৃত বহুল উচ্চারিত ওই সংলাপটি ছিলো
'বাংলার
ভাগ্যাকাশে আজ দুর্যোগের ঘনঘটা,
কে তাকে দেবে আশা,
কে দেবে ভরসা,
কে শোনাবে সান্ত্বনার বাণী'।
আড়াইশ'
বছর আগে ইংরেজ বেনিয়াদের বাংলা তথা গোটা ভারতবর্ষ দখলের আগের পটভূমি
ফুটিয়ে তুলতেই আশ্রয় নেওয়া হয়েছিল এই রূপকের।
যার অন্তর্নিহীত রূপ ছিল বাংলাকে ঘিরে ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত।
কাশিমবাজার কুটিরকে ঘিরে পরিচালিত সেই ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের এক মাথায় ছিল
এদেশীয় বিশ্বাসঘাতকের দল,
অপর প্রান্তে ছিল বৃটিশ বেনিয়া ইংরেজ।
বলা বাহুল্য এই চক্রান্তেরই ফসল ছিল বাংলা তথা গোটা ভারতবর্ষে দু'শ
বছর ইংরেজের গোলামী।
আড়াইশ'
বছর পর আজ আবারও তৈরি হচ্ছে সেই একই পটভূমি।
নাটুকে ভাষায় যাকে বলা যেতে পারে
'বাংলার
দুর্বাঘাসে আজ চক্রান্তের জাল পাতা।'
এই জালের এক মাথায় উগ্র ধর্মান্ধ,
ধর্ম ব্যবসায়ী,
ধর্মবেত্তা ও তাদের দেশীয় গডফাদার যাদের অবস্থান ক্ষমতার ভেতর ও বাইরে
এবং জালের দড়িটাকে ধরে আর এক প্রান্তে বসে আছে আধিপত্যবাদী মার্কিনী
প্রশাসন ও তার সহযোগী সৌদি আরবের সেবাদাস বেনিয়ারা।
এই চক্রান্ত বাংলার অমিত সম্ভাবনাকে ঘিরে।
বাংলার মাটির তলায় ছড়িয়ে থাকা প্রাকৃতিক সম্পদকে ঘিরে।
হাজার হাজার বছর ধরে পরিপুষ্ট বাংলার সোনালী ঐতিহ্যকে ঘিরে।
অগণিত সাধকের পদধূলি ধন্য বাংলার পবিত্র জমিনকে ঘিরে এবং বাংলার
মাটি-জল-বায়ু মথিত করে উঠে আসা এর
'অমৃতের
সন্তান'দের
ঘিরে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় বাংলাকে ঘিরে বাংলার মানুষকে ঘিরে,
সমৃদ্ধ তিন হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতিকে ঘিরে চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র নতুন
নয়।
এই চক্রান্তেরই ধারাবাহিকতায় ইতিহাসের পরতে পরতে দেখা যায় বাংলার
ভাঙ্গা-গড়া,
বিশেষ করে ১৯০৫ সালের
'বঙ্গভঙ্গ'
এবং ১৯৪৭ সালের মহা প্রতারণার বাংলা বিভক্তি।
১৯৭১।
বাঙালির সশস্ত্র যুদ্ধ।
এই যুদ্ধে বাঙালি অসম্পূর্ণ এক খন্ডিত বাংলার পূর্বাংশ নিয়ে প্রতিষ্ঠা
করে একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ - বাংলাদেশ।
কিন্তু,
বাঙালির বিরুদ্ধে,
বাংলাদেশের বিরুদ্ধে চক্রান্ত থেমে থাকেনি।
'৭১-এ
স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থানকারী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,
সৌদি আরব সহ মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন পদলেহী শাসকরা ষড়যন্ত্রকারীদের যোগায়
অর্থ,
অস্ত্র,
প্রশিক্ষণ সহ প্রয়োজনীয় উপকরণ।
পরিনামে ১৯৭৫ সাল থেকে শুরু হয় স্বাধীন দেশটির পশ্চাৎগামিতা।
ধর্মান্ধতার বিষবৃক্ষের চাষ আবারও শুরু হয় বাংলার জমিনে।
এই বিষবৃক্ষের বীজ আমদানী হয় মার্কিনীদের গবেষণাগার থেকে।
চারা ফুটানো হয় মধ্যপ্রাচ্যে আর পাকিস্তান- আফগানিস্তানের বিষাক্ত মাটিতে।
বপনের পালা চলে বাংলাদেশের মাটিতে মসজিদ-মাদ্রাসা আর তথাকথিত ইসলামী
প্রতিষ্ঠান-সংগঠনগুলোর মধ্যে।
তিন দশকে দেশব্যাপী ধর্মান্ধদের মস্তিষ্কে বিছানো ষড়যন্ত্রের জাল এখন
সুবিস্তৃত সুসংহত।
এখন চলছে বিভিন্ন পটভূমি তৈরির পালা।
নাটের গুরু মার্কিন-সৌদি শাসকরা সাদ্দাম তৈরি করেছিল - সাদ্দামকে দিয়ে
কুয়েত দখলও করিয়েছিল।
কুয়েত মুক্ত করার নাম করে মধ্যপ্রাচ্যে গেড়ে বসেছে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি।
মার্কিনীরা কলের পুতুল ওসামাকে বিশ্ববাসীর কাছে বৈরী করে তাকে রেখে
দিয়েছে নিজেদের হেফাজতে।
ওসামার নাম করে নিজেরাই টুইন টাওয়ার ধ্বংস করেছে।
দখল করে আফগানিস্তান এখন পুরো কব্জায় নিয়ে নেয়ার জন্য চালাচ্ছে হত্যাযজ্ঞ।
ওদের দরকার বাংলাদেশ।
দরকার বাংলাদেশের সমুদ্র বন্দর।
দরকার এদেশের মাটির তলায় পড়ে থাকা প্রাকৃতিক সম্পদ।
দরকার পার্বত্য-চট্টগ্রাম।
চট্টগ্রাম-পার্বত্য চট্টগ্রাম কেন্দ্র করে মার্কিনীরা ভারতের
দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয়
'সেভেন
সিস্টার'
বলে পরিচিত সাতটি রাজ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠা করতে চায় খ্রীষ্টান রাষ্ট্র - ঠিক
ইসরাইলের স্টাইলে।
যে রাষ্ট্র দিয়েই গোটা এশিয়া বিশেষত ভারত ও চীনকে তাদের ইচ্ছা দাসে পরিণত
করার মহাপরিকল্পনা মার্কিনী শাসকদের আছে।
এ
লক্ষ্যেই বাংলাদেশের মাটিতে চাই মার্কিনীদের সামরিক ঘাঁটি।
এক্ষেত্রে পাশে পেতে চাইছে প্রতিবেশী ভারতকে।
ভারতেরও দরকার চট্টগ্রাম বন্দর,
দরকার ট্রানজিট সুবিধা,
দরকার গ্যাস।
মার্কিনীদের পোষা আল কায়দা তাই - ঢুকানো হচ্ছে এদেশে বেনামে।
মার্কিন মদদপুষ্ট আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় বাংলাদেশকে জঙ্গি অধ্যুষিত
অকার্যকর রাষ্ট্র হিসাবে তুলে ধরার সকল পদক্ষেপও নেয়া হয়েছিল একই তালে
কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে।
একের পর এক বিস্তৃত করা হচ্ছে ষড়যন্ত্রের জাল সন্তর্পণে।
এখন চলছে আগ্রাসনের নতুন পটভূমি তৈরির পালা।
পরিকল্পনা মতোই ষড়যন্ত্রের জালের পরতে পরতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে সন্ত্রাসের
ভয়ঙ্কর কীট।
এর বিষাক্ত কামড়ে গত দশ বছরেই রক্তাক্ত হয়েছে মাজার প্রাঙ্গন,
উরস,
সভা-সমাবেশ,
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান,
সাংস্কৃতিক সভা-সমাবেশ,
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান,
সাংস্কৃতিক ও বিনোদন কেন্দ্রস্থল।
আতঙ্কিত মানুষের মনে স্বভাবতই জিজ্ঞাসা এই চক্রান্ত ষড়যন্ত্রের পরিণতি কী?
শান্তির (ইসলামের) পবিত্র গ্রন্থ আল কুরআনে এর ফয়সালা দেয়া আছে
সুস্পষ্টভাবে।
সূরা ফাতির-এ (৪৩ নম্বর আয়াত) আল্লাহ্ দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেছেন,
''তারা
পৃথিবীতে ঔদ্ধত্য দেখাতো ও কূট ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল।
যারা ষড়যন্ত্র করে,
ষড়যন্ত্র তাদেরকেই ঘিরে ফেলে।''
ষড়যন্ত্রীদের পরিণতি সম্পর্কে সূরা নাহল-এ (আয়াত নং-২৬) আরো পরিষ্কারভাবে
ঘোষণা করা হয়,
''ওদের
পূর্ববর্তীরাও ষড়যন্ত্র করেছিল,
আল্লাহ্ ওদের ষড়যন্ত্রের কাঠামোর ভিত্তিমূলে আঘাত করেছিলেন (আর সেই)
কাঠামোর ছাদ ওদের উপর ধসে পড়েছিল।
আর ওদের উপর এমন দিক থেকে শাস্তি এলো যা ছিল ওদের ধারণাতীত।''
তাই সকল অঙ্গনে ষড়যন্ত্রকে নস্যাৎ করার জন্য সংকীর্ণতার উর্দ্ধে উঠে
বাঙালি জাতিকে আবারও প্রস্তুত থাকতে হবে।
সময়ই বলে দেবে কখন কি করতে হবে।
|