ছাব্বিশ না সাতই মার্চ স্বাধীনতা দিবস!

 

 

মানুষ আসছে বাসে ট্রেনে নৌযানে পায় হেঁটে রিক্সায় ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে যে যেভাবে পারছে, সেভাবেই ছুটে আসছে মিছিলের পর মিছিল কোনটা দীর্ঘ কোনটা খন্ড খন্ড মানুষের মিছিল উত্তাল-উন্মুখ মানুষ উজ্জীবিত মানুষ - উত্তপ্ত মানুষ শুধু মানুষ - মানুষের ভিড় লক্ষ লক্ষ জনতায় উত্তপ্ত রেসকোর্স ময়দান

শ্রমিক কৃষক ছাত্র কেরানী দক্ষ-কারিগর শিক্ষক অভিনেতা মহান শিল্পী কবি লেখক বুদ্ধিজীবী সংগ্রামী নেতা - আর এই জনতা উপরে আকাশ আর নিচে এই রেসকোর্স ময়দান; বাকি সব পৃথিবী যেন স্তব্ধ হয়ে আছে এক মহামন্ত্রের অপেক্ষায় রৌদ্র প্রখর মার্চের আকাশ জীবন্ত সূর্যের গলন্ত তাপ, উত্তপ্ত মানুষের ঘর্মাক্ত দেহ এতটুকু ক্লান্ত করতে পারেনি অপেক্ষার দৃঢ়তায় তেমনি সারা দেশ উন্মুখ আজ রুদ্ধশ্বাসে - কখন আর কতো দেরি!

ইতোমধ্যে অনেক ঘটনা, নয়া ইতিহাসের প্রথম পাতা লেখা হয়ে গেছে ঔপনিবেশিক শাসক গোষ্ঠি এবং তাদের ধর্মজীবী তাবেদাররা মরিয়া ক্ষমতার ষড়যন্ত্রে বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে গুড়িয়ে দিতে সেনা ব্যারাক পরিপূর্ণ ম্যারাথন আলোচনা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গুলি করে হত্যা করে প্রতিবাদের ভাষাকে নির্মূল করার প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আমদানিকৃত সৈন্যরা হরতাল-কারফিউ আর বাঙালির অসহযোগ আন্দোলন তখন চূড়ান্ত পরিণতির দিকে পা পা করে এগিয়ে যাচ্ছে

মানুষ জানে না তাকে কোথায় যেতে হবে তার ঠিকানার সন্ধানের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে শুধু তার আনুষ্ঠানিকতা প্রয়োজন কারণ তেইশ বছর ধরে বাঙালিকে শাসনের নামে যে লুট আর রক্তের ইতিহাস উপহার দিয়েছিলো ধর্মের নামে রাষ্ট্র পাকিস্তান তাতে ইসলামের আত্মিক সম্পর্ক কোন কালেই প্রতিষ্ঠিত হয়নি বরং পূর্বকে লুন্ঠন করে পশ্চিমকে সাজাবার প্রক্রিয়াই প্রধান থাকায় জন্মলগ্ন থেকে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ধারণাটি ছিল কবরস্থ তাই তেইশ বছর পার করতেই বাঙালির আত্মচেতনা আত্মনিয়ন্ত্রণের যৌক্তিকতা সামান্যও দৃঢ় করতে পারেনি বরং ধর্মের উগ্র আচরণ চিরন্তন বাঙালি সত্তাকে নির্মমভাবে আহত এবং প্রতারিত করেছে

আসলে সেই আটচল্লিশেই বাঙালির মনস্তাত্ত্বিক ক্ষেত্র পাকভূমির মোহ বর্জিত হতে শুরু করেছিলো তাকে আরো বেগবান করেছিলো বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন ভাষার সেই রক্তস্নাত ইতিহাস আর পাকিস্তানের পক্ষে গণঐক্যের ফাটলকে স্থায়ী করা সম্ভব হয়নি তারপর একটার পর একটা ইতিহাসের নতুন পাতা সংযোজন করেছিলো বাঙালিরা তার মধ্য দিয়েই প্রমাণিত হয়েছিলো যখনই অধিকারের প্রশ্ন তুলেছে বাঙালিরা তখনই তাকে অস্ত্রের জোরে ধ্বংস করতে চেয়েছে পাক-শাসন তখন মুসলিম উম্মা শব্দটি শাসকবর্গের চিত্ত মানিবক হতে সামান্যও সাহায্য করেনি

আসলে সত্তরের ঘূর্ণিঝড়ে বিপন্ন লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রতি পাকিস্তান রাষ্ট্রটির দায়িত্ব পালনের প্রত্যক্ষ নমুনা সেই সময় সাড়ে সাত কোটি বাঙালিকে পরিপূর্ণ একটি সিদ্ধান্তেই পৌঁছতে বাধ্য করে; তা হলো - আর নয় মিথ্যাচারের রাষ্ট্রীয় ঐক্য তারই পূর্ণ প্রতিফলন ঘটে নির্বাচনের মাধ্যমে কিন্তু এই নির্বাচন শাসককূলের চিন্তার মূলে চরম আঘাত করে এবং বাঙালি ঐক্যের প্রতি প্রতিশোধ নিতে তারা তখন মরিয়া সংগত কারণেই বাঙালির চেতনায় পাকিস্তান নামের রাষ্ট্রটি তখন মৃত মৃত রাষ্ট্রের বোঝা বয়ে নেয়া বাংলার মানুষের পক্ষে আর সম্ভব ছিলো না না নৈতিক ভাবে না রাজনৈতিক ধর্মীয় অনুভূতিতে মুক্তির অমিয় স্রোতে বাঙালির হৃদয় তখন টগবগ করে ফুটছে চাই স্বাধীনতা - চাই স্বাধীকার

এই মহামন্ত্রের দীক্ষা নিতেই সেদিন ৭ মার্চ ১৯৭১ লক্ষ লক্ষ বাঙালিই সমবেত হয়েছিলো সিদ্ধান্ত তাদের নেয়াই ছিলো নিয়েছিলো সারা দেশবাসী মাত্র কয়দিন আগেই তো দেশের বিবেকী প্রহরী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা স্বাধীন দেশের জন্য নতুন পতাকা উত্তোলন করে স্বাধীনতার ঘোষণাও পাঠ করে দিয়েছিলো তাদের এই বিপ্লবী অগ্রযাত্রায় সমগ্র দেশবাসী উজ্জীবিত হয়ে উঠেছিলো স্বাধীনতার জন্য, শাসকবর্গ আর তাদের অনুচর ছাড়া কারো দৃষ্টিতেই এই কাজ গর্হিত ছিলো না তা ছিলো মহান ছিলো অসীম আনন্দের-মুক্তির-বিশ্বাসের নয়া জয়গান কাজেই সাত মার্চের ওই সভা কোন দলের নয়; তা ছিলো একেবারেই বাঙালি সত্ত্বার জাগরণ তাই সেখান থেকে দেশবাসী একটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা চেয়েছিলো মাত্র কারণ ইতোমধ্যেই বিভিন্ন স্থানে প্রতিরোধ স্পৃহা মানুষ তাদের ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছিলো বাঙালিরা তখন নিশ্চিত যুদ্ধে অবতীর্ণ এবং তাদের এই মুক্তির সংগ্রাম যে রক্তপাতহীন নয় তাও তাদের কাছে সুনিশ্চিত ছিলো আর সে কারণেই তাদের প্রয়োজন ছিলো একটি আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে একটি ঘোষণা

সেদিন নেতা অনেক ছিলেন ত্যাগী-নির্যাতিত-দীর্ঘ কারাবাসভোগী বাম-গণতান্ত্রিক-চরম বিপ্লবী-জাতীয়তাবাদী-বর্ষিয়ান জাতীয় নেতা কোন কমতি ছিলো না দেশপ্রেমিক বুদ্ধিজীবী লেখক কবি শিল্পী বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক - কেউ উপস্থিত ছিলেন কেউ ছিলেন না কিন্তু বাঙালিরা শুধু একজনের মুখ থেকেই ঐতিহাসিক মহামন্ত্র শুনতে চেয়ে রেসকোর্সে মিলেছিলো মহা জনসমুদ্রে সেই একজন যিনি ছিলেন শুধু বাঙালি সত্তার প্রতীক তিনি শেখ মুজিব মুজিবর রহমান তাকেই আজ বলতে হবে তিনিই বলবেন তারই নির্দেশের অপেক্ষা মাত্র

তিনি এলেন অনেকটা শিকারীর বন্দুকের নাগাল থেকে ছাড়া পাওয়া বাঘের মতো উত্তাল জনতা মুহূর্তেই চুপ এতক্ষণ যারা জ্বলন্ত কড়াইতে ফুটছিলেন শ্লোগানে শ্লোগানে উত্তাল হচ্ছিল রেসকোর্সের বাতাস মূহর্মূহ করতালির পর মুহূর্তের মধ্যেই পিনপতন নিঃস্তব্ধতা তিনি শুরু করলেন পরিচিত চশ্‌মাটি খুলে রেখে পরিচিত ভঙ্গিমায় উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ বজ্র নিনাদের মতোই কেঁপে কেঁপে উঠতে শুরু করলো বাঘের গর্জনের মতো আর সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়তে লাগলো উপস্থিত গণসমুদ্রে তিনি বলছেন - কখনো অতীত কখনো বর্তমান অপূর্ব সমন্বয় কখনো মনে হচ্ছে অগোছালো আবার তারই মধ্যে চমৎকার বিন্যাস পরিস্কার প্রতিটি উচ্চারণ কখনো তার মধ্যে আঞ্চলিক শব্দও এসে যাচ্ছে কিন্তু তাতে কি? তিনি তো গণমানুষের হৃদয়ের আকুতিগুলোই বলে যাচ্ছেন অবলিলায় তিনি যাই বলছেন তাতেই ভরে উঠছে বাঙালির হৃদয় কানায় কানায় যেন হাজার বছর ধরে এই ঐশী বাণী শোনার জন্যই অপেক্ষায় বাঙালির প্রতিটি মন ওই সময় তিনিই যে ত্রাতা তিনি যা বলবেন তাতেই জন্মাবে নতুন ইতিহাস বাঙালির ইতিহাস - নয়া জাতিসত্তার ইতিহাস

জনতা যতই শুনছে ততোই ফুঁসে উঠছে হৃদয়ে ঘৃণার বারুদ তাজা গ্রেণেডের মতো প্রতিটি মন তখন হাজার লক্ষ স্পিলিন্টারে তৈরি হচ্ছে তিনি বলছেন ইতিহাস - বাঙালির ঐতিহ্যের কথা বর্তমান ভবিষ্যতের কথা প্রতিরোধ প্রতিশোধের কথা বলতে বলতেই তিনি বললেন - মহামন্ত্রের মহাবাণী, 'এবারের সংগ্রাম - স্বাধীনতার সংগ্রাম' মূহুর্তের মধ্যেই যেন আণবিক বোমার মতো তার কন্ঠ নিঃসৃত মহাবাণী ছড়িয়ে পড়লো আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে লক্ষ জনতাকে উপছে দিয়ে সমগ্র বাংলায় মানুষের হৃদয়ে হৃদয়ে

শেষ হলো অপেক্ষা হাজার হাজার বছরের অপেক্ষা দু'শো বছরের অপেক্ষা তেইশ বছরের অপেক্ষা আর দ্বিধা নয় প্রয়োজন নেই কোন আনুষ্ঠানিকতার পরিপূর্ণ ঘোষণার মাধ্যমে নির্দেশিত বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের কর্মধারা শত্রু চিহ্নিত; মিত্রও চিহ্নিত শুধু প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে ঘরে বাইরে সর্বত্র যে বাতাস প্রলয়ের প্রবল ঘূর্ণিতে উদিত হয়েছিলো ঢাকার রেসকোর্সে সাত মার্চ  উনিশ্‌শো একাত্তরে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির হৃদয়ে পৌঁছে গেল তা মুহূর্তের মধ্যেই শেষ হলো আনুষ্ঠানিকতা পূর্ণ হলো বাঙালির ইতিহাসের একটি পর্ব শুরু হলো আর এক পর্ব যা আজও বহমান

আজ ৩৮ বছর পরও ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস পালন করা দেখলে তৎকালীন ও বর্তমান রাজনীতিকদের অদূরদর্শী ঐতিহাসিক মূর্খ ছাড়া আর কি সম্ভাষণ করা যায়! ভবিষ্যৎ ইতিহাস আর প্রজন্মই তার চুলচেরা বিশ্লেষণ করে নির্ধারণ করুক ওই দিনটি এটাই আমাদের প্রত্যাশা

 

মহিউদ্দিন মাসউদ

ভোলা

 

শহীদ আসাদ - একটি ইতিহাস

 

 

২০শে জানুয়ারি ১৯৬৯ ঢাকার রাজপথ রক্তে রঞ্জিত হলো শহীদ আসাদের পবিত্র রক্তে তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানে আইয়ুব শাহীর বিরুদ্ধে এক অগ্নিসুলিঙ্গ এই শহীদ আসাদ তাঁর রক্ত দানের ২ মাসের মধ্যে স্বৈরাচারী আইয়ুব খান পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট থেকে পদত্যাগে বাধ্য হন ২৫শে মার্চ এরমাত্র দু'বছরের মধ্যে স্বাধীনতার সংগ্রাম ইয়াহিয়ার হানাদার পাকিস্তানী বাহিনীর বিরুদ্ধে বাংলার আবালবৃদ্ধ জনতা এক হয়ে স্বাধীনতার সংগ্রামে-মুক্তির সংগ্রামে জীবনপন করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল পরিনামে ৩ বছরের মধ্যে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় পৃথিবীর মানচিত্রে

বর্তমান বাংলাদেশের নরসিংদী জেলার শিবপুরের এক আদর্শবান হাইস্কুলের শিক্ষক পিতা ও শিক্ষয়িত্রী মাতার ঘরে বিংশ শতাব্দীর চল্লিশ দশকের মাঝামাঝি শহীদ আসাদের জন্ম প্রগতিশীল চিন্তাচেতনার অধিকারী এই শিক্ষত পরিবারটি সমগ্র এলাকায় এক আদর্শবান পরিবার বলেই সব মহলেই পরিচিত ছিলেন শিক্ষক পিতা এবং শিক্ষয়িত্রী মাতার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে শহীদ আসাদ অন্যায়ের কাছে নতী স্বীকার না করার আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন' সেজন্য বাল্যকাল থেকেই তিনি প্রগতিশীল সংঘে জড়িত হয়ে পড়েন

১৯৫৮ সালে সামরিক আইন জারির পর ১৯৬২ এর সামরিক শাসন বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে এলাকায় তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন ১৯৬২ এর ১৭ই সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের গড়া বিচারপতি হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট বাতিল আন্দোলনে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করেন সে সময় থেকেই তিনি মওলানা ভাসানীর আদর্শে বিশ্বাসী হয়ে ওঠেন

্বশোষণমুক্ত সমাজ, সব মানুষের সমান অধিকার ও মর্যাদা, ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদ দূর করা-অর্থাৎ এককথায় বলা চলে মানবতার সুমহান আদর্শ তাঁর মনে স্থায়ীভাবে আসন পাতে এই আদর্শগুলো সামনে রেখে তিনি তাঁর রাজনৈতিক জীবনকে এগিয়ে নিতে থাকেন তাঁর অঞ্চলে তিনি হয়ে ওঠেন এক আদর্শ স্থানীয় যুবক পাশাপাশি তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে এম.এ. পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আইন কলেজে ভর্তি হন শিবপুর, হাতিরদিয়া-মনোহরদী এলাকায় তিনি হয়ে ওঠেন এক জ্বলন্ত অগ্নি শিখা-যে শিখা সমস্ত প্রকার অন্যায়, অত্যাচার, নিপীড়নের বিরুদ্ধে লেলিহান এলাকায় কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, খেটে খাওয়া একদম মেহনতি মানুষকে তিনি সংগঠিত করেন এক পতাকার নীচে তা হলো কোন অবস্থাতেই অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করা

১৯৬৮'র ডিসেম্বরে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে মওলানা ভাসানীর ডাকে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন দানা বেঁধে উঠতে থাকে এরই ফলশ্রুতিতে ২৯শে ডিসেম্বর হাতিরদিয়া-মনোহরদী এলাকায় শহীদ আসাদের নেতৃত্বে সফল হরতাল পালিত হয় কিন্তু সে সময়ই তিনি তৎকালীন স্বৈরাচার সরকারের প্রতক্ষ টার্গেটে পরিণত হন।    

১৯৬৯'র ২০শে জানুয়ারি ঢাকায় আইয়ুব বিরোধী মিছিলে নেতৃত্ব দেয়ার সময় সরকারের গোয়েন্দা বাহিনীর জনৈক বাঙালি ডি.এস.পি (উপ পুলিশ সুপার) তাকে লক্ষ্য করে রিভলবার দিয়ে গুলি বর্ষণ করে এতে তিনি ঘটনাস্থলেই শহীদ হন তার এক বড় ভাই ডাঃ রশিদুজ্জামান তখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে কর্মরত ছিলেন গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের কাছেই জানিনা সেই বাঙালির মনে এব্যাপারে কোন প্রতিক্রিয়া হয়েছিল কিনা কারণ এক অর্থে এই গুলিবর্ষণ হত্যাকান্ডের সঙ্গে তুলনীয় কারণ মিছিল ছিল শান্তিপূর্ণ সুতরাং এ থেকে সহজেই অনুমান করা যায় যে শহীদ আসাদ অনেক আগে থেকেই স্বৈরাচারী সরকারের টার্গেটে পরিণত হয়েছিলেন

শহীদ আসাদের আত্মত্যাগের পর ঘটনা প্রবাহ দ্রুত গতিতে ঘটতে থাকে ২৪শে জানুয়ারি গণঅভ্যুত্থান দিবসে স্কুলছাত্র মতিউর সহ বেশ ক'জন নিহত হন ১৫ই ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বেয়নেট চার্জে এবং গুলি করে হত্যা করা হয় প্রক্টর ও রসায়নশাস্ত্রের সহযোগী অধ্যাপক ডঃ শামসুদ্দোহা এবং সিটি কলেজের ছাত্র নুরুল ইসলামকে ১৯৬৯ এর ২০শে জানুয়ারি থেকে ১৯৭১ এর ১৬ই ডিসেম্বর সময়ের ব্যাপ্তিকাল এক মাস কম তিন বছর পৃথিবীর মানচিত্রে স্বাধীন সার্বভৌমত্ব বাংলাদেশের অভ্যুদয় মাঝে নয় মাস-১৯৭১ এর ২৫শে মার্চ দিবাগত রাত থেকে ১৯৭১ এর ১৬ই ডিসেম্বর বিকেল-পৃথিবীর ইতিহাসে নৃশংসতম নরহত্যা এ নারী নির্যাতন সংঘটিত হয় অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগ ও নারীর সভ্রমের বিনিময়ে এই স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হবে যখন আমরা 'সোনার বাংলা' প্রকৃত অর্থেই 'সোনার বাংলা' হবে

মোহাম্মাদ জাহিদ হোসেন

নতুনদেশ, কানাডা

 

একশত বছরে নারী

সংলাপ

 

২০১০ সালে আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবস একশত বছর পূর্ণ করলো শ্রমজীবী নারী আন্দোলনের দাবির প্রেক্ষিতে সমাজতান্ত্রিক নারী সম্মেলনের পক্ষ থেকে এই দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় শিল্প বিপ্লবের সূচনা লগ্ন থেকেই শ্রমজীবী নারীদের উপর পুঁজিবাদী শোষণ শুরু হয় পুরুষ শ্রমিকদের থেকেও বেশি মাত্রায় ধনতান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থায় নারী ও শিশু শ্রমিকদের অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে শোষণের শিকার হতে হয় এই কথা কনডিশন অব ওয়ার্কিং ক্লাস ইন ইংল্যান্ড বইতে কার্ল মার্কস বিশদভাবে তুলে ধরেছিলেন এই শোষণের বিরুদ্ধে পুরুষদের সাথে নারী শ্রমিকরাও ঐক্যবদ্ধভাবে সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছে প্রথম থেকেই'প্রথম আন্তর্জাতিক সংগঠন' তৈরি করার সময় থেকে নারীপুরুষ উভয়কেই এক সংগঠনে যুক্ত করা হয় শ্রমজীবী নারীরাও তাদের বিভিন্ন দাবি নিয়ে সংগ্রামে অবতীর্ণ হয় ১৮৫৭ সালে নিউইয়র্কের দরজি শ্রমিক মেয়েরা মজুরি ও কাজের ঘণ্টা কমানোর দাবিতে মার্চ মাসব্যাপী আন্দোলন গড়ে তোলেন প্রায় সমসাময়িক সময়ে জার্মানের সুতাকল শ্রমিক মেয়েরাও আন্দোলনে নামে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স প্রভৃতি দেশের শ্রমিক নারীরা আন্দোলনে যুক্ত হয়

১৮৭১ সালের প্যারি কমিউনে নারী শ্রমিকরা উল্লেখযোগ্যভাবে অংশগ্রহণ করে তাদের সেই বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামকে উদ্দেশ্য করে কালমার্কস লিখেছেন, ''....... প্রকৃত প্যারি মহিলারা ব্যারিকেড ও বধ্যভূমিতে প্রফুল্ল মনে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন,'' বীর প্যারি নারী যোদ্ধাদের মধ্যে লুই মিচেল এবং এলিজাবেথ ডেভিডের নাম উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক বিচারের সময় মিচেল গর্বভরে ঘোষণা করেছিলেন, ''....... আমি সর্বতোভাবে বিপ্লবের সাথে যুক্ত এবং যা করেছি তার দায়িত্ব নিতে সম্পূর্ণ রাজি''

১৮৮৯ সালে ক্লারা জেন্টকিন প্যারি শহরে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে সর্বপ্রথম নারীপুরুষের সর্বক্ষেত্রে সমঅধিকারের দাবিটি উত্থাপন করেন, যা দেশে দেশে শ্রমজীবী নারীদের মধ্যে দারুণ উদ্দীপনা তৈরি করে ১৯০৭ সালে জার্মানির স্টুটগার্টে প্রথম আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে অন্যান্য দাবির সঙ্গে নারীর ভোটাধিকারের দাবিটিও উত্থাপিত হয় তারই প্রভাবে ১৯০৮ সালে নিউইয়র্ক দরজি শ্রমিক মেয়েরা সমমজুরি, ৮ ঘণ্টা কাজসহ ভোটাধিকারের দাবিটি গৃহীত হয়

১৯১০ সালে আন্তর্জাতিক নারী সংগঠনের দ্বিতীয় সম্মেলনে ভোটাধিকারের দাবিতে প্রতি বৎসর একটি দিন নারী দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় সেই অনুযায়ী পরবর্তী বছরগুলোতে মার্চ মাসের যে কোন একটি দিন আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবস পালন করা হয় ১৯১৪ সালে আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক নারী সম্মেলন মঞ্চ থেকে সিদ্ধান্ত হয় যে নিউইয়র্ক দরজি শ্রমিকদের ঐতিহাসিক ধর্মঘটকে স্মরণ করে ৮ই মার্চ প্রতি বছর আন্তর্জাতিক শ্রমদিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয় এই প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন সংগঠনের সম্পাদিকা ক্লারা জেটকিন নারীর ভোটাধিকারের আন্দোলন তৎকালীন প্রেক্ষিতে ছিল একটি বিশেষ বৈপ্লবিক আন্দোলন কারণ তখন পর্যন্ত কেবল মাত্র কয়েকটি দেশে সীমাবদ্ধভাবে নারীর ভোটাধিকার স্বীকৃতি লাভ করেছিল বুর্জোয়া নারীরাও ভোটাধিকারের দাবিতে সরব ছিলো, কিন্তু তারা শুধুমাত্র তাদের শ্রেণীর মেয়েদের জন্যই ভোটাধিকারের দাবিত তুলতে আগ্রহী ক্লারা জেটকিন তাই এই দাবিসহ নারী দিবস পালনের বিষয়টি খুব সুস্পষ্টভাবেই সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই বিশ্লেষণ করেছেন এবং একে আন্তর্জাতিক চরিত্র দিতেও সক্রিয় থেকেছেন

আজকের দিনে ৮ই মার্চ আমরা অবশ্যই স্মরণ করব এই দিনটির ঐতিহাসিক তাৎপর্যকে সূচনা লগ্ন থেকেই সমাজতান্ত্রিক নারী সংগঠন এই দিনটিকে নারী সমানাধিকার দিবস হিসাবে চিহ্নিত করে এসেছে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ বিরোধী আন্দোলনের মঞ্চ হিসাবেও দিবসটিকে ব্যবহার করা হয়েছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে ১৯১৩ সালের ৮ই মার্চ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সমাজতন্ত্রী নারী সংগঠনের উদ্যোগে যুদ্ধবিরোধী দিবস হিসাবে এটি প্রতিপালিত হয় ১৯১৭ সালে ৮ই মার্চ রাশিয়ার যুদ্ধের ও জারতন্ত্রের অবসানের দাবিতে কয়েক সহস্র মেয়ে রাশিয়ার তৎকালীন পেট্রোগাদে সমবেত হয়ে সভা করেন ১৯৩৬ সালে স্পেনের বিপ্লবী নেত্রী লা পাশিওনারার ডেলোরাম ইবারুরীর নেতৃত্বে ৮ই মার্চ আশি হাজার শ্রমজীবী নারী ফ্যাসিস্ত ফ্রাঙ্কো সরকারের বিরুদ্ধে শোভাযাত্রা ও পথ অবরোধ মাদ্রিদ শহরকে কাঁপিয়ে দিয়েছিলো ১৯৫০ সালের ৮ই মার্চ পশ্চিম জার্মানির তিন লক্ষ নারী চ্যান্সেলর আদিনুরকে নিরস্ত্রীকরণে দাবি জানিয়ে স্বাক্ষর পাঠিয়েছিলেন ইরানের সুতাকলের শ্রমজীবী নারীরা শান্তি ও খাদ্যের দাবিতে শোভাযাত্রা করে পাশাপাশি পঞ্চাশ হাজারের উপর মহিলা তৈলক্ষেত্র জাতীয়করণের দাবিতেও ৮ই মার্চ পথে নামে

যে দাবিগুলোর ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদ্‌যাপিত হয়েছে প্রারম্ভ থেকে সেগুলো আজও প্রাসঙ্গিক বিশেষ করে সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিপর্যয়ের পরে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বে বিশ্বব্যাপী যে যুদ্ধোন্মদনা তার বিরুদ্ধে নারী সমাজকে অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে ইরাক ও আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতায় আমরা লক্ষ্য করেছি যে সাম্রাজ্যবাদী এই যুদ্ধে অসামরিক জনগণের মধ্যে সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নারী ও শিশুরা যুদ্ধবিধ্বস্ত বিভিন্ন দেশে সামাজিক নিপীড়নও মেয়েদের উপর বৃদ্ধি পেয়েছে সামাজিক সুরক্ষার যে দাবি বারংবার উত্থাপিত হয়েছে আন্তর্জাতিক নারী দিবসে, বিশ্বায়নের অর্থনীতির কুপ্রভাবে সেইসব সামাজিক সুরক্ষার সিংহভাগই আজ উপেক্ষিত পুঁজিবাদী দুনিয়াসহ তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিভিন্ন দেশের নারী আন্দোলন আজ নারীদের অধিকারের দাবিতে সংগঠিত হচ্ছে আজকের দিনে জরুরি কাজ হচ্ছে ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও হিংসার বিরুদ্ধে শোষিত ও নিপীড়িত নারী সমাজকে সংগঠিত করা

শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষার প্রশ্নে নারীদের অবস্থান সারা পৃথিবী জুড়েই আজও বিপন্ন উদার অর্থনীতির ফলে মেয়েরা ক্রমশ প্রান্তবাসিনী হচ্ছে বিশ্বে নারী জনসংখ্যাও আজ হ্রাসমান তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কন্যা ভ্রুণহত্যার মতো লজ্জাজনক ঘটনাও ক্রমবর্ধমান পুত্র লালসাই এর অন্যতম মূল কারণ সাম্প্রতিক কালের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে প্রায় ৯ কোটি নারী বিশ্ব জনসংখ্যা থেকে নিখোঁজ এক ভারতবর্ষেই নারী জনসংখ্যার তুলনায় পুরুষের সংখ্যা ২৫০ কোটি বেশি বিশ্বের নিরক্ষর জনসংখ্যার দুই তৃতীয়াংশই নারী

বিশ্বে ক্ষুধা ক্লিষ্ট মানুষের ৭০ ভাগই হচ্ছে নারী এবং শিশু আমাদের দেশও এর ব্যতিক্রম নয় এর অন্যতম মূল কারণ অস্বাভাবিক হারে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি রাষ্ট্রসঙ্ঘের শাখা হিসাবে ফেয়ো (ফুড এন্ড এগ্রিকালচারাল অর্গানাইজেশন ) - এর মতো ২০০৭ সাল থেকে বিশ্ব বাজারে গমের দামই বেড়েছে ৭৭%, চালের দাম বেড়েছে ৩০ শতাংশের মতো এবং এই দাম কমার কোন লক্ষণ নেই উন্নয়নশীল দেশে খাদ্যশস্য উৎপাদনেও ঘাটতি দেখা যাচ্ছে

মূল্যবৃদ্ধি স্বল্প আয়ের কোটি কোটি মানুষকে আরো দারিদ্র্যের মধ্যে নামিয়ে আনবে বলে ধরে নেয়া হচ্ছে সর্বজনীন গণবণ্টন ব্যবস্থা কার্যকরী করতে হবে ক্ষুধা মুক্তির লড়াইয়ে শামিল করতে হবে ব্যাপক নারী সমাজকে উদার অর্থনীতির ফলে অন্য দেশগুলোর মতই আমাদের দেশেও দ্রুত বেড়ে চলেছে ধনী-দরিদ্রে ব্যবধান আর দরিদ্রের মধ্যে দরিদ্রতম অংশ মহিলারা বঞ্চিত হচ্ছে খাদ্য নিরাপত্তা থেকে খাদ্যের অধিকারকে বাঁচার অধিকারের মতই মৌলিক অধিকার হিসাবে স্বীকৃতি দিতে হবে

দারিদ্র্য বৃদ্ধির কারণে নারীদের প্রতিহিংসা বৃদ্ধি পাচ্ছে উত্তরোত্তর বিশ্বজুড়েই প্রতি দশ জন মেয়ের মধ্যে ছয় জন মেয়ে তাদের জীবদ্দশায় শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার হন এই হিংসাগুলো হচ্ছে পারিবারিক হিংসা, ধর্ষণ, যৌন হিংস্রতা, যৌন নিপীড়ন, বাধ্যতামূলক বিয়ে, সম্মান রক্ষার নামে অপরাধ, নারী পাচারসহ আরো বিভিন্ন ধরনের পৃথিবীর ৮৯টি দেশে পারিবারিক হিংসা রোধে কতিপয় আইনের ব্যবস্থা থাকলেও ১০২টি দেশে এই বিষয়ে কোন সুনির্দিষ্ট আইনই নেই

সন্ত্রাসবাদী বা জঙ্গী সংগঠনগুলো অস্ত্রের মুখে জোর করে মেয়েদের ব্যবহার করছে তাদের কাজে বিশেষ উগ্রপন্থী ধর্মীয় সংগঠন আমাদের বেশ কয়েকটি জেলায় দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে গুপ্ত হত্যা, নাশকতামূলক কাজে লিপ্ত করাচ্ছে উগ্রপন্থী বিভিন্ন সংগঠন মেয়েদের ড্রেস কোড, বা আচরণ বিধি প্রচলন করার নামেও তাদের উপর হিংসাত্মক আক্রমণ নামিয়ে আনছে

বিশ্বজুড়েই নারী পাচারের হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে বিশেষত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো থেকে দারিদ্র্যের কারণে ব্যাপক সংখ্যক নারী পাচার হচ্ছে প্রতিনিয়ত ভারতবর্ষে নারী পাচার চলছে রমরমিয়ে অথচ পাচার বিরোধী তেমন কোন আইন না থাকার ফলে পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভবপর হচ্ছে না নারী বা শিশু পাচার বন্ধে সরকারকে কঠোর আইন প্রণয়ন করতে হবে এই দাবি আন্তর্জাতিক নারী দিবসের সরকারকে আরো সুনির্দিষ্টভাবে দারিদ্র্যদূরীকরণ কর্মসূচী রূপায়ণে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে প্রান্তিক এবং দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাসকারী নারীদের বাজেটে আর্থিক বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে কর্মসংস্থানের প্রশ্নেও বিশ্বব্যাপী নারীদের অবস্থান অত্যন্ত করুণ বিশ্বায়নে উদার অর্থনীতির প্রভাবে কর্মসঙ্কোচনের বড় একটা আঘাত মেয়েদের উপর নেমে এসেছে গত দশক থেকে বর্তমান দশকে কর্মরত মেয়েদের সংখ্যা ২০ কোটি হ্রাস পেয়েছে অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরত মেয়েদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও তাদের জীবিকা স্থায়ী নয় বর্তমানে কাজের সন্ধানে পুরুষদের মতো বহুসংখ্যক মেয়ে স্থানান্তরে যেতে বাধ্য হচ্ছে এই পরিযায়ী নারী শ্রমিকদের জীবন অত্যন্ত সমস্যাসঙ্কুল স্বল্প মজুরিতে অত্যাধিক পরিশ্রম করতে বাধ্য হন অসংগঠিত ক্ষেত্রের নারী শ্রমিকরা বিশ্ব শ্রমসংস্থার হিসাব অনুযায়ী কর্মরত মেয়েদের বেশিরভাগ কৃষি কাজ ও খাদ্য উৎপাদনের কাজে নিযুক্ত অথচ প্রদীপের নিচেই অন্ধকার কারণ এই সমস্ত ক্ষেত্রে কর্মরত মেয়েরা মজুরি বৈষম্যের যেমন শিকার তেমনি বুভুক্ষা আর ক্ষুধারও শিকার

নারীর ক্ষমতায়নের প্রশ্নে আজ বিশ্ব আলোড়িত ১৯৯৫-এ বেজিং বিশ্বনারী সম্মেলনে নারীর হাতে আরো বেশি প্রশাসনিক দায়িত্ব তুলে দেবার কথা আলোচিত হয়েছে প্রায় পনেরো বছর অতিক্রান্ত একটি শতাব্দী পার করে নতুন শতাব্দীর এক দশকও পার হতে চলেছে বিশ্বজুড়ে খুব বেশি অগ্রগতি হয়নি যদিও এর মধ্যে কয়েকটি দেশে আইন সভায় নারীদের জন্য আসন সংরক্ষণ আইন পাস করার ফলে নারী প্রতিনিধির সংখ্যা আইন সভায় বৃদ্ধি পেয়েছে তা সত্ত্বেও পৃথিবীর পাঁচটি দেশে এখনও নারীরা ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ভোটাধিকারের যে দাবি নিয়ে শ্রমজীবী নারী আন্দোলন তাদের সংগ্রামের সূচনা করেছিল যা আজ পৃথিবীর প্রায় সমস্ত দেশেই স্বীকৃত তা আরো বৃহত্তরভাবে আত্মপ্রকাশ করেছে নারীদের জন্য আরো ক্ষমতায়নের স্বীকৃতির মাধ্যমে সামন্তবাদী, পুরুষ প্রধান মানসিকতাকে অতিক্রম করে এক ব্যাপক অংশের মেয়েরা প্রকৃত অর্থেই পারিবারিক ও সামাজিক বাধাকে উপেক্ষা করে প্রশাসনের কাজে তাদের দায়বদ্ধতা ও দক্ষতা প্রমাণ করেছে

আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রকৃত তাৎপর্য নারী পুরুষের বৈষম্য দূর করে সর্ব অর্থে নারীর সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করা সমাজ ব্যবস্থায় উত্তরণের পরই এটা বাস্তবায়িত হওয়া সম্ভব তবুও বিগত এক দশক ধরে সারা বিশ্ব জুড়েই নারী সমাজের এক বৃহৎ অংশ ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও হিংসার বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী উদার অর্থনীতির বিরুদ্ধে, যুদ্ধের বিরুদ্ধে, শান্তির সপক্ষে সংগ্রামরত শতবর্ষে এই আন্দোলনকে আরো তীব্র করে তুলে এগিয়ে যাবার শপথ গ্রহণ করতে হবে

 

সত্যের প্রতীক সালমান আল ফার্সি

 

সংলাপ

 

সালমান আল-ফার্সি বর্তমান ইরানের তেহেরান ও সিরাজ অঞ্চলের মধ্যবর্তী নগর আসবিহানে জন্মগ্রহণ করেছিলেন যেই মাত্র সালমান একজন ধর্মপ্রবর্তক মহাপুরুষের আবির্ভাবের ভবিষ্যদ্বানী জানতে পেরেছিলেন, তিনি তাঁর খোঁজে পারস্য ত্যাগ করেন ইসলাম ধর্মে অন্তর্ভুক্ত হবার আশায় নিচে সালমানের নিজের জবানীতে কাহিনীটি বর্ণনা করা হলো : 'আমি ছিলাম 'জেইন' নামক পারস্যের একটি গ্রামের বালক আমার বাবা ছিলেন গ্রামের একজন উচ্চপদস্থ সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি এবং অন্যতম ধনী আমার বাবা আমাকে এতো বেশি ভালোবাসতেন যে, আমার নিরাপত্তার জন্য আমাকে তালাবদ্ধ করে রাখতেন আমাদের আরাধনার বস্তু আগুনের তত্ত্বাবধায়ক মনোনীত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আমি প্রাচীন পারসিক পুরোহিত মন্ডলির অন্যতম ধর্ম বিশ্বাসের প্রতি মনোঃকষ্ট বোধ করতাম আগুন প্রজ্জ্বলিত করার কার্যভার আমার ওপর নীত ছিল, কাজেই ইহার ক্ষীণ হওয়ার ক্ষমতা ছিল না আমার পিতার আবাদযোগ্য জমি ছিল এই সকল জমি হতে প্রচুর পরিমাণে শস্য উৎপাদন হতো এক সময় তিনি অন্যকিছু নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন এবং জমির দেখাশোনা ঠিক মতো করতে পারছিলেন না তার পরিবর্তে তিনি আমাকে জমির দেখাশোনা করতে বললেন আমার যাবার পথে একটি গীর্জা দেখতে পেলাম এবং শুনলাম খ্রিষ্টানরা সেখানে প্রার্থণা করছে ইহা আমার কৌতূহল জাগরিত করেছিল খ্রিষ্টান অথবা অন্য কোনো ধর্মের অনুসারী সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা ছিল না তারা কি করে এটা দেখার উদ্দেশ্যে আমি গীর্জায় ঢুকেছিলাম তাদের প্রার্থনা আমার ভেতর অনুভূতি জাগিয়েছিল এবং আমার খ্রিষ্টান ধর্ম অনুসরণের আকাঙ্খা হলো আমি অনুভব করেছিলাম যে এটা আমার ধর্মের থেকে অপেক্ষাকৃত ভালো আমি আবাদের কাজে না গিয়ে সেখানে সূর্য অস্ত যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত অবস্থান করেছিলাম আমি গীর্জায় অবস্থানরত ব্যক্তিদেরকে তাদের ধর্মের উৎসমূল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম উত্তরে তারা বলেছিল যে, খ্রিষ্টান ধর্মের আদি উৎস প্রাচীন সিরিয়াতে

রাতে যখন আমি বাড়িতে ফিরে আসলাম, আমার পিতা আবাদ সংক্রান্ত বিষয়ে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন আমি তাকে সমগ্র গল্পটি বললাম এটা শোনার পর আমার পিতা আমাকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন এবং বোঝানোর চেষ্টা করলেন যে, আমাদের ধর্ম খ্রিষ্ট ধর্ম থেকে অপেক্ষাকৃত ভালো যখন আমি তাকে বললাম যে, খ্রিষ্ট ধর্ম অপেক্ষাকৃত ভালো, তিনি আমাকে তালাবদ্ধ করলেন এবং পায়ে বেড়ি দিলেন কারণ তিনি ভীত হয়ে পড়েছিলেন যে, আমি স্বধর্ম ত্যাগ করবো

সিরিয়া থেকে আগত যাত্রীদল সম্পর্কে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে এবং তথ্য প্রদানের অনুরোধ করে খ্রিষ্টানদের নিকট সংবাদবাহক প্রেরণ করেছিলাম আমি পায়ের বেড়ি মুক্ত করতে সমর্থ হয়েছিলাম এবং সিরিয়া পৌঁছানোর পূর্ব পর্যন্ত লুক্কায়িত অবস্থায় ভ্রমণ করেছিলাম আমি সেখানে পৌঁছে খ্রিষ্ট ধর্মের সবচেয়ে স্বনামধন্য ব্যক্তির খোঁজ করলাম এবং একজন বিশপের তত্ত্বাবধানে ছিলাম আমি তার কাছে আমার খ্রিষ্ট ধর্ম গ্রহণ করার, তার সাথে থাকার, তার সেবা করার, তার কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করার এবং তার সাথে প্রার্থনা করার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলাম তিনি রাজি হয়েছিলেন খুব শীঘ্রই আমি আবিষ্কার করলাম যে, তিনি ছিলেন একজন খারাপ লোক তিনি মানুষের কাছ থেকে সোনা ও রূপা দানের উদ্দেশ্যে গ্রহণ করতেন এবং এই সকল সোনা-রূপা নিজের জন্য গোপন ভান্ডারে সঞ্চয় করে রাখতেন আমি তাকে খুব ঘৃণা করতাম যখন সে মারা গেল, আমি লোকদের কাছে তার অপরাধের কথা বললাম এবং তাদের দেখালাম কোথায় বিশপ বাক্সগুলো লুকিয়ে রেখেছিল অতঃপর তারা তার দেহকে ক্রশবিদ্ধ করে পাথর নিক্ষেপ করেছিল

যখন আরেকজন নতুন ব্যক্তি বিশপ পদে অধিষ্ঠিত হলেন আমি তার    সাথে থাকতে লাগলাম তিনি ছিলেন কঠোর সংযমী তাপসী এবং ধর্মবিশ্বাসে একান্ত অনুগত আমি তাকে খুব ভালোবাসতাম আমি তার সাথে কিছু সময় কাটিয়েছিলাম যখন তিনি মৃত্যুর সম্মুখীন হয়েছিলেন, আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম তার মৃত্যুর পর আমার কোন ব্যক্তিকে অনুসরণ করা উচিত মোসুলে বসবাসকারী একজন ব্যক্তির কাছে যাওয়ার ব্যাপারে তিনি আমাকে উপদেশ দিয়েছিলেন আমি মোসুলে গিয়েছিলাম এবং মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তার সাথে ছিলাম মৃত্যুর পূর্বে উক্ত ব্যক্তিকে আমি জিজ্ঞাসা করলাম তার মৃত্যুর পর আমার কোন ব্যক্তিকে অনুসরণ করা উচিত নাসিবিনে বসবাসকারী একজন ব্যক্তির কাছে যাওয়ার ব্যাপারে তিনি আমাকে উপদেশ দিয়েছিলেন মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত আমি উক্ত ব্যক্তির সাথে ছিলাম তার মৃত্যুশয্যায় আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম তার মৃত্যুর পর কোন ব্যক্তিকে আমার অনুসরণ করা উচিত তিনি আমাকে আম্‌মুরিয়াহতে বসবাসকারী একজন ব্যক্তির কাছে যাওয়ার জন্য উপদেশ দিয়েছিলেন আমি সেখানে গিয়ে তার সাথে সাক্ষাৎ করলাম আম্‌মুরিয়াহতে অবস্থানের সময় আমি কাজ করেছিলাম এবং একটি ভেড়া ও কয়েকটি গরু হস্তগত করেছিলাম

যখন আম্‌মুরিয়াহতে বসবাসকারী ব্যক্তিটি মৃত্যুশয্যায়, আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম তার মৃত্যুর পর আমার কোন ব্যক্তিকে অনুসরণ করা উচিত তিনি আমাকে বলেছিলেন যে সত্যিকার খ্রিষ্ট ধর্মের অনুসারীরা আর কেউ বেঁচে নেই যাই হোক, তিনি আমাকে বলেছিলেন যে, শেষ ধর্মপ্রবর্তক মহাপুরুষের আরবে আবির্ভাব ঘটেছে এবং তাঁর বিশেষ কার্য আসন্ন প্রায় তিনি বলেছিলেন মানুষটি ইব্রাহিমের ধর্মের অনুসারী দুটি শক্ত ভিত্তির মধ্যস্থলে থেকে তিনি নিজের গৃহ ত্যাগ করে প্রবাসে বসবাস করেন তার বসবাসকৃত নগরে খেজুর গাছের আবাদ থাকবে তার কিছু পরিস্কার চিহ্ন আছে : তিনি উপহার গ্রহণ করেন কিন্তু কখনোই সদকা গ্রহণ করেন না ধর্মপ্রবর্তক সম্বন্ধীয় সীল মোহর তাঁর দুই কাধের মাঝে অবস্থিত যদি তুমি তাকে অনুসরণ করো, কখনোই বিভ্রান্ত হবে না

কাল্ব গোত্রের একদল আরব নেতা আমুরিয়া দিয়ে যাচ্ছিল আমার নিকটে যে অর্থ ছিল তার বিনিময়ে আমি তাদের সাথে আরবে যাবার জন্য আবেদন করলাম তারা রাজি হলে আমি তাদের অর্থ পরিশোধ করলাম তারা পথিমধ্যে অদিউল কোরা নামক স্থানে (মদিনা ও সিরিয়ার মধ্যবর্তী স্থান) তাদের শর্তভঙ্গ করে আমাকে এক ইহুদির নিকট বিক্রয় করে দেয় আমি তার ভৃত্য হিসাবে কাজ করতে থাকি কিন্তু ঘটনাক্রমে তিনি আমাকে বনি কুরাইশ গোত্রের তার ভাতিজার নিকট আমাকে বিক্রয় করে এই ভাতিজা আমাকে সঙ্গে করে ইয়াসরিব নিয়ে যান যাকে খেজুর বাগানের শহর বলে এই স্থানের বিবরণ পূর্বেই আম্‌মুরিয়াহর খ্রিষ্টানদের কাছ হতে আমি জেনেছিলাম

এ সময় নবী মুহাম্মদ (সাঃ) মক্কাবাসীদের ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছিলেন কিন্তু আমি দাসত্বের কঠোর দায়িত্ব পালনের চাপে এসবের কিছুই শুনিনি যখন মক্কা হতে হিজরত করে নবী মদিনার পথে সে সময় আমি আমার মনিবের এক খেজুর বৃক্ষের চূড়ায় উঠে কাজ করছিলাম আমার মনিব গাছের নিচে বসে ছিলেন তার এক ভাইপো এসে বললো, আস এবং খাজরাজ গোত্রের মধ্যে যুদ্ধ লাগতে পারে তারা এখন কুবায় সমবেত হচ্ছে সেই ব্যক্তির মোকাবেলা করার জন্য যিনি নিজেকে নবী দাবি করে মক্কা থেকে চলে এসেছেন আমি খুব উত্তেজিত অনুভব করতে লাগলাম কথাগুলো শুনে এবং ভয়ে এমনভাবে কাঁপতে লাগলাম যে ভয় পাচ্ছিলাম বুঝি আমি গাছের উপর থেকে আমার মনিবের উপর পড়ে যাচ্ছি আমি দ্রুত গাছ থেকে নামলাম এবং আমার প্রভুর ভাইপোকে বললাম, তুমি পুনরায় খবরটি আমাকে শোনাও

আমার মনিব ক্ষুব্ধ হয়ে আমাকে ভয়ানক জোরে কষাঘাত করলেন এবং বললেন, তোমার এতে কি? তুমি তোমার কাজে ফিরে যাও - বলে চিৎকার করে ধমক দিলেন

সেই সন্ধ্যায় জমাকৃত খেজুর হতে আমি কিছু খেজুর নিয়ে নবীজির নিকট গেলাম এবং তাঁকে বললাম, আমি শুনেছি আপনি একজন পূণ্যবান মানুষ এবং আপনার সঙ্গী সাথীরা আগন্তুক এবং অভাবী আমার নিকট থেকে কিছু ছদকা দিতে চাই আমি এর জন্য অন্যদের চেয়ে আপনাকেই বেশি উপযুক্ত মনে করি নবীজি তার সঙ্গী-সাথীদের তা খাইতে হুকুম দিলেন কিন্তু তিনি নিজে তা ছুঁলেন না আবার আমি কিছু খেজুর সংগ্রহ করে নবীজির কুবা হতে মদিনা যাবার প্রাক্কালে উপস্থিত হয়ে বললাম, পূর্বে আমি কিছু খেজুর এনেছিলাম সদকা হিসাবে কিন্তু আপনি তা ছুঁয়ে দেখেননি এখন আপনার জন্য কিছু উপহার এনেছি গ্রহণ করলে বাধিত হবো নবীজি তা গ্রহণ করে নিজে এবং সঙ্গীদের নিয়ে খেলেন

নবীজির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সমূহের মধ্যে অন্যতম বৈশিষ্ট্য দৃঢ় সততায় মুগ্ধ হয়ে আমি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলাম'

অতঃপর নবীজি ইহুদিকে মোট অঙ্কের মূল্য দিয়ে এবং বেশ কিছু খেজুর জমা দিয়ে সালমানকে দাসত্ব মুক্ত করলেন ইসলাম গ্রহণের পর সালমানের নিকট তার পিতার পরিচয় জানতে চাইলে তিনি উত্তর দিতেন, আমি সালমান, আদম সন্তানদের হতে ইসলামের সন্তান

মুসলিম দেশ গঠনে সালমান এর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খন্দকের যুদ্ধে তিনি একজন দক্ষ সমর কৌশলী হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন তিনি মদিনার চারদিকে খাল খননের পরামর্শ দেন খন্দক যুদ্ধের পূর্বে  প্রস্তুতি হিসেবে এবং কুরাইশ সৈন্যদের ঠেকাতে যখন আবু সুফিয়ান (মক্কীদের নেতা) দেখলো সেই খাদ তিনি বললেন, এই ধরনের কৌশল আরবীয়গণ ইতোপূর্বে  চিন্তাও করেনি

সালমান 'ভালোর আঁধার' হিসেবে পরিচিত হন তিনি ছিলেন একজন জ্ঞানী ব্যক্তিত্ব তিনি সাধারণ এবং সাধনায় জীবন অতিবাহিত করেন তিনি এমন একটা আলখেল্লাহ পড়তেন যাতে শয়নের সময় অন্য কিছু লাগতো না তিনি ছাদের নিচের আশ্রয় খোঁজেননি বরং বৃক্ষের নিচে কিংবা প্রাচীরের পাশে থাকতেন এক ব্যক্তি একদা তাঁকে বসবাসের জন্য একটি বাড়ি বানিয়ে দিতে চাইলেন তিনি উত্তরে জানালেন তাঁর বাড়ির প্রয়োজন নেই লোকটি তাঁকে বলতে থাকলো তুমি যেমনটি চাও আমি তোমাকে সেই রকম ঘর দেবো যেখানে তুমি দাঁড়ালে মাথায় আঘাত পাবে এবং পা লম্বা করে শুলে প্রাচীরে পা বাধা পাবে

পরবর্তীতে সালমান পাঁচ হাজার দিরহামের বৃত্তিতে বাগদাদের নিকটবর্তী মাদায়েনের গভর্ণরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এই বৃত্তি তিনি সদকা হিসেবে দান করতেন তিনি নিজ হাতের উপার্জনে চলতেন যখন মাদায়েনে জনগণ তাঁর নিকট এসে তাঁকে খেজুর বাগানে কাজ করতে দেখে তারা বলেন - আপনি এখানকার নেতা (আমীর) আপনার জীবনধারণ অনুদান নিশ্চিত করা হয়েছে! আর আপনি এ কাজ করছেন!

তিনি উত্তরে বললেন, 'আমি নিজ হাতের উপার্জন পছন্দ করি সালমান চরমপন্থীর সাধক ছিলেন না প্রসঙ্গত একদা তিনি আবু দারদাকে দেখতে যান আবু দারদার সাথে নবীজি তাঁর ভ্রাতৃত্বের যোগসূত্র স্থাপন করেন আবু দারদার বেগম অত্যন্ত শোচনীয় অবস্থায় আছে শুনে তার খবর জানতে চাইলেন, তিনি উত্তরে জানালেন, 'এ জগতে তোমার ভাইয়ের কোনো অভাব নেই'

আবু দারদা এসে সালমানকে শুভেচ্ছা জানিয়ে খাবার দিলেন সালমান তাকেও সঙ্গে খেতে বললেন, আবু দারদা জানালেন তিনি রোজা আছেন সালমান বললেন, আমি প্রতিজ্ঞা করেছি তুমি না খেলে আমি খাবো না সে মতে সালমান তথায় রাত্রিযাপন করলেন সে রাত্রে আবু দারদা দাঁড়ালেন কিন্তু সালমান তাকে ধরে বললেন, ওগো আবু দারদা তোমার প্রভুর তোমার উপর অধিকার আছে, তোমার পরিবারের তোমার উপর অধিকার আছে, তোমার নিজ শরীরেরও তোমার প্রতি অধিকার আছে, সকলের পাওনা পরিশোধ করে দাও

ভোরে তারা একত্রে প্রার্থনা করলেন এবং নবীজির নিকট দেখা করতে গেলেন সালমান যা কিছু বলেছেন সেগুলোর প্রতি নবীজি সমর্থন জ্ঞাপন করলেন

প্রজ্ঞাবান হিসেবে সালমান তাঁর পর্যাপ্ত জ্ঞান এবং প্রজ্ঞা লিপিবদ্ধ করেন আলী তাঁকে বলেন যে, তিনি লোকমানের মতো বিজ্ঞ কাম্ব-আল-আহবার বলেন, সালমান জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় এমন পূর্ণ মহাসাগর যা কোনোদিন শুকাবে না সালমান খ্রিষ্ট ধর্ম, ইসলাম ধর্ম এবং যুরুসথ্র ধর্মের জ্ঞানে সমৃদ্ধ ছিলেন সালমান নবীজির জীবদ্দশায় কুরআনের অংশ বিশেষ ফার্সীতে অনুবাদ করেন তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি বৈদেশিক ভাষায় প্রথম কুরআন মজিদ অনুবাদ করেন সালমান প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান হবার কারণে তাঁর সময়ে পারস্য সরকারের সুবাদে একজন হোমরা-চোমরা ব্যক্তি হিসেবে বিকশিত হতে পারতেন কিন্তু তাঁর সত্যানুসন্ধানী অনুরাগ তাকে সীসার মতো শক্ত করে গড়েছে তিনি নবীজির কাছে আগমনের পূর্বে আরাম আয়েশের জীবন অতিক্রান্ত করেও পরে মর্যাদাহীন দাসত্ব জীবনের শিকার হয়েছেন নবীজির ওফাতের পরও তাঁকে বহু যন্ত্রণা দেয়া হয়েছে কিন্তু তিনি কারো কাছে মাথা নত করেননি এক সময় তাঁকে গৃহে  অন্তরীন করে রাখা হয় এবং অন্তরীন থাকা অবস্থায় গ্রহণযোগ্য হিসাব অনুযায়ী তিনি ৩৫ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন এ সময় খলিফা ওসমানের খিলাফত কাল ছিল

 

পাক-ভারত যুদ্ধ আসন্ন!

সংলাপ

 

ভারতের প্রধানমন্ত্রী পাকিস্তানের সঙ্গে শান্তি আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছেন; সে আলোচনা যতে সফল হয়, সে জন্য তিনি সৌদি আরবের রাজারও দ্বারস্থ হয়েছেন আমেরিকার ইঙ্গিতে পাকিস্তান জঙ্গি উৎপাদন করে, সৌদি আরব টাকা জোগায় সেই সঙ্গে জোগায় ইসলামের তত্ত্ব ওয়াহাবি ইসলাম সৌদি আরবের রাজধর্ম ওয়াহাবি ইসলামই ধর্মান্ধ উগ্রবাদীতার ভিত্তি

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ভারতের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে তোলাকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেন এই কাজে তার দক্ষতা ও আন্তরিকতা সর্বত্র স্বীকৃত তিনি চিন্তা করেন, ভারতীয় অর্থনীতিকে আরও মজবুত করতে হলে আগামী ছয়-সাত বছর শান্তি থাকা দরকার যুদ্ধ ও অশান্তি হলে অর্থনীতি বিপর্যস্ত হবে তাই, যে কোনও মূল্যে চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘর্ষ এড়াতে হবে

মনমোহন সিংয়ের এই যুক্তি অকাট্য ভারতের জাতীয় অর্থনীতি বিকাশের জন্য শান্তি বজায় রাখা একান্ত প্রয়োজন কিন্তু, ভারতের এই ক্রমোন্নতি কি পাকিস্তান পছন্দ করে? আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারত এখন যে মর্যাদা পাচ্ছে, এশিয়ার এক বিরাট শক্তি রূপে ভারতের যে অভ্যুদয় ঘটছে, তাতে চীন কি সন্তুষ্ট? পাকিস্তান ও চীন, ভারত উভয়ের চক্ষুশূল

এদিকে ভারতের সেনা প্রধান জেনারেল দীপক কাপুর বলেছেন, চীন ও পাকিস্তান উভয়ের সঙ্গে একই সময়ে যুদ্ধ করার জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে কথাটি তিনি বলেছিলেন এক রুদ্ধদ্বার হলঘরে অনুষ্ঠিত মিলিটারি সেমিনারে

পাকিস্তান জেনারেল কাপুরের ওই উক্তিকে ভারতের তরফে যুদ্ধ ঘোষণা বলে বর্ণনা করেছে পাকিস্তানের সেনা প্রধান জেনারেল আশফাক কায়ানি বলেছেন, ভারত যেন মনে রাখে, তাদের তুলনায় পাকিস্তানের ক্ষেপণাস্ত্র অনেক বেশি দূরগামী আমেরিকার হিসাব মতে, ভারতের মজুত ভাণ্ডারে পরমাণু বোমা আছে ৬০টি, পাকিস্তানের আছে ১০০টি তাই, পরমাণু যুদ্ধ হলে পাকিস্তানই প্রাধান্য লাভ করবে

ভারতের জেনারেল কাপুর বলেছেন, পারমাণবিক অস্ত্র যার যতই থাকুক, যুদ্ধ হতে পারে প্রথাগত উপায়ে, অর্থাৎ পরমাণু বোমা আদৌ ব্যবহার না করে জেনারেলের ওই বিবৃতিতে পাকিস্তান আরও শংকিত তাদের সংবাদপত্রগুলোতে নিশ্চিত ভঙ্গিতে বলা হচ্ছে, ভারত যুদ্ধ বাধাবেই তামাম পাকিস্তান জুড়ে যুদ্ধোন্মদনা সৃষ্টি করা হচ্ছে

পাকিস্তানের সেনা কর্তারা হয়তো এটাকে সুযোগ হিসাবে ব্যবহার করছেন আমেরিকা পাকিস্তানের উপর চাপ দিচ্ছে তালিবানের বিরুদ্ধে পুরোপুরি যুদ্ধে নামার জন্য তালিবানের ঘাঁটি পাকিস্তানের পশ্চিম অঞ্চলে ও আফগানিস্তানে পাকিস্তানের সৈন্য বাহিনী, বিশেষত আইএসআই তালিবানের স্রষ্টা ও পৃষ্ঠপোষক তাই, আমেরিকার নির্দেশে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যেতে পাক আর্মি রাজি নয় পাকি  জেনারেল কায়ানি আমেরিকাকে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ভারতই তাদের শত্রু, তালিবান নয় তাই, পাকিস্তানের পূর্ব সীমান্তে তাদের সৈন্য মোতায়েন রাখতে হচ্ছে, পশ্চিম সীমান্তে তালিবানের মোকাবিলা করতে সৈন্য পাঠানো তাদের পক্ষে সম্ভব নয়

আমেরিকা বরাবরই পাকিস্তানের যুক্তি ও আবদার মেনে এসেছে আমেরিকারই স্বার্থে আফগানিস্তানে যুদ্ধে নেমে তারা পাকিস্তানের উপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়েও পড়ছে তারা জেনারেল কায়ানির যুক্তি মেনে নিয়ে তাকে এই মর্মে আশ্বস্ত করছেন যে, ভারতের দিক থেকে যাতে বিপদ না ঘটে, তা তারা দেখবেন; তারা পাকিস্তানের সঙ্গে শান্তি চুক্তি করার জন্য ভারতের উপর চাপ দেবেন

আমেরিকা ভারতের উপর সেই চাপ দিচ্ছে প্রেসিডেন্ট ওবামা ঘোষণা করেছেন, ২০১১ সালের জুলাইয়ের মধ্যে তিনি আফগান যুদ্ধ শেষ করে মার্কিন সৈন্যদের ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন

আফগানিস্তানের যুদ্ধে আমেরিকান সৈন্যদের পাশাপাশি ন্যাটোভুক্ত ইউরোপীয় দেশগুলির সৈন্যরাও লড়ছে তারাও নিহত ও আহত হচ্ছে তাই, ইউরোপের ওই দেশগুলিও তাদের সৈন্যদের ঘরে ফিরিয়ে আনার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউনের উদ্যোগে কিছু দিন আগে লন্ডনে ৭০টি দেশের এক সম্মেলন বসেছিল আফগানিস্তান সম্পর্কে নীতি নির্ধারণই ছিল ওই সম্মেলনের উদ্দেশ্য আফগানিস্তান থেকে বিদেশি সৈন্যদের কত দ্রুত ফিরিয়ে নেয়া যায় তার উপরই সম্মেলনে জোর দেয়া হয়েছিল ওই সম্মেলনে আমন্ত্রিত হয়ে ভারতের বিদেশ মন্ত্রী এস এম কৃষ্ণ গিয়েছিলেন কিন্তু কোন কথা বলতে পারেননি

আফগানিস্তান থেকে যাতে তাড়াতাড়ি সরে পড়া যায়, সে জন্য দু'টি উপায় আমেরিকা অবলম্বন করেছে এক, তালিবানের উপর প্রচণ্ড আঘাত দিয়ে তাকে কাবু করে ফেলা দুই, ওইভাবে চাপ সৃষ্টি করে সন্ধি চুক্তি করতে বাধ্য করা

আফগানিস্তানে যুদ্ধকে তুঙ্গে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রেসিডেন্ট ওবামা অতিরিক্ত ৩০ হাজার সৈন্য পাঠিয়েছেন আফগানিস্তানে যুদ্ধরত আমেরিকান সৈন্যের সংখ্যা এক লক্ষ ছাড়িয়েছে তাদের সঙ্গে আছে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলির সৈন্য এই সম্মিলিত বাহিনী হেলমন্দ প্রদেশে তালিবানের ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দিয়েছে

পাকিস্তানকেও তালিবানে বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামার জন্য আমেরিকা চাপ দিচ্ছে পাকিস্তান তাতে রাজি নয় এই নিয়ে আমেরিকা-পাকিস্তান সম্পর্ক তিক্ত হচ্ছিল আমেরিকা সাহায্য বন্ধ করার হুমকিও দিয়েছিল এই চাপ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য জেনারেল কায়ানি আমেরিকাকে বুঝিয়েছেন, ভারতই তাদের প্রধান শত্রু, তাই পূর্ব সীমান্ত ফাঁকা করে দিয়ে পশ্চিম সীমান্তে তারা সৈন্য পাঠাবেন না তবে, তালিবানের উপর তাদের প্রভাব থাকায়, তারা আলোচনার টেবিলে তালিবানকে নিয়ে আসবেন ও সন্ধি চুক্তিতে সই করতে তাদের বাধ্য করবেন

আমেরিকা ভারতকে পাকিস্তানের সঙ্গে শান্তি চুক্তি করার উপর জোর দিচ্ছে একই সঙ্গে তারা তালিবানের সাথে সন্ধি করতে উদ্যোগী হয়েছে মোল্লা ওমর সহ তালিবানের প্রধান নেতারা, যথাঃ জালালুদ্দিন এবং সিরাজ পাকিস্তানেই বাস করেন সেখানে নিরাপদে বাস করে তারা আফগানিস্তানে যুদ্ধ পরিচালনা করেন বেলুচিস্তানের রাজধানী কোয়েটা শহরে ও তার আশেপাশের অঞ্চলে মোল্লা ওমর তার প্রধান কমরেডদের নিয়ে বাস করেন বলে তাদের 'কোয়েটা শুরা' বা কোয়েটা সংসদ নামে অভিহিত করা হয় আমেরিকা ড্রোন বিমানের সাহায্যে ওই এলাকায় বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে বলে পাকি আর্মি ওই নেতাদের সরিয়ে এনে করাচিতে স্থান দিয়েছিল এখন আমেরিকার মনোরঞ্জন করার জন্য করাচিতে আশ্রয় নেয় তালিবানি নেতাদের তারা গ্রেপ্তার করছে

তালিবান সংগঠনে মোল্লা ওমরের পরেই যার স্থান, সেই মোল্লা আব্দুল গনি বরাদরকে করাচি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে আরও গ্রেপ্তার করা হয়েছে তালিবান কমান্ডার মোল্লা আবদুল সালাম, কুন্দুজের প্রাক্তন তালিবানি গভর্নর মোল্লা মহম্মদ সহ কয়েক জন নেতাকে এই সব গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্যে হল, ওই নেতারা যাতে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে আমেরিকা ও তালিবানের মধ্যে সন্ধি ঘটাতে পারেন এখন মোল্লা ওমরের জামাইকে করাচি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এই নেতারা সবাই পাক আর্মির আশ্রয়ে বাস করছিলেন এরাই হবেন আমেরিকা-তালিবান সন্ধি সাধনের অগ্রদূত

পাকিস্তান এভাবে সাহায্য করছে দেখে আমেরিকা খুশি প্রেসিডেন্ট ওবামা পাকিস্তানকে নতুন করে ১২টি ড্রোন বিমান, ১৮টি সর্বাধুনিক এফ-১৬ বিমান, এক হাজার স্মার্ট বোমা তৈরির উপকরণ, লেসার চালিত বোমা কিট দেবার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি পাকিস্তানকে আর্থিক সাহায্য দান বর্তমান বছরের ৭০০ মিলিয়ন ডলার থেকে আগামী বছর বাড়িয়ে ১.২ বিলিয়ন ডলার করবেন

এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং পাকিস্তানের সঙ্গে শান্তি চুক্তি করতে চাচ্ছেন প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসাবে দুই দেশের বিদেশ সচিবদের মধ্যে বৈঠক আয়োজন করা হয়েছে ওই বৈঠকের কথা ঘোষণা হওয়া মাত্র লাহোরে বিশাল ভারত বিরোধী সমাবেশ করে হুংকার ছাড়া হয়েছে একই দিনে মুজাফ্‌ফরাবাদে পাক জঙ্গি সংগঠনগুলো ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার দাবিতে বিশাল জমায়েত করেছে ওই জমায়েতের আহ্বায়ক ছিল জামাত-উল-দাওয়া ওই জমায়াতে বক্তৃতা করেছিলেন আবদুল রামান মাক্কি, হিজবুল মুজাহিদিনের কমাণ্ডার সৈয়দ সালাহউদ্দিন এবং আই এস আইয়ের প্রাক্তন প্রধান হামিদ গুল

অপরদিকে ঘটেছে, পুনেতে ভয়ংকর বিস্ফোরণ যার পিছনে লস্কর-ই-তোইবা সমর্থিত ইন্ডিয়ান মুজাহিদিন ছিল বলে মনে করা হচ্ছে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি দিল্লিতে দুই দেশের বিদেশ সচিবদের বৈঠক হয়েছে বৈঠকের আগে ও পরে পাকিস্তান দাবি করেছে, কাশ্মীর, সিয়াচেন ও স্যারক্রিকের সমস্যা আগে মেটাতে হবে কাবুলে ভারতীয় কর্মীদের খুন করে লস্কর-ই-তোইবা এবং আইএসআই বুঝিয়ে দিয়েছে, শান্তি নয়, ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধই চলবে লস্কর-ই-তোইবার প্রধান হাফিজ সায়ীদ নতুন করে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ডাক দিয়েছেন পাকিস্তানের প্রাক্তন বিদেশমন্ত্রী মাহমুদ কাসুরি বলেছেন, পাক-ভারত যুদ্ধ অনিবার্য গুজব ছড়ানো হচ্ছে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের শান্তির উদ্যোগকে দুর্বলের আত্মসমর্পণ বলে তাহলে পাক-ভারত যুদ্ধ কি আসন্ন!

    

সূফী সাধক আনোয়ারুল হক্‌ এঁর বাণী তাৎপর্য অন্বেষণে -

 

'' কৃতিত্ব সেখানে যেখানে মুখের ভাষাকে আয়ত্বে রাখা যায়''

 

 

ড. এমদাদুল হক কাজল  

 

আমরা যেন ভাষার উপরেই আছি ভাষা আমাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ আমরা চোখ থেকেও বেশি গুরুত্ব দেই কানকে তাই একজন মানুষকে দেখে আমরা কিছুই বুঝি না ঘন্টার পর ঘন্টা দু'জন মানুষ পাশাপাশি বসে থাকলেও একজনের সাথে আরেকজনের পরিচয় হয় না যতক্ষণ পর্যন্ত না ভাষার বিনিময় হয় একজনের কথা আরেকজন যত বেশি শুনি আমরা মনে করি তত বেশি পরস্পর পরস্পরকে চিনতে পেরেছি অর্থাৎ, আমরা একজন মানুষকে দেখে তাকে চিনতে পারি না কিন্তু শুনে তাকে চিনতে পারি অর্থাৎ, আমরা শুনাকে দেখার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেই আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে আমরা কানকে চোখের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেই শুধু মানুষকে চেনার বেলায় মানুষ ছাড়া অন্য কোন বস্তু বা প্রাণী যারা কথা বলতে পারে না তাদেরকে চেনার বেলায় কিন্তু আমরা শুনার চেয়ে বেশি মূল্য দেই দেখাকে একটা গাভীকে দেখে আমরা বলতে পারি এটা কোন্‌ জাতের গাভী কিন্তু একজন মানুষকে দেখে তার জাত চিনতে পারি না কেন? গাভী তার কি জাত তা আমাদের বলে না কিন্তু আমরা দেখে তার জাত চিনে ফেলি আর মানুষ অবিরাম তার জাতের পরিচয় দিতে থাকে কিন্তু তবু মানুষ চিনতে আমরা বার বার ভুল করি কেন? কারণ ভাষা কারণ, ভাষা দিয়ে মানুষ আসলে নিজেকে প্রকাশ করে না ভাষা দিয়ে মানুষ নিজেকে আড়াল করে মানুষ তার ভেতরের জন্তুটাকে সুন্দর সুন্দর শব্দের কাপড় পড়িয়ে ঢেকে রাখতে চায় সব কদর্যতাকে চাপা দেয়ার জন্য মানুষ আবিষ্কার করেছে শ্রুতিমধুর শব্দ মালা যার মধ্যে কোন কদর্যতা নেই সে কোন ভাষা ছাড়াই নিজেকে সম্পূর্ণ প্রকাশ করতে পারে ধরা যাক একটা শিশুর কথা, একটা শিশুর ভাষা হচ্ছে হাসি এবং কান্না একটা শিশু যত স্পষ্টভাবে তার হাসি এবং কান্না দিয়ে তার ভালবাসা, ভাললাগা, খারাপলাগা, ক্ষুধা, যন্ত্রণা, আনন্দ, উচ্ছ্বাস, ভয় ইত্যাদিকে প্রকাশ করতে পারে আমরা যারা বিভিন্ন ভাষার অসংখ্য শব্দ জানি আমরা কি একটা শিশুর মতো এত স্পষ্টভাবে নিজেকে ব্যক্ত করতে পারি? একটা শিশু শব্দ দিয়ে বলে না - 'আমি তোমাকে ভালবাসি' কিন্তু তার হাসি এবং চাহনি দিয়ে প্রকাশ করতে পারে তার অন্তরের সবটুকু ভালবাসা কিন্তু আমরা তা পারি না কেন? কেন আমাদের বারবার বলতে হয় -'আমি তোমাকে ভালবাসি'?  কারণ আমরা 'আমি তোমাকে ভালবাসি' এ কথা বলে এটা আড়াল করতে চাই যে - 'আমি আসলে তোমায় ভালবাসি না, আমার ভালবাসা প্রত্যাশাহীন নয়, আমি ভালোবাসা এই সুন্দর শব্দটি দিয়ে আসলে তোমাকে আমার প্রয়োজনে ব্যবহার চাই'

দু'জন মানুষ সারাজীবন পাশাপাশি বসে বাক্য বিনিময় করতে পারবে, যুক্তি-তর্ক করতে পারবে কিন্তু কখনোই একজন অন্যজনকে বুঝতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা নীরব থেকে একজন অন্য জনের সাথে সংযোগ স্থাপন করছে কারণ, ভাষা আসলে মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম নয়, মনের প্রকৃত ভাবটাকে আড়াল করার একটা মাধ্যম এই যে আমি এখন লিখছি, কেন লিখছি? আমার এই লেখার উদ্দেশ্য কি? কেন আমি শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে কথার মালার মালা তৈরি করছি? তা কি আমার মনের ভাবকে প্রকাশ করার জন্য? মোটেই না আমি লিখছি - আপনার কাছে এটা প্রমাণ করার জন্য যে আমি জানি, আমি জ্ঞানী কিন্তু আসলে আমি জ্ঞানী নই, আমার কোন জ্ঞান নেই আমার অন্তরের এই অজ্ঞানতাকে আড়াল করার জন্যই আমি লিখছি আমি আনোয়ারুল হকের বাণীর তাৎপর্য লিখছি, আনোয়ারুল হক্‌ কি লেখাপড়া জানতেন না? জানতেন, তাহলে তিনি লেখেন নি কেন? তিনি লেখেন নি কারণ তিনি আসলেই জ্ঞানী, তাই অজ্ঞানতাকে আড়াল করার জন্য লেখালেখির কোন প্রয়োজন তাঁর ছিল না এ জগতে তারাই বেশি লিখছে যারা কম জানে যারা জানে তারা লেখে না, যারা লেখে তারা জানে না সক্রেটিস জানতেন তাই তিনি লেখেননি, যীশু জানতেন তাই তিনি লেখেননি, মোহাম্মদ জানতেন তাই তিনি লেখেননি, রামকৃষ্ণ জানতেন তাই তিনি লেখেননি আবু আলী আক্তারউদ্দিন কি পাড়তেন না একটা বই লিখে তার দর্শনকে ভক্তদের কাছে তুলে ধরতে? পারতেন তবে তিনি তা করেন নি কেন? তিনি তা করেন নি কারণ প্রকৃতই তিনি জ্ঞানী ছিলেন অজ্ঞানতাকে আড়াল করার জন্য ভাষাকে ব্যবহার করবার কোন প্রয়োজন তাঁর ছিল না শোনা যায় তিনি শেষ জীবনে এসে কথাই বলতেন না, একদম চুপ হয়ে গিয়েছিলেন তাই আনোয়ারুল হক্‌ বলেছেন - কৃতিত্ব সেখানে যেখানে মুখের ভাষাকে আয়ত্বে রাখা যায় অর্থাৎ প্রকৃত অর্থে কৃতিত্ব তারই - যে তার মুখের ভাষাকে আয়ত্বে আনতে পেরেছে; কৃতিত্ব তারই - যার আড়াল করার মতো কিছু নেই; কৃতিত্ব তারই - যে মিথ্যাকে ঢাকার জন্য নয়, সত্যকে প্রকাশ করার জন্য ভাষার ব্যবহার করে

সূফী সাধক আনোয়ারুল হক্‌ বলতেন - শরীয়ত ও ত্বরীকত একত্রে মিশিয়ে ডুব দিলে আল্লাহ্‌র প্রেমে নিমগ্ন থাকা যায় আমরা শরীয়ত ও ত্বরিকত একত্রে মিশিয়ে আনোয়ারুল হকের উক্ত বাণীটিতে ডুব দিতে চাই শরীয়তেও ভাষাকে আয়ত্বে রাখার জন্যে অনেক নির্দেশ এসেছে কুরআন বারবার ভাষাকে নিয়ন্ত্রণের তাগিদ দিয়েছে ইসলাম শান্তির ধর্ম কিন্তু ভাষা দিয়ে মানুষ প্রতিদিন কত অসংখ্যভাবেই যে অমঙ্গল ও অশান্তি সৃষ্টি করতে পারে তার কোন ইয়ত্তা নেই অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অশান্তি মানুষের ভাষা থেকেই সৃষ্টি হয় কথা দিয়ে মানুষ এত রকমের অশান্তি সৃষ্টি করতে পারে যে সবগুলোর উল্লেখ করা অসম্ভব আমি এখানে মূল বিষয়গুলো তুলে ধরার চেষ্টা করবো

১. অনাবশ্যক বাক্যব্যয় : আমরা যত কথাই বলি না কেন তা মূলত দুই প্রকারের হতে পারে আবশ্যক এবং অনাবশ্যক অনাবশ্যক কথা পরিহার করাই ইসলামের নির্দেশ কারণ, যে ব্যক্তি অধিক কথা বলে তার দোষ ত্রুটিও অধিক হয় যার দোষ-ত্রুটি অধিক হয় তার পাপও অধিক হয় যার পাপ অধিক হয় তার জন্য জাহান্নাম নির্ধারিত হয় হযরত হাসান বসরী বলেন, যে ব্যক্তি তার মুখের ভাষাকে আয়ত্বে রাখে না সে তার ধর্মকে পালন করে না

অনর্থক কথা বলা বাকশক্তির অপচয় অপব্যয়কারী শয়তানের ভাই সুতরাং যে বাকশক্তির অপচয় করে সে শয়তানের ভাই

কারো সাথে দেখা হলেই আমরা জিজ্ঞেস করি কেমন আছেন? প্রশ্নটি অত্যন্ত জটিল এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর অনেকেই জানে না এ প্রশ্ন করা অনাবশ্যক, কারণ প্রশ্নকারী যাকে প্রশ্ন করছে সত্যিই সে কেমন আছে তা জানতে চায় না'কেমন আছেন?' এ প্রশ্নর উত্তরে - 'ভাল আছি, খারাপ আছি, আছি একরকম', যাই বলা হোক না কেন মিথ্যা বলা হতে পারে একইভাবে কারো সাথে দেখা হলেই আমরা সালাম দেই - এটাও অনাবশ্যক কারণ, ১. শরীয়তে দেখা হলেই কাউকে সালাম দিতে হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই কিন্তু যাকে সালাম দেয়া হলো এরচেয়ে উত্তম সালাম দেয়া অথবা অনুরূপ সালাম দেয়া তার জন্য বাধ্যতামূলক হয় (সূরা নিসা : ৮৬) যাকে আমি সালাম দিলাম সে যদি আমাকে উত্তম সালাম অথবা অনুরূপ সালাম না দেয় তবে সে অপরাধী হয়ে যাবে সুতরাং আমার সালাম একজনকে অপরাধী (পাপী) বানিয়ে দিতে পারে তাই দেখা হলেই কাউকে সালাম দেয়া অনাবশ্যক ২. সালামের মাধ্যমে আমরা পরস্পরের শান্তি কামনা করি সালাম দিয়ে আমরা যার উপর শান্তি বর্ষিত হবার জন্য দো'আ করলাম এবং যে আমার উপর শান্তি বর্ষিত হবার জন্য দো'আ করলো আমরা পরস্পর যদি কোনদিন কোন কারণে একজন আরেকজনের অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াই তবে কি তা মিথ্যাচার হয়ে যাবে না?

একইভাবে 'কোথায় যাচ্ছেন?''কোত্থেকে এসেছেন?' ইত্যাদি অনেক রকমের অনাবশ্যক প্রশ্ন করে আমরা উত্তরদাতাকে বিব্রত করি বা মিথ্যা বলতে প্ররোচিত করি যার দায়-দায়িত্ব প্রশ্নকারীর উপরেই বর্তায় তাই অনাবশ্যক প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকাই উত্তম যে প্রশ্নের উত্তর আমরা আসলে জানতে চাই না বা যেসব প্রশ্নের উত্তর জানলেও আমাদের কোন উপকারে আসবে না সেসব প্রশ্ন কাউকে না করাই সঙ্গত

মানুষ প্রায়সই যেসব বিষয়ে অনাবশ্যক আলোচনা করে সেসব বিষয়কে মূলত তিনভাগে ভাগ করা  যায় যথা :

ক. রাজনৈতিক আলোচনা : পরনিন্দা, গুজব এবং মিথ্যাচার ইত্যাদিই রাজনৈতিক আলোচনার মূল বিষয়বস্তু যারা রাজনৈতিক আলোচনায় সময় নষ্ট করে তারা যেন সবজান্তা রাজনৈতিক আলোচনায় বক্তারা এত নিশ্চিতভাবে ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলে যেন প্রত্যেকেই ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা অথচ ভবিষ্যতে কি হবে নিশ্চিত করে তা বলার অধিকার কারোরই নেই

খ. ধর্মীয় আলোচনা : অনাবশ্যক আলোচনার আরেকটা মূল বিষয় হচ্ছে ধর্ম আমরা এ ভাবে ধর্ম নিয়ে আলোচনা করি যেন আমাদের অজানা কিছুই নেই আমরা নিশ্চিত ভাবে আল্লাহ-কে নিয়ে কথা বলি অথচ আমরা কি জানি আল্লাহ্‌ কি? আমরা কি কেউ আল্লাহ্‌কে নিজের মধ্যে অনুভব করেছি? আমার জন্য সত্যিই কি আমার আল্লাহ্‌ই যথেষ্ট? আমি কি আমাকে সমর্পণ করেছি আমার আল্লাহ্‌র কাছে? আমি কি অনুভব করেছি আল্লাহ্‌র স্বাদ? তাহলে এ নিয়ে এত কথা আমরা বলি কেন? আমরা অনর্গল কথা বলে যাই ধর্ম নিয়ে অথচ কী জানি আমরা ধর্ম সম্পর্কে? পানির ধর্ম সিক্ততা, আগুনের ধর্ম উত্তাপ, আমার ধর্ম কি? আমি কি আমার ধর্মকে আজো আবিষ্কার করতে পেরেছি? তাহলে ধর্ম নিয়ে এত কথা আমরা বলি কেন?

ইসলামের (শান্তির) বিধান হচ্ছে ধর্ম নিয়ে তর্ক বিতর্ক না করা কারণ তর্ক-বিতর্কের মাধ্যমে অশান্তির সৃষ্টি হয় ধর্ম সম্পর্কে আলোচনায় যুক্তির চেয়ে আমলের প্রাধান্য বেশি কে কতটা যুক্তি দিয়ে কথা বলল তা বিচার্য বিষয় নয় যে যা বলছে সে তা পালন করছে কি-না তাই বিচার্য বিষয়

গ. যৌন আলোচনা : যৌন আলোচনা এমন একটা বিষয় যা সব সময় প্রকাশ্যে না হলেও মনে মনে এ আলোচনা চলতে থাকে অথচ এসব আলোচনা অনাবশ্যক আমরা ক্ষুধা লাগলে ভাত খাই কিন্তু ভাত নিয়ে কেউ আলোচনা করি না অথচ যৌনতা নিয়ে আলোচনা করি কেন? কারোর যৌন ক্ষুধা থাকলে সে ক্ষুধার নিবৃত্তিই উত্তম এ সম্পর্কে আলোচনা অনাব্যশক এবং গর্হিতও বটে

২. বাচালতা :  অকারণে বেশি কথা বলাই বাচালতা সেই- বেশি কথা বলে যে চিন্তা করে কম আমরা কম বেশি সবাই বাচাল কারণ আমাদের কথা বলার কোন কারণ নেই কখনো কি কথা বলার আগে আমরা নিজেরা নিজেদের প্রশ্ন করি কোন্‌ কারণে আমরা কথা বলছি? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোন কারণ ছাড়াই আমরা অনর্গল কথা বলে যাই মানুষের প্রতিটি কথা লিপিবদ্ধ করে রাখার জন্য না-কি দুজন ফেরেশ্‌তা নিয়োজিত আছেন এবং একদিন প্রতিটি কথিত কথার জন্য আমাদের হিসেব দিতে হবে প্রতিদিন এত কথা যে বলছি তার হিসেব কিভাবে আমরা দেবো তা-কি একবারও ভেবে দেখেছি?

'দু'জন ফেরেশতা আমাদের কথার হিসেব লিখছেন' - এটা আসলে রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে দু'জন ফেরেস্তা হচ্ছেন মস্তিষ্কের দু'টি বলয় - বাম বলয় এবং ডান বলয় আমরা যা কিছুই বলছি আমাদের মস্তিষ্কের এই দু'টি বলয়ের সাথে সাথে তা লিপিবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং প্রতিটি উচ্চারিত কথার জন্য আমরা অবিরাম হিসেব দিয়ে চলেছি নিজেরই কাছে আমরা অনুতপ্ত হই যে কথা বলে ফেলেছি সে কথার জন্য যদি আমরা একটা দিনের কথিত কথাগুলোর দিকে সতর্ক হই তাহলেই দেখতে পাব কত কথাই না বলে ফেলেছি যা না বলাই ভাল ছিল আমাদের কথা দিয়ে কত ভাবেই না পরিবেশ ও নিজেকে অশান্ত করে তুলেছি যেহেতু কথিত কথার জন্যই আমাদেরকে অনুতপ্ত হতে হয় সেহেতু কথা বলার সময় হিসেব করে কথা বলাই উত্তম

যারা বেশি কথা বলে তাদের নিজেকে প্রকাশ করার ক্ষমতা যারা কম কথা বলে তাদের চেয়ে অনেক কম একজন বাচাল অনেক কথা বলেও একটা ধারণাকে স্পষ্ট করতে পারে না, অপর দিকে যবানের উপর যার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আছে সে এক লাইনেই একটা ধারণাকে প্রকাশ করতে পারে একটা ধারণা প্রকাশ করতে যত বেশি শব্দের ব্যবহার করা হয় শব্দের শক্তিও তত কমতে থাকে তাই আনোয়ারুল হক্‌ বলেন, - “কৃতিত্ব সেখানে, যেখানে মুখের ভাষাকে আয়ত্বে রাখা যায়

মুহাম্মদ সা. বলেন - যে ব্যক্তি অতিরিক্ত কথা নিজের জন্য সঞ্চয় করে রাখে আর অতিরিক্ত ধন পরের জন্য বিলিয়ে দেয় সে-ই সার্থক এটা খুবই লজ্জার কথা যে আমরা অতিরিক্ত ধন নিজের জন্য সঞ্চয় করে রাখি আর অতিরিক্ত কথা পরের জন্য বিলিয়ে দেই আমরা যেন সেই মূর্খের মতোই কাজ করছি যে ঝিনুকের খোলসগুলো যত্ন করে রাখে আর মুক্তাগুলো ছুঁড়ে ফেলে দেয়

একহাজার কথার মধ্যে শুধুমাত্র একটা কথাই সত্যকে ব্যক্ত করার জন্য যথেষ্ট বাকি কথাগুলো জিহ্বাকে উত্যক্ত করে, কানকে বিরক্ত করে আর হৃদয়কে আরক্ত করে তাই আমরা ইসলামে (শান্তিতে) থাকতে পারি না। (চলবে)        

 

শান্তির অন্বেষায় সূফীতত্ত্ব (১১)

 

(পূর্ব প্রকাশের পর)

সূফীরা সব সময় নিজেদেরকে স্রষ্টার দাস ব্যক্তি রূপে বলে থাকেন কুরআনেও অনেক জায়গায় আল্লাহ্‌র মনোনীত ব্যক্তিদের কথা বলা হয়েছে মুসলিম সাধকদেরকে এক বচনে ওলী এবং বহুবচনে আউলিয়া বলা হয়ে থাকে যার মূল অর্থ হচ্ছে নৈকট্য বা নিকটতম যেমন নিকট আত্মীয়, অভিভাবক, রক্ষাকর্তা, বন্ধু কুরআনে সাধকদের এই অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে স্রষ্টা হচ্ছেন বিশ্বাসীদের রক্ষা কর্তা ও মানুষের রক্ষাকর্তা'আল্লাহ্‌ তাদেরকে রক্ষা করুন - সূফীরা এই বাক্যকে সকল ব্যক্তির জন্য ব্যবহার করে থাকেন সূফীদের পবিত্রতা তাদেরকে স্রষ্টার নিকটবর্তী করেছে এবং তাঁর নিকট হতে বিশেষ অনুগ্রহ বা অলৌকিক ক্ষমতা, পেয়েছেন তাঁর বন্ধুরা ভীত হবে না বা কষ্ট পাবে না (কুরআন ১০:৬৩) তাঁদের বিরুদ্ধে শত্রুতা করার অর্থ আল্লাহ্‌র সাথে শত্রুতা করা

অনুপ্রেরণার দিক দিয়ে মুসলিম সাধক ও নবীদের মধ্যে সবাই একরৈখিক কোন পার্থক্য নেই বললে চলে স্রষ্টার সাথে তাদের নিবিড় সম্পর্কের কারণে মুসলমানদের মতে কিছু সাধক সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত হন স্রষ্টা সম্বন্ধে গভীর জ্ঞান বা ভালো কাজ করা বা কঠোর তপস্যা বা নৈতিক উন্নতি একজনকে মুসলিম সাধকে পরিণত করতে সাহায্য করে কোনো ব্যক্তির এই গুণ সমূহ থাকতে বা না থাকতে পারে কিন্তু সূফী হতে যে গুণ তার থাকার দরকার তা হলো নিজকে ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ রূপে ভুলে যাওয়া এবং ভুলে যাওয়ার আনন্দে বর্তমান আনন্দলোকে থাকা যিনি এই আনন্দে উল্লাসে ডুবে থাকেন তাঁকে ওলী বলে এবং যখন তারা অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী হন তখন তাঁরা জীবিত বা মৃত উভয় অবস্থাতেই সম্মান বা শ্রদ্ধা পেয়ে থাকেন সাধকদের মধ্যে অনেক সাধক নিজেদেরকে গুপ্ত অবস্থায় রাখেন তাঁরা একে অন্যকে জানেন না বা তাদের কাজ সম্পর্কে অবহিত নন তারা সর্বক্ষেত্রে নিজদেরকে মনুষ্য সমাজ হতে লুকায়িত এবং বিচ্ছিন্ন রেখে থাকেন'

সাধকগণ অদৃশ্য প্রশাসনিক কাঠামো গঠন করে থাকেন এই প্রশাসনিক কাঠামোর উপর সারা বিশ্বের প্রশাসনিক ব্যবস্থা ন্যস্ত আছে প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদে যিনি আসীন তাকে কুতুব বলা হয় কুতুব হচ্ছেন তার যুগের প্রখ্যাত সাধক তিনি এই প্রশাসনিক সংসদের সকল নিয়মিত বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন এই সভায় যোগ দেওয়ার ব্যাপারে এর সদস্যদের জন্য স্থান ও কাল কোনো বাধা হয় না তারা চোখের পলকে যে কোনো জায়গা হতে এসে সমবেত হতে পারেন এই আসা যাওয়ার মাঝে সমুদ্র, পাহাড়, মরুভূমি ইত্যাদি প্রতিবন্ধকতা তারা এমনভাবে অতিক্রম করেন যে মনে হবে একজন সাধারণ মানুষ রাস্তা অতিক্রম করছে কুতুবের নীচে পদ মর্যাদা অনুযায়ী অন্যান্য সাধকদেরকে পদায়ন করা হয় সাধক হুজুউরী বলেন, প্রশাসনিক পদমর্যাদা অনুযায়ী নিম্নোক্তভাবে সাধকদেরকে পদায়ন করেছেন :- ৩০০ জন আখইয়ার (ভাল), ৪০ জন আবদাল (বিকল্প), ৭ জন আবরাব (ধার্মিক), ৪ জন আওতাদ (সাহায্যকারী), ৩ জন নুকাবা (তত্ত্বাবধায়ক) সর্বমোট ৩৫৪ জন এরা একে অন্যকে জানেন এবং পারষ্পরিক সম্মতি ছাড়া কোনো কাজ করেন না

আওতাদদের কাজ হচ্ছে প্রতি রাতে সমগ্র পৃথিবী ভ্রমণ করা এবং কোথাও কোনো অসংগতি বা ব্যতিক্রম দেখলে তা কুতুবকে অবহিত করা যাতে করে তিনি সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে পারেন

আমরা এতক্ষণ মুসলমানদের আধ্যাত্মিক জীবন সম্পর্কে কিছু জানলাম এখন আমরা সূফী সাধকদের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা এবং এর ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশ নিয়ে আলোচনা করবো প্রশিক্ষণের প্রারম্ভে প্রথমে একজন ওলী তার বন্ধুদেরকে নিয়ে বিশেষ স্থানে বসে আলাপ করেন এই সময়ে তিনি এলাকা ভিত্তিক আধ্যাত্মিক পথ প্রদর্শক রূপে কাজ করেন নিজদের সমগোত্রীয় সদ্যসদের, যারা দরবেশ নামে অভিহিত, সাথে সাথে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সাধারণ মানুষের সাথে যুক্ত হয়ে থাকেন এতে করে তাঁদের প্রভাব সমাজের সকল মানুষের মধ্যে অনুপ্রবেশ করতে পারে না তাঁরা সকলে স্বতন্ত্র ভাবে আত্মিক উন্নতিতে নিয়োজিত থাকেন তাঁদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দিতা হয়, কিন্তু একের মত অন্যের উপর চাপায় না প্রত্যেকেই তাঁর বিশ্বাস এবং পদ্ধতি অনুযায়ী কাজ করে থাকেন ফলে বিভিন্ন মতবাদ ও রীতিনীতি, রূপ ও পদ্ধতির জন্ম নিলেও স্বাধীনতা খর্ব হয় না এই জন্য মুসলমানদের মধ্যে বিচিত্র রীতিনীতি ও স্বভাবের সাধক দেখা যায়

সাধকদের তাঁদের সাধনা সম্পর্কে সচেতন হওয়া প্রয়োজন কুশায়রী ও হুজউরীর এই সম্পর্কে হ্যাঁ সূচক উত্তর দিয়েছেন তবে এঁদের বিরুদ্ধবাদীরা যুক্তি দেখান যে সাধকদের স্বচেতনার অর্থ তাঁদের মুক্তি বা উদ্ধার পাওয়া যা কোনো ভাবেই সম্ভব নয় কারণ কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারেন না যে শেষ বিচারের দিন তিনি রক্ষা প্রাপ্তদের মধ্যে থাকবেন অবশ্য এর প্রতি উত্তরে বলা হয় যে, স্রষ্টা তার ঐশী গুণে তাঁদের রক্ষার ব্যাপারে নিশ্চিত করবেন এই সময়ে তাঁর ঐশী ক্ষমতা বজায় রেখে তাঁকে সকল প্রকার অবাধ্যতা থেকেও রক্ষা করবেন সাধকরা নিষকলঙ্ক নন কিন্তু ঐশী অনুগ্রহ তাকে সকল অপবিত্রতা হতে রক্ষা করে থাকে সাধারণ মত এই যে, সাধনা প্রেমভক্তি সমর্পণ ও বিশ্বাসের উপর নির্ভরশীল, তার ব্যবহারের উপর নয় ধর্মে অবিশ্বাস ছাড়া অন্য কোনো পাপ তাঁকে সাধনা হতে বিরত করতে পারে না অবশ্য এই ভঙ্গুর স্ববিরোধীতাকে ধর্মীয় নীতি কঠোরভাবে পালনের মাধ্যমে দূর  হয়

বায়জীদ বোস্তামীর নিজের উদ্ধৃতিকে অনেকে অনেকভাবে ব্যবহার করেছেন :-

'আমাকে বলা হয় যে অমুক শহরে একজন সাধক বাস করেন আমি তাঁর সাথে সাক্ষাতের জন্য যাত্রা করি আমি মসজিদে প্রবেশ করলে তিনি তার কক্ষ হতে বের হয়ে মেঝেতে থুথু ফেলেন আমি তাঁকে সম্মান না দেখিয়ে ফেরৎ আসলাম এবং নিজে নিজে চিন্তা করলাম যে, একজন সাধকের ধর্মীয় অনুশাসন মানা উচিৎ যাতে করে স্রষ্টা তাকে সাধনার মধ্যে রাখতে পারেন এই ব্যক্তি সাধক হলে রীতি মেনে মেঝেতে থুথু ফেলা হতে বিরত থাকতো বা খোদা তাঁকে এই ঘৃন্য কাজ হতে বিরত রাখতেন'

অনেক ওলী মনে করেন যে এই ধরনের বিধি নিষেধ যতক্ষণ সে শিক্ষা গ্রহণ করেন বা শৃঙ্খলার মধ্যে থাকেন ততক্ষণ প্রযোজ্য তাঁদের মতে এ ধরনের লোক, লোকের স্থান সাধারণ লোকের চেয়ে অনেক উর্ধ্বে এবং তাঁদের কাজ যা ধর্মীয় দৃষ্টিতে অবৈধ মনে হতে পারে, কিন্তু কোনো ভাবেই নিন্দনীয় বলা যাবে না অনেক সূফীরা মনে করেন যে, কোনো ওলী যদি তাঁর নিজস্ব আইন ভঙ্গ করেন তবে তাঁকে ভন্ড বলা উচিৎ নয় সাধকদের মধ্যে প্রচলিত বিশ্বাস এই যে আইনের ছত্রছায়ায় সাধককে সম্মান প্রদর্শন ওলীদের সম্মান বৃদ্ধি করছে এবং এই ধারণা জন্ম দিচ্ছে যে ঐশী অনুগ্রহ প্রাপ্ত ব্যক্তিরা কোনো ভুল করতে পারেন না অথবা তাঁর কোনো কাজকে শুধুমাত্র দেখার মাধ্যমে বিচার করা উচিত নয় এই ব্যাপারে আল্লাহ্‌র বন্ধু মুসা (আঃ) সাথে খিজির (আঃ) এর কাহিনীকে সবচেয়ে বড় উদাহরণ রূপে দেখানো হয়ে থাকে এই কাহিনী কুরআনে বর্নিত আছে (১৮:৬৪-৮০) অবশ্য কুরআনে তাকে খিজির (আঃ) নামে অবহিত করা হয় নি খিজির (আঃ) একজন অমরত্ব প্রাপ্ত রহস্যময় ব্যক্তিত্ব তিনি ভবঘুরে সূফীদের সাথে আলাপ করতেন এবং তাঁদেরকে ঐশী জ্ঞান প্রদান করতেন মুসা (আঃ) তাঁর সাথে এক যাত্রায় সহযোগী হওয়ার বাসনা করলেন যাতে করে তিনি খিজির (আঃ) এর কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেন খিজির (আঃ) এই শর্তে সম্মত হলেন যে ভ্রমনকালে মুসা (আঃ) তাঁকে কোনো প্রশ্ন করতে পারবেন না

উভয়ে একত্রে যাত্রা আরম্ভ করলেন একটা নৌকা করে নদী পার হওয়ার পর খিজির (আঃ) তা ছিদ্র করে দিলেন মুসা (আঃ) চিৎকার করে বললেন, 'নৌকা ছিদ্র করার ফলে এর মালিকের ক্ষতি হলো তুমি অদ্ভুত কাজ করলে' খিজির (আঃ) বললেন, 'আমি তোমাকে আমার সাথে কথা না বলে ধৈর্য্যের সাথে চলতে বলেছি

তারা আবার চলা শুরু করলেন যতক্ষণ না এক বালককে দেখতে পেলেন খিজির (আঃ) তাকে হত্যা করলেন'সে কোনো অন্যায় করেনি তথাপি তাকে হত্যা করলেন কেনো?' মুসা (আঃ) জিজ্ঞাসা করলেন

মুসা তাঁর অঙ্গীকার ভঙ্গ করলে খিজির (আঃ) তাঁকে ছেড়ে যেতে মনস্থ করলেন খিজির (আঃ) বললেন, 'যাবার আগে আমি ঘটনা সমূহের অর্থ বলবো যে ব্যাপারে তুমি ধৈর্য্য ধারণ করতে পারো নি নৌকাটি একজন দরিদ্র লোকের যে এর দ্বারা জীবিকা অর্জন করে আমি নৌকাকে এই কারণে ছিদ্র করেছি যে রাজার সৈন্যরা ভালো নৌকা জোর করে নিয়ে নিচ্ছে'

'আর যে বালককে আমি হত্যা করেছি তার পিতামাতা নেক্‌কার আমার ভয় হচ্ছে এই ছেলে বড় হয়ে ধর্মদ্রোহী হবে এবং পিতামাতাকে কষ্ট দেবে'

সূফীরা এই ঘটনাকে উদ্ধৃত করে বুঝান যে ওলীরা তর্ক বিতর্কের উর্দ্ধে এবং তাঁরা সাধারণ মানুষ নন জালালুদ্দীন রূমীর মতে তাঁদের হাত খোদার হাত হয়ে যায় সাধারণ মুসলমানেরা এই দাবিকে সমর্থন করে থাকেন কারণ তারা প্রচলিত নৈতিকতা ওলীদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে অনিচ্ছুক

সাধকরা যখন কোনো অলৌকিকতা প্রদর্শন করেন তখন তাকে 'কারামত' বলা হয় অন্যদিকে নবীগণ কোনো অলৌকিক  ঘটনা প্রদর্শন করলে তাকে 'মুজেযা' বলা হয় মুজেযা অর্থাৎ এমন কাজ যা অন্য কেউ নকল করতে পারবে না কারামত ও মুজেযার মধ্যেকার সুক্ষ্ম পার্থক্যের কারণে অনেক বিতর্কের জন্ম হয়েছে সূফীরা অবশ্য বিনয়ের সাথে ক্ষমা প্রার্থনা করে স্বীকার করেন এবং এ বিষয়ে চুপ করে থাকেন তাঁরা বলেন যে, সাধকরা হচ্ছেন নবীর উত্তরাধিকারী এবং সকল অলৌকিকতা তাঁর কাছ থেকেই প্রাপ্ত

বায়জীদ বোস্তামী বলেন যে, 'আমার শিক্ষানবীশ কালে আল্লাহ্‌ আমার সামনে বিভিন্ন অলৌকিক এবং আশ্চর্য বস্তুসম্পদ দিতেন কিন্তু আমি তার প্রতিদৃষ্টি দিতাম না যখন তিনি আমাকে ওই রকম করতে দেখলেন তখন তিনি নিজ হতে ওই বস্তুসমূহ অর্জনের জ্ঞান দান করলেন'

জুনায়েদ মনে করেন যে 'কারামত' এক ধরনের পর্দা যা সাধককে পর্দার অভ্যন্তরে অবস্থিত সত্যকে জানতে সাহায্য করে এটা খুবই উচু ধরনের দর্শন যা সাধারণে বুঝতে অক্ষম

সাধকরা কখনই বলেন না যে তাঁরা অলৌকিক ক্ষমতা অর্জন করেছেন তাঁরা বলেন যে এই ক্ষমতা তাদেরকে দান করা হয়েছে কিছু সাধকের মতে, ওই সময় তাঁরা সম্পূর্ণরূপে সচেতন থাকেন তবে অধিকাংশের মতে ওই সময়ে তারা ঐশী প্রেমে মগ্ন থাকেন এবং সম্পূর্ণরূপে ঐশী শক্তির অধীনে থাকেন তাঁর নিজস্ব সত্তা লোপ পায় এবং তাঁর বিরোধিতা করার অর্থ আল্লাহ্‌র বিরোধিতা করা স্রষ্টা তখন তার ঠোঁটের মাধ্যমে কথা বলেন, হাতের মাধ্যমে প্রহার করেন এই প্রসঙ্গে জালালুদ্দীন রূমী বর্ণনা করেছেন বায়জীদ বোস্তামী হচ্ছেন পারস্যের সেই প্রখ্যাত সাধক যিনি আল্লাহ্‌ প্রেমে উল্লোসিত হয়ে মাঝে মাঝে বলতেন, 'তিনি আর কেউ নন স্বয়ং আল্লাহ্‌'

'একদিন ওই রকম অবস্থা হতে জ্ঞান পাওয়ার পর যখন শুনলেন যে অচৈতন্য অবস্থায় তিনি কি বলেছেন তখন বায়জীদ তার শিষ্যদের কে আদেশ দিলেন 'যদি আমি পুনরায় ওই ধরনের কথা বলি তবে তোমরা আমাকে ছুরি দ্বারা আঘাত করবে' মসনবীতে ঘটনাটি এইভাবে বর্ণিত আছে : -

'খোদার প্রেমে অচেতন হয়ে চিৎকার করে বললেন তিনি,

আমার মাঝেই আল্লাহ্‌ আছে

খুজছো কেনো স্বর্গে তাঁকে?

শিষ্যরা সব ভয়ে পাগল

করলো আঘাত ছুরি দিয়ে

পবিত্র তার দেহের পরে

যারা তাকে হানলো আঘাত

দেখলো তারা ভয়ে একি

আঘাত সব ফিরে এসে

লাগছে তাদের দেহের পরে

আঘাত কেনো লাগলো না সেই পাক দেহে

রক্তের ধারায় স্নাত হলো শিষ্যদেরই আপন দেহ'  (চলবে)   

 

আত্মদর্শনঃ পথের বাঁকে বাঁকে (১)

 

সংলাপ

 

পৃথিবীতে যা দেখা যায় তা শূন্যে দেশকালের বৈদ্যুতিক স্পন্দন ব্যতীত আর কিছুই নয় চিন্তাশক্তি এর নাগাল পায় না- ধরবার জন্য অগ্রসর হয় মাত্র এই সকল স্পন্দন মস্তিস্কে গিয়ে একটা রাসায়নিক প্রক্রিয়া ঘটায় বাইরে যে ঘটনাগুলি আমরা ঘটতে দেখছি তা প্রকৃতপক্ষে আমাদের মস্তিষ্ক কেন্দ্রে ঘটছে আমরা যা দেখি তা কতকগুলো সেন্‌স ডেটা মাত্র ইন্দ্রিয়জ অনুভূতি হচ্ছে একটি বস্তুর উপস্থিতি যেখানে মস্তিষ্ক ও ইন্দ্রিয়বর্গ রয়েছে বস্তুর তাই উপস্থিতি ঘটছে একটি স্থানে এবং কালে যে স্থানে মস্তিষ্ক ও ইন্দ্রিয়গুলোর সংযোগ বর্তমান রয়েছে এবং সেখানে যে সকল উপস্থিতির সংমিশ্রণ ঘটছে তাদের যোগফল চিন্তাপ্রবাহ

মন বা জড় কেহই সত্য নয় ধারণা মাত্র সত্য হচ্ছে সৃষ্টির আদিমতত্ত্ব মন ও জড় তা হতে উদ্ভূত পার্থক্য কেবল পরিবেশ মোতাবেক তাদের ভিন্ন ভিন্ন ভাবে গুছিয়ে নেবার ভঙ্গীর জ্ঞানকে উৎপত্তিতে ও প্রসারে সীমাবদ্ধ করেছে চিন্তার ভাষা ভাষা জাগতিক ঘটনাগুলো বেশি প্রকাশ করতে পারে কিন্তু অন্য বিষয়, যথা- অনুভূতির ব্যাপার, মানস ব্যাপার ইত্যাদি প্রকাশ করতে গেলে সে অক্ষম হয়ে পড়ে

জ্ঞানতত্ত্ব মূল্য-তত্ত্বের মধ্যেই পড়ে জ্ঞানতত্ত্বের ভেতর আমাদের জানবার ইচ্ছারূপ প্রয়োজনীয়তা নিহিত রয়েছে এবং জীবনের কল্যাণকর বস্তু জ্ঞানে এই প্রয়োজনীয়তা বস্তুবাদে ও ভাববাদেও রয়েছে কিন্তু এই প্রয়োজনীয়তা আমাদের নিয়ে যাচ্ছে এই দু'য়ের উর্দ্ধে পরতত্ত্বে এই পরতত্ত্বেই প্রয়োজন পূর্ণ অতএব এই পরতত্ত্বই আমাদের পরম প্রয়োজন, পরমূল্য 'পরমার্থ' অনেক সময় ভাববাদকে অতিক্রম করে যাচ্ছে এতে দুটি স্বতঃসিদ্ধ কথা ধরে নেয়া হয়েছে। (১) আদিতে একটি পদার্থ আছে। (২) এই 'অস্তি' পদার্থ আমরা জানতে পারি জ্ঞানতত্ত্বের দৃষ্টিতে দেখলে পরদর্শন, বস্তুবাদ এবং ভাববাদের মধ্যে অবস্থিত

জ্ঞানের প্রকৃত যন্ত্র হচ্ছে আদিম সহজাত প্রবৃত্তি বুদ্ধি এই নিরবচ্ছিন্ন প্রাণ-প্রবাহকে কেটে ছেঁটে গ্রহণ করছে এবং জড় জগৎরূপে তাকে দর্শন করছে অনন্তকালকেও সে দেখছে খণ্ড খণ্ড করে কাজেই বুদ্ধিজ জ্ঞান আপেক্ষিক এটা ভিতরের জ্ঞান দান করতে পারে না এবং এটা অগ্রগতিশীল নয় এই আদিম বৃত্তিকে স্বার্থহীন করে অসীমতায় পরিণত করতে পারলে এটাই বোধেতে পরিণত হবে এবং সত্য-জ্ঞান দান করবে

এক মিশ্র রহস্যময়তার আধার হলেন নারী অর্থাৎ মাতা নারী শক্তি, যা ব্যতিত স্বয়ং সৃষ্টি অচল অর্থাৎ যেখানেই সৃষ্টি বিরাজিত, সেখানেই তার স্বাভাবিক শক্তি স্বরূপা যোগমায়া সহযুক্তা হয়ে থাকেন অভিধানে 'মায়া' শব্দের অর্থ হলো কৃপা মমতাময়ী শক্তি অধিকারিনী মাতা কৃপা করেন নারী জীবনের প্রধান ধর্ম তার নারী স্বত্তার যথাযথ উন্মোচন ঘটানো তা  শুধু সন্তান ধারণে সীমাবদ্ধ নয়

যখন নারী সর্বস্তরের শিশুর মধ্যে আপন সন্তানের মমতা উপলব্ধি করতে পারে তখন বলা হয় তার মধ্যে মাতৃত্ববোধ জাগ্রত হয়েছে বদলে যাওয়া সমাজ সংস্কারে প্রকৃতিকে ধাবিত করছে মরণ ধ্বংসের দিকে কালের অকাল গ্রাসে এই মাতৃরূপের সর্বনাশ ঘটছে আমাদের মূল্যবোধ লোপ পাচ্ছে একে অন্যেকে স্থূল দোষারোপ করছি জীবনের অর্জনের পথে অপ্রাপ্যতার তাগিেেদ একজন নারীকে মাতৃরূপে উদ্ভাসিত হতে তার স্বীয় মূল্যবোধ যতখানি জাগ্রত করা প্রয়োজন ঠিক ততখানি প্রয়োজন নরের ভূমিকা যথাযথভাবে পালনের'স্রষ্টা' সদৃশ জ্ঞানে 'মাতৃ' শব্দের তাৎপর্য উপলব্ধি মনুষ্য সমাজের সূচনালগ্ন হওয়া উচিৎ ছিল কিন্তু তা আজো আংশিক রূপায়ন ছাড়া পরিপূর্ণ হয়নি

শুধু পার্থিব জ্ঞান দিয়ে কিছু হয় না আধ্যাত্মিক জগতে জ্ঞানের সঙ্গে চাই ভক্তি ভক্তিতেই মুক্তি ভক্তি একটা পথে যায় আবার আসে, স্থায়ী বাসা বেধে নিলে আর কিছু লাগে না অন্তরের ভিতর তাকে ধরে রাখা যায় জনম জনম এ সাধনা জনম জনমের একমাত্র ভক্তিই পারে শান্তির সাগরে ডুবিয়ে রাখতে, হিংসা, বিদ্বেষ, অহংকার, পরশ্রীকাতরতা আরও বহু কিছু থেকে মুক্ত রাখতে ভক্তির জায়গাটা শূন্যে ভক্তির সমুদ্র, অসীম শূন্যতার মাঝে, সংকীর্ণ সীমায় তাকে ধরে রাখা যায় না সমুদ্রের পানি যেমনি ঘটিতে তুলে নিয়ে আসলে মাটির সাথে মিশে পানির বিশালত্ব থাকে না, উদারতা থাকে না বস্তুর সাথে রয়েছে ভক্তির দ্বন্দ্ব বস্তুতে এসে ভক্তি বেশির ভাগ সময় হারিয়ে যায় ভক্তি অধরা তাকে ধরে রাখতে হয় অধরার মাঝে, ভক্তি হৃদয়ের ব্যাপার মস্তিষ্কের নয়, চিন্তাপ্রবাহের ধারায় ইচ্ছাশক্তির সহায়তায় ভক্তিতে মস্তিষ্ক অবনত হলে, বিচার ক্ষমতার সহায়ক শক্তিতে ভক্তি সর্বময় হয় এখানে, না, নেই প্রশ্ন নেই, কেন নেই, বিচার নেই আপাদমস্তক ভক্তিতেই ভক্ত

ভক্তি দেহের সমস্ত অনু পরমাণুতে মিশে থাকে ভক্তি ছাড়া গুরুকে ধরে রাখা যায় না একমাত্র নিরবিচ্ছিন্ন ভক্তিই পারে গুরুকে জনম জনম ধরে রাখতে নিরাকার ভক্তির সাথে সাকারের ভক্তির একটা দ্বন্দ্ব আছে ভক্তি  একরৈখিক হয়ে জ্ঞান সহযোগে সাকার হয়ে ওঠে ভক্তিবিহীন সাকার হাজারো দোষে দুষ্ট ভক্তিবিহীন সাকার মরুময় ভক্তি তাকে দেয় নতুন জীবন ভক্তি অরূপ, অখন্ড, অসীম চর্মচক্ষের দেখা ভক্তি চলে যেতে পারে অন্তর্চক্ষুর দ্বারা ভক্তিকে দেখাই প্রকৃত দেখা

ভক্তির মাঝে আছে সেবা সেবা বড় কঠিন যারা মা-বাবারই সেবা করতে পারে না তারা আবার গুরুর সেবা করবে কি করে? গুরুকে যেদিন মা-বাবার মত সেবা করতে পারবে, সেদিন সে কিছু সেবার কাজে লাগবে, তার আগে গুরুকে সেবা করতে পারবে না সেবার সময় কতো ধমক খেতে হয় গুরু অনেক কাজেই ধমকাবেন, রাগ করে বসে থাকলে তাঁর সেবায় লাগতে পারা যায় না

গুরুর সেবা করতে তাঁর কখন কি দরকার হয় তার প্রতি সজাগ অর্থাৎ হুঁশ রাখতে হয় তবে সেবার ফল পাওয়া যায় সেবা বলতে শুধু দৈহিক শুশ্রুষা ও পরিচর্যা বুঝায় না ভিক্ষা করেও যদি কেউ গুরুকে ভক্তি ভরে ভাল ভাল বস্তু উপহার দেয়, তাহলে তার সেবা উত্তম

গুরুর সাথে সংযোগের জন্য প্রার্থনা করতে হয় গুরু তাঁর স্বরচিত প্রার্থনার  পথ ও মন্ত্র শিষ্যদের ব্যবহারের জন্য উচ্চারণ করেন ইহাই শিষ্যের জন্য পৃথিবীর মধ্যে সর্বাধিক একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিক মূল্যবান প্রার্থনা এবং শিষ্যরা তাদের প্রত্যাহিক জীবনে এটি স্মরণ করে প্রার্থনা খুব সরল ও তাৎপর্যপূর্ণ একে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করলে মর্মার্থ হারাতে হয় যারা সাধন-ভজন করে, এর অর্থ তাদের কাছে স্ব স্বভাবে প্রতিভাত হয়; কারণ এতে সংক্ষেপে বর্ণিত হয়েছে মৌলিক উপাদানগুলো- যার মধ্যে আছে আধ্যাত্মিক জীবন, প্রার্থনার প্রতিটি অংশ গুরু ও গুরুর আদর্শকে স্বরণ  করিয়ে দেয়

প্রার্থনাকে দু'ভাবে ভাগ করা যায়- একটি মানবকেন্দ্রিক অপরটি আধ্যাত্মিকজগৎকেন্দ্রিক সাধারণ লোকের প্রার্থনা মানবকেন্দ্রিক তারা গুরুর (সাধকের) কাছে চায় পার্থিব ধন দৌলত, যন্ত্রণা থেকে নিষ্কৃতি, সুখ, সম্পদ ও সফলতা অপর পক্ষে সাধকদের প্রার্থনা আসে বিচার ও ভক্তি প্রণোদিত হয়ে যেসব সাধক কেবল গুরুকেই চায় তারা জানে জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে গুরু লাভ প্রার্থনা হয় গুরুকেন্দ্রিক তারাই গুরু চৈতন্যে মগ্ন হয়ে শাশ্বত আনন্দ ও মুক্তি পায় কোন ধর্মীয় বিশ্বাস বা মতবাদের ভিতর দিয়ে যেমন চলা যায় আবার না গেলেও চলবে যে বিশ্বাস করে যে গুরু আছেন ও তাঁকে দর্শন করা যায় এবং দিবা-রাত্র যথাযথভাবে উপদেশ পালন করে সে পূর্ণতা লাভ করবেই

প্রার্থনাকালে শুধুমাত্র গুরুকেই চিন্তা করতে হয় গুরুর নৈর্ব্যক্তিক সত্তার উপর ধ্যান করা শিষ্যের উপাসনা, যদিও অধিকাংশের পক্ষে দুরূহ গুরু একটা প্রেম ভাব বিশেষ; শিষ্য অনুভব করে যদিও সে কামনা-বাসনা বিজড়িত রক্তমাংসের শরীর শিষ্য সবসময় প্রেম সাগরে ডুবে ভক্তিযোগের উপর জোর দিয়ে থাকেন-যাতে গুরুকে সাকার রূপে উপাসনা করা হয় গুরুকে যাতে শিষ্য সমস্ত হৃদয় ও মন-প্রাণ দিয়ে ভালবাসতে পারে- সে জন্য শিষ্য গুরুকে অতি আপনার জন বলে বোধ করে

আর তাঁকে আপনার করতে হলে শিষ্যকে গুরুর সঙ্গে সংযোগের পথ ধরে একটা নির্দিষ্ট সম্পর্ক গড়ে তুলতে  হয়

মানবিক স্তরে প্রেমের যে সব অভিব্যক্তি আছে প্রেম পথে তা প্রায় একই রকম

ভক্তিযোগের সাধকদের মতো শিষ্যের সঙ্গে গুরুর পাঁচটি প্রধান সম্বন্ধ বিদ্যমান প্রথম : স্রষ্টা ও সৃষ্ট প্রাণীর মধ্যে যে সম্বন্ধ, দ্বিতীয় : দাস-প্রভু বা সন্তান ও পিতামাতার মধ্যে যে সম্বন্ধ, তৃতীয় : বন্ধুতে বন্ধুতে যে সম্বন্ধ, চতুর্থ : মাতা-পিতা ও সন্তানের মধ্যে যে সম্বন্ধ, পঞ্চম : প্রেমিক ও প্রেমাস্পদের সম্বন্ধ গুরুর সঙ্গে এই পাঁচ প্রকারের সম্বন্ধ কেবলমাত্র গুরু-শিষ্য এবং সাধক ও ভক্তদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নিরাহার ব্যক্তি অর্থাৎ যে কোন বিষয় ভোগ করছে না তার থেকে বিষয় দূরে রয়েছে ঠিকই কিন্তু আকাঙক্ষা গিয়েছে কি? বিষয় থেকে দূরে থাকলেই সে বিষয়ের প্রতি আকাঙক্ষা চলে যাবে তা বলা যায় না যেকোন বিষয়ের প্রতি শিষ্যের আকাঙক্ষা দূর হয়ে যায় সেই পরমবস্তু গুরুকে উপলব্ধি করলে যিনি গুরু, যাঁর আকাঙক্ষায় শিষ্য অভিষিক্ত হলে অন্য কোন আকাঙক্ষা আর ভাল লাগে না, তাঁকে যে উপলব্ধি করেছে তার চিন্তাপ্রবাহ অন্য দিকে যায় না, তিনি একনিষ্ঠ এবং একরৈখিক তাই কোন বিষয় তাকে প্রলুব্ধ করতে পারে না তার কোন আসক্তিও থাকে না গুরু আসক্তি অনুভব করলে অন্যসব আসক্তি দূর হয়ে যায়

গুরুকে পেলে শিষ্য তার চেয়ে বড় আর কোন আকাঙক্ষার বস্তু আছে বলে মনে করে না গুরুপ্রেমে আনন্দের স্বাদ পেলে আর ভাবনা নেই, শিষ্য তখন 'নিকষিত হেম' হয়ে যায়

সাধনার পথে সমস্ত জীবন ধরে নীরস সংগ্রাম করে যেতে হয়, আনন্দের আকাঙক্ষা করে বসে থাকলে হয় না অনেক সময় গুরুকে পেলাম না বলে হতাশা এসে পাবার ইচ্ছাটিকে পর্যন্ত ভুলিয়ে দেয়, কিন্তু সাধককে এ বিষয়ে সচেতন থাকতে হয় যে কোন অবস্থাতেই সে গুরুকে আজীবন ধরে থাকবে, অন্য কিছু চাইবে না এটাই উত্তম পথ

শিষ্য যখন গুরুর সঙ্গে একতানে একনিষ্ঠভাবে একরৈখিকভাবে নিজেকে মিলিয়ে চলে শিষ্যকে কোন বাধা বিপত্তি সাধনার পথ রুদ্ধ করতে পারে না শিষ্যের মধ্যে সৃষ্ট ওই শক্তির সম্মুখে কোন বাধাই মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না অন্ধকার ঘরে আলো আনলে যেমন আঁধার চলে যায়, তেমনি শিষ্য যখন নিজের হৃদয় গৃহে সত্যের আলো জ্বালায় তখন কোন কলুষতা বা দুঃখ সেখানে থাকতে পারে না সেখানেই মৃত্যুঞ্জয়ের আনন্দলোকের পথে যাত্রা

শিষ্য যখন নির্ভীক চিত্তে সব সমস্যার সম্মুখীন হতে শেখে তখন সে যে বল পায়, সার্বিকভাবে ঐশী সাহায্য লাভ করে, সাহস, অনুপ্রেরণা কাজ করবার শক্তি পায় তা সবই গুরুর করুনা জীবনে যত কঠিন বাধা বা অভিজ্ঞতাই আসুক না কেন তা সকলই শিষ্যের চলার পথে উপকার করে।