আমেরিকায় বাঙালিরা কেমন কোথায়

 

 

ইমরান 

 

২০০৮ অর্থ বছর পর্যন্ত ১০ বছরে ৪৭৩৯৮ বাংলাদেশী যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেনএ সময়ে গ্রীণকার্ড পেয়েছেন ৮৭ হাজার ৪৩২ জন নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন ১ লাখ ৫৯ হাজার ৪৫১ জনএর মধ্যে এসাইলাম পেয়ে গ্রীণকার্ড লাভ করেছেন ১৮৩২ জনঅপরদিকে ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি, রিয়েল এস্টেট প্রতারণা, খুন, ধর্ষণসহ নানা অপকর্মে দণ্ডভোগের পর যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে ১৮২ বাংলাদেশীকেইউএস ইমিগ্রেশন এন্ড সিটিজেনশিপ সার্ভিসের মুখপাত্র লুজ ফিগুয়েরো ইরাজাবেল এবং ইউএস ইমিগ্রেশন এন্ড কাস্টমাস এনফোর্সমেন্টের মুখপাত্র নিকল নাভাসের উদ্ধৃতি দিয়ে চলতি সংখ্যা (শুক্রবার প্রকাশিত) ঠিকানা প্রকাশ করেছে সংবাদটিপ্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী গত বছরের ১ অক্টোবর থেকে এ বছরের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত ৩ মাসে ৩৭ বাংলাদেশীকে গ্রেফতার এবং বহিষ্কার করা হয় ১৭ জনকেএছাড়া আরো ৬১ জনকে গ্রেফতার করে ডিটেনশন সেন্টারে নেয়া হয়েছেঅপরদিকে ২০০৯ অর্থ বছর তথা  ২০০৮ সালের ১ অক্টোবর থেকে গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ২১১ বাংলাদেশীকে গ্রেফতার করা হয় ইমিগ্রেশনের আইন লংঘনের জন্য

ইমিগ্রেশনের দেশ হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসতি গড়া ইমিগ্র্যান্টদের বিগত একশত বছরের তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায় দিন যত যাচ্ছে আমেরিকায় বসতি গড়ার আগ্রহ তত প্রবল হচ্ছে১৮২০ থেকে ১৮২৯ সাল অর্থাৎ এই দশকে ১২৮৫০২ জন বিদেশী গ্রীণকার্ড পেয়েছেনঅথচ এর পরের দশকে তা কয়েকগুণ বেড়ে ৫৩৮৩৮১ হয়েছেএরপরের দশক তথা ১৮৪০ থেকে ১৮৪৯ সালে সে সংখ্যা বেড়ে ১৪২৭৩৩৭ হয়েছে১৮৯০ থেকে ১৮৯৯ সালের দশকে গ্রীনকার্ড পেয়েছেন ৩৬৯৪২৯৪ জনউনিশ শতকের প্রথম দশকে গ্রীনকার্ড পান ৮২ লাখ ২ হাজার ৩৮৮ জন১৯৬০ থেকে ১৯৬৯ সালের দশকে গ্রীনকার্ড পান ৩২ লাখ ১৩ হাজার ৭৪৯ অর্থাৎ এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে আগমনের আগ্রহ কম পরিলক্ষিত হয়েছেতবে এরপর আবার তা দ্বিগুণ হয়েছে

একাত্তরে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীনতা অর্জনকারী বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আগমনের আগ্রহ মূলতঃ নব্বইয়ের দশকে তীব্র হয়এর আগে সত্তর ও আশির দশকে সাধারণতঃ পেশাজীবী এবং উচ্চতর ডিগ্রি নেয়ার জন্যেই বাংলাদেশীরা এসেছেন আমেরিকায়১৯৮৭ সালের আগে এক দফা হিড়িক পড়েছিল প্রেসিডেন্ট রিগ্যান কর্তৃক জেনারেল এ্যামনেস্টি প্রদানের সময়এরপর ১৯৮৯ সালে ওপি ওয়ান লটারীতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাঙালিদের আটলান্টিক পাড়ি দেয়ার আগ্রহ প্রবল হতে থাকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা, আইন শৃখলা পরিস্থিতির চরম অবনতি, গণতন্ত্রের লেবাসে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের উপর বর্বরোচিত হামলা, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সাথে অকথ্য আচরণ ইত্যাদি কারণে নব্বইয়ের দশকে হাজার হাজার বাংলাদেশীর যুক্তরাষ্ট্রে আগমণ ঘটেছে ইমিগ্রেশন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী ১৯৯৯ সালে ৬০৩৮ বাংলাদেশী গ্রীণকার্ড পেয়েছেনএর পরের বছর সে সংখ্যা বেড়ে ৭২০৪ হয়েছে২০০১ সালে গ্রীনকার্ড পান ৭১৫২ জন২০০২ সালে এ সংখ্যা কমে ৫৪৮৩ হয়২০০৩ সালে আরো কমে ৪৬১৬ জনে দাঁড়ায়২০০৪ সালে অবশ্য তার প্রায় দ্বিগুণ হয়-৮০৬১এরপর ২০০৫ সালে ১১৪৮৭, ২০০৬ সালে ১৪৬৪৪, ২০০৭ সালে ১২০৭৪ এবং সর্বশেষ ২০০৮ অর্থ বছরে ১১৭৫৩ বাংলাদেশী গ্রীনকার্ড পেয়েছেন২০০৮ সালে সারাবিশ্বের ১১ লাখ ৭ হাজার ১২৬ জন গ্রীনকার্ড পেয়েছেনঅপরদিকে ১৯৯৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণকারী বাংলাদেশীর সংখ্যা হচ্ছে ২২৭৭ নাগরিকত্ব গ্রহণের হারও ক্রমান্বয়ে বেড়েছে পরবর্তী বছরগুলোতেতা হচ্ছে ২০০০ সালে ৩৩০৯, ২০০১ সালে ৪৪১৬, ২০০২ সালে ৫৬২৬, ২০০৩ সালে ৪৩৪৫, ২০০৪ সালে ৫১৪৮, ২০০৫ সালে ৫৫০৩, ২০০৬ সালে ৬৬৮৩, ২০০৭ সালে ৪৭৪৬ এবং ২০০৮ অর্থ বছরে ৫৩৪৫ জন২০০৮ সালে সারাবিশ্বের মোট ১০ লাখ ৪৬ হাজার ৫৩৯ জন যুক্তরাষ্ট্রের সিটিজেনশিপ নিয়েছেন

স্টুডেন্ট, চাকরি, শ্রমিক, ট্যুরিস্ট, ব্যবসা-বিনিয়োগ, কূটনীতিক, গৃহপরিচারিকা ইত্যাদি নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসায় বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আগমণের গতিপ্রকৃতিতে জানা গেছে, ১৯৯৯ অর্থ বছরে ১৭৮৫৫ জন, ২০০০ সালে ২০২৬৬, ২০০১ সালে ২১১২০, ২০০২ সালে ১৫৫৯৩, ২০০৩ সালে ১৩৯১৪, ২০০৪ সালে ১৪৭১২, ২০০৫ সালে ১৪৯০৯, ২০০৬ সালে ১৪২২৪, ২০০৭ সালে ১৩১০০ এবং ২০০৮ অর্থ বছরে ১৩৭৫৮ জন২০০৮ অর্থ বছরে সারাবিশ্ব থেকে মোট ৩ কোটি ৯৩ লাখ ৮১ হাজার ৯২৮ জন এসেছেন নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসায়

গত বছর অস্থায়ী ওয়ার্ক ভিসায় মাত্র ৮২৫ বাংলাদেশী এসেছেন যুক্তরাষ্ট্রেএর মধ্যে এইচ ওয়ান বি-তে ৪৫৭ জন, অকৃষি শ্রমিক-৩, বিশেষভাবে দক্ষ শ্রমিক-৪, খেলোয়াড়, শিল্পী এবং বিনোদন কর্মী-৩৬ এবং বিনিয়োগকারী ভিসায় মাত্র ৪ জন এসেছেন পাক্ষান্তরে ভারত এইচ ওয়ান বি-তে এসেছেন ৩ লাখ ১৫ হাজার ৬৭৪ জন বিশেষভাবে দক্ষ শ্রমিক হিসেবে ভারত থেকে এসেছেন আরো ১ লাখ ৫৪ হাজার ৭২৬ জন

গত দশকে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রাপ্তদের মধ্যে ৬৪৭ জন যুক্তরাষ্ট্রে অবতরণের পর এটর্নীর মাধ্যমে আবেদন করেছিলেনঅপর ১১৮৫ জন রাজনৈতিক আশ্রয় চান ইমিগ্রেশনের হাতে গ্রেফতার হওয়ার পরতারা উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়া হলে নির্ঘাত তাদের প্রাণ যাবে অথবা সারাটি জীবন পঙ্গু হয়ে দুর্বিসহ অবস্থায় কাটাতে হবেএর সপক্ষে অবশ্য ডক্যুমেন্ট প্রদর্শন করতে হয় সারাবিশ্ব থেকে এ ধরনের এসাইলামপ্রার্থীর সংখ্যা গত দশকে মাত্র ১১৩৬৯২১ জনএর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হচ্ছে চায়নিজ-৩২৫৩৪

ইমিগ্রেশনের আইন এবং ফেডারেল আইন লংঘনের দায়ে ১৯৯৯ অর্থ বছরে ৬৮, ২০০০ সালে ৬৮, ২০০১ সালে ৮৭, ২০০২ সালে ১২১, ২০০৩ সালে ১৪৯, ২০০৪ সালে ১৩১, ২০০৫ সালে ১৪৫, ২০০৬ সালে ১৫১, ২০০৭ সালে ১৩৮ এবং ২০০৮ অর্থ বছরে ১০৮ জনকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করা হয়েছেএ ধরনের বহিষ্কারের ঘটনা ১৮৯২ সাল থেকেই চলছে১৮৯২ সালে ২৮০১ জন বিদেশীকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করা হয়তবে ১৯২৬ সাল পর্যন্ত বহিষ্কৃতরা পুনরায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছে বলে জানা যায়নিতবে ১৯২৭ সালের পর যাদেরকে বহিষ্কার করা হয়েছে তার বড় একটি অংশ প্রতি বছরই ফিরে এসেছে ভিন্ন পথে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টির আড়ালে১৯৫৬ সালের রেকর্ডে দেখা যায় যে, বহিষ্কারের চেয়ে প্রায় ৯ গুণ বেশী পুনরায় ঢুকেছে বহিষ্কারের সংখ্যা ছিল ৯০০৬ জন, অপরদিকে আগে বহিষ্কার হয়েছিল এমন ৮০৮৯১ জন ঐ বছর ফিরেছে অবৈধভাবে১৯৮৫ সালেও তেমন ঘটনা রয়েছে ১০৪১২৯৬ জনের২০০৮ সালে বহিষ্কার করা হয় ৩৫৮৮৮৬ জনকে পক্ষান্তরে পুনরায় প্রবেশ করেছে ৮ লাখ ১১ হাজার ২৬৩ জন

এদিকে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্টের পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, ২০০৮ সালের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ ইমিগ্র্যান্টের সংখ্যা কমেছে২০০৮ সালের জানুয়ারিতে ছিল ১১.৬ মিলিয়ন তথা ১ কোটি ১৬ লাখ অপরদিকে গত বছরের জানুয়ারিতে সে সংখ্যা হয়েছে ১ কোটি ৮ লাখ২০০৫ থেকে ২০০০ সালের মধ্যেই ১ কোটি ৭ লাখ ৫০ বিদেশী যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকেছে অবৈধভাবেএর মধ্যে মেক্সিকান-৬৬ লাখ ৫০ হাজার, আল সালভেদর-৫ লাখ ৩০ হাজার, গুয়াতেমালা-৪ লাখ ৮০ হাজার, হন্ডুরাস-৩ লাখ ২০ হাজার, ফিলিপাইন-২ লাখ ৭০ হাজার, ভারত-২ লাখ, কোরিয়া-২ লাখ, ইকুয়েডর-১ লাখ ৭০ হাজার, ব্রাজিল-১ লাখ ৫০ হাজার, চীন-১ লাখ ২০ হাজারসবচেয়ে বেশী অবৈধ ইমিগ্র্যান্ট বাস করছে ক্যালিফোর্নিয়া স্টেটে-২৬ লাখ দ্বিতীয় বৃহত্তম টেক্সাস-১৬ লাখ ৮০ হাজার, তৃতীয় বৃহত্তম হচ্ছে ফোরিডা-৭ লাখ ২০ হাজার নিউইয়র্ক হচ্ছে চতুর্থ এবং এখানে বাস করে ৫ লাখ ৫০ হাজার অবৈধ ইমিগ্র্যান্ট।