শ্রীলঙ্কাঃ লঙ্ঘিত মানবতা

রাশেদুল ইসলাম

শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট রাজাপাকশা বলেছেন যে তার সরকার ওই দেশের অন্তর্দাঙ্গায় পিষ্ট হওয়া প্রায় ২ লক্ষ ৮০ হাজার সাধারণ তামিলের জন্য একটি মানবতার পথ প্রশস্ত করে দিয়েছে তামিল নাগরিকদের দুঃখ-দর্দশা দুঃখজনকভাবে এমন একটি বিষয় যা বিশ্ব খবরের নজর কাড়তে পুরোপুরি সক্ষম নয় প্রশ্ন হলো, আরো কতজনকে এর জন্য জীবন বলি দিতে হবে? সকলেই একপেশেভাবে এক পক্ষের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কথা বলতে চায় কিন্তু ওইদেশের প্রেসিডেন্টের যদি তামিল নাগরিকদের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবের উৎসাহ থাকতো তাহলে তিনি চাইলেই তো ওই যুদ্ধ বন্ধ করতে পারেনবন্ধ করতে পারেন অবিরত ভয়াবহ আকাশ বোমা হামলা তৈরি করতে পারেন এমন এক পরিবেশ যাতে ওই দুর্ভাগা তামিলরা তথাকথিত যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করে নির্বিঘ্নে বেরিয়ে আসতে পারে

এ কথা ভুলে যাওয়া চলবে না যে রাজাপাকশার ওই 'যুদ্ধক্ষেত্র' হলো হাজার হাজার অন্তর্দ্বাস্তু তামিলের মাতৃভূমিএমন কি গ্যারান্টি আছে যে, তামিলরা যখন ওই তথাকথিত মানবতার পথ ধরে পালিয়ে আসবে তখন তাদের উপর বোমা বর্ষণ হবে না বা গুলি করে ফেলে দেয়া হবে না? কোন আন্তর্জাতিক শক্তি কি বিষয়টি নিশ্চিত করতে দৃশ্যপটে উপস্থিত থাকবে?

লজ্জাজনকভাবে এসবের উত্তর হলো - 'না'

কেউ যদি রাষ্ট্র নীতি বিষয়ে দ্বিমত প্রকাশ করে তবে নিশ্চিতভাবেই তাকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হবে - এ কথা এখন ওপেন সিক্রেট

সুতরাং, মৌলিক মানবাধিকারহীন ওইসব তামিল নাগরিকের ওই বিষয়ে কোন উচ্চবাচ্যও নেইএকজন সচেতন বোধসম্পন্ন মানুষ কীভাবে  চিন্তা করতে পারে যে ওই দুর্দশাগ্রস্ত জনগণ তাদের প্রেসিডেন্টের কথায় আস্থা রাখবে যখন তারা তাকে দেখেছে বোমা হামলার নির্দেশ দিয়ে ঘর-বাড়ি বাসস্থান গুড়িয়ে নির্বিচারে গণহত্যা যজ্ঞ চালাতে এমনকি হাসপাতালও সেই তান্ডব থেকে বাদ পড়েনি

সে কারণেই ওই তথাকথিত মানবতার পথ ধরে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা যে তামিলদের জন্য আত্মহত্যার সামিল তা যে কোন সচেতন ব্যক্তিরই অভিমত বিষয়টি এমন যে ফেরাউনের কথায় আস্থা রেখে মুসা (আঃ) ও ইহুদী দাসদের লোহিত সাগর পার হওয়া!

অন্যদিকে, ছোট্ট ওই দ্বীপটিতে যখন এ ধরনের নৃশংসতা চলছে তখন প্রতিবেশী ভারত ও পশ্চিমা সরকারগুলো মুখে কুলুপ এঁটে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রবাসী তামিলরা তাই দ্বিধান্বিত হয়ে ভাবছেন - এ কী হচ্ছে!

কোন মানবিক মূল্যায়নে রাজাপাকশা ওই যুদ্ধ বন্ধ করছেন না তা তামিলরা জানে না বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যুদ্ধ বন্ধ হলেই তারা অর্থাৎ 'ওই দেশের জনগণ' নিরাপদেই ওই তথাকথিত মানবতার পথ ধরে বেরিয়ে আসতে পারে সেটা করাই সরকারের নৈতিক দায়িত্ব

শুধুমাত্র এমনটি করলেই ওই দেশের প্রেসিডেন্ট প্রমাণ করতে পারবেন যে ওই সাধারণ তামিলদের তিনি মানুষ হিসেবে বিবেচনা করেন তাদেরও একটি নিরাপদ স্থান প্রয়োজন যেখানে গুলি-বোমা-সন্ত্রাস করে নির্বিচারে গণহত্যা করা হয় না

অন্যথায় সবকিছুই নির্মম পরিহাসে পর্যবসিত হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন এবং বিষয়টি থেকে এমনভাবে গা ধুয়ে বেরিয়ে আসবেন রাজাপাকশা যে তার গা থেকে ফুলের সুবাস বেরিয়ে আসবে - যেন কিছুই হয়নি! আর ধূলোয় লুটিয়ে কাঁদবে মানবতা