জেগে ওঠো নারী

                                                                       

 

শাহীনূর আক্তার

 

নারী ও সম্পদ

 

 

প্রতিটি ঘরের নারীদের প্রতি রইল লাল গোলাপ শুভেচ্ছাবাঙালি ঘরের মায়েরা চিরকাল বৈষম্যের শিকার হয়েছেন এবং সেভাবেই নিজেও একইভাবে সন্তানদের মধ্যে সেই একই আচরণ করে আসছেনফলাফল বলতে গেলে এই দাঁড়ায়, চিরকাল ঠকেছেন, বাকি জীবন ঠকাবার রাস্তা গড়বেননারী মুক্তি, নারী মুক্তি বলে আমরা গলা ফাটিয়ে ফেলছি কিন্তু নিজের ঘরেই তো নারী পরাধীনমুক্তি আসবে কি করে? সম্পত্তি বন্টন করার সময় আমাদের গৃহকর্তাদের কন্যাসন্তানের কথা মনেই থাকে নাছোট ছোট ঘটনা ও প্রেক্ষাপট নিয়ে আজকের লেখাতাই বিষয়টা মাথার মধ্যে তোলপাড় করছেআমার শ্বশুড়কূলে পরমাত্মীয়, বৃদ্ধ হয়েছেন, তার জীবনের একান্ত বাসনা হজ্জ্ব করতে যাবেনছেলেরা হজ্জ্বে যাবার সমস্ত ব্যবস্থা করে দিলেন হজ্জ্বে যাবার আগে যে বিষয় গুলো সমাধান করে যেতে হয় তা হলো সম্পদ থাকলে তা সন্তানদের মধ্যে বিলি বাটোয়ারা করে যাওয়াসকল কর্তব্য পালনের সাথে ওই ব্যক্তি ছেলেদের ডেকে ঘরোয়া সভা করলেনতার চারজন কন্যাসন্তান ছিলেন তাদের কাউকে ওই সভায়  ডাকলেন নাএখানে উল্লেখ্য ওই সভা ছয় ছেলেদের নিয়ে করা হলো ভাইয়েরাও বোনদের ডাকেনিতখন বুঝিনি এখন বিষয়টি এমন মনে হচ্ছে, সেটা করেননি নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্যেই

বাবা ও মায়ের উপস্থিতিতে বসতবাড়ি জমি সবকিছু ভাগ করে দিলেনবাড়ির দিকে আম বাগান ও এজমালি সেখানকার কিছুটা অংশ মেয়েদের দেবেন বলে মৌখিক স্বীকৃতি দেয়া হয়এখানে বলা প্রয়োজন ওই অংশটুকুও হজ্জ্ব থেকে ফিরে এসে বিক্রি করে নিজ প্রয়োজনমত খরচ করেছেনএভাবে আপন পিতা-মাতার কাছ থেকে নারীরা বৈষম্যের শিকার হন প্রতিকার করতে গেলে নারীকে হতে হয় অভিসপ্ত, তাছাড়া ধর্মীয়ভাবে যে বৈষম্য আছে তা হলো, ছেলেরা যা পাবে মেয়েরা পাবে তার অর্ধেকসেই সামান্য সম্পত্তিও তারা দাবী করতে পারে নাএরপর সামাজিক কুসংঙ্কার তো আছেইএমন ফতোয়া গ্রাম বাংলার বাতাসে ছড়িয়ে আছে যে মেয়েরা বাপের বাড়ির সম্পত্তি নিলে স্বামীর বাড়ি ধ্বংস হয়ে যায় ফলে ভয়েও বেশিরভাগ নারীরা বাপের বাড়ি সম্পত্তির দাবী নিয়ে দাঁড়ায় নাআল কুরআনের বর্ণনা আমরা এভাবে পাই-

তোমাদের মধ্যে যখন কারো মৃত্যু উপস্থিত হয় আর যদি তার ধন সম্পত্তি থাকে, তবে পিতামাতা ও আত্মীয় স্বজনের জন্য অছিয়ত করার বিধান দেয়া হলো মুত্তাকীদের জন্য ইহা অবশ্য পালনীয়উহা জানার পরও যদি কেউ অছিয়ত পরিবর্তন করে তবে সে পাপী  হবে; নিশ্চই আল্লাহ সব শোনেন, সব জানেন (সুরা বাকারা ১৮০-১৮২)

এখানে যে আহ্বান তা কি সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করা হলো নাআসলে অর্থ ব্যয় করে যে সওয়াব লাভের উদ্দেশ্যে হজ্জ্ব ব্রত পালন করতে যাওয়া সেখানে এক আল্লাহ্‌র বিধান না মানাও একরকম ভং ছাড়া অন্য কিছু মনেই হয় না আমার

নিজ কন্যা সন্তানদের হক নষ্ট করে পবিত্র মক্কা মদিনা ভ্রমন করলে কতখানি সওয়াব লাভ করবেন জানি না, আমার ক্ষুদ্র জানার মধ্যে জেনেছি, আল্লাহ্‌র বান্দার প্রতি অন্যায় করা হয়েছে এমন অন্যায় আল্লাহ্‌ ক্ষমা করেন না যতক্ষণ না এক বান্দা অন্য বান্দাকে ক্ষমা না করেতাহলে ব্যক্তি পিতা যখন সন্তানের হক আদায় না করে মৌখিকভাবে স্বীকার করে পরে নিজেই সম্পদ খেয়ে ফেলেন, সেক্ষেত্রে কুরআনের দিক দিয়ে চিন্তা করলে কি হবে?

এতো গেল নারীদের বাপের বাড়িতে বঞ্চিত হবার নমুনাস্বামী প্রবাসী বাঙালীধনী পরিবার, সকল ভাইদের আলাদা বাড়ী ও জমি রয়েছেসাতবছর বিবাহিত জীবনে একটি মাত্র পুত্র সন্তান জন্মলাভ করলো সন্তানের জন্মের তিন মাসের মাথায় তার স্বামী বিদেশে দুর্ঘটনায় মারা যান বর্তমানে তার বয়স ২৮-৩০ বছর হবে সন্তানের বয়স এখন ৮/৯ বছর কথা হচ্ছিল অতীত সময় নিয়েসেই নারী মূর্তিটির নাম আসমা বেগমআসমার স্বামীর মৃত্যুর পর সকলে মিলে বিয়ের জন্য অস্থির হয়ে গেল স্বামীর বাড়ীর লোকেরা একসময় অস্থির হয়ে গেল বউ তাড়ানোর জন্যহিসেব করে দেখলো ভাইয়ের ছেলেকে ও বউকে রাখলে অনেক সম্পত্তি হাতছাড়া হয়ে যাবেফলে তারাও আসমার বাবাকে মেয়ে বিয়ে দেবার ব্যপারে বেশ তাড়া দিতে লাগলোকিন্তু সদ্য বিধবা আসমা স্বামীর শোকে পাথর হয়ে গেলজাগতিক কোন চিন্তা চেতনা তার মধ্যে কাজ করলো নাসে কেবল ভাবতে লাগলো কেন আমার স্বামী আমাকে একা করে চলে গেলেনশোক তাপ আগলে বেশি দিন সংসারে মানুষগুলো থাকতে দিল নাএক সময় তার ভাসুর বলে বসলো দেবরের সাথে তার বিয়ে দিলে কেমন হয়আসমা ভাবে, একজন নারীর কি বিয়েই একমাত্র শেষ উপায়এর বাইরে কি করনীয় কিছু নেই?

আসমা ভাবে, নারী হিসেবে একজন মানুষ হিসেবে আমার কোন মতামত  নেই? তার কাছে কোন কিছু জিজ্ঞাসা না করেই একের পর এক সিদ্ধান্ত হয়ে যাচ্ছেএকসময় আসমা জাগতিক চেতনায় ফিরলো সন্তানের দিকে তাকিয়ে, তার কাছে মনে হলো সন্তানকে  বাঁচিয়ে তুলতে হবেবড় করতে হবেসে বুঝতে পারলো তার বিয়ে মানে সন্তানকে হাতছাড়া, কোলছাড়া করার নিকৃষ্টতম কূটবুদ্ধি মাত্রসে তখন দৃঢ় প্রত্যয়ী হয়ে উঠলোনা বিয়ে নয়, এই পরিবারের একজন হয়ে নিজ সন্তানের রক্ষা কবচ হয়ে তাকে সামনের উত্থাল সমুদ্র পাড়ি দিতে হবেছেলের বয়স যখন সাত বছর পূর্ণ হলো তখন আসমা তার সন্তানের সম্পত্তি দেখাশোনার অভিভাবক রূপে আইনগত অধিকার পেল সম্পত্তি নিজের নামে নয়, সন্তানের নামেএখানেও কি মনে হয় না, একজন নারী কতখানি অবমূল্যায়ন হলেনএকজন বাল্যবিধবা নারী কিভাবে মানসিকভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন সংসার ও সমাজেবিধবা নারীর জীবন এতটাই গঞ্জনাময় হয় যে, শেষ কালে বিয়ে হয় শ্রেষ্ঠ সমাধানতবে আমার ধারণা একজন নারীর ভরণপোষণের ব্যবস্থা করা গেলে বা সম্পদ থাকলে সে কখনো কারো দারস্থ হবে না বা নির্যাতনের স্বীকার হবে নাআজকের আসমা সময়ের প্রহর গুনছে, ছেলে সাবালক বা ১৮ বছর পূর্ণ হলে সম্পদ নিজ নামে করে নিয়ে নিজের দুর্বল স্থানটিকে সুদৃঢ় করবেএখানেও তখন ক্ষীণ ভয় ছেলে বড় হলে তার আলাদা হওয়ার ইচ্ছা হলে তখন তার অবস্থান কোথায় হবেনারীর জীবন প্রতিনিয়ত লড়াই করে টিকে থাকতে হয়যুগে যুগে পুরুষতান্ত্রিকতার মধ্য দিয়ে নারী যাতে  কোন কালে সম্পদের উত্তরাধিকারী হতে না পারে তার দিকে জোরদার প্রচেষ্টা বলবৎ রয়েছেনারী চিরকাল যাতে পুরুষের পদতলে সেবাদাসী রূপে গড়ে ওঠে সেই চিন্তার বীজ বুনে দেয়া হয় নারী সত্তার মগজেআর সেই চিন্তার বীজ সকল কালে নারীদের ভেতরে স্থায়ী হয়ে রয়েছেআজকের এই তথ্য প্রযুক্তির যুগেও নারীকে কখনো আপাদমস্তকে মানুষ বলে মনে হয় নাতাকে ভোগ বিলাসের একটা মাধ্যম ছাড়া কিছুই ভাবা যায় নাযতই বলি নারী অধিকার নারী মুক্তি বিষয়টা সমাজ কাঠামোগতভাবে একরকম হাস্যকর ভাবে উপস্থাপন করেএর যুক্তিবিচার করলে মনে হয় আজকের প্রথাগত বলয় থেকে যারা নিজেকে মুক্ত করার প্রয়াসী শিক্ষা-দীক্ষা, কৃষ্টি সভ্যতার মাঝে তারাও যেন সাবলীল গতিতে চলতে পারছেন নাসম্পদে নারী অধিকারএ প্রসঙ্গে আর একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে একব্যক্তি জীবিতকালে দুটি বিবাহ করেছেনদুই সংসারে ছেলেপুলেও আছেপ্রথম স্ত্রীর ঘরে পাঁচ সন্তানতিনজন কন্যা ও দুইজন পুত্র সন্তান দ্বিতীয় স্ত্রীর একছেলে ও একমেয়েবাবার জীবদ্দশায় দ্বিতীয় স্ত্রীর ছেলেটি মারা যায়ওই ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার সম্পত্তি প্রথম স্ত্রীর সন্তানরা নিজেদের নামে লিখিয়ে নিলেন কিন্তু বৈমাত্রেয় বোনটিকে একটি পয়সাও দিলেন না নারীদের জন্য আমার বলা এতটুকুই যে, আজকে আপনি কোন নারীর ন্যায় সঙ্গত অধিকারে পথ আগলে দাঁড়ালে কে বলতে পারে একদিন আপনার কন্যা সন্তানটিও এমনভাবে বঞ্চিত হতে পারে কোন এক প্রেক্ষাপট ধরে নিজেদের স্বার্থে নিজেদের সম্মিলিত মঙ্গলের জন্য নারী হয়ে নারীর ন্যায় ও বাস্তব সম্মত নীতির পক্ষে রায় দিনতাতে করে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাবে নারীর অধিকার রক্ষায় এক বৃহৎ আন্দোলনের সূচনা ঘটবেসমাজ, সংসার ও রাষ্ট্রীয়ভাবে অধিকার প্রতিষ্ঠার পূর্বেই প্রয়োজন নারীর জাগরণনারী চেতনায় ঝড় না উঠলে  অধিকার কার্যকর হবে নাচিরকাল ঠকে ঠকে নারী যে জঞ্জালময় গহ্বরে নিমজ্জিত সেখান থেকে পরিত্রাণের চেষ্টা নারীকেই করতে হবেআজকের যে প্রয়োজন নারীদের জীবনে দেখা দিয়েছে তা বহুকাল আগেও ছিলকিন্তু সেটা পাওয়ার সহজ রাস্তাটি জানা ছিল না

আজ যখন শিক্ষার মাধ্যমে জানছেন তখন আপনার করনীয় কর্তব্যকে সামনে রেখে এগিয়ে যান

পরিবারে কিংবা পরিবারের বাইরে যখন কোন সম্পদ বন্টন সভা বসবে তখন খেয়াল রাখবেন নারীর সম্পদ বন্টনে বাদ পড়লে জোর কন্ঠে আওয়াজ তুলুন আর যদি বন্টনের ক্ষেত্রে বৈষম্যের ব্যাপার লক্ষ্য করেন তাহলে ন্যায় সংগত কারণে নারীর পক্ষে রায় দিন ও দাবী আদায়ে সচেষ্ট হোনএ সম্পদ শুধুমাত্র সম্পদ নয় এটা একটা অধিকারসেখানে কোন প্রকার আপোষ করবেন না

নিজ পরিবারে কর্তার পাশে বসে যখন সম্পদ বন্টন করবেন তখন আপনার পাশে বসা কর্তা কোন কারনে আপনার কন্যা সন্তানকে ভুলে গেলে প্রথম আপনি স্বোচ্চার হোনসেখানে আপনি মা নন, বোন নন, ভাইয়ের স্ত্রী নন, আপনার পরিচয় একটা০ই হোক আপনি একজন নারী আপোষহীন, সমঝোতাহীন নারী