|
ফতোয়া অবৈধঃ
ফতোয়াবাজদের দৌরাত্ম্য থেকে জাতি মুক্ত
শেখ উল্লাস
॥
‘ধর্ম মানবতার
জন্য, কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থের জন্য নয়’
- এই কথাটি সমাজের সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠিত করতে দীর্ঘ দিন ধরে
সভা-সেমিনার-গবেষণা-আলোচনা-লেখা-লেখি করে আসছে সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপ।
ধর্মের
নামে এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে ধর্মভীরু ও ধর্মান্ধ বানিয়ে নিজেদের কায়েমী
স্বার্থ উদ্ধার করে যাচ্ছে ফতোয়াবাজ ধর্মব্যবসায়ীরা।
ফলে
ধার্মিক ও ধর্মপ্রাণ মানুষের সংখ্যা দিন দিনই কমে যাচ্ছে, যার খেসারত দিতে
হচ্ছে সমাজকে, দুর্নীতিসহ যাবতীয় মিথ্যাচার কায়েম হচ্ছে সর্বত্র।
তথাকথিত
ধর্মবেত্তারা নিজেদের স্বার্থে ধর্মের বিশেষ করে ইসলাম ধর্মের মনগড়া ব্যাখ্যা
বিশ্লেষণ করছে যার অপর নাম ফতোয়াবাজি।
গত ৮
জুলাই বৃহস্পতিবার ফতোয়ার নামে সংঘটিত সব ধরনের বিচারবহির্ভূত কার্যক্রমকে
অবৈধ ও আইন বহির্ভূত বলে রায় দিয়েছে হাইকোর্ট।
ফতোয়ার
নামে দণ্ডদাতাদের অপরাধী গণ্য করে তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে মামলা দায়েরের
নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
এই
ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে ধর্মের অপব্যবহার-কারীদের কবল থেকে এদেশের ধর্মপ্রাণ
মুসলমানরা এবার মুক্তি পাবে বলে আশা করছে জাতির বিবেকবান মহল।
ধর্মব্যবসায়ী ও ফতোয়াবাজদের দৌরাত্ম্য থেকে জাতিকে মুক্ত করা না গেলে এদেশের
অসাম্প্রদায়িক, উদার ও প্রকৃত ধার্মিক জনগোষ্ঠীর ভিতকে শক্তিশালী করা কখনো
সম্ভব হবে না।
আদালতের রায়ের
বিস্তারিত বিবরণঃ হাইকোর্টের বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি গোবিন্দ
চন্দ্র ঠাকুরের বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেন।
এতে বলা
হয়েছে, ফতোয়ার নামে যেকোনো ধরনের শাস্তি ঘোষণা সংবিধান ও দেশের প্রচলিত আইনের
পক্ষে সাংঘর্ষিক।
ফতোয়ার
নামে এ ধরনের শাস্তি যারা ঘোষণা করবেন, তাদেরসহ যারা এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে
সম্পৃক্ত থাকবেন, তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে অপরাধের সহযোগী হিসেবে একই
ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
ফতোয়াবাজির
ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হাইকোর্টে জনস্বার্থে আইন ও
সালিশ কেন্দ্র (আসক), বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট
(ব্লাষ্ট), ব্র্যাক, নারীপক্ষ ও নিজেরা করি - এই পাঁচ সংগঠন এবং সুপ্রীম
কোর্টের তিন আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুব শফিক, কে এম হাফিজুল আলম ও এম
ইমরানুল হাই পৃথক তিনটি রিট করেছিলেন।
এর মধ্যে
গত বছর একটি এবং চলতি বছর দুটি রিট করা হয়।
এর মধ্যে
একটি রিট হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দোর্রা মারার ঘটনাকে কেন্দ্র করে।
যে
ঘটনাটি ছিল এরকম, গত ২১ মে জেলার বাঞ্চারামপুর উপজেলার পূর্বপাড়ায় আওয়ামী
লীগের কিছু নেতার সহযোগিতায় এলাকার তিন ইমাম এক তরুণীকে ১০১ দোর্রা মারার
ফতোয়া দেন।
দোর্রা
মারার পরদিন তা পত্র-পত্রিকায় ও জনসমক্ষে উঠে আসে।
বিচার
বহির্ভূত এই শাস্তির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী
ব্যারিস্টার মাহবুব শফিক, এ্যডভোকেট কে এম হাফিজুল আলম ও ইমরানুল হাই
জনস্বার্থে হাইকোর্টে রিট আবেদন করলে শুনানী শেষে ওই দিন রুল জারি করা হয়।
ভিক্টিম
ও তার মাকে হাইকোর্টে এনে তাদের জবানবন্দি নেন আদালত।
এর আগে ২০০১
সালের ১ জানুয়ারি বিচারপতি মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানী ও বিচারপতি নাজমুল আরা
সুলতানার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এক ঐতিহাসিক রায়ে সব ধরনের ফতোয়াবাজিকে
অবৈধ ঘোষণা করেছিলেন।
ফতোয়াকে
একটি আইনী মতামত হিসেবে বর্ণনা করে রায়ে বলা হয়েছিল, সংবিধান অনুযায়ী কেবল
আদালতই এ ধরণের মতামত দিতে পারে।
ওই রায়ে
অননুমোদিত কর্তৃপক্ষের জারি করা সব ধরনের ফতোয়াকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ গণ্য করে
আইন প্রনয়ণ করতে সংসদের কাছে সুপারিশ করা হয়েছিল।
এছাড়া
রায়ে সব স্কুল ও মাদ্রাসায় মুসলিম পারিবারিক আইন ও অধ্যাদেশ পাঠ বাধ্যতামূলক
করার জন্যও সব মসজিদের ইমামকে জুমার নামাজের দিন এ অধ্যাদেশ সম্পর্কে আলোচনা
করার নির্দেশ দানের সুপারিশ করা হয়েছিল।
কিন্তু জাতির
দুর্ভাগ্য ও দুঃখজনক দিকটি হলো দীর্ঘ ১০ বছর হতে চল্লো হাইকোর্টের সেই
সুপারিশ বাস্তবায়নে সংসদকে কার্যকর করার কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি।
অধিকন্তু ২০০১-২০০৬ সময়কালে বিএনপি-জামাত জোট রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন
থাকাকালে জঙ্গীবাদ, সন্ত্রাসবাদসহ যাবতীয় অনাচার অনিয়ম তুঙ্গে উঠতে সহায়তা
করেছে যার পিছনে কাজ করে ছিল ফতোয়াবাজি।
বর্তমানে
যুদ্ধাপরাধীসহ বড় বড় সকল অনিয়ম ও সন্ত্রাসের বিচার প্রক্রিয়া আবার শুরু
হয়েছে।
ধর্মীয়
অনুভূতিতে আঘাত হানার জন্য দায়ের করা মামলায় ইতোমধ্যে জামাতের শীর্ষস্থানীয়
নেতাদের গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে।
যা
একটি শুভ উদ্যোগ বলেই মনে করছে সংশ্লিষ্ট বিবেকবান মহল।
জামাতের এই নেতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধেরও অভিযোগ রয়েছে।
দেখা
যাচ্ছে যারা যুদ্ধাপরাধ করেছে তারাই পবিত্র ইসলাম ধর্মকে কলুষিত করছে,
ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়েছে, ফতোয়াবাজি করে নিজেদের ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থ
আদায়ের জন্য।
সময়
এসেছে এই ফতোয়াবাজি ধর্মব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য থেকে মোহাম্মদী ইসলাম রক্ষা
করে দেশবাসীকে মুক্ত করতে।
সরকারকে এখন এগুতে হবে অত্যন্ত সতর্কতা ও আন্তরিকতার সাথে।
|