‘মা
প্রকৃতি নিজের হাতে আমাদের চেহারায় ও ভাষায় বাঙালিত্বের এমন ছাপ রেখে
দিয়েছেন যে মালা-তিলক-টিকিতে কিংবা টুপি-লুঙ্গি-দাড়িতে ঢাকবার জো-টি নেই।’
মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর এ-দুঃসাহসিক উক্তি বাঙালির জাতীয় চেতনা শাণিতকরণে
মাইলফলকের ভূমিকা আজও পালন করে যাচ্ছে।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার (১৯৪৭) পরপরই দেশের রাষ্ট্রভাষা উর্দু হবে,
না বাংলা হবে এ বিতর্ক সৃষ্টি হলে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে জোরালো
বক্তব্য উপস্থাপন করেন।
তাঁর এ ভূমিকার ফলে তৎকালীন পূর্ব বাংলায় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পথ
প্রশস্ত হয়।
জন্ম,
পেয়ারা গ্রাম,
চব্বিশ পরগনা,
পশ্চিমবঙ্গ,
১০ জুলাই ১৮৮৫।
ভাষাবিদ,
ভাষাবিজ্ঞানী,
গবেষক ও শিক্ষাবিদ।
১৯০৪-এ হাওড়া জেলা স্কুল থেকে এন্ট্রাস পাস।
বিভিন্ন ভাষার প্রতি উৎসাহ এবং একাধিক ভাষা শিক্ষার সূত্রপাত এই বয়সেই
হয়েছিল।
১৯০৬-এ কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এফ.এ. পাস।
১৯০৮-১৯০৯-এ যশোর জেলা স্কুলে শিক্ষকতা।
১৯০৯-১৯১০-এ কলকাতা সিটি কলেজে অধ্যয়ন ও সংস্কৃতে অনার্সসহ বি.এ.পাস।
১৯১২-তে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বে এম. এ. পাস।
১৯১১-১৯১৫-তে সদ্য প্রতিষ্ঠিত বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির (৪
সেপ্টেম্বর ১৯১১) সম্পাদক।
১৯১৩-তে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের সহায়তায় জার্মানিতে উচ্চশিক্ষা লাভের
জন্য ভারত সরকারের বৃত্তি লাভ,
কিন্তু স্বাস্থ্য সম্পর্কিত ছাড়পত্রের অভাবে বিদেশ যাত্রায় ব্যর্থ।
১৯১৪-তে বি.এল.পাস।
১৯১৫-এর মার্চ মাস পর্যন্ত সীতাকুন্ড হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক।
একই বছর আল আসলাম পত্রিকার সহ-সম্পাদক।
১৯১৫-১৯১৯-এ চব্বিশ পরগনা জেলার বশিরহাটে আইন ব্যবসা।
স্থানীয় পৌরসভার ভাইস-চেয়ারম্যান নির্বাচিত।
১৯১৭-তে দ্বিতীয় বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সম্মেলনের সভাপতি।
১৯১৮-১৯২১ পর্যন্ত বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি ও সমিতির মুখপাত্র
‘বঙ্গীয়
মুসলমান সাহিত্য পত্রিকার যুগ্ম-সম্পাদক।
১৯১৯-১৯২১ পর্যন্ত ড. দীনেশচন্দ্র সেনের সহকর্মী হিসেবে কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে শরৎকুমার লাহিড়ী গবেষণা সহায়ক পদে দায়িত্ব
পালন।
১৯২১-এর ২ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগে প্রভাষক পদে
যোগদান।
একই সঙ্গে সলিমুল্লাহ হলের আবাসিক শিক্ষক (১৯২৫ পর্যন্ত)।
১৯২৬-এর ১৯ জানুয়ারি ঢাকায়
‘মুসলিম
সাহিত্য সমাজ’
কর্তৃক আয়োজিত প্রতিষ্ঠা সভার সভাপতি।
১৯২৬-১৯২৮ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে খণ্ডকালীন অধ্যাপক।
১৯২৩-এর ২২ ও ২৩-এ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত শান্তি নিকেতনের সমাবর্তন উৎসবে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান।
১৯২৬-১৯২৮ পর্যন্ত প্যারিসের সরবন বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈদিক ভাষা,
প্রাচীন ফার্সি,
তিব্বতি,
বিভিন্ন আধুনিক ভারতীয় ভাষা অধ্যয়ন ও পি.এইচ.ডি. ডিগ্রি অর্জন,
উপরন্তু ডিপ্লোমা-ফোন সনদপত্র লাভ।
১৯২৭-১৯২৮- এ সরবনে পাঠরত অবস্থাতেই এক অবকাশে জার্মানির ফ্রাইবুর্গ
বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈদিক,
সংস্কৃত ও প্রাকৃত ভাষা অধ্যয়ন।
১৯২৮-এর আগস্ট মাসে দেশে প্রত্যাবর্তন এবং প্রাক্তন কর্মস্থলে যোগদান।
একই বছরের অক্টোবর মাসে কলকাতায় অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় নিখিল বঙ্গ মুসলিম যুবক
সম্মেলনে সভাপতিত্ব।
১৯৩৭-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগ পৃথক হলে বাংলা
বিভাগের অধ্যক্ষ ও রিডার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ।
১৯৪০-১৯৪৪ পর্যন্ত ফজলুল হক মুসলিম হলের প্রভোস্ট।
১৯৪১-এ হায়দ্রাবাদে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত প্রাচ্যবিদ্যা সম্মেলনে
ভাষাতত্ত্ব শাখার সভাপতি,
এবং ফিলোসপি এন্ড ইন্ডিয়ান লিঙ্গুইসটিক্স নামক প্রবন্ধ পাঠ।
১৯৪২-এ ঢাকায়
‘সোভিয়েত
সুহৃদ সমিতি’
কর্তৃক আয়োজিত
‘সোভিয়েত
মেলা’
নামক চিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন।
১৯৫৩-১৯৫৫ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের
ফরাসি ভাষার খন্ডকালীন অধ্যাপক।
১৯৪৪-এ বাংলা বিভাগের রিডার ও অধ্যক্ষের পদ থেকে অবসর গ্রহণ করার পর
বগুড়ায় আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষের পদে যোগদান।
১৯৪৫-এ জয়পুরে অনুষ্ঠিত পি.ই.এন. আয়োজিত নিখিল ভারত লেখক সম্মেলনে যোগদান।
১৯৪৮-এ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনের সভাপতি।
একই বছরের নভেম্বর মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে সংখ্যাতিরিক্ত
অধ্যাপক হিসেবে বাংলা বিভাগে পুনরায় যোগদান।
১৯৫৫-এর ১ ডিসেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগের
অধ্যক্ষপদে যোগদান এবং ১৯৫৮-এর ডিসেম্বরে অবসর গ্রহণ।
১৯৫৮-এর নভেম্বর মাসে মাদ্রাজে অনুষ্ঠিত
‘ইন্টারন্যাশনাল
সেমিনার অন ট্রেডিশনাল কালচার ইন সাউথ-ইস্ট এশিয়া’-তে
ইউনেস্কো মনোনীত প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান ও সেমিনারের চেয়ারম্যান নিযুক্ত।
১৯৫৯-১৯৬০-এ করাচিতে অবস্থিত উর্দু উন্নয়ন সংস্থা পরিচালিত উর্দু-অভিধান
প্রকল্পের সম্পাদক নিযুক্ত এবং এক বছরকাল সেখানে অবস্থান।
১৯৬০-এর ১ জুলাই
‘পূর্ব
পাকিস্তানি আদর্শ অভিধান’
প্রকল্পের সম্পাদক হিসেবে বাংলা একাডেমীতে যোগদান।
১৯৬১-১৯৬৪-তে বাংলা একাডেমীর ইসলামি বিশ্বকোষ প্রকল্পের অস্থায়ী সম্পাদক।
একই সময়ে পাকিস্তান এশিয়াটিক সোসাইটির সভাপতি।
১৯৬৩-তে
‘পূর্ব
পাকিস্তানি ভাষার আদর্শ অভিধান’
প্রকল্পের প্রথম অংশ
‘পূর্ব
পাকিস্তানি আঞ্চলিক ভাষার অভিধান’
প্রণয়নের কাজ সমাপ্ত।
১৯৬৩-১৯৬৪-তে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার কর্তৃক নিযুক্ত ইসলামি
বিশ্ববিদ্যালয় কমিশনের সদস্য।
একই সময়ে ঢাকার ইসলামিক একাডেমীর কার্যনির্বাহক সভার সদস্য।
১৯৬২-১৯৬৭ পর্যন্ত বাংলা কলেজের সাংগঠনিক সংসদ ও ব্যবস্থাপক সংসদের
সভাপতি।
১৯৬৩-তে বাংলা একাডেমী কর্তৃক গঠিত বাংলা পঞ্জিকার তারিখ বিন্যাস কমিটির
সভাপতি।
এই কমিটি কর্তৃক উদ্ভাবিত তারিখ যুক্তিসম্মত ও সহজে অনুসরণযোগ্য।
রচনাকর্ম-গবেষণা: প্রায় চল্লিশ (৪০)টি।
১৯৬৭-তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ইমেরিটাস প্রফেসর পদ লাভ।
তৎকালীন পাকিস্তান সরকার-কর্তৃক রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রাইড অব পারফরম্যান্স,
১৯৬৭-তে ফরাসি সরকার কর্তৃক নাইট অব দি অর্ডারস অব আর্টস অ্যান্ড লেটার্স
পদক প্রদান।
আদমজী,
দাউদ প্রভৃতি সাহিত্য পুরস্কার কমিটির স্থায়ী সভাপতিরূপে দায়িত্ব পালন।
বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান সম্পাদনা তাঁর জীবনের প্রধান একটি কাজ।
তিনি প্রাচ্যের অন্যতম ভাষাবিজ্ঞানী।
একজন খাঁটি বাঙালি ও ধর্মপ্রাণ মুসলমান।
ধর্মীয় অনুভূতি অপেক্ষা জাতীয় অনুভূতিকে অধিক গুরুত্ব প্রদান।
বাঙালি জাতির কাছে চিরস্মরণীয় ছিলেন-আছেন-থাকবেন।