পরিস্থিতি মোকাবিলায় গত সপ্তাহে বুধবার কাশ্মীরে সেনা মোতায়েন করেছে
ভারত।
রাজ্য প্রশাসনকে সহযোগিতা করার জন্যই সেনা পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে
ভারত।
কাশ্মীরের কারফিউ কবলিত এলাকায় হিংসা মোকাবিলায় প্রতিরোধক ব্যবস্থা
হিসেবে কাজ করবে সেনাবাহিনী।
ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের রাষ্ট্রমন্ত্রী এম এম পাল্লাম
রাজু জানিয়েছেন,
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলেই একমাত্র সেনাবাহিনীকে ব্যবহার
করা হবে।
কাশ্মীর উপত্যকার বিভিন্ন এলাকায় ফ্ল্যাগ মার্চ করে সেনাবাহিনী।
গত সপ্তাহে মঙ্গলবার কাশ্মীরের পরিস্থিতি ফের অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে।
নিরাপত্তাবাহিনীর গুলিতে চারজনের মৃত্যুর পর পরিস্থিতি ক্রমশ
নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে মুখ্যমন্ত্রী ওমর আব্দুল্লা রাতেই
কথা বলেন কেন্দ্রের সঙ্গে।
কাশ্মীরের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সেনা পাঠানোর জন্য
কেন্দ্রের কাছে আবেদন করেন তিনি।
এর পরিপ্রেক্ষিতে গত সপ্তাহে বুধবার সকালে নিরাপত্তা সংক্রান্ত
ক্যাবিনেট কমিটির বৈঠক বসে।
প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে এই বৈঠকেই কাশ্মীরে সেনা মোতায়েনের
সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র পি চিদাম্বরম,
প্রতিরক্ষামন্ত্রী এ কে অ্যান্টনি,
ক্যাবিনেট সেক্রেটারি কে মেনন,
স্বরাষ্ট্র সচিব কে পিল্লাই এবং প্রতিরক্ষা সচিব উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় কাশ্মীরে মোতায়েন করা হলেও সেনাবাহিনী একটি
নির্দিষ্ট চৌহদ্দির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।
জনবহুল এলাকায় সেনা পাঠানো হবে না।
বিশৃঙ্খলা এবং হিংসা সৃষ্টিকারীদের মোকাবিলা করার জন্যই সেনাবাহিনীকে
ব্যবহার করা হবে।
উপত্যকায় স্বাভাবিক পরিস্থিতি না ফেরা পর্যন্ত সেনাবাহিনী মোতায়েন
থাকবে বলে জানা গেছে।
বৈঠকেই সিদ্ধান্ত হয় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র সচিব জি কে পিল্লাই
পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে শ্রীনগর যাবেন।
সেই মতো এদিন শ্রীনগরে যান পিল্লাই।
মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেন।
উপত্যকায় আইন শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কেন্দ্রীয় সরকার সব রকমের সহযোগিতা
করবেন বলে তিনি মুখ্যমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করেন।
মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পরেই পিল্লাই সিআরপিএফ,
সেনাবাহিনী,
রাজ্য পুলিশের আধিকারিক এবং গোয়েন্দা বিভাগের আধিকারিকদের নিয়ে একটি
বৈঠক করেন।
এর আগেই পিল্লাই রাজ্য পুলিশের প্রধান কুলদীপ খোদা এবং সেনাবাহিনীর
১৫নং বাহিনীর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল জি এস মারওয়ার সঙ্গে বৈঠক
করেন।
মুখ্যমন্ত্রী ওমর আব্দুল্লা বুধবার টেলিফোনে প্রধানমন্ত্রীকে কাশ্মীর
উপত্যকার আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সবিস্তার জানান।
ওমর আব্দুল্লা টেলিফোনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরম এবং
প্রতিরক্ষামন্ত্রী এ কে অ্যান্টনির সঙ্গেও টেলিফোনে কথা বলেন।
এদিকে সেনাবাহিনী ফ্ল্যাগ মার্চ করলেও ওই বুধবার কাশ্মীরের বিভিন্ন
জায়গায় রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখায় জনতা।
বহু জায়গায় সেনাবাহিনীর ফ্ল্যাগ মার্চের সময়েই মসজিদগুলোর ভেতরে জড়ো
হওয়া জনতা নিরাপত্তাবাহিনীর বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে এদিনও বারমুলা জেলায় উত্তেজিত জনতা
নিরাপত্তাবাহিনীকে লক্ষ্য করে পাথর ছোঁড়ে।
সোপোর,
ছানকান,
অসপীর,
অমরগড়,
সিমেট ব্রিজ,
খাজা বাগ,
পুরানো বারমুলা শহর,
পালহাল্লান এবং জামিয়া কাদিম এলাকা শান্তিপূর্ণ বলে জানিয়েছে পুলিশ।
আবার বাতমালো,
ছাত্তাবাল,
রামবাগ এলাকায় মানুষ সকালেই মসজিদের ভিতরে ঢুকে যান।
সেখান থেকেই স্লোগান দেন।
বুদগাম জেলার নওগাম এলাকায় বিক্ষোভ দেখায় জনতা।
সেনাবাহিনীর মুখপাত্র কর্নেল জেএসব্রার জানিয়েছেন,
পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
কারফিউ জারি আছে।
আমরা এখানে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত আছি।
আমাদের প্রয়োজন পড়লেই কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমরা পুলিশ,
সিআরপিএফ এবং প্রশাসনকে সাহায্য করতে নেমে পড়তে পারবো,
জানিয়েছেন ব্রার।
কাশ্মীরে সেনা মোতায়েনের সমালোচনা করেছে কাশ্মীর রাজ্যের প্রধান
বিরোধীদল পিডিপি।
রাজ্য সরকারের কড়া সমালোচনা করে পিডিপি-র মুখপাত্র জানিয়েছেন,
রাজ্য সরকার মানুষের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে পারে না।
এখন নিরস্ত্র মানুষদের মোকাবিলা করার জন্য সেনা নামাচ্ছে।
নয়াদিল্লিতে কংগ্রেস মুখপাত্র জয়ন্তী নটরাজন কাশ্মীরের পরিস্থিতি নিয়ে
গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন,
কাশ্মীরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পিছনে সীমান্তপারের পাকিস্তানের
বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হাত আছে! স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফেরাতে কেন্দ্র ও
রাজ্য সরকার যে পদক্ষেপ নেবে কংগ্রেস তাকে সমর্থন জানাবে বলে তিনি
জানান।
জানা গেছে,
জম্মু কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী সাধারণ মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।
নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে আছেন তিনি।
এতে কংগ্রেস প্রবল উদ্বিগ্ন।
রাজ্যে সোনিয়া গান্ধীর দল ওমরের ন্যাশনাল কনফারেন্সের সঙ্গে জোট সরকারে
আছে।
আবার,
ওমরের বাবা ফারুক আবদুল্লা কেন্দ্রে মনমোহন সিং সরকারের শরিক মন্ত্রী।
কাশীরে গত কয়েকদিনের ঘটনায় পরিস্থিতি যেভাবে প্রশাসনের হাতের বাইরে চলে
যাচ্ছে,
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তার দায় কংগ্রেসকেই নিতে হবে।
ওমরের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ব্যর্থতা তখন ধামাচাপা পড়ে যাবে।
এমনটাই কংগ্রেস হাইকমান্ডের আশঙ্কা।
গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এবং কেন্দ্রীয় স্বরামন্ত্রী পি
চিদাম্বরম তাঁকে রাজ্যের অগ্নিগর্ভ জেলাগুলোর সাধারণ মানুষের কাছে যেতে
টেলিফোনে অনেক বোঝান।
তারপরও ওমর মাত্র একবারই বারামুলা জেলায় গিয়ে জেলা শাসকের দপ্তরে বসে
বৈঠক করে ফিরে যান শ্রীনগরে।
শরিক মুখ্যমন্ত্রীর এহেন উদাসীনতায় কংগ্রেস হাইকমান্ড যার পরনাই
বিস্মিত।
তবে ভারত কেন্দ্র কাশ্মীর উপত্যকায় চলতি অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির
মোকাবিলায় খুব বেশিদিন সেনাবাহিনী মোতায়েন করে রাখুক,
তাও চাইছে না কংগ্রেস হাইকমান্ড।
কারণ,
তাতে বিরূপ রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া হতে পারে,
বিশেষত,
আন্তর্জাতিক মহলে।
ভারতীয় রাজনীতির সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ইস্যু কাশ্মীর।
তাই কাশ্মীরের চলতি হিংসার জেরে মোতায়েন করা সেনাকে যত শীঘ্র সম্ভব
ব্যারাকে ফেরাতে হবে বলে গত শুক্রবার কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী,
প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং,
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদম্বরম,
কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায়,
প্রতিরক্ষামন্ত্রী এ কে অ্যান্টনির মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে কথা
হয়েছে।
জানা গেছে,
সোনিয়ার পৌঁরোহিত্যে কংগ্রেস কোর গ্রুপের বৈঠকে চিদাম্বরম দলীয়
সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রীকে কাশ্মীর পরিস্থতির সর্বশেষ রিপোর্ট দেন।
এদিকে সংবাদ সংস্থার খবর,
শুক্রবার টানা চতুর্থদিন কাশ্মীর উপত্যকায় কার্ফু বহাল ছিল।
তবে জুম্মাবারের নমাজে যোগ দিতে যাতে সাধারণ মানুষের সুবিধা হয়,
সেজন্য তা কিছুটা শিথিল করা হয়।
এদিনও পাথর নিক্ষেপকারীদের বিরুদ্ধে ধরপাকড় অভিযান চালিয়েছে পুলিশ।
কট্টরপন্থী হুরিয়তের তিনকর্মী সহ প্রায় দু’ডজন
পাথর নিক্ষেপকারীকে গ্রেফতার করা হয়।
তিনজনের বিরুদ্ধে যুবকদের খেপিয়ে তোলার অভিযোগ আনা হয়েছে।
উপত্যকায় চলতি হিংসার পিছনে যে সৈয়দ আলি শাহ্ গিলানির অনুগামীদের মদত
রয়েছে,
টেলিফোনে আড়ি পেতে শোনা এক বার্তায় নিরাপত্তাবাহিনীর কাছে এটা পরিস্কার
হয়ে গিয়েছে।
ওই বার্তায় শোনা গিয়েছে,
কট্টরপন্থীদের এক নেতা তার অনুগামীদের হিংসা ছড়িয়ে আরও কিছু মানুষকে
শহিদ করার নির্দেশ পাঠাচ্ছে।
এরপরই ধরপাকড় অভিযান শুরু হয়।
সাবির আহমেদ ওয়ানি নামে ওই নেতা ধরা পড়েছে।
এর মধ্যেই এদিন উত্তর কাশীরের সোপোরে জঙ্গিরা তিনটি স্থানে হামলা চালায়।
জঙ্গিদের ছোঁড়া গ্রেনেডের ঘায়ে জখম হন দু’জন
পুলিশকর্মী।
তিনটির পিছনেই লস্কর ই তোইবা জড়িত।
বৈঠকে শীর্ষ কংগ্রেস নেতৃত্বের মধ্যে আলোচনা হয়েছে,
ওমর শ্রীনগরে বসে শুধু মুষ্টিমেয় কমান্ডারের সঙ্গে পরামর্শ করে ভাবছেন,
তিনি এই গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতির মোকাবিলা করছেন।
কিন্তু এতে পরিস্থিতি আরও বিগড়ে যাচ্ছে।
সেনা মোতায়েন করে কাশ্মীর উপত্যকার চলতি গৃহযুদ্ধের জ্বলন্ত পরিস্থিতি
সামাল দেয়া যাবে না।
কাশ্মীরের জেলায় জেলায় সাধারণ মানুষ,
দোকানদার,
ছোট ব্যবসায়ী,
অভিভাবকদের সঙ্গে মুখোমুখি হয়ে ওমরকে বোঝাতে হবে যে,
সমাজের এই অবিরাম পাথর ছোঁড়ার জঙ্গিপনায় রাজ্যের সর্বনাশ হয়ে যাচ্ছে।
পযর্টন,
অর্থনীতি ও ব্যবসা লাটে উঠছে,
কাশ্মীরকে এরপর কেউ বাঁচাতে আসবে না।
মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে ওমর শক্ত হাতে প্রশাসনের হাল না ধরলে জঙ্গিরা এবং
তাদের পাকিস্তানি মদতদাতা,
পৃষ্ঠপোষক আই এস আই কাশ্মীর উপত্যকার রাজনীতি ও সমাজ জীবনে আরো
জাঁকিয়ে বসবে,
সেই বিপদের আশঙ্কার কথাও প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের বাংলোয় কংগ্রেস
কোর গ্রুপের বৈঠকে উঠেছে বলে জানা গেল।