|
ভেনেজুয়েলায়
সন্ত্রাসে মেতেছে আধিপত্যবাদ
সংলাপ
॥
সাভেজ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার দু'বৎসর
পূর্বে ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বর মাসে ফ্রান্সের সামরিক ও পুলিশ সংক্রান্ত
সাময়িক পত্রিকা
'রেডস'
লিখেছিল -প্রতি সপ্তাহান্তে ৮০ জন মানুষ হত্যা,
গণ-পরিবহনের উপর আক্রমণ নিত্যকার ঘটনা,
দারিদ্র্য ব্যাখ্যাতীত হারে বৃদ্ধি এবং আর্থিক সঙ্কট যা দেশটাকে গত ১৫
বছরের বেশি সময় ধরে ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির হার ১০০% ছাড়িয়ে
গেছে-কারাকাস বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক শহরে পর্যবসিত হয়েছে,
সম্ভবত সর্বাধিক বিপজ্জনক।
অল্পসংখ্যক মানুষেরই তা স্মরণে রয়েছে।
বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে সঙ্গে প্রচার মাধ্যমও সাভেজকেই দায়ী করছে বর্তমান
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে।
২০০৮ সালের পরিসংখ্যান অনুসারে ভেনেজুয়েলায় নরহত্যার হার ৪৮ প্রতি ১ লক্ষ
জনসংখ্যার বিচারে যা উদ্বেগজনক।
কারাকাসে এই হার প্রায় ১২৭,
যেখানে ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে ১৯৭৬টি হত্যার
ঘটনা হয়েছে।
ফ্রান্সের পত্রিকা লা এক্সপ্রেস মে মাসে লিখেছে,
'রাষ্টপ্রতি
উগো সাভেজের বলিভারীয় বিপ্লবের নেতৃত্বে,
ভেনেজুয়েলার রাজধানী বিশ্বের অন্যতম হিংস্র শহরে পরিণত হয়েছে।'
এই
মনোভাবের তীব্র বিরোধিতা করে বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী মিগুয়েল অ্যাঞ্জেল পেরেজ
অভিযোগ করেছেন যে-'ওরা
আমাদের বিশ্বাস করাতে চাইছে যে নিরাপত্তাহীনতা হলো সাভেজিমের ফসল।
ওরা
ভুলে যাচ্ছে যে আটে'র
দশকের শেষ ভাগ ও
'নয়'-এর
দশকের প্রথম ভাগে কী ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি ছিল।
আপনি রাস্তায় বেরোতে পারতেন না।'
প্রসঙ্গত,
২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভেনেজুয়েলা আইনসভায় নির্বাচন,
তার
উল্লেখ করে তিনি বলেছেন -
'এটা
নির্বাচনের বছর।
নির্বাচনের বছরে আমরা যাকে নিরাপত্তাহীনতার রেখাচিত্র বলি তা বৃদ্ধি পায়।
নিরাপত্তাহীনতা হলো বিরোধীদের যুদ্ধের ঘোড়া এবং প্রচারমাধ্যম সেই আগুনে
হাওয়া দিচ্ছে।'
প্রতি সোমবার বেলো মন্টের মর্গে একদল সাংবাদিক জড়ো হয়ে নিহত ব্যক্তিদের
পরিবারের সঙ্গে মিলিত হয়ে উত্তেজনার পারদ চড়ায়।
স্পেনের সংবাদপত্র এল পায়াস গত ১৮ই এপ্রিল লিখেছে,
'কারাকাস
একটি রক্তাক্ত শহর।
এর
বাড়িগুলো থেকে রক্তের নদী প্রবাহিত হয় এবং পাহাড় থেকে রক্তনদী গড়িয়ে চলে,
এর
প্রতিটি গৃহ থেকে রক্তের নদী প্রবাহিত হয়।'
৩০
লক্ষাধিক জনসংখ্যার এই শহরের মানুষ এই প্রতিবেদন পড়ে বিস্মিত হলেও
আইন-শৃঙ্খলার পরিস্থিতি সম্পর্কে তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
ভেনেজুয়েলার অপরাধ তদন্ত সংস্থা (সিআইসিপিসি)-র প্রচার কার্যালয় বন্ধ থাকার
কারণে জাতীয় কোন তথ্যভাণ্ডার পাওয়া যাচ্ছে না অপরাধ সম্পর্কে।
ফলে
সংবাদমাধ্যম নিজেদের মতো ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে পরিসংখ্যান পেশ করছে নিশ্চিন্তভাবে।
সাধারণভাবে কেউ কারণ অনুসন্ধান করেন না।
শুধুমাত্র তার প্রভাব বিচার করেন।
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ভেনেজুয়েলায় খনিজ তেলের ভাণ্ডার আবিষ্কৃত হওয়ার পর
থেকে আন্দিজ পর্বতমালা ও সমতল এলাকা থেকে কৃষিজীবী জনগণ শহর অভিমুখে জড়ো
হতে শুরু করেন।
মায়াকে,
ভ্যালেন্সিয়া,
মারাকাইরো এবং কারাকাস প্রভৃতি শহরে জনপ্লাবন ঘটে।
কারাকাস সংলগ্ন পার্বত্য এলাকা অল্প সময়েই বস্তি এলাকা হয়ে ওঠে যেখানে
পানীয় জল বা বিদ্যুৎ নেই,
চালগুলোকে বিপজ্জনকভাবে আঁকড়ে ধরে মানুষের জনবসতি।
এর
সঙ্গে এল দারিদ্র্য,
সামাজিক বর্জন ও নিরাপত্তাহীনতা।
অনেকের স্মরণে আছে যে সেই সময় আপনার জুতোজোড়া,
ঘড়ি
বা সোনার হার সবই ছিনতাই হতো,
কারণ তারা বাধ্য হতো খাদ্য সংগ্রহের অর্থ জোটাতে।
সেটা ছিল ভীষণই অন্য ধরনের হিংসা যা এখন দেখা যাচ্ছে।
গত
দশকে ভেনেজুয়েলার দারিদ্র্য হার ৬০ শতাংশ থেকে হ্রাস পেয়ে হয়েছে ২৩ শতাংশ।
এমনকি চূড়ান্ত দরিদ্র হার ২৫ শতাংশ থেকে হয়েছে ৫ শতাংশ।
কিন্তু অপরাধের সংখ্যা বাড়ছে।
সরকার হয়তো হিংসার ঘটনার পিছনে দারিদ্র্যকেই কারণ হিসেবে নির্ধারণ করেছে।
সেজন্য তার সমস্ত ক্ষমতা নিয়ে সামাজিক কর্মসূচী রূপায়নে উদ্যোগ নিয়েছে
স্বাস্থ্য,
শিক্ষা ও খাদ্যের জোগান প্রকল্পে।
কিন্তু সম্ভবত মনে করা হয়েছিল যে পরিস্থিতির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে
নিরাপত্তাহীনতা হ্রাস পাবে।
জনগণ সাধারণ কারণগুলোকেই এর জন্য দায়ী করেন।
যথা- পরিবারে ভাঙন,
লিঙ্গ ভিত্তিক হিংসা,
গার্হস্থ্য হিংসা,
সিংস্রতার অনুকরণ বা জনবিস্ফোরণের মতো পরিস্থিতিগুলোকে।
অনেকে ভেনেজুয়েলাবাসীদেরকেই হিংস্র জাতি হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেন।
কেউ
কেউ ভাবেন নৈতিকতার অভাব,
অর্থাৎ মানুষ আর প্রয়োজনে চুরি করেন না তারা তা করে প্রবৃত্তিগত কারণে।
নতুন মূল্যবোধ গড়ে উঠেছে যা মানুষের ঐশ্বর্য,
প্রভাব আর হত্যাকারী হিসেবে ভূমিকাকেই শ্রদ্ধা করতে শেখাচ্ছে,
বন্দুক আর মদের সহজলভ্যতা বা বৈদ্যুতিন প্রচার মাধ্যমের প্রভাব হিসেবেও
অনেকেই ব্যাখ্যা করেছেন।
যেহেতু দারিদ্র হ্রাস পেয়েছে,
সুতরাং মানুষের হাতে পর্যাপ্ত অর্থ আছে,
তাই
ছিনতাইকারীদের সক্রিয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে-এরকমটাও অনেকে বিশ্বাস করেন।
তারা এটাও বিশ্বাস করেন যে আইন অপরাধীদের পক্ষেই,
যারা জানে কীভাবে তার ব্যবহার করতে হয়।
আপনি তাকে গ্রেফতার করতে পারেন কিন্তু তারা সহজেই ছাড়া পেয়ে যাবে।
প্রায় সমস্ত আমেরিকান রাষ্ট্রগুলোতে পুলিশ হলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির
পক্ষে সমস্যাজনক,
সমাধানের উল্টো।
ভেনেজুয়েলার সাধারণ পুলিশ কাউন্সিলের সদস্য সেরোয়া এল আস্কার বলেছেন-'সমস্যা
হলো এই যে আমাদের কোন একটা পুলিশ বাহিনী নেই,
রয়েছে ১৩৫টি।'
বিকেন্দ্রীকৃত ভেনেজুয়েলা প্রজাতন্ত্রে প্রতিটি গভর্নর ও মেয়রদের নিজস্ব
নিরাপত্তাবাহিনী রয়েছে।
কোন সাধারণ আইন নেই,
এমনকি প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রেও।
প্রাক্তন সামরিক বাহিনীর সদস্যদের নিজস্ব প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর
প্রশিক্ষণের দায়িত্ব দেয়া হয়।
সাম্প্রতিককালেও,
মেট্রোপলিটান পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে আরো পাঁচটি পৌরবাহিনী কারাকাসের
নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল।
তাদের নিজেদের মধ্যে কোনরকম বোঝাপড়া ছিল না এবং কখনো কখনো নিজেদের
রাজনৈতিক বিভিন্নতার কারণে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পর্যন্ত পড়েছে।
২০০২ সালের এপ্রিলে,
মেট্রোপলিটান বাহিনীর একাংশ,
পলিসাকাও এবং পলি বারুতা বাহিনী যারা বিরোধী মেয়রদের নিয়ন্ত্রণে সাভেজের
বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানে শামিল পর্যন্ত হয়েছিল।
গত মে মাসে সাভেজপন্থী আন্দো আতেগুই প্রদেশের গভর্নর ২৫জন আধিকারিককে
বরখাস্ত করেছেন প্রদেশের পুলিশবাহিনী থেকে।
যাদের মধ্যে ১৫জনকে পেশাগত অভব্যতা,
দু'জনকে
যৌন হেনস্তা,
পাঁচজনকে চুরি করার অপরাধে এবং একজনকে নরহত্যায় শামিল হওয়ার কারণে
বরখাস্ত করা হয়।
দেশের আভ্যন্তরীণ মন্ত্রী তারেক এল আইসামি সম্প্রতি বলেছেন ভেনেজুয়েলার
২০ শতাংশ অপরাধের পিছনে পুলিশ আধিকারিকদের হাত রয়েছে।
জেনারেল পুলিশ কাউন্সিলদের এল আস্কার বলেছেন,
'পুলিশকে
যদি সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা যায়,
কোনরকম পর্যবেক্ষণ বা আভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যতিরেকে,
হিংসা বৃদ্ধি পাবে না।
আমরা যে দীর্ঘকালীন সংস্কার কর্মসূচী গ্রহণ করেছি তাই কেবলমাত্র
নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করবে।'
পুলিশবাহিনীর দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বলিভারিয়ান ন্যাশনাল পুলিশ ফোর্সের
প্রশিক্ষণ কেন্দ্র উদ্বোধন করেন উগো সাভেজ।
১৩ই মে শুরু হওয়া এই প্রশিক্ষণ কেন্দের লক্ষ্য হলো প্রযুক্তিগত
প্রশিক্ষণের পাশাপাশি মানবাধিকার ও সামাজিক সম্পর্ক বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া।
পুরানো মেট্টোপলিটান পুলিশ বাহিনীর ১০৫৮জন স্বচ্ছ ভাবমূর্তির কর্মীকে
প্রশিক্ষণ দেয়া হয় যারা বর্তমানে কাটিয়া প্রদেশে কর্মরত।
আগামী তিন বছরের মধ্যে ৩১০০০ জনকে প্রশিক্ষণের লক্ষ্য স্থির হয়েছে।
কিশোরদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো মাদকের নেশা।
অপ্রাপ্ত বয়স্করা পর্যন্ত বন্দুক পাচ্ছে কোথায়?
নিশ্চয়ই পেছনে তাদের দুর্বৃত্ততাই রয়েছে।
পার্শ্ববর্তী কলম্বিয়া থেকে মাদক চোরাচালান হচ্ছে যা সামাজিক স্থিতিশীলতা
বিনষ্টের মূল কারণ বলে অনেকের অভিমত।
২০০৭ সালের সমীক্ষা অনুসারে,
প্রায় ৪২ লক্ষ মানুষ কলম্বিয়া থেকে চলে এসে ভেনেজুয়েলায় বসবাস করছেন।
এদের মধ্যে প্রায় ৫,২০,০০০জন
সে দেশের নাগরিকত্ব লাভ করেছেন।
প্রায় ২ লক্ষ জন উদ্বাস্তু বাসিন্দা হিসেবে স্বীকৃত ও বাকিটা
'অবৈধ
অনুপ্রবেশকারী'।
কলম্বিয়া ছেড়ে চলে আসা মানুষের স্রোত অব্যাহত।
তাদের বেশিভাগই সৎ,
সুস্থ মানসিকতার এবং ভেনেজুয়েলার সমাজের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে মিশে গেছেন।
কিন্তু এই সুযোগে পুলিশ ও ন্যাশনাল গার্ডের কিছু অসাধুকর্মীদের সঙ্গে
যোগসাজশে ভেনেজুয়েলাকে গুদাম হিসেবে ব্যবহার করছে কলম্বিয়ার মাদক
চোরাচালান চক্র।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও আফ্রিকায় পাচারের উদ্দেশ্যে এরা কারাকাসে ঘাঁটি
গেড়েছে।
এই সুযোগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
'মাদক
রাষ্ট্র'
হিসেবে ভেনেজুয়েলাকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে।
যদিও বেআইনি মাদকের কারবার মার্কিন দেশেই সর্বাধিক,
যা প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলার ভেনেজুয়েলার মাদক রোধ কর্মসূচীতে এ বছর প্রায় ২৮
টন মাদক আটক করা হয়েছে।
১৩ই জুলাই তিনজন মাদক পাচারকারীকে আটক করা হয়েছে,
যাদের অন্যতম হলো কার্লোস আলবার্তো
'বেটো'
রেন্টেরিয়া নামে কলম্বিয়ার কুখ্যাত চোরাচালান চক্রের প্রধান।
মাদক চোরাচালানের লক্ষ্যে প্রান্তিক যুবকদের স্বল্পদামে এমনকি বিনামূল্যে
মাদকের নেশা ধরানো হয়।
নেশাগ্রস্ত যুবকরা ছিনতাই,
চুরি,
নির্যাতন এমনকি হত্যা করলেও পিছপা হয় না মাদকের নেশা জারি রাখার জন্য।
এরা গুণ্ডাবাহিনী গড়ে প্রদেশ জুড়ে অপরাধ চালাতে থাকে।
প্রতিবেশী রাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত এই মাদক চোরাচালান চক্রের আভ্যন্তরীণ
গণ্ডগোলের পরিণতিতে প্রচুর মানুষের জীবন শেষ হয়,
যা সংবাদমাধ্যমের কাছে বিশেষ অভিপ্রেত।
আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের এই বাড়বাড়ন্তের শিকার শুধুমাত্র ভেনেজুয়েলা।
পরিচয় গোপন রাখা তথাকথিত প্রাক্তন গেরিলাদের জবানবন্দী হিসেবে এই প্রচার
চালানো হয়।
যদিও কলম্বিয়ার রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের গোয়েন্দা শাখা ডিএএস-র
তথ্যপ্রযুক্তি দপ্তরের প্রাক্তন প্রধান রাফায়েল গার্সিয়ার উদঘাটিত রহস্য
সম্পর্কে এরা নিশ্চুপ থাকে।
বর্তমানে কারাবন্দী গার্সিয়া আত্মপরিচয় গোপন করেননি এবং তিনি ডিএএস এবং
দক্ষিণপন্থী আধা সামরিক সংগঠনসমূহের মধ্যেকার যোগসূত্র উদঘাটন করেছিলেন।
এরাই মূলত মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।
তিনি দাবি করেছেন যে,
ডিএএস-র প্রাক্তন ডিরেক্টর জর্জ নগুয়েরা আধা সামরিক বাহিনীগুলোর সঙ্গে ও
ভেনেজুয়েলার বিরোধী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন এই
পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করার লক্ষ্যে যে,
ভেনেজুয়েলা সরকারের স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করে সাভেজকে হত্যা করা হবে।
প্রসঙ্গত,
ভেনেজুয়েলার সীমান্তবর্তী টাচিরা,
আপুরে এবং জুলিয়া প্রদেশগুলোতে এধরনের আধা সামরিকবাহিনীর দাপট দীর্ঘদিনের।
২০০৮ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে,
গোয়েন্দা বিভাগের অধিকর্তা এলিজার ওটাইজা দাবি করেছেন যে ২০,০০০
কলম্বিয়ার আধা সামরিক বাহিনীর লোকজন ভেনেজুয়েলাতে অপহরণ,
হত্যা ও মাদক চোরাচালানের কাজে লিপ্ত।
ভেনেজুয়েলার সংবাদমাধ্যম এ বিষয়ে কোন আলোকপাত না করলেও বোগোটা থেকে
প্রকাশিত ২০০৯ সালের ৩১শে জানুয়ারি এল এম্পেক্টাডর পত্রিকার হেডলাইন ছিল
'ব্ল্যাক
ঈগল ভেনেজুয়েলায় উড়ে এসেছে।'
এই ব্ল্যাক ঈগল গোষ্ঠীটি ২০০৫ সালের বিতর্কিত
'বিচার
ও শান্তি'
আইন অনুসারে আধা সামরিক সংগঠনগুলো ভেঙে দেয়ার পরবর্তীতে গড়ে ওঠে।
সাংবাদিক এনরিক ভিভাস লিখেছেন এ ধরনের সংগঠনগুলো টাচিরা-র সমস্ত কিছু
নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।
যদিও ইউনাইটেড সোস্যালিস্ট পার্টি অব ভেনেজুয়েলার সদস্যরা এর আওতার বাইরে।
যাদের অনেকেই এ বছর ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে নিহত হয়েছেন।
জুলিয়া প্রদেশের পুলিশবাহিনীর সঙ্গে যোগসাজশে আধা সামরিক গোষ্ঠীগুলো
হিংসা বা অর্থ ঋণ দেয়ার মধ্য দিয়ে মারাকিবো-র আংশিক দখল কায়েম করেছে।
লা প্লেইতাসের স্থানীয় ব্যবসা ও ক্ষুদ্র বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে এরাই।
জুলিয়া প্রদেশের কর্তৃপক্ষ কৃষক মিছিল সংগঠিত করে থাকে যাদের বেশির ভাগই
আসেন কলম্বিয়া থেকে এবং ফিরে যায় না।
বারিনাস প্রদেশের বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতা হলো ইতোপূর্বে এত কলম্বিয়াবাসী
তারা দেখেননি।
এরা সম্পত্তি ক্রয় করে ভাড়া খাটায়।
সমস্যাসঙ্কুল লোকদেরকে আর্থিক সাহায্য করে।
এদের কাজকর্ম অনেকটা ব্রাজিলের কুখ্যাত নার্কোস গোষ্ঠীর মতো।
কারাকাসের মতোই এখানেও হিংস্র অপরাধের সমস্যা ক্রমবর্ধমান।
অপরাধী আর আধা সামরিক বাহিনীর মধ্যে পার্থক্য চিহ্নিত করা দুষ্কর।
২০০৭ সালের এপ্রিলে শিল্পপতি নিকোলাস আলবার্তো সিড সুতো-র অপহরণের ঘটনার
তদন্তে কেজেডেসে প্রদেশের পুলিশ গার্সোন সালভারেজ নামে কুখ্যাত
দুষ্কৃতীকে গ্রেফতার করে।
কলম্বিয়ার অন্য একটি গোষ্ঠীর প্রাক্তন প্রধান পরবর্তী সময়ে ব্ল্যাক ঈগলের
কোষাধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত।
২০০৮ সালের মার্চ মাসে জুলিয়া প্রদেশ সিআইসিপিসি গ্রেফতার করে মাদক-আধা
সামরিক গোষ্ঠীর নেতা হার্মাগোরাস গঞ্জালেসকে।
সে ভেনেজুয়েলার গোয়েন্দা শাখা ডিসিপ এবং ন্যাশনাল গার্ডের পরিচয়পত্র নিয়ে
ঘুরছিল।
২০০৯ সালের নভেম্বর মাসে মাগলি মোরেনো নামে আরেকজন কুখ্যাত মাদক
চোরাচালানকারীকে গ্রেফতার করা হয় মোকারাইবো থেকে।
সাভেজের প্রভাবশালী এলাকা কারাকাসের ২৩ডি ইনেরো প্রদেশের সাইমন বলিভার
কোঅর্ডিনেশনের গুয়াডালুপে রডরিগুয়েজ বলেছেন-'আমরা
কখনো কখনো নিরাপত্তাহীনতার ঘটনার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি লক্ষ্য করি।
এতে মনে হয় যে স্থিতিশীলতা বিনষ্টের নীতি অনুসারে তা হচ্ছে!
'সমাজ
সচেতন পেরেজ তার অভিজ্ঞতা থেকে বলেছেন-আজকের কারাকাস হচ্ছে ১৯৮০-র দশকের
মেডেলিন।
সেই একই পরিকল্পনা গুপ্তবাহিনী নিরাপত্তাহীনতা ক্রমশ বাড়িয়ে তুলছে যার
লক্ষ্য হলো সমান্তরাল রাষ্ট্র গঠন করা।'
২০০৪ সালে কলম্বিয়া ১১৬জন আধা সামরিক বাহিনীর জওয়ানকে গ্রেফতার করা হয়
কারাকাসের কাছে একটি খামার বাড়ি থেকে।
ভেনেজুয়েলা সরকারকে উল্টে দিয়ে রাষ্ট্র প্রধানকে হত্যা করা ছিল এদের
পরিকল্পনা।
২০০৭ সালের ২রা ডিসেম্বরের গণভোটের পূর্বে লা ভেগা প্রদেশ থেকেও আরো
অনেকে গ্রেফতার করা হয়।
কলম্বিয়া সীমান্তবর্তী আপুরে ও টাচিরা প্রদেশে আধা সামরিক গোষ্ঠীগুলো যে
বিশৃঙ্খলা ও হিংসার বাতাবরণ সৃষ্টি করেছিল তা থেকে তারা বিরত থাকবে বলে
লিফলেট বিলি করছে।
এরাই আতঙ্ক তৈরি করেছিল আর এখন রক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে চাইছে যা
পরিকল্পিত কৌশল মাত্র।
একজন প্রবীণ সরকারি আধিকারিক আশঙ্কা ব্যক্ত করে বলেছেন-'আমার
মনে হয় সরকারের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা বিপদকে অবজ্ঞা করছেন।
তারা অপরাধী গোষ্ঠীর কথা বলেছেন।
কিন্তু আমরা যার সম্মুখীন তা হলো সংগঠন বা এমনকি দখলদার সামরিক বাহিনী।
কয়েক দশক ধরে রাজনৈতিক-সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় অত্যন্ত অল্প কয়েকটি প্রদেশ
যথা- ২৩ ডি ইনেরো,
গুয়ারেনা ও গুয়াতিরে নিজেদের অঞ্চলের উপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম রাখতে সমর্থ
হলেও বেশিরভাগ প্রদেশের নিরাপত্তা উদ্বেগজনক।
২০০২ সালের ১৩ই এপ্রিল,
অভ্যুত্থানের চেষ্টা হলে,
বারিওসের সশস্ত্র ও সুগঠিত আধা সামরিক বাহিনী আরেকটা ১৩ই এপ্রিল হওয়া
আটকে দেবে।'
অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর বিশৃঙ্খলা যদি প্রচার মাধ্যমের মদতপুষ্ট বলে ধরে নাও
নেয়া হয়,
আদতে তা দক্ষিণপন্থীদের স্বার্থসিদ্ধি করছে।
যত মৃতদেহ সংখ্যায় বাড়বে,
বিরোধীদের ভোটও সেই পরিমাণে বাড়বে।
তা জানেন বলেই উগো সাভেজ প্রতিবেশী কলম্বিয়ার বিদ্রোহীদের অস্ত্র নামিয়ে
রেখে শান্তির পথে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
কলম্বিয়ার রাষ্ট্রপতি জুয়ান ম্যানুয়েল স্যান্টোস যে ভিত্তিহীন অভিযোগ তার
সরকার সম্পর্কে করেছেন সে সম্পর্কে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন সাভেজ।
পরিকল্পিত হত্যা রহস্য উন্মোচিত হয়ে আধিপত্যবাদের নগ্ন চক্রান্ত প্রকাশ
হবেই।
ভারতে সংসদ
সদস্যদের বেতন ভাতা
তিন গুণ বাড়লোঃ বামদের আপত্তি
সংলাপ
॥
বামপন্থীদের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও লালু-মুলায়মদের চাপের কাছে নতিস্বীকার
করে ভারতের কেন্দ্র সরকার সাংসদদের বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ মেনে নিল।
এক লাফে লোকসভা ও রাজ্যসভার সদস্যদের বেতন বাড়িয়ে তিন গুণ করা হল।
যেখানে তারা ১৬ হাজার টাকা বেতন পেতেন সেখানে তা বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা
করা হচ্ছে।
এ
ছাড়া অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও দ্বিগুণ বাড়ানো হচ্ছে।
সংসদে মূলত বামদের আপত্তির কারণেই সিদ্ধান্তটি দুদিনের জন্য মুলতবি রাখা
হয়েছিল।
শুক্রবারে সেই সুপারিশে অনুমোদন দিয়েছে দিল্লি।
সংসদীয় কমিটি সাংসদদের মাসিক বেতন ৮০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করেছিল।
পরে তা এসে ৫০ হাজার টাকায় দাঁড়ায়।
ওই সুপারিশে বলা হয়েছিল,
পদমর্যাদার দিক থেকে সাংসদরা সরকারি সচিবদের চেয়ে অনেক ওপরে।
তাই তাদের বেতন সচিবদের চেয়ে বেশি হওয়াই যুক্তিসঙ্গত।
সংসদীয় কমিটির সুপারিশে সাংসদদের অফিস চালানোর জন্য টাকার পরিমাণ ২০
হাজার থেকে বাড়িয়ে মাসে ৪০ হাজার করা হচ্ছে।
নির্বাচনী কেন্দ্র-ভাতা ২০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৪০ হাজার করা হচ্ছে।
গাড়ি কেনার জন্য সাংসদদের সুদবিহীন ঋণের পরিমাণ বর্তমান ১ লাখ টাকা থেকে
বাড়িয়ে ৪ লাখ করা হচ্ছে।
এ
ছাড়া সাংসদদের পরিবারবর্গ রেল ও বিমানে যতবার খুশি বিনা ভাড়ায় প্রথম
শ্রেণীতে অথবা এক্সিকিউটিভ ক্লাসে যাতায়াত করতে পারবেন।
পেনশন বাড়ছে ৮ হাজার টাকা থেকে মাসে ২০ হাজার টাকা।
৬০
লাখ বছর আগের সন্ত্রাসী পাখির খোঁজ
সংলাপ
॥
আমরা এতদিন জানতাম মানুষ সন্ত্রাসী হয়।
এখন জানা গেল,
পাখিও নাকি সন্ত্রাসী হতে পারে! এর আবার উপযুক্ত কারণও নাকি আছে! সে কথা
গবেষকরাই জানালেন।
এরা ছিল মাংসাশী।
এ
অতিকায় পাখি উড়তে পারত না।
দেখতেও ছিল ভয়ঙ্কর।
কিন্তু এরা পাঁচ কোটি বছর ধরে দক্ষিণ আমেরিকা চষে বেড়িয়েছে।
অবশেষে তারা ডাইনোসরের কাছে পরাস্ত হয়।
নতুন গবেষণায় দেখা গেছে,
এসব পাখির সূচালো ও ধারালো ঠোঁট ছিল।
এ
ঠোঁট দিয়ে তারা শিকারকে প্রথমে খুব দ্রুত আক্রমণ করত।
তারপর ঠোঁট দিয়ে শিকারকে ঠুকরে ঠুকরে ছিড়ে ফেলত।
শিকার হওয়া প্রাণীটি নিজেকে বাঁচানোর কোন সুযোগই পেত না।
ড. স্টিভ রি আন্তর্জাতিক একটি দলের হয়ে এ বিস্ময়কর পাখির অদ্ভূত শিকারি
আচরণ নিয়ে গবেষণা করছেন।
দক্ষিণ আমেরিকা যখন একটি মহাদ্বীপ ছিল,
তখন এ পাখিরা সেখানে রাজত্ব করে বেড়াত।
কয়েক লাখ বছর আগে এরা পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়।
গবেষকরা এদের ১৮টি প্রজাতির অস্তিত্ব এখন পর্যন্ত খুঁজে পেয়েছেন।
পৃথিবীতে এখন আর এ ধরনের শিকারি পাখির খোঁজ মেলে না।
তাছাড়া এখনকার পাখিদের সঙ্গে এর বৈশিষ্ট্যের কোন মিলও খুঁজে পাওয়া যায় না।
তবে তারা এ সন্ত্রাসী পাখির কঙ্কাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নাম দিয়েছেন
আন্দালগালোরনিস।
৬০ লাখ বছর আগে এ অদ্ভূত প্রাণী (পাখি) উত্তর-পশ্চিম আর্জেন্টিনায় চড়ে
বেড়াতো।
গড় উচ্চতা ছিল ৬ ফুট।
আর ওজন ছিল প্রায় ৪০ কেজি।
যার মাওলা নেই
তার রোজা আছে কি?
(২)
ড. এমদাদুল
হক কাজল
॥
(পূর্ব প্রকাশের পর)
২.
আত্ম-সংযম : মনের যাবতীয় কামনা-বাসনা,
আবেগ ও উচ্ছ্বাসকে ইচ্ছাশক্তি,
বুদ্ধি,
ও
আত্মদর্শনের অনুসারী করে তোলার নামই আত্মসংযম।
আল্লাহ্র কাছে সে ব্যক্তিই মর্যাদার আসন লাভ করে যে ব্যক্তি আত্মসংযমের
পরীক্ষায় উত্তীর্ণ।
আল্লাহ্ বলেন,
'আমার
নৈকট্য অন্বেষণকারীদের মধ্যে সংযমী ব্যক্তির সমান নৈকট্য লাভ করা আর কারো
দ্বারাই সম্ভব হয় নাই।'
মানুষের মধ্যে কাম-ক্রোধ-লোভ-মোহ-মদ-মাৎসর্য প্রভৃতি এমন কতগুলো প্রবৃত্তি
রয়েছে যার তাড়নায় মানুষ তার ইচ্ছার বিরোধী কাজ করে।
রোজার উদ্দেশ্য হচ্ছে এ সব প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা
চালানো এবং ধীরে ধীরে এমন অভ্যাস গড়ে তোলা যেন,
এসব
প্রবৃত্তি ব্যক্তির ইচ্ছাধীন হয় এবং রমজানের এ সাধনা যেন সারা বৎসর ব্যাপী,
তথা
সমগ্র জীবন ব্যাপী পরিব্যপ্ত হয়।
৩.
আত্ম উন্নয়নঃ আল্লাহ্র নির্দেশিত পথে কোন গুণাবলীই সহজে অর্জন করা যায় না।
মানুষকে অনেক চেষ্টা করে,
অনেক সাধনা করে তা অর্জন করতে হয়।
রমজান হলো এই সাধনার মাস।
সাধনার মর্মকথা হলো নিজেকে -
'নিজ'
হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করা।
কারণ,
মানুষের জন্য,
নিজের মধ্যে থাকাটাই হচ্ছে সবচেয়ে কঠিন কাজ।
রমজান মাসের দহনের মাধ্যমে আশা করা হয়েছে যেন মানুষ তার
'নিজ'
এর
মধ্যে থাকার সাধনায় লিপ্ত থাকে।
রোজা হচ্ছে ঢাল স্বরূপ।
কেউ
রোজা রাখলে তার মুখ থেকে যেন এমন কোন কথা বের না হয় যা অন্যকে আঘাত করতে
পারে,
নিরুৎসাহিত করতে পারে বা পরচর্চা হয়ে যেতে পারে।
রোজা রাখার অর্থ হচ্ছে - সবসময় স্মরণে রাখা যে
'আমি
একজন রোজাদার'।'
যে
ব্যক্তি মিথ্যাচার ত্যাগ করেনি তার খাওয়া বা পান করা বা সম্ভোগ ছেড়ে দেয়াতে
আল্লাহ্র কোন প্রয়োজন থাকতে পারে না।
কারণ আল্লাহ্ রোজা দিয়ে মানুষকে শারীরিক ভাবে কষ্ট দিতে চাননি,
আত্মিকভাবে উন্নত করতে চেয়েছেন।
৪.
নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকা: মহান ও পরাক্রমশালী আল্লাহ্ বলেন,
'যে
ব্যক্তির অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আমার নিষিদ্ধ কাজগুলো হতে রোজা রাখে না,
আমার উদ্দেশ্যে তার পানাহার ছেড়ে দেবার কোন প্রয়োজন নেই।'
নবী
করীম (সা.) বলেছেন,
'অনেক
রোজাদার এমন আছে যারা তাদের রোজা দ্বারা অনাহারের কষ্ট ও তৃষ্ণা ব্যতীত
কিছুই লাভ করে না,
আর
এমন অনেক রাত জাগরণকারী আছে যারা অনিদ্রা ব্যতীত কিছুই হাসিল করতে পারে না।'
ইমাম গাজ্জালী তাঁর
'সিয়াম
সাধনা ও শান্তির পথ'
গ্রন্থে বলেন -
'প্রায়
রোজাদারই প্রকৃত অর্থে রোজা করে না,
অন্যদিকে অনেক বে-রোজাদারই প্রকৃত অর্থে রোজা পালন করেন।
অনেকে পানাহার করে ঠিকই,
কিন্তু প্রকৃত অর্থে রোজা পালন করেন।
তিনি কে?
তিনি হচ্ছেন ওই ব্যক্তি যিনি পাপ থেকে মুক্ত হয়ে যান।
আবার ক্ষুধা এবং পিপাসায় কষ্ট করেন অনেকে,
অথচ
প্রকৃত অর্থে তাদের রোজা হয় না,
কারণ পাপে নিমজ্জিত থাকেন তিনি।
রোজার অন্তর্নিহিত অর্থ যারা অনুধাবন করতে পেরেছেন তারা জানেন যে,
শুধু যারা পানাহার এবং ছহব্বত থেকে নিবৃত্ত হয়ে রোজা রাখে অথচ অন্য পাপ কাজ
করে,
তারা ওই ব্যক্তিদের ন্যায়,
যারা মল ধৌত না করে প্রস্রাব করে গলা পানিতে নামেন।
এ
ধরনের মানুষ শুধু বাইরের খোলস নিয়েই ব্যস্ত থাকে।
তারা বুঝেন না যে ক্বলব পরিষ্কার না করে হাত পা সাফের কোন অর্থ হয় না।
তাদের অজ্ঞতার ফলে তাদের এবাদত কবুল হয় না।
আর
যে ব্যক্তি আহার করে রোজা ভাঙ্গেন কিন্তু অন্য কোন পাপ কাজ করেন না,
তিনি যেন তাঁর দেহের সব কিছুই সাফ করেন।
তাঁর এবাদত আল্লাহ্র ইচ্ছায় কবুল হবে।
তিনি যদিও বাইরের খোলস নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন না,
কিন্তু তিনি পাপ মুক্ত হয়ে আল্লাহ্র বিধান মেনে চলেছেন।'
৫.ভোগবাদীতার প্রতিরোধ :
রোজার আর একটি অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষকে বল্গাহীন ভোগবাদীতা থেকে
রক্ষা করা।
জীবনের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পানীয় ও খাদ্যের।
রমজানে খাদ্য ও পানীয় ত্যাগের মাধ্যমে আল্লাহ্ তায়ালা মানুষকে সীমাহীন
ভোগবাদীতা থেকে সংযমের শিক্ষা দিতে চান।
প্রকৃত অর্থে রমজান ধৈর্য ও ত্যাগ-তিতিক্ষার মাস - সত্য,
সুন্দর,
ন্যায় ও কল্যাণে প্রতিষ্ঠিত হবার মাস।
'ভোগের
আনন্দ সাময়িক,
ত্যাগের আনন্দ চিরন্তন'
-
সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এঁর এই আদর্শই রমজানের মূল নির্দেশনা।
এক
মাস রোজা রাখার পরও আমরা যেমন ছিলাম তেমনই থাকলে,
আমাদের মিথ্যাচার,
আত্মপ্রবঞ্চনা ও পরচর্চা বন্ধ না হলে ধরে নিতে হবে,
রোজার উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়েছে।
আর
উদ্দেশ্যের সাথে সামঞ্জস্যহীন রোজা তো শুধুই উপোস থাকা।
৬.
অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা :
অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা ও সমাজের দরিদ্র লোকদের প্রতি সহানুভূতি
প্রদর্শনের ক্ষেত্রেও রমজানের আধ্যাত্মিক ভূমিকা আছে।
একমাস পানাহার থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে - যাদেরকে কখনোই খাদ্যের অভাবে
ক্ষুধার্ত থাকতে হয় না,
তারা অনুভব করতে পারে ক্ষুধার যন্ত্রণা এবং আশা করা যায় রমজানের পরে তারা
ক্ষুধার্তদের প্রতি সমবেদনা অনুভব করবে।
এবং
কোন ক্ষুধার্ত মানুষ খাদ্য চাইলে তাকে খাদ্য দানের জন্য নিজেকে দায়বদ্ধ মনে
করবে।
বিত্তবানদের মনে বিত্তহীনদের জন্য মর্মবেদনা জাগ্রত হবে এবং বিত্তবানেরা
উৎসাহিত হবে বিত্তহীনদের জন্য সহযোগিতার হাত প্রসারিত করতে।
ক্ষুধার্তকে অন্নদান,
অভাবগ্রস্তকে অভাবমুক্ত করা এবং সমাজে বিদ্যমান অর্থনৈতিক বৈষম্যের অবসান
করাও রোজার একটা উদ্দেশ্য।
তাই
আল্লাহ্ বলেন,
'আর
যে ব্যক্তির পক্ষে রোজা রাখা দুঃসাধ্য তার একজন অভাবগ্রস্তকে অন্নদান করা
কর্তব্য।'
(সূরা
বাকারা : ১৮৪)।
অনেকেই মনে করেন উক্ত আয়াতটি রহিত হয়েছে কিন্তু মোটেও তা নয়।
আল্লাহ্ তায়ালা কোন আয়াতই রহিত করেননি।
আল্লাহ্র বাণীকে রহিত করতে চায় তারাই,
যারা দুনিয়ার স্বার্থে ইসলামকে বিকৃত করতে চায়।
আল্লাহ্ বলেন,
'আমি
কোনো আয়াত রদ করলে বা ভুলে যেতে দিলে তার চেয়ে আরো ভালো বা তার সমতুল্য
আয়াত আনি।”
(সূরা
বাকারা : ১০৬)।
রোজার এই উদ্দেশ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ সর্বোত্তম আয়াত হচ্ছে -
'আর
যে ব্যক্তির পক্ষে রোজা রাখা দুঃসাধ্য তার একজন অভাবগ্রস্তকে অন্নদান করা
কর্তব্য।'
যে
দেশের মানুষ দু'বেলা
পেট ভরে খেতে পায় না,
যে
দেশের মানুষকে বাধ্য হয়েই প্রায় সারা বছর রোজা রাখতে হয় সে দেশে বাস করে এক
মাস রোজা রাখার পরও ভোগপ্রবণতা,
অপচয় প্রবণতা প্রশমিত না হলে সিয়ামের নাম করে শুধু ক্ষুধা ও পিপাসায় কষ্ট
পাওয়ারই নামান্তর হবে।
৭.
রোজার আধ্যাত্মিক তাৎপর্যঃ
রোজা রাখতে হয় নিজের মধ্যে কোন একটা বদ অভ্যাসকে কেন্দ্র করে।
অভ্যাস বদল হলে মানুষ বদলে যায়।
সাধকেরা ভাবেন -
'আমার
এমন কোন অভ্যাস কি আছে যার দিকে আমি অতিমাত্রায় ঝুঁকে পড়েছি?'
সাধকেরা রমজানের মাসকে তাদের অভ্যাস পরিবর্তনের মাস হিসেবে ব্যবহার করেন।
রোজার আধ্যাত্মিক তাৎপর্য হচ্ছে আমিত্বের আবরণ দূর করার প্রচেষ্টা করা,
দুনিয়া ও দ্বীনের আশা-আকাঙ্খা পরিত্যাগ করার প্রচেষ্টা করা।
দুনিয়ার আশা আকাঙ্খাগুলো হচ্ছে - আরো সম্পত্তি অর্জন ও সঞ্চয়ের আশা,
আরো যশ-প্রতিপত্তি ও ক্ষমতা লাভের আশা।
আর দ্বীনের আশা আকাঙ্খা হচ্ছে - পরকালে বেহেস্ত ও হুরের আশা-আখাঙ্খা।
এই উভয়বিদ আশা আকাঙ্খাই আল্লাহ্র সান্নিধ্য লাভের ক্ষেত্রে
প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে।
দোজখের ভয় এবং বেহেস্তের লোভ থাকলে দোজখ বা বেহেস্ত লাভ হতে পারে কিন্তু
আল্লাহ্র সান্নিধ্য কেমন করে লাভ হবে?
সাধকের সকল আশা-আকাঙ্খা,
সকল চিন্তা ও কর্ম যখন তাঁর আল্লাহ্কে কেন্দ্রীভূত করে রচিত হতে থাকে
তখনই রোজা সার্থকতা পায়।
আল্ল্লাহ্র নৈকট্য ছাড়া সাধকের আর কোন কিছু কাম্য থাকে না।
সাধারণ মানুষ রাজা রাখে,
রোজা ভাঙ্গে।
সূফী সাধকেরাও রোজা রাখেন কিন্তু আল্লাহ্তে আশ্রিত না হয়ে তিনি রোজা
ভাঙ্গেন না।
সূফী সাধকদের রোজা শুরু হয় আল্লাহর সাথে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে,
আর শেষ হয় আল্লাহ্র সাথে সম্পর্কের মাধ্যমে।
সাধকের রোজা ততদিন পর্যন্ত চলতে থাকে যতদিন পর্যন্ত না তিনি আল্লাহ্তে
আশ্রিত হয়েছেন।
সূফী সাধকদের রোজা তাই শুধু কোন একটা মাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
আল্লাহ্র সান্নিধ্য লাভ ব্যতিত সূফীর কাছে অন্য কোন ইফতার নেই।
আল্লাহ্র আশ্রয়ে আশ্রিত হওয়াই সাধকদের এক এবং অদ্বিতীয় ইফতার।
এটাই তৌহীদের মর্মবাণী।
ইফতারের আর কোন উদ্দেশ্য রোজার মধ্যে শেরেক সৃষ্টি করে।
খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি বলেন -
'যে
ব্যক্তির শায়েখ,
মুর্শিদ বা পথ প্রদর্শক নেই তার দ্বীন নেই।
যার দ্বীন নেই তার মারেফাতে এলাহি নেই।
যার মারেফাতে এলাহি নেই সত্যপথের পথিকদের সাথে তার সম্পর্ক নেই।
সত্যপথের পথিকদের সাথে যার সম্পর্ক নেই তার কোন শুভাকাঙ্খী নেই।
যার শুভাকাঙ্খী নেই তার কোন বন্ধু বা মাওলা নেই।'
যার মাওলা নেই তার রোজা আছে কি?
(সমাপ্ত)
সূফী সাধক
আনোয়ারুল হক্ এঁর বাণী তাৎপর্য অন্বেষণে
''আল্লাহ্র
স্বভাব মোতাবেক নিজের স্বভাব তৈরি করলে আল্লাহ্র পরিচয় লাভ হবেই হবে!''
(১)
ড.এমদাদুল
হক কাজল
॥
উক্ত বাণীটির তিনটি বৈশিষ্ট্য প্রতীয়মান হয়ঃ
১.
তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যঃ আল্লাহ্ বলেন,
'ইন্নাল্লাহা
খালাকা আদামা আলা সুরাতিহি'
অর্থাৎ
'আদমকে
আমি সৃষ্টি করেছি আমার নিজের সুরাত বা চেহারা দিয়ে।'
মুহাম্মদ (সা.) বার বার বলেছেন,
'তাখাল্লাকু
বি আখলাকিল্লাহ'
অর্থাৎ তোমরা আল্লাহ্র চরিত্রে চরিত্রবান হও।
মানুষের মধ্যে আল্লাহ্ নিজের রূহকে ফুঁকে দিয়েছেন।
(সুরা
হিজর ঃ ২৯)।
মানুষকে আল্লাহ্ নিজ প্রকৃতি বা ফিতরাত দিয়ে সৃষ্টি করেছেন।
(সুরা
রূমঃ ৩০)।
তোমরা যেখানেই থাক না কেন আল্লাহ্ তোমাদের সাথে আছেন (সুরা হাদিদ ঃ ৪)।
“আমরা
আমাদের প্রতিমূর্ত্তিতে,
আমাদের সাদৃশ্যে মনুষ্য নির্মাণ করি।”
(আদিপুস্তক
ঃ ১ ঃ ২৬)।
সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এঁর বাণী,
“আল্লাহ্র
স্বভাব মোতাবেক নিজের স্বভাব তৈরি করলে আল্লাহ্র পরিচয় লাভ হবেই হবে”
-
উল্লেখিত তত্ত্বকে আরো সমৃদ্ধ ও সহজ বোধ্য করে।
২.
নিশ্চয়তার বৈশিষ্ট্যঃ বাণীটিতে শতভাগ নিশ্চিয়তা আছে।
কোন
তত্ত্বকে নিজের পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করে কাঙ্খিত ফলাফল পেলেই কেবল শতভাগ
নিশ্চিয়তা দেয়া যায়।
সুতরাং আল্লাহ্র স্বভাব মোতাবেক নিজের স্বভাব তৈরি করে আল্লাহ্র পরিচয়
লাভ করেছেন বলেই তিনি শতভাগ নিশ্চিত হয়ে বলতে পারছেন যে -
“আল্লাহ্র
স্বভাব মোতাবেক নিজের স্বভাব তৈরি করলে আল্লাহ্র পরিচয় লাভ হবেই হবে।”
৩.
নির্দেশনার বৈশিষ্ট্যঃ নিজের পরীক্ষাগারে প্রমাণিত হবার পর তিনি আল্লাহ্
পিপাসুদের পথ প্রদর্শন করছেন।
বলেছেন,
- 'আধ্যাত্মিকতায়
হতাশার কোন স্থান নেই।
যারা আল্লাহ্র পরিচয় লাভ করতে চায় তারা তাঁর পরিচয় লাভ করবেই তবে শর্ত
হচ্ছে - আল্লাহ্র স্বভাব মোতাবেক নিজের স্বভাব তৈরি করা।'
এই
বাণীটির তাৎপর্য অন্বেষণে যেসব প্রশ্ন আমাদেরকে আলোড়িত করে তা হলোঃ
ক.
আল্লাহর স্বরূপ কি?
মানুষের পক্ষে কি আল্লাহ্র পরিচয় লাভ করা সম্ভব?
খ.
আল্লাহ্র স্বভাব কি মন্দ হতে পারে?
গ.
মানুষের স্বভাব কি?
ঘ.
আল্লাহ্র স্বভাব মোতাবেক স্বভাব তৈরি করা কি মানুষের পক্ষে সম্ভব?
ঙ. আল্লাহ্র স্বভাবে মোতাবেক নিজের স্বভাব তৈরি করা যায় কিভাবে?
ক. আল্লাহ্র স্বরূপ কি?
মানুষের পক্ষে কি আল্লাহ্র পরিচয় লাভ করা সম্ভব?
আল্লাহ্ কি?
পৃথিবীর প্রতিটি মানুষকে এ প্রশ্ন করা হলে প্রত্যেকেই ভিন্ন ভিন্ন উত্তর
দেবেন।
কেউ হয়তো বলবেন,
'আল্লাহ্
নিরাকার'
আবার কেউ হয়তো বলবেন
'আল্লাহ্
যেহেতু সর্বশক্তিমান যে কোন আকারেই তিনি প্রকাশিত হতে পারেন'
কেউ হয়তো বলবেন,
'আল্লাহ্
সর্বত্র বিরাজমান'।
অন্যজন বলবেন,
'আল্লাহ্
সর্বত্র বিরাজমান হলে মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহ্র সাথে দেখা করার জন্য
মেরাজে গিয়েছিলেন কেন'?
আল্লাহ্ কি এ প্রশ্নের উত্তর জানা একজনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ,
আবার অন্যজনের কাছে এটি হাস্যকর ও উদ্ভট প্রশ্ন হতে পারে।
কেউ বলবে আল্লাহ্ আছে,
কেউ বলবে নাই,
কেউ বলবে আল্লাহ্ আছে নাকি নাই এ বিষয়ে তার কোন চিন্তাই নেই।
মোট কথা
'আল্লাহ্
কি?'
এ
বিষয়ে প্রত্যেকের একটা নিজস্ব মতামত আছে।
প্রত্যেকেই তার চিন্তার স্তর থেকে উত্তর দেবে।
যে যেমন পরিবার ও পরিবেশে বড় হয়েছে,
যে যেসব বই পড়েছে এবং এ বিষয়ে যে যা শুনেছে তার ভিত্তিতেই সে উত্তর দিতে
চেষ্টা করবে।
'আল্লাহ্
কি?'
এই প্রশ্নের উত্তরে যে যাই বলুক না কেন (পুঁরুষ ব্যতিত) তা অন্যের কাছ
থেকে শুনা কথা,
নিজের অভিজ্ঞতা নয়।
এমনকি
“আল্লাহ্র
স্বভাব মোতাবেক নিজের স্বভাব তৈরি করলে আল্লাহ্র পরিচয় লাভ হবেই হবে”
সাধক আনোয়ারুল হক এঁর এই বাণীটিকে দশজনকে ব্যাখ্যা করতে বলা হলে দশজনই
ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা উপস্থাপন করবেন।
প্রত্যেকেই নিজস্ব চিন্তা-চেতনার স্তর থেকে বাণীটিকে ব্যাখ্যা করবেন।
আমরা কি বলতে পারবো যে একটা ব্যাখ্যা সঠিক আর অন্যটি ভুল?
সকল ব্যাখ্যাই চিন্তাগত।
কোন্ ব্যাখ্যাটা সঠিক,
কোন্টা অপব্যাখ্যা,
কোন্টা অসম্পূর্ণ ব্যাখ্যা তা বলতে পারবেন সাধক নিজে এবং তিনি,
যিনি আল্লাহ্র স্বভাব মোতাবেক নিজের স্বভাব তৈরি করেছেন।
একইভাবে আল্লাহ্র স্বরূপ কি?
তা সঠিকভাবে বলতে পারবেন আল্লাহ্ এবং তিনি যিনি আল্লাহ্র পরিচয় লাভ
করেছেন।
কিন্তু সূফী সাধকেরা প্রত্যেকটি উত্তরকেই সঠিক বলে মনে করেন,
তাঁরা প্রত্যেকের ধারণার প্রতি সমান শ্রদ্ধাশীল।
তাঁরা মনে করেন - সমগ্র জগত আল্লাহ্রই প্রকাশমাত্র,
তাঁর বাইরে কিছুই নেই বা থাকতে পারে না।
তাই আল্লাহ্র স্বরূপ কি এ সম্পর্কে যত উত্তরই আসুক না কেন তার সবই
আল্লাহ্রই অর্ন্তভূক্ত।
তিনি এক,
অদ্বিতীয়,
স্বপ্রকাশ,
স্বয়ম্ভু,
স্বনির্ভর,
স্বয়ং-প্রতিষ্ঠ ও স্বয়ং-সম্পূর্ণ।
তাঁর অস্তিত্ব কোন বিশেষ স্থানে সীমাবদ্ধ নয়।
তিনি অসীম,
অনন্ত ও স্থান-কালের অতীত।
তিনিই সময়।
তিনি সর্বজ্ঞ।
তাই তিনি প্রতিটি মানুষের চিন্তা-চেতনা,
আন্তরিক আশা-আকাঙ্খা সম্পর্কে অবহিত।
তিনি সর্বত্র বিরাজমান।
এমন একটা পরমাণুও থাকতে পারে না যার মধ্যে আল্লাহ্র উপস্থিতি নেই।
আসমান এবং জমিনে যা কিছু আছে তা তাঁরই সত্তাধীন।
তাঁর সিংহাসন সমস্ত আসমান ও জমিনকে পরিবেষ্টিত করে আছে।
সুতরাং,
যে যাই বলুক না কেন তা চূড়ান্ত বিচারে আল্লাহ্রই।
সূফী মতে - প্রতিটি মানুষের মধ্যেই তিনি আছেন।
তিনি মানুষের অতি নিকটবর্তী।
সুতরাং তাঁকে পাওয়ার জন্য বনে জঙ্গলে বা দূরে কোথাও যাবার প্রয়োজন নেই।
তিনি আত্মার আত্মা - পরমাত্মা।
প্রতিটি মানুষের অন্তরের বাণীই আল্লাহ্র বাণী।
এই বাণী মোতাবেক নিজেকে গড়ে তুললে প্রতিটি মানুষই তার নিজের মধ্যে
আল্লাহ্র উপস্থিতি উপলব্ধি করতে পারে।
প্রতিটি প্রেমময় সত্তায়ই তিনি প্রকাশিত হন।
আল্লাহ জগৎ থেকে পৃথক কোন বস্তু নয়।
প্রত্যক্ষগোচর কোন নির্দিষ্ট বিস্তৃতি,
রং,
গন্ধ,
কাঠিন্য বা কোমলতা তাঁর নেই।
তাই মানুষ তার ইন্দ্রিয় সমূহ দিয়ে নিজের থেকে পৃথক কোন আল্লাহ্র পরিচয়
লাভ করতে পারে না।
যিনি আল্লাহ্র পরিচয় লাভ করেছেন তাঁর কাছ থেকে বর্ণনা শুনেও আল্লাহ্র
পরিচয় লাভ করা অসম্ভব।
কারণ,
মানুষের মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম হচ্ছে ভাষা কিন্তু ভাষা দিয়ে
প্রকৃতপক্ষে মনের কোন গভীর ভাবকেই প্রকাশ করা যায় না।
একজন মানুষের খুব বেশি মাথা ব্যথা হলে সে এইটুকু বলতে পারে যে তার
প্রচন্ড মাথা ব্যথা হচ্ছে,
টন টন করছে,
যন্ত্রণা আর সহ্য হচ্ছে না কিন্তু তার কেমন মাথা ব্যথা হচ্ছে তা কি সে
ভাষা দিয়ে প্রকাশ করতে পারবে?
হাসনাহেনার গন্ধ যে কোন দিন পায়নি তাকে ভাষা দিয়ে কি হাসনা হেনার গন্ধ কি
রকম তা বুঝানো সম্ভব?
সম্ভব নয়।
তাই কোন বইয়ের বর্ণনা থেকে বা কারো কাছ থেকে শুনে আল্লাহর পরিচয় লাভ করা
যায় না।
যুক্তি দিয়েও আল্লাহ্র পরিচয় লাভ অসম্ভব।
কারণ,
যুক্তি দিয়ে আল্লাহ্র যে পরিচয়ই দেয়া হোক না কেন পাল্টা যুক্তি দিয়ে এই
যুক্তিকে খন্ডন করা সম্ভব।
প্রত্যক্ষ ভিত্তিক অনুমান দিয়েও আল্লাহ্র পরিচয় লাভ অসম্ভব।
কারণ প্রত্যক্ষণ কেবল বস্তুর বাহ্যিকতা সম্পর্কে জ্ঞান দিতে পারে কিন্তু
বস্তুর স্বপ্রকৃতি সম্পর্কে কোন জ্ঞান দিতে পারে না।
তাই বলে আল্লাহ্র পরিচয় লাভ করা যে মানুষের পক্ষে একবারেই অসম্ভব তা নয়।
আল্লাহ্র পরিচয় লাভ করা তখনই সম্ভব যখন মানুষ আল্লাহ্র স্বভাব মোতাবেক
নিজের স্বভাব তৈরি করে।
খ. আল্লাহ্র স্বভাব কি মন্দ হতে পারে?
আল্লাহর স্বপ্রকৃতিই তাঁর স্বভাব।
তাঁর স্বপ্রকৃতি কি?
আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই আল্লাহ্র।
আল্লাহ্ হচ্ছেন সবকিছুর সমষ্টি।
কিন্তু মানুষের সীমাবদ্ধ জ্ঞান দিয়ে সে অসীমকে বুঝতে পারে না।
তাই বেশিরভাগ মানুষই মনে করে আল্লাহ্ শুধু মঙ্গলের সাথে আছেন অমঙ্গলের
সাথে নাই,
আল্লাহ্ শুধু সৌন্দর্যের মধ্যে আছেন কুশ্রীতার মধ্যে নাই,
আল্লাহ্ শুধু ভালোর মধ্যে আছেন মন্দের মধ্যে নাই।
কিন্তু আল্লাহ্ নিজেই ঘোষণা করেছেন যে,
আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই তাঁর।
সব বিষয়ই তাঁর জ্ঞানের পরিধিভুক্ত।
তাই তিনি শৃঙ্খলা-বিশৃঙ্খলা,
সঙ্গতি-অসঙ্গতি,
সামঞ্জস্য-অসামঞ্জস্য,
সৌন্দর্য-কুশ্রীতা,
মঙ্গল-অমঙ্গল,
প্রেম-ঘৃণা সব কিছুর মধ্যেই আছেন।
যেহেতু জলে,
স্থলে,
আকাশে,
বাতাসে,
আগুনে,
পর্বত ও বৃক্ষলতা সর্বত্রই তিনি বিরাজমান সেহেতু যা কিছু মন্দ,
অশুভ বা ঘৃণ্য বলে মানুষ মনে করছে তার মধ্যেও তিনি আছেন।
তাই আল্লাহ্ হচ্ছেন দাররু বা বিপদ প্রদানকারী,
ক্বাহ্হারু বা মহাশাস্তিদাতা,
মুযিল্লু বা অপমানকারী ও হীনকারী,
মুমিতু বা মৃত্যুদাতা।
মুনতাক্বীমু বা প্রতিশোধ গ্রহণকারী।
আল্লাহ্ স্থান ও কালের অতীত।
একটা নির্দিষ্ট স্থানে এবং একটা নির্দিষ্ট কালে থেকে মানুষ যাকে মন্দ
বলছে সে তার জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার জন্যই তাকে মন্দ বলছে।
প্রকৃত অর্থে তা মন্দ নয়।
স্থান ও কালের ঊর্ধ্বে উঠে বস্তু এবং ঘটনা প্রবাহকে বিচ্ছিন্নভাবে না
দেখে এক এবং অবিচ্ছিন্ন সত্তার অংশ হিসেবে দেখতে পারলে দেখা যাবে আপাত
দৃষ্টিতে যাকে আমরা মন্দ বলছি তা আসলে মন্দ নয়।
ধরা যাক ভূমিকম্প হয়ে লাখো মানুষের প্রাণহানী হলো,
আমরা মনে করতে পারি যে এটা অমঙ্গল।
আমরা প্রশ্ন তুলতে পারি - আল্লাহ্ মঙ্গলময় হলে তিনি অমঙ্গল করছেন কেন?
কিন্তু আল্লাহ্ যা জানেন আমরা তা জানি না।
এমনও হতে পারে যে সমস্ত পৃথিবীকে টিকিয়ে রাখার জন্য,
প্রকৃতিতে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য,
কোটি কোটি মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য এবং পৃথিবীতে আল্লাহ্র লীলা পূর্ণ
করার জন্য এটির প্রয়োজন ছিল।
পালনকর্তাই ভালভাবে জানেন কিভাবে তিনি পালন করবেন।
কোরানের সুরা কাহাফে মুসা আ. ও খিজিরকে নিয়ে একটা গল্প আছে।
এই গল্পটিতে ভাল-মন্দ সম্পর্কে মানুষের ধারণা কতটা সীমাবদ্ধ এবং আল্লাহর
জ্ঞানের পরিধি কতটা বিস্তৃত তা তুলে ধরা হয়েছে।
গল্পটা এরকমঃ মুসা খিজিরকে বললো,
'ন্যায়
পথের যে জ্ঞান আপনাকে দান করা হয়েছে তা আমাকে শিক্ষা দেবেন - এ শর্তে কি
আমি আপনার অনুসরণ করতে পারি'?
তিনি বললেন,
'নিশ্চয়ই
আপনি আমার সঙ্গে ধৈর্য ধারণ করে থাকতে পারবেন না;
আর আপনি কেমন করেই বা সে বিষয়ে ধৈর্য ধারণ করবেন যে বিষয় আপনার জ্ঞান
সীমার বাইরে!'।
(চলবে)
ফিনল্যান্ডে ধূমপান নিষিদ্ধ আইন
ফয়সাল
॥
ফিনল্যান্ডের
প্রেসিডেন্ট তারজা হ্যালোনেন দেশে পুরোপুরিভাবে ধূমপানের অবসান ঘটানোর
লক্ষ্যে সরকারের প্রস্তাবিত একটি নতুন তামাক আইন অনুমোদন করেছেন।
নতুন তামাক আইনটির লক্ষ্য হচ্ছে,
শিশু ও যুবাদের ধূমপান থেকে বিরত রাখা।
নতুন আইনে ১৮ বছরের কম বয়সী বিশেষ করে শিশু ও যুবাদের কাছে তামাক বিক্রি
ও সরবরাহ করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
কোন দোকান বা ব্যক্তি ১৮ বছরের কম বয়সী কারও কাছে তামাক বিক্রি বা সরবরাহ
করতে পারবে না।
আইন অনুযায়ী,
কোন ব্যক্তি সিগারেট বিক্রি করলে বা কোন অল্প বয়সী শিশুর জন্য কোন দোকান
থেকে সিগারেটের প্যাকেট কিনলে তাকে জরিমানা বা ৬ মাস পর্যন্ত কারাদ দেয়া
যেতে পারে।
বিনামূল্যেও কোন শিশুর কাছে তামাক সরবরাহ করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
ঢাকায় ব্লেয়ার দম্পতি
সংলাপ
॥
ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার ও তার স্ত্রী চেরি ব্লেয়ার
ব্যক্তিগত সফরে গত শুক্রবার ঢাকা পৌঁছেছেন।
ব্লেয়ার দম্পতি বেলা ৩-৪০ মিনিটে একটি বিশেষ বিমানে হযরত শাহজালাল (র:)
আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন।
বাংলাদেশ সরকারের প্রতিমন্ত্রী মর্যাদার বিশেষ দূত মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন,
পররাষ্ট্র সচিব মোহাম্মদ মিজারুল কায়েস এবং ঢাকায় ব্রিটিশ হাইকমিশনার
স্টিফেন ইভান্স বিমানবন্দরের ভিভিআইপি টার্মিনালে তাদের স্বাগত জানান।
বিমানবন্দর থেকে অতিথিরা ব্রিটিশ হাইকমিশনারের বাসভবনে যান।
সফরকালে তারা সেখানেই অবস্থান করবেন।
উল্লেখ্য,
টনি ব্লেয়ার এর আগেও দুবার বাংলাদেশ সফর করেছেন।
পররাষ্ট্রসচিব বলেন,
'এটি
টনি ব্লেয়ার ও তার স্ত্রীর ব্যক্তিগত সফর হলেও ব্যক্তি হিসেবে টনি
ব্লেয়ারের একটি অবস্থানও রয়েছে।
সে অবস্থান থেকেই তিনি দুদেশের দ্বিপাক্ষিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে
আলোচনা করবেন।
রাতে টনি ব্লেয়ার ও চেরি ব্লেয়ার ডা. দীপু মনির সরকারি বাসভবন
'পররাষ্ট্র
ভবনে'
নৈশ ভোজে অংশ নেন।
ভোজসভায় বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ রেহানা,
তার কন্যা ব্রিটিশ লেবার পার্টির প্রভাবশালী সদস্য ও লন্ডনের ক্যামডেন
এলাকার কাউন্সিলর টিউলিপ সিদ্দিকী,
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়,
তার স্ত্রী ক্রিস্টিন ওভামায়ার,
অ্যাম্বাসেডর অ্যাট লার্জ মোহাম্মদ জিয়া উদ্দিন,
ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূত স্টিফেন ইভানসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
শনিবার সকাল সাড়ে ১০ টায় তারা গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে
এবং দুপুরে বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করেন।
বেলা চারটায় অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে তার বাসভবনে সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হন
ব্লেয়ার দম্পতি।
রবিবার সকালে যুক্তরাজ্যের উদ্দেশে যাত্রা করেন।
ব্লেয়ারের সফরে অপর দুজন সদস্য হচ্ছেন প্রটোকল প্রধান হিল ক্রিস্টোফার ও
ব্যক্তিগত সহকারি বুলক সুসান।
সত্য
(৪)
সংলাপ
॥
(পূর্ব প্রকাশের পর)
সত্যকথা বলা ভালো আজ আমার এই কথা সকলের পুরাতন ঠেকিতেছে।
সত্য চিরদিনই নূতন,
কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্যক্রমে,
দুর্বলতাবশত পুরাতন হইয়া যায়।
সত্যকে যতক্ষণ সত্য বলিয়া অনুভব করিতে থাকি,
ততক্ষণ তাহা নূতন থাকে,
কিন্তু যখন মনের অসাড়তাবশত আমরা সত্যকে কেবলমাত্র মানিয়া লই অথচ মনের
মধ্যে অনুভব করিতে পারি না,
তখন তাহার অর্ধেক সত্য চলিয়া যায়,
সে প্রায় মিথ্যা হইয়া উঠে।
যে শব্দ আমরা ক্রমাগত শুনি,
অভ্যাসবশত তাহা আর শুনিতে পাই না,
এই কারণে পুরাতন সত্য সকলে বলিতে পারে না।
মহাপুরুষেরাই পুরাতন সত্য বলিতে পারেন-- বুদ্ধ,
খৃস্ট,
চৈতন্যেরাই পুরাতন সত্য বলিতে পারেন।
সত্য তাঁহাদের কাছে চিরদিন নূতন থাকে,
কারণ সত্য তাঁহাদের যথার্থ প্রিয়ধন।
আমরা যাহাকে ভালোবাসি সে কি আমাদের কাছে
কখনো পুরাতন হয়! তাহাকে কি প্রতি নিমেষেই নূতন করিয়া অনুভব করি না?
প্রথম সাক্ষাতেও নেত্র যেমন অসীম তৃপ্তি অথবা অপরিতৃপ্তির সহিত তাহার
মুখের প্রতি আবদ্ধ থাকিতে চায়,
দশ বৎসর সহবাসের পরেও কি নেত্র সেই প্রথম আগ্রহের সহিত তাহাকেই চারি দিকে
অনুসন্ধান করিতে থাকে না?
সত্য মহাপুরুষদের পক্ষে সেইরূপ চিরনূতন প্রিয়বস্তু।
আমার কি তেমন সত্যপ্রেম আছে যে,
আজ এই পুরাতন যুগে মানবসভ্যতা প্রাদুর্ভাবের কত সহস্র বৎসর পরে পুরাতন
সত্যকে নূতন করিয়া মানবহৃদয়ে জাগ্রত করিতে পারিব!
যাহারা সহজেই সত্য বলিতে পারে তাহাদের সে কী অসাধারণ ক্ষমতা! যাহারা
হিসাব করিয়া পরম পারিপাট্যের সহিত সত্য রচনা করিতে থাকে,
সত্য তাহাদের মুখে বাধিয়া যায়,
তাহারা ভরসা করিয়া পরিপূর্ণ সত্য বলিতে পারে না।
রামপ্রসাদ ঈশ্বরের পরিবারভুক্ত হইয়া যেরূপ আত্মীয় অন্তরঙ্গের ন্যায়
ঈশ্বরের সহিত মান অভিমান করিয়াছেন,
আর কেহ কি দুঃসাহসিকতায় ভর করিয়া সেরূপ পারে! অন্য কেহ হইলে এমন এক
জায়গায় এমন একটা শব্দ প্রয়োগ,
এমন একটা ভাবের গলদ করিত যে,
তৎক্ষণাৎ সে ধরা পড়িত।
অনুভব করিয়া বলিলে সত্য কেমন সহজে সর্বাঙ্গসম্পূর্ণ হইয়া ধরা দেয় তাহার
একটা দৃষ্টান্ত আমার মনে পড়িতেছে।
প্রাচীন ঋষি সরল হৃদয়ে যে প্রাথর্ঞ্চনা উচারণ করিয়াছিলেন,
'অসত্যে
মা সদগময়,
তমসো মা জ্যোতির্গময়,
মৃত্যৎর্মামৃতং গময়,
আবিরাবীর্ম এধি,
রুদ্র যত্তে দক্ষিণং মুখং তেন মাং পাহি নিত্যং।'
অপরূপ নিয়মে হীরক যেমন সহজেই হীরক হইয়া উঠে,
এই প্রার্থনা তেমনি সহজে ঋষিহৃদয়ে উজ্জ্বল আকার ধারণ করিয়া উদিত হইয়াছিল,
আজ যদি কেহ হিসাব করিয়া এই প্রার্থনার ভাব সংশোধন করিতে বসেন,
তাহা হইলে আমাদের হৃদয়ে আঘাত লাগে,
হয়তো তাহাতে এই প্রার্থনাস্থিত সত্যের সহজ উজ্জ্বলতা ম্লান হইয়া যায়।
'রুদ্র
তোমার যে প্রসন্ন মুখ তাহার দ্বারা আমাকে সর্বদা রক্ষা করো'
প্রার্থনার এই অংশটুকু পরিবর্তন করিয়া কেহ কেহ বলিয়া থাকেন,
জ্ঞদয়াময় তোমার যে অপার করুণা,
তাহার দ্বারা আমাকে সবর্ঞ্চদা রক্ষা করোঞ্চ এইরূপে ঋষিদিগের এই প্রাচীন
প্রার্থনার কিয়দংশ ছিন্ন করিয়া তাহাতে একটি নূতন ভাব তালি দিয়া লাগানো
হইয়াছে-- কিন্তু এ কি বাস্তবিক সংশোধন হইল?
সরলহৃদয় ঋষি কি মিথ্যা বলিয়াছিলেন?
এই প্রার্থনায় ঈশ্বরকে যে রুদ্র বলা হইয়াছে সত্যপরায়ণ ঋষির মুখ দিয়া অতি
সহজে এই সম্বোধন বাহির হইয়াছে।
অসত্য,
অন্ধকার মৃত্যুর ভয়ে ভীত হইয়াই ঋষি ঈশ্বরকে ডাকিতেছেন,
কিন্তু সেইসঙ্গে তাঁহার মনের এই বিশ্বাস ব্যক্ত হইতেছে যে,
সত্য আছে,
জ্যোতি আছে,
অমৃত আছে।
এই বিশ্বাসে ভর করিয়াই তিনি বলিয়াছিলেন,
'রুদ্র
তোমার যে প্রসন্ন মুখ'--
এমন আশ্বাসবাণী আর কী হতে পারে,
এমন মাভৈঃ ধ্বনি শুনিতেছি আমাদের আর ভয় কী! যে
'প্রসন্ন
মুখ'--
এমন আশ্বাসবাণী আর কী হইতে পারে,
এমন মাভৈঃ ধ্বনি শুনিতেছি আমাদের আর ভয় কী! যে ঋষি অসত্যের মধ্যে সত্য,
অন্ধকারের মধ্যে জ্যোতি,
মৃত্যুর মধ্যে অমৃত দেখিয়াছেন,
তিনিই রুদ্রের দক্ষিণমুখ দেখিয়াছেন,
এবং সেই আনন্দবারতা প্রচার করিতেছেন,
তিনি বলিতেছেন ভয়ের মধ্যে অভয়,
শাসনের মধ্যে প্রেম বিরাজ করিতেছে।
এখানে
'দয়াময়'
বলিলে এত কথা ব্যক্ত হয় না,
সে কেবল একটা কথার কথা হয় মাত্র।
তাহাতে রুদ্রভাবের মধ্যেও প্রসন্নতা,
আপাতপ্রতীয়মান অমঙ্গলরাশির মধ্যেও সরল হৃদয়ে মঙ্গলস্বরূপের প্রতি দৃঢ়
নির্ভর এমন সুন্দররূপে ব্যক্ত হয় না।
মহর্ষি এতশত ভাবিয়া বলেন নাই,
ঈশ্বরের প্রসন্ন দক্ষিণমুখ দেখিতে পাইয়াছেন বলিয়াই তিনি নির্ভয়ে ঈশ্বরকে
রুদ্র বলিতে পারিয়াছেন,
তাঁহার মুখ দিয়া সত্য অবাধে বাহির হইয়াছে,
আর আমরা বিস্তর তর্ক করিয়া যুক্তি করিয়া তাহার একটি কথা পরিবর্তন
করিলাম,
তাহার সর্বাঙ্গ সম্পূর্ণতা নষ্ট হইয়া গেল।
ইহা হইতেই প্রমাণ হইতেছে,
সত্য বলা সহজ নয়।
ইস্কুলের পড়ার মতো সত্য মুখস্থ করিয়া সত্য বলা যায় না।
(চলবে)
রাজধানীতে আবার সক্রীয় হয়ে উঠেছে হিযবুত তাহরীর
সংলাপ
॥
নিষিদ্ধ সংগঠন হিযবুত তাহরীর আবারো সক্রিয় হয়ে উঠেছে রাজধানীতে।
খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এলাকা কুড়িলের বিভিন্ন দেয়ালজুড়ে গত কয়েক দিনে
লেগেছে সংগঠনটির হাজার হাজার পোস্টার।
নর্দা,
মোহাম্মদপুরসহ অনেক এলাকার দেয়ালও ছেয়ে গেছে একই পোস্টারে।
জুমার নামাজের পর বিভিন্ন মসজিদে বিলি করা হয়েছে লিফলেট।
সংগঠনকে শক্তিশালী করতে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া যুবকদের নিয়ে কয়েকটি
এলাকায় বৈঠকও হয়েছে।
অথচ এসবের কিছুই জানে না পুলিশ।
জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে নিষিদ্ধ হওয়ার মাত্র ১০ মাসের মাথায়
হিযবুত তাহরীরের এভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠাকে খুব একটা আমলে নেয়নি গোয়েন্দারাও।
আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার চোখ ফাঁকি দিয়ে মসজিদে মসজিদে লিফলেট বিতরণ,
দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার সাঁটোনো ও গোপনে মহল্লায় মহল্লায় গণসংযোগসহ
বিভিন্ন কৌশলে সাংগঠনিক কার্যক্রম ইদানীং আবারো জোরদার করছে হিযবুত
তাহরীর।
গত বছরের ২২ অক্টোবর নিষিদ্ধ হওয়ার পর আইন প্রয়োগকারী সংস্থা দেশব্যাপী
অভিযান চালিয়ে সংগঠনের প্রধান মহিউদ্দিনসহ কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে গ্রেপ্তার
করে।
এরপর কিছুদিন গা ঢাকা দিয়েছিল অন্যরা।
তবে ভেতরে ভেতরে তাদের কার্যক্রম থেমে থাকেনি।
মহিউদ্দিনকে গ্রেপ্তারের কয়েকদিন পর হঠাৎ একযোগে রাজধানীর বিভিন্ন মসজিদে
জুমার নামাজের পর লিফলেট বিলি করে হিযবুত তাহরীর।
এ
সময় তাদের বেশ কয়েকজন কর্মীকে গ্রেপ্তারও করা হয়।
পরে মাস কয়েক প্রকাশ্য কার্যক্রম বন্ধ রেখে সমপ্রতি তারা আবারো সক্রিয়
হয়ে উঠেছে।
জানা গেছে,
রাজধানীর বাড্ডা থানার কুড়িল ও গুলশান থানার নর্দা এলাকা এখন হিযবুত
তাহরীরের বড় আস্তানা।
নর্দা সরকার বাড়ি জামে মসজিদে প্রতি জুমার পর এই সংগঠনের বৈঠক বসে।
ওই এলাকার মসজিদে মসজিদে জুমার নামাজের পর হিযবুত তাহরীর লিফলেট বিতরণ
করা হয়।
আগে সংগঠনের যুবকরা হাতে হাতে এ লিফলেট বিলি করতো।
তবে এখন কৌশল বদলে তারা মসজিদের কোনো একটি জায়গায় লিফলেটগুলো রেখে দিয়ে
চলে যাচ্ছে।
নামাজ শেষে মুসল্লিরা কৌতূহলবশত সেই লিফলেট হাতে তুলে নিচ্ছেন।
পাশাপাশি প্রতিটি মহল্লার দেয়ালেও সংগঠনটির অসংখ্য পোস্টার দেখা গেছে।
এলাকার কেউ কেউ এসব পোস্টার ছিঁড়ে ফেললে পরদিনই দেখা যায় সেখানে নতুন
পোস্টার লাগানো হয়েছে।
প্রতিদিন গভীর রাতে কে বা কারা এসব পোস্টার লাগিয়ে দিয়ে যায় তা নিয়ে
স্থানীয়রা মুখ খোলেন না।
সবচেয়ে বেশি পোস্টার লাগানো হয়েছে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার প্রবেশ মুখে
যমুনা ফিউচার পার্কের পশ্চিম পাশের দেয়ালে।
দক্ষিণ কুড়িলের মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান সরণির প্রায় প্রতিটি বাড়ির
দেয়ালেই হিযবুত তাহরীরের পোস্টারে ঢাকা।
সমপ্রতি ইসলামী ছাত্রশিবির থেকে যারা পদত্যাগ করেছে তাদের দলে টানছে
নিষিদ্ধ সংগঠন হিযবুত তাহরীর।
দলের নেতাকর্মীদের অভিজাত প্রভাবশালী পরিবারে গৃহশিক্ষক নিয়োগ করে ওই
পরিবারের সদস্যদের সমর্থন আদায় করে সংগঠনের শক্তি বৃদ্ধির কৌশল নিয়েছে
তারা।
প্রভাবশালী পরিবারের গৃহশিক্ষক হওয়ার সুবাদে তারা অবাধে এলাকায় সংগঠনের
প্রচারণা চালাতে পারছে।
এ
ছাড়াও নতুন উদ্যমে বিভিন্ন এলাকায় টার্গেট করে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের
ছাত্রদের দলে টানার চেষ্টা করছে সংগঠনের সিনিয়র নেতারা।
বিশ্ব উষ্ণায়নঃ মেরু অঞ্চলের বরফের পাহাড় ভাঙছে
সংলাপ
॥
বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে প্রতিবছরই ভাঙছে মেরু অঞ্চলে জমে থাকা বরফের পাহাড়।
এসব বরফের পাহাড়ের আকৃতি কয়েক মাইল থেকে শুরু করে কয়েকশ'
মাইল পর্যন্ত।
উত্তর মেরুর কাছের দেশ গ্রিনল্যান্ড নামে গ্রিন হলেও তা বরফের সাদা চাদরে
ঢাকা।
উত্তর মেরুর দিকে দেশটির উপরের অংশে দু'টি
বিশাল আকারের বরফের পাহাড় জমে আছে।
তার একটির নাম পিটারম্যান গ্ল্যাসিয়ার।
সাগরের পানির ওপর ভেসে থাকা এই গ্ল্যাসিয়ার বা বরফের পাহাড়টি হচ্ছে ৭০
কিলোমিটার লম্বা।
কিছুদিন আগে তারই একটি বড় অংশ ভেঙে আলাদা হয়ে গিয়েছে সমুদ্রে।
এই মাসের শুরুর দিকে নাসার উপগ্রহ থেকে পাঠানো ছবিতে ঘটনাটি লক্ষ্য করতে
পেরেছিলেন মার্কিন বিজ্ঞানীরা।
তখনই তারা জানিয়ে দেন যে,
গ্রিনল্যান্ডের উত্তরে একটি নতুন বরফ খ দেখা যাচ্ছে যেটি নিউইয়র্ক শহরের
ম্যানহাটানের চেয়ে নাকি চারগুণ বড়।
যুক্তরাষ্ট্রের সব পানির কল যদি টানা ১২০ দিন খুলে রাখা হয় তাহলে যে
পরিমাণ পানি পড়বে সে পরিমাণ পানি জমে আছে এই বরফ খ টিতে।
ক্যানাডার আইস সার্ভিসের বিজ্ঞানীরাও এই বরফ খন্ড ভেঙে পড়ার ওপর নজর
রাখছিলেন।
সেখানকার কর্মকর্তা ট্রুডি ওলেনবেন এই বরফ খ টির আকার সম্পর্কে বলেন,
''আপনি
যদি এর মাঝে দাঁড়িয়ে থাকেন,
তাহলে বুঝতে পারবেন না যে এটি একটি ভাসমান বরফের চাঁই।
অথবা যদি জাহাজে থাকেন,
তাহলে মনে হবে সমুদ্রের মধ্য থেকে একটি বিশাল বরফের দেয়াল ভেসে উঠেছে।”
বিশাল আকারের এই বরফের খ টি ভেঙে পড়েছে গ্রিনল্যান্ডের উত্তরের নারিস
স্ট্রেইট এলাকায়।
এলাকাটি উত্তর মেরু থেকে এক হাজার কিলোমিটার দক্ষিণে এবং গ্রিনল্যান্ডের
উত্তর-পশ্চিম ও ক্যানাডার উত্তর পূর্বাঞ্চলের এলেসমেয়ার দ্বীপের
মিলনস্থলে।
বরফের দ্বীপটি এখন আর্কটিক সমুদ্রে স্রোতে ভেসে চলেছে এবং ক্রমশ এগিয়ে
আসছে ক্যনাডার উপকূলের দিকে।
বিজ্ঞানীরা দেখছেন,
বরফ খ টির গতিপথ এখন ক্যানাডার নিউফাউন্ডল্যান্ড এলাকার ল্যাব্রাডর
উপকূলের দিকে।
বিজ্ঞানী ট্রুডি ওলেনবেন জানিয়েছেন এই পথটুকু পাড়ি দিতে এক থেকে দুই বছর
লেগে যেতে পারে বরফ খ টির?
তবে বিশেষ করে বিপদে পড়তে পারে সমুদ্রে চলাচলকারী জাহাজগুলো।
ট্রুডি ওলেনবেনের কথায়,
''এর
আগে ২০০৮ সালে এর চেয়ে ছোট একটি বরফ খ ভেঙে গিয়েছিল।
জুলাইয়ের মধ্যে তা ভাঙতে শুরু করে।
ল্যাব্রাডর উপকূলের উত্তর বিন্দু ব্যাসিন দ্বীপ পর্যন্ত পৌঁছতে এর সময়
লেগেছিল প্রায় এক বছর।
তার আগেই এটা ভেঙে ছোট ছোট টুকরো হয়ে যায়।
আমার মনে হয় এটাও ভেঙে যাবে।
তবে সমস্যা হলো এই ভাঙা টুকরোগুলো জাহাজ চলাচলের সমুদ্র এলাকাতে ঢুকে
যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এছাড়া তেল উত্তোলনের এলাকাতেও চলে আসতে পারে বরফের ভাঙা টুকরোগুলো।
তখন এগুলোকে ভাঙতে যেসব পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে তাতে অনেক ধরনের জটিলতা
রয়েছে।
আমি নিশ্চিত যে এই বরফ খন্ড গলতে শুরু করবে।
তবে আমাদের দেখা অন্য যে কোনগুলোর চেয়ে এটি অনেক বড়।”
সমুদ্রপৃষ্ঠ যেভাবে দিন দিন উষ্ণ হচ্ছে,
তার কারণেই কি বরফের এই ভেঙে পড়া?
বিজ্ঞানীরা অবশ্য এখনই এই ঘটনার জন্য জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করতে
চাচ্ছেন না।
কারণ,
সমুদ্রপৃষ্ঠ উষ্ণায়ন ছাড়াও আরো অনেক কারণ তারা সম্ভাব্য হিসেবে তালিকায়
রাখছেন।
ট্রুডি ওলেনবেন বললেন,
''এখানে
অনেক বিষয়ই জড়িত।
এর সঙ্গে কোন একটি বিষয়কে সরাসরি সংযুক্ত করাটা কঠিন।
জমে থাকা বরফের পাহাড়ের নিচে সমুদ্রতলের স্রোতের গতি,
মহাদেশের তাপমাত্রা,
গ্রিনল্যান্ডের দিকে বাতাসের গতি- অনেক কিছুই রয়েছে।
আমি সুনির্দিষ্ট কিছুকে দায়ী করতে চাচ্ছি না।”
তবে বিজ্ঞানীরা কোন কিছুকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করতে না চাইলেও
প্রশ্ন কিন্তু উঠছেই।
মেরু অঞ্চলে সমুদ্রের ওপর ভেসে থাকা এসব বরফের পাহাড় ৫৫ মিটার পর্যন্ত
পুরু।
কিন্তু এই পুরু বরফ কি এখন পাতলা হয়ে আসছে?
এই প্রশ্নের উত্তর এখন না দিলেও পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছেন
পরিবেশ বিজ্ঞানীরা।
অপরাধীর স্পাইনাল কর্ড কেটে দেয়ার নির্দেশ
রুবেল
॥
চোখের বদলে
চোখ,
কানের বদলে
কান কিংবা প্রাণের বদলে প্রাণ - সৌদি আরবের বিচার ব্যবস্থায় এখনও এই
'বদলি
সাজা'র
রীতি প্রচলিত।
যার
সর্বশেষ প্রতিফলন ঘটেছে সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় তাবুক শহরে একজন
বিচারকের দেয়া রায়ে।
সামান্য মাংস চুরির ঘটনায় দুই ব্যক্তির মধ্যে মারামারির জেরে একজন
পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয় এবং পরে সে একটি পা হারায়।
অপরজন ভর্তি হয় হাসপাতালে।
পরে
পক্ষাঘাতগ্রস্ত লোকটি তার করা মামলায় অপরজনেরও অনুরূপ শাস্তির জন্য
প্রার্থনা জানায়।
মামলার রায়ে বিচারক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে আদেশ দেন,
সম্ভব হলে
যেন হাসপাতালে ভর্তি আসামির স্পাইনাল কর্ডটি কেটে ফেলা হয়,
যাতে সেও
পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়।
বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর এর কঠোর সমালোচনা করে অ্যামনেস্টি
ইন্টারন্যাশনাল বলেছে,
সৌদি
কর্তৃপক্ষের উচিত,
যে কোন
মূল্যে এ রায় কার্যকরে বাধা দেয়া।
কারণ
সচেতনভাবে কাউকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করাটা মোটেই আইনসঙ্গত নয়।
বরং
এটা এক ধরনের অত্যাচার এবং মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লংঘন।
সৌদি
ইসলামী বিধান অনুযায়ী,
কুকর্মের
শাস্তি হিসেবে চোখ উপড়ে ফেলা কিংবা হত্যার শাস্তি হিসেবে শিরশ্ছেদ করার
নিয়ম প্রচলিত।
ব্রিটেনভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মুখপাত্র
হাসিবা হাজ সাহরাওয়ি বলেন,
এ ধরনের
শাস্তি প্রয়োগ থেকে সরে আসার জন্য আমরা সৌদি কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ
জানিয়েছি।
কারণ
এটি একটি নির্মম অত্যাচার।
শুধু
তাই নয়,
কাউকে
সচেতনভাবে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করাটা আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত মানবাধিকারের
লংঘনও বটে।
রাজনৈতিক সংস্কার প্রয়োজন
মাসুদুর
রহমান
॥
অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ধরে রাখতে চীনে রাজনৈতিক সংস্কার প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রী ওয়েন জিয়াবাও চীনের শেনঝেন শহর সফরকালে একথা বলেন।
ওয়েনের রাজনৈতিক সংস্কারের আহ্বানে সুনির্দিষ্ট কিছু বলা হয়নি।
তবে তার মন্তব্যে এ উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছে যে,
ক্ষমতাসীন দল সরকারি কর্মকর্তাদের আরো জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কিছু
সংস্কার কার্যক্রম হাতে না নিলে দুর্নীতি এবং অপব্যবহার দেশে অর্থনৈতিক
সমৃদ্ধির সম্ভাবনা নস্যাৎ করতে পারে।
সিনহুয়া ওয়েনের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে,
রাজনৈতিক সংস্কার ছাড়া চীন ইতিমধ্যেই যে অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করেছে
তা হারানোসহ আধুনিকায়নের লক্ষ্যও হয়ত অর্জন করতে পারবো না।
তিনি আরো বলেছেন,
জনগণের গণতান্ত্রিক ও আইনগত অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
জনগণ আইন,
রাষ্ট্র,
অর্থনৈতিক,
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আবহ অনুযায়ী তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
জনগণকে সরকারের সমালোচনা করা এবং তদারকি করার মতো পরিবেশও তৈরি করে দেয়ার
ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন ওয়েন।
২০১৩ সালের প্রথম দিকে ওয়েন প্রধানমন্ত্রীত্ব থেকে অবসর নেবেন বলে জানা
গেছে।
সামপ্রতিক বক্তব্য ও মন্তব্যে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন,
শেষ বছরে তার উদ্দেশ্য সমাজ কল্যাণে আরো কাজ করা,
আরো অর্থের মজুদ তৈরি করা,
আরো ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আনা এবং সরকারের সঙ্গে জনগণের
অসন্তোষের বিষয়গুলো তুলে ধরা।
বাগদাদে সেনা নিয়োগ কেন্দ্রে
আত্মঘাতী হামলাঃ নিহত ৫৯ আহত ৮০ জন
ফয়সাল
॥
ইরাকের রাজধানী বাগদাদে একটি সেনা নিয়োগ কেন্দ্রে আত্মঘাতী বোমা হামলায়
কমপক্ষে ৫৯ জন নিহত ও ৮০ জন আহত হয়েছেন।
মুসলামানদের পবিত্র রমজান মাসকে অস্থিতিশীল করতেই এ হামলা চালানো হয় বলে
প্রশাসনিক সূত্রে জানা যায়।
ইরাকের উপ-স্বাস্থ্যমন্ত্রী খামিস আল-সাদ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন।
সাদ্দাম শাসনামলে সেনা নিয়োগের এ কেন্দ্রটি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ছিল।
তবে
২০০৩ সালে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং জাতীয় শাসন কাঠামো পরিবর্তন হওয়ার পর
থেকেই দখলদার যুক্তরাষ্ট্র এটিকে সেনা নিয়োগ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
এছাড়া কেন্দ্রটি সামরিক ঘাঁটি হিসেবেও ব্যবহার করা হয়।
নাম
প্রকাশে অনিচ্ছুক বাগদাদ মর্গের এক সূত্র জানায়,
সকালের মধ্যেই মর্গ ৫৯ জনের লাশ গ্রহণ করে।
এদিকে বাগদাদের সিটি হাসপাতাল সূত্র জানায়,
ঘটনার শেষ অবধি তারা ১২৫টি লাশ গ্রহণ করে থাকবে।
পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সেনাসূত্র জানায়,
সুন্নি মৌলবাদী আল-কায়েদা ও এর স্থানীয় সহযোগীদের অন্তত দুজন এ আত্মঘাতী
হামলায় অংশ নিয়েছে বলে তাদের ধারণা।
নির্বাচনের পাঁচ মাস পরেও সরকার গঠন না হওয়ায় দেশটিতে রাজনৈতিক অস্থিরতা
বিরাজ করছে।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র চলতি মাসেই নিরাপত্তা দায়িত্ব ইরাকের নিরাপত্তা বাহিনীর
হাতে দিয়ে ইরাক যুদ্ধের ইতি টানবে বলে ঘোষণা দেয়।
এর
মধ্যে হাজার সংখ্যক আমেরিকান সৈন্য দেশে ফেরত পাঠানোর কথা।
এরই
প্রেক্ষিতে হামলা বেড়ে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হয়।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দাপ্তরিক সূত্রে জানা যায়,
ঘটনাস্থলে নিহতদের বেশিরভাগই প্রার্থী,
তবে
বেশ কয়েকজন সেনাসদস্যও নিহত ও আহত হন।
এদের বেশিরভাগই ওই কেন্দ্রের প্রার্থীদের তত্ত্বাবধানে নিয়োজিত ছিলেন।
আহতদের আরো ১০০ জনের অবস্থাও করুণ।
ধারণা করা হচ্ছে মৃতের সংখ্যা আরো বেড়ে যাবে।
ইরাকি নিরাপত্তা মন্ত্রণালয় জানায়,
ইরাকের স্থানীয় সময় সকাল ৭.৩০ টায় হামলাকারী ঘটনাস্থলে প্রবেশ করে।
তবে হামলাকারী কেন সেনাসদস্যদের গোচরে আসল না এ বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।
হামলার পরপরই ইরাকি সেনাবাহিনী ঘটনাস্থল ঘিরে ফেলে।
হামলা স্থলে কাউকে প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না।
কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরাকে রক্তক্ষয়ী হামলা চলছে।
এ
ঘটনা তারই ধারাবাহিকতা বলে জানা যায়।
অস্ট্রেলিয়ার নির্বাচনঃ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন স্বতন্ত্রপ্রার্থীরা
সংলাপ
॥
অস্ট্রেলিয়ার পার্লামেন্ট নির্বাচনে কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ
করেনি।
ফলে হতাশ হয়ে পড়েছে বিনিয়োগকারীরা।
এদিকে নতুন সরকার গঠনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে নির্বাচিত
স্বতন্ত্রপ্রার্থীদের সমর্থন।
এতে প্রধান দুটি দলই স্বতন্ত্রপ্রার্থীদের নিজ নিজ দলে টানার চেষ্টা করছে।
১৯৪০ সালের পর অস্ট্রেলিয়ায় এই প্রথম কোনো নির্বাচনে সরকার গঠনের জন্য
দ্বিধাদ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছে।
এ
পর্যন্ত ৭৮.১ শতাংশ ভোট গণনা শেষে দেখা গেছে,
ক্ষমতাসীন ও প্রধান বিরোধী দলের মধ্যে কোনো দলই এককভাবে সরকার গঠন করার
জন্য প্রয়োজনীয় আসন পায়নি।
গণনাকৃত ৭৮.১ শতাংশ ভোটের মধ্যে ক্ষমতাসীন লেবার পেয়েছে ৩৮ শতাংশ এবং
প্রধান বিরোধী কনজারবেটিভ দল পেয়েছে ৪৩.৯ শতাংশ।
এদিকে গ্রিন দল পেয়েছে ১১.৫ শতাংশ এবং স্বতন্ত্রপ্রার্থী ও অন্যরা পেয়েছে
৬.৬ শতাংশ ভোট।
প্রধানমন্ত্রী জুলিয়া গিলার্ডের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন লেবার পার্টি
পেয়েছে ৭০টি আসন এবং টনি অ্যাবোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধীদলীয় জোট পেয়েছে
৭২টি আসন।
কিন্তু ১৫০ আসনের পার্লামেন্টের নিয়ন্ত্রণ পেতে হলে প্রয়োজন ৭৬টি আসন।
তাই পার্লামেন্টের ক্ষমতার লাগাম ধরতে হলে ৪ জন স্বতন্ত্রপ্রার্থীর ওপর
নির্ভর করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী জুলিয়া গিলার্ড শনিবার তার দলের সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন,
এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলার সময় আসেনি।
অনেক আসন বাকি যার ফলাফল এখনো পাওয়া যায়নি।
তিনি জানান,
চূড়ান্ত ফলাফল পেতে কয়েকদিন সময় লাগবে।
কিন্তু পরবর্তী সরকার গঠন যাদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে সেসব
নির্বাচিত স্বতন্ত্রপ্রার্থীদের মন জয়ের চেষ্টা ইতিমধ্যেই শুরু করে
দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
গত শনিবারের এ নির্বাচনের পর সরকার গঠনের জন্য পার্লামেন্টের
স্বতন্ত্রপ্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলবেন বলে জানান বিরোধীদলীয় নেতা টনি
আ্যাবট।
|