লরিয়েলের
উত্তরাধিকারী লিলিয়ান বেটেনকোর্ট সারকোজির ডানপন্থী দলকে অবৈধভাবে নগদ অর্থ
দিয়েছেন,
এই অভিযোগ
ওঠার কয়েক দিন আগেই বিরোধী এক সাংসদ বলেন,
'আমরা
যেন একটি ব্যানানা রিপাবলিকে (ছোট পরনির্ভর দেশ) বাস করি।
ফরাসিদের পক্ষে আর তা সহ্য করা সম্ভব নয়।'
লিলিয়ান
বেটেনকোর্টের প্রাক্তন এক হিসাবরক্ষকের বরাত দিয়ে তদন্তমূলক প্রতিবেদনের
ওয়েবসাইট
'মিডিয়াপার্ট'
সম্প্রতি এই
অভিযোগ তোলার পর কঠিন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন নিকোলাই সারকোজি ও
তার সরকার।
বামপন্থী সাময়িকী মারিআন তাদের ওয়েবসাইটে লিখেছে,
জনস্বার্থ
সংরক্ষণের কাজে যেসব নৈতিক বিধি থাকা দরকার,
প্রেসিডেন্ট
সারকোজির আমলে তার সবই লঙ্ঘিত হয়েছে।
সারকোজি ও তার
নির্বাচনী প্রচারের সময় কোষাধ্যক্ষের দায়িত্বে থাকা বর্তমান শ্রমমন্ত্রী
এরিক জ্যাখট অবৈধভাবে অর্থ নেয়ার অভিযোগ জোরালোভাবে অস্বীকার করেছেন।
কৌঁসুলিরা ঘটনাটি তদন্ত শুরু করেছেন।
এই
অভিযোগ আর তদন্তই সারকোজি সরকারের প্রতি দেশবাসীর নৈরাশ্য আর বিরক্তি
বাড়িয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট।
কেন না
দুই দশকের বেশি সময় ধরে রাজনৈতিক - আর্থিক কেলেঙ্কারিতে ফ্রান্সের জনগণের
জীবন বিষাক্ত হয়ে পড়েছে।
আশি ও
নব্বইয়ের দশকে প্রধান দক্ষিণপন্থী দলের অবৈধ তহবিল সংগ্রহের দায়ে ২০০৪ সালে
প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী আলা জুপের কারাদণ্ড স্থগিত হয়েছিল।
ওই
অপরাধে প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জ্যাক শিরাকের সম্ভাব্য ভুমিকার তদন্ত এখনো
চলছে।
আলোচিত অন্য
অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে বিদেশি অস্ত্র চুক্তি থেকে অবৈধ কমিশন নিয়ে তা
দলের নির্বাচনী প্রচারে ব্যবহার।
১৯৯৪
সালে সারকোজি বাজেটমন্ত্রী ছিলেন।
এই সময়
পাকিস্তানে ডুবোজাহাজ বিক্রির ঘটনার তদন্ত আবার সামনে উঠে আসতে পারে।
আটের দশকের
শেষের দিকে প্রকাশিত হয় যে,
ক্ষমতাসীন
সোশ্যালিস্টসহ অন্য দলগুলো ভুয়ো পরামর্শক প্রতিষ্ঠান খুলে ও বিভিন্ন উপায়ে
ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঘুষ নিয়েছে।
এ নিয়ে
গণক্ষোভের মুখে সরকার ১৯৮৮ সালে দেশে প্রথমবারের মতো রাজনৈতিক অর্থায়নের
ওপর আইন তৈরি করে।
এতে
রাজনৈতিক দলে অনুদান ও খরচের কঠোর মাত্রা বেঁধে দেয়া হয়।
এটি
নজরদারির জন্য একটি সংস্থা গঠন করা হয়।
আরেকটি
গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তহবিলের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর কর্পোরেট চাঁদার ওপর
নির্ভরশীলতা কমাতে সরকারি বরাদ্দের ব্যবস্থা করা।
১৯৯৫ সালে আরো
একটি আইন করে কোম্পানি ও অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ নেয়া নিষিদ্ধ
করা হয়।
তবে
রাজনৈতিক দলগুলোর পরস্পরকে অর্থ দেয়ার সুযোগ বহাল রাখা হয়।
কোনো ব্যক্তি
চাইলে কোনো দলকে অনুদান দিতে পারেন।
একজন
ব্যক্তি একটি দলকে বছরে সর্বোচ্চ সাড়ে সাত হাজার ইউরো এবং প্রার্থীকে
সর্বোচ্চ চার হাজার ৬০০ ইউরো দিতে পারবেন।
১৫০ ইউরোর
বেশি অনুদান দিতে চাইলে অবশ্যই তা চেকের মাধ্যমে দিতে হবে।
বেটেনকোর্টের ঘটনায় এসব নিয়ম লঙ্ঘন করা হয়েছে কি না,
তা তদন্ত করা
হচ্ছে।
তাহলে
প্রশ্ন উঠতে পারে,
সংস্কার
কার্যক্রম কি ব্যর্থ হয়েছে?
আর দুর্নীতি
কি সেই আগের মতোই রয়ে গেছে?
প্যারিসভিত্তিক সংস্থা
'অবজারভেটরি
অব পলিটিক্যাল অ্যান্ড পার্লামেন্টারি লাইফ'-এর
প্রধান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ডেনিস পুইয়াড মনে করেন,
ফ্রান্সের
রাজনীতি এখন আটের দশকের চেয়ে অনেক বেশি স্বচ্ছ।
বিবিসি
নিউজ ওয়েবসাইটকে পুইয়াড বলেন,
বড় ধরনের
পরিবর্তন হয়েছে।
তবে
অনিয়ম কমে এলেও সংস্কারের কিছু পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হয়েছে,
যার প্রতিকার
প্রয়োজন।
এই
অনিচ্ছাকৃত পার্শ্ব প্রতি ক্রিয়াগুলোর একটি হলো সরকারি তহবিলের সুযোগ পেয়ে
রাতারাতি রাজনৈতিক দল গজিয়ে ওঠা।
১৯৯০
সালে ফ্রান্সে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ছিল ৩০টিরও কম।
গত বছর
এ সংখ্যা ছিল ১০ গুণ বেশি।
এর
মধ্যে কয়েকটি দল মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরাই গঠন করেছেন।
বেটেনকোর্টের মামলায়
'এরিক
জ্যাখেটর কর্মসূচী সহায়ক সংগঠন'
নামের একটি
সংগঠন আলোচনায় উঠে এসেছে।
এ
সংগঠনটিকে বেটেনকোর্ট সাড়ে সাত হাজার ইউরো দিয়েছেন,
যা পুরোপুরিই
বৈধ।
এরিক
জ্যাখট বর্তমানে শ্রমমন্ত্রী।
ফ্রান্সজুড়ে স্থানীয় নেতারা এ রকম দল তৈরিতে ব্যস্ত।
পুইয়াডের মতে,
তহবিল সংগ্রহ
করাই অনেক ছোট দলের একমাত্র লক্ষ্য।
বিশ্লেষকদের মতে,
বিপদের বিষয়
হচ্ছে,
বড় দলগুলোর
হয়ে অর্থ সংগ্রহের জন্য ছোট দলগুলোকে কাজে লাগানো সম্ভব।
যেহেতু
দলগুলো নিজেদের মধ্যে অনুদান বিনিময় করতে পারে,
সেহেতু একজন
দাতা বৈধভাবেই সর্বোচ্চ সীমার মধ্যে থেকে একাধিক ছোট দলকে অনুদান দিতে পারে,
যারা আসলে
একটি বড় সংগঠনের সঙ্গেই যুক্ত।
রাষ্ট্র
বিজ্ঞানী পুইয়াড বলেন,
আমুল কোনো
সংস্কার প্রয়োজন নেই।
কিন্তু
আইনের ফাঁক ফোকর বন্ধ করা এবং শক্তিশালী পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি গঠন করা প্রয়োজন।
এটি
ফরাসি ভোটারদের আশ্বস্ত করবে যে তারা 'ব্যানানা
রিপাবলিক'-এ
বাস করেন না।