সংলাপ
: মুক্তিযুদ্ধে আপনি কিভাবে অংশ নিলেন?
সি আর দত্ত : আমার চাকুরিজীবন শুরু হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। তখন
একটা নিয়ম ছিলো যে প্রতিবছরে একমাস করে ছুটি নেয়া যাবে অথবা তিনবছর পরপর
তিনবছরের জন্য একবারে সর্বোচ্চ তিন মাস ছুটি নেয়া যাবে। আমি তিন মাস পরপরই
দেশে আসতাম। সেবারও সেনা অধিদপ্তর থেকে অনুমতি নিয়ে আমি স্বপরিবারে তিনমাসের
ছুটিতে এসেছি। সেটা ছিলো জানুয়ারি মাস, ১৯৭১। পূর্ব পাকিস্তানে আমার
হবিগঞ্জের বাসভবনে উঠেছি। তখনও পূর্ব পাকিস্তানে কি চলছে সে সম্বন্ধে আমার
স্পষ্ট ধারণা ছিলো না। পশ্চিম পাকিস্তানে থাকার সময়ও এসব বিষয়ে কিছু জানতে
পারিনি কারণ তখন তথ্য সেভাবে আসতো না। আর আমার সামনে এসব বিষয় নিয়েও কেউ
আলোচনা করেনি। সিলেট থেকে আমার মা-বাবা যে চিঠিপত্র পাঠাতেন তাতেও তারা কিছু
লিখতেন না এবং আমিও এ ব্যাপারে কিছু লিখতাম না। তাই আমি যখন জানুয়ারিতে এসে
পৌঁছালাম তখন আমার জানা খুব সীমিত থাকলেও বন্ধু-বান্ধবদের সাথে দেখা হওয়ার পর
তাদের মুখ থেকে অবস্থা সম্পর্কে জ্ঞাত হলাম। এরপর আমি পত্র-পত্রিকা ঘেঁটে আরো
কিছু তথ্য জানলাম। দেশের অবস্থা দেখে আমি মানসিকভাবে বেশ অস্থির হয়ে পড়লাম।
এরপর ৭ মার্চ আসলো।
৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু জ্বালাময়ী ভাষণ দিলেন। তিনি আহ্বান
রাখলেন ‘এবারের সংগ্রাম - মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার
সংগ্রাম। যার যা কিছু আছে তা নিয়েই শত্রুর মোকাবেলা করো।’ এই বক্তব্য আমাকে
দারুণভাবে নাড়া দিলো। সিদ্ধান্ত নিলাম আমি আর পশ্চিম পাকিস্তানে ফেরত যাবো
না। আমার এখন কি করা প্রয়োজন তা নিয়ে ভাবতে লাগলাম। কারো কাছ থেকেই কোনো
নির্দেশনা পেলাম না। আমার হবিগঞ্জের বাসার পাশেই কর্ণেল রব থাকতেন - পরে তিনি
জেনারেল হয়েছিলেন। ২৬ মার্চ সকালে তিনি আমাকে ডাকলেন। আমি সকালে নাস্তা খেয়ে
তার বাসায় গেলাম। ২৫ মার্চ ক্র্যাকডাউন সম্পর্কে আমার কোন ধারণাই ছিলো না। এ
ব্যাপারে কোন খবরই পাইনি। সেখানে যাওয়ার পর দেখলাম কমান্ডার মানিক চৌধুরীও
উপস্থিত আছেন। তারা দু’জনেই আওয়ামী লীগ করতেন। কর্ণেল রব পরিস্থিতি সম্পর্কে
অবহিত করলেন এবং বললেন যে বঙ্গবন্ধু তাকে নির্দেশ দিয়েছেন হবিগঞ্জে ফিরে যেতে
ও স্থানীয়দের সংঘবন্ধ করে সিলেটকে শত্রুমুক্ত করতে। কর্ণেল রব আরো কয়েকজন
স্থানীয় প্রভাবশালী এবং আনসার, ইপিআর, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর বাঙালি সদস্যদের
ওই বৈঠকে ডেকেছিলেন। সব মিলিয়ে প্রায় ১৫০ জনের মতো হবে। বৈঠকে তিনি বললেন,
‘বঙ্গবন্ধু নির্দেশে আমাদের সিলেটকে পাকিস্তানী হানাদারমুক্ত করতে হবে।’
তারপর তিনি আমার দিকে ফিরে বললেন, ‘মেজর দত্ত অভিযান পরিচালনার ভার তুমি
নাও।’ আমি সেসময় অত্যন্ত উৎফুল্ল হয়ে উঠে বললাম, ‘দাদা আমি রাজী আছি।’ আমি তো
চাইছিলামই পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে। দাদা আমাকে সুযোগটা করে দিলেন।
তিনি আমাকে নির্দেশনা দিলেন যে বড় বড় বেল্টগুলো যেন আগে শত্রুমুক্ত করি যাতে
তারা আমাদের মুভমেন্টে বিরক্ত করতে না পারে। সেদিনই বিকাল ৪.০০টায় আমার সিলেট
সদরের দিকে যাত্রা করি ওই এলাকাকে শত্রু মুক্ত উদ্দেশ্য নিয়ে। অপারেশনের
পুরোভাগে ছিলাম আমি। ৪.০০টায় সময় জীপ এসে উপস্থিত হলো আর যেসমস্ত সিপাহীরা
ছুটিতে ছিলো তাদের একত্রিত করে একটি দল আসলো। আমরা যখন রওনা হলাম তখন চারপাশ
থেকে জয় বাংলা - জয় বাংলা ধ্বনি উঠতে লাগলো। সেটা এমন একটা মুহূর্ত যেটা
নিজের চোখে না দেখলে অনুধাপবন করা যায় না। সারা শরীরে যেন একটা শিহরণ খেলে
যায়। রবদা, আমি ও মানিক চৌধুরী জীপে করে গেলাম এবং বাকিরা ট্রাকে করে আসতে
থাকলো। রাস্তায় রাত নেমে আসলো। আমি তো এলাকায় তেমন কাউকে চিনতাম না। রবদা
বললেন যে, ‘জীপ ঘুরিয়ে রশিদপুরে নিয়ে যাও সেখানে আমরা রাত্রে হল্ট করতে
পারবো।’ রশিদপুরের চা বাগানের ম্যানেজার আমাদের সঙ্গে ছিলো। তাই ঠিক হলো যে
রশিদপুরে আমরা রাতটা কাটাবো, খাওয়া-দাওয়া করে পরেরদিন আবার সকালে রওয়ানা হবো।
যেতে গিয়ে রাস্তায় দেখলাম ব্যারিকেড বসানো হয়েছে, যেগুলো মেরামত করা প্রয়োজন।
রবদা এসব রাস্তায় ব্যরিকেড বসাতে বললেন যাতে পাকিস্তানীরা এসব রাস্তায় না
আসতে পারে। হবিগঞ্জ থেকে রশিদপুর যেতে ঘন্টা খানেক লাগতো কিন্তু ব্যরিকেড
মেরামত করে বসাতে আমাদের অনেক সময় লেগে গেলো। আমরা খবর পেয়েছিলাম যে খালেদ
মোশাররফ শমসের নগরে একটা চা বাগানে অবস্থান করছেন। আমি তখন দাদাকে বলেছিলাম
যে আমাদের তার সাথে যোগাযোগ করতে হবে কারণ তার সাথে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট
আছে। তার ব্যাটেলিয়ন এবং আমার সাথে যারা আছে তাদের মিলিত শক্তিতে আমরা খুব
সহজেই সিলেট শহর শত্রুমুক্ত করতে পারবো। কিন্তু রশিদপুরে এসে খবর পেলাম যে
সকালেই শমসের নগর চা বাগান থেকে খালেদ মোশাররফ চলে গেছেন কুমিল্লা অভিমুখে।
আমার তখন একটু মন খারাপ হলো যে সে কুমিল্লার দিকে যাবে কেন, তার তো সিলেটের
দিকে থাকার কথা। যাই হোক যেহেতু দেখা হলো না তাই সিদ্ধান্ত নিলাম যা করার
আমাকে একাই করতে হবে। এইভাবে আমরা রাত দু’টার মৌলভীবাজার পৌঁছালাম।
মৌলভীবাজার একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। এখানে দুটো রাস্তা - শেওড়াকান্দা ও
কুলাওড়া এর মাঝে মৌলভীবাজার। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে মৌলভীবাজারকে আমার
সেন্টার বানাবো। হেডকোয়ার্টার বানাবার পর স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ফরিদ
গাজী, ইলিয়াস ও অন্যান্য আমার সাথে দেখা করলেন এবং সর্বোতভাবে সহযোগিতা দেয়ার
আশ্বাস দিলেন। তখন আমি খবর পেলাম যে পাকিস্তানীরা শেওড়াকান্দের কাছে ক্যাম্প
করেছে। ওটাকে আমার বের করতে হবে তাই আমি সবাইকে খবর নিতে বললাম। খবর আমি
পেলাম যে সুরমা নদীর ওপারে ওরা অবস্থান নিয়েছে। এদেরকে যদি না সরাতে পারি
তাহলে আমি সিলেট যেতে পারি না। সেখানে তাদের একটা পুরো প্লাটুন ছিলো। তাই আমি
দাদাকে বললাম এই ১৫০ জন সৈন্য দিয়ে শুধু হবে না। আমার আরো কিছু লোক এবং
গোলাবারুদ প্রয়োজন। ওই সময় মানিক চৌধুরী বর্ডারে চলে গেলো কারণ সেসময় বর্ডারে
ভারতের সৈন্যদের অবস্থান ছিলো, তাদের কাছে অনেক গোলাবারুদ থাকতো। পরেরদিন
তারা লোকজন ও গোলাবারুদ নিয়ে আসলো। তখন আমার কাছে প্রায় ৩০০-৩৫০’র মতো ছেলে
হয়ে গেলো। তারা ইপিআরের ট্রেইনড্ছিলো। আমি তখন বললাম যে এবার আমি
পাকিস্তানীদের শেষ করতে পারবো। তারপর পরিকল্পনার মাধ্যমে তাদের হটাতে আমরা
আক্রমণ করলাম। আমাদের আক্রমণে তারা সরে যেতে লাগলো। আমার কাছে মনে হলো তারা
সময় ক্ষেপন করছে কারণ তারা আসল যুদ্ধ করবে সিলেট শহরে। তাদের হাবভাবে আমার
কাছে তাই মনে হলো। এভাবে ধীরে ধীরে আমরা সিলেট শহরের দিকে এগিয়ে যেতে থাকলাম
যুদ্ধ করতে করতে এবং একসময় সিলেট শহর দখল করে নিতে সক্ষম হলাম।
সংলাপ : ৭ মার্চ ১৯৭১ সালে রেসকোর্সে প্রদত্ত বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণকে
আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করেন?
সি আর দত্ত : আগেও বলেছি যেহেতু আমি পশ্চিম পাকিস্তানে ছিলাম পূর্ব
পাকিস্তানের অবস্থা সম্পর্কে আমার তেমন ধারণা ছিলো না। যতটুকু শুনেছি তা
বন্ধু-বান্ধবদের মুখে। বঙ্গবন্ধু যখন এই ভাষণ দিলেন তখন আমি হবিগঞ্জে। এই
উদাত্ত আহবান আমার জীবনটাকে তছনছ করে দেয়। আমাকে তার ভাষণ এমনভাবে আলোড়িত করে
যে তখনই আমি সিদ্ধান্ত নেই যে আমি মুক্তিযুদ্ধে যাবো।
সংলাপ : ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার
সংগ্রাম’ - বক্তৃতার এই অংশটি সুস্পষ্টভাবে স্বাধীনতা ঘোষণার শামিল ছিলো
কিনা?
সি আর দত্ত : আমি মনে করি এটাই স্বাধীনতার ভাষণ এবং তখন থেকেই শুরু
হয়ে গেছে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ।
সংলাপ : ১ মার্চ গণপরিষদ অধিবেশন স্থগিত করার মধ্য দিয়ে সমগ্র
পূর্ববাংলায় বিদ্রোহের যে দাবানল প্রজ্জ্বলিত হয়ে ওঠে ৭ মার্চের বক্তৃতা এবং
এর আগে-পরে বঙ্গবন্ধুর দিক নির্দেশনায় পরিচালিত হয়েছিলো গোটা বাংলা। নিজস্ব
অভিজ্ঞতার আলোকে এ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কি?
সি আর দত্ত : আমি রাজনীতি বুঝি না। তবে আমি এটুকু বুঝেছিলাম ৭ মার্চের
পর সব কিছু তার নিয়ন্ত্রণেই ছিলো।
সংলাপ : ২৩ মার্চ পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবসে সেনানিবাস আর গভর্নর
হাউস ছাড়া সারা বাংলায় আর কোথাও পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা ওড়েনি। ২৩ মার্চ
সারা দেশে ঘরে ঘরে উড্ডীয়মান স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা বঙ্গবন্ধু সেদিন তার
বাসভবনেও আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তোলন করেন এবং এর মধ্য দিয়েই কার্যত কবর রচিত হয়
পূর্ব-পাকিস্তানের। মন্তব্য করুন।
সি আর দত্ত : আমি তো হবিগঞ্জে ছিলাম। আমি সে অবস্থান থেকে বলতে পারি
যে ৭ মার্চের পর আমরা সেখানে তো বাংলাদেশের পতাকাই উড়িয়েছি এবং যতদিন যুদ্ধ
করেছি ততদিন আমরা সেই পতাকাই বহন করেছি।
সংলাপ : আপনার জানা মতে ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস ঘোষণার ভিত্তি কি?
সি আর দত্ত : আমার কাছে যেটা মনে হয় যে ২৬ মার্চ সংঘবদ্ধভাবে সশস্ত্র
যুদ্ধ শুরু করেছি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সে কারণেই ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস
ঘোষণা হয়েছে। এর আগে যেটা হয়েছে সেটা অসংগঠিত প্রতিরোধ লড়াই ছিলো।
সংলাপ : ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু কর্তৃক স্বাধীনতা ঘোষণার কোনো গ্রহণযোগ্য
প্রমাণ নেই এবং ঘটনার গতিধারাতে স্পষ্ট যে ৭ মার্চের বক্তৃতায় ও তৎপরবর্তী
ঘটনাবলীর পর নতুন করে এরূপ কোনো ঘোষণা প্রদানের প্রয়োজনও ছিলো না - যুক্তিও
দেখা যায় না। আপনার অভিমত কি?
সি আর দত্ত : ৭ মার্চের ঘোষণার পর আর নতুন করে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু
বলার প্রয়োজন ছিলো না। আমি এ ব্যাপারে আপনাদের সাথে একমত।
সংলাপ : ২৭ মার্চ মেজর জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ-কে ঠেকাতে গিয়ে
২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর নামে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা বস্তুতঃ
বঙ্গবন্ধুকে হেয় করার সামিল এবং মিথ্যাচারে ভরপুর। মন্তব্য করুন।
সি আর দত্ত : ২৬ মার্চ তো আমরা যুদ্ধ শুরুই করে দিয়েছি। জেনারেল রব ২৬
মার্চ এসে আমাদের সংঘবদ্ধ করলেন। তিনি আমাকে সিলেট দখল করার দায়িত্ব দিলেন।
সুতরাং ইতোমধ্যেই তো আমরা শুরু করে দিয়েছি। শুধু সিলেট সেক্টরে নয়, এছাড়াও
অন্যান্য সেক্টরে সেসময় যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিলো। কাজেই কারো কাছ থেকে নতুন
করে কোন ঘোষণা দরকার পড়ে না।
সংলাপ : বঙ্গবন্ধু সব নেতাকে পালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে বলেছিলেন -
কিন্তু তিনি নিজে কেন গ্রেপ্তার হতে গেলেন?
সি আর দত্ত : আমি বিশ্বাস করি না যে তিনি নিজে গ্রেপ্তার হয়েছেন। তিনি
একজন মহান রাজনীতিক। তবে সেনাবাহিনীর পরিকল্পনার পুরো ধারণা তার সেসময় ছিলো
না তাই তিনি ধরা পড়লেও অন্যদের পালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে বলেছিলেন।
সংলাপ : এই সকল বিষয়গুলোর পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বলতে চাচ্ছি যে ৭
মার্চকে স্বাধীনতা দিবস ঘোষণা করা হোক - এ বিষয়ের সাথে আপনি কি একমত।
সি আর দত্ত : আমার আপত্তি নেই। কারণ ৭ মার্চের ভাষণই আমাকে উদ্বুদ্ধ
করেছে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে।
------------------