গত ২৬ জুন ২০০৯, শুক্রবার বিকেল ৪.০১ মিনিটে জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপ-এর আয়োজনে শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলার সাধককুল বিষয়ে অনুষ্ঠিত হলো মুক্ত আলোচনা উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট ধর্মীয় চিন্তাবিদ, গবেষক, ঐতিহাসিক, সমাজবিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদগণ কথা দিয়ে কথা না রাখা সাধকদের দৃষ্টিতে অমার্জনীয় অপরাধ হলেও উপস্থিত থাকার সম্মতি দিয়েও উপস্থিত হতে পারেননি অনেকেই মুক্ত আলোচনার বিষয়বস্তু বাঙালির চেতনা ও অস্তিত্ব সম্পর্কে হলেও কোন অদৃশ্য কারণে হয়তো তা তাদের উপলব্ধি স্পর্শ করতে পারেনি বর্তমান বাঙালির চিন্তা ও মননের সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করাই ছিলো মুক্ত আলোচনার প্রয়াস

মুক্ত আলোচনায় যে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য এসেছে তা বাঙালিকে আবার নতুন করে ভাবতে সহায়ক শক্তি হবে তাই পাঠকের জ্ঞাতার্থে তা তুলে ধরা হলো :

 

 

শাহ্‌ সারফুল ইসলাম মাহমুদ

সদস্য, পরিচালনা পর্ষদ, সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপ

 

স্বাগত ভাষণে তিনি বলেন, সূফী সাধক আনোয়ারুল হক আশীর্বাদপুষ্ট সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপ আয়োজিত এই মুক্ত আলোচনায় আপনাদের জানাই হার্দিক হাক্কানী শুভেচ্ছা সর্বগ্রাসী প্লাবনের মতই মিথ্যাচারিতা ধারাবাহিকভাবে গ্রাস করে আসছে আমাদের গোটা সমাজ ব্যবস্থাকে চিন্তাবিদদের চিন্তায় ধরা পড়েছে সত্যের আজ বড়ই আকাল এই দেশে বর্তমান সংলাপ সত্যকে তুলে ধরার দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়ে ১৯৯৩ সালে আত্মপ্রকাশ করেছিল মাসিক হিসেবে সত্য প্রকাশে আপোষহীন থেকে লক্ষ্যের পানে এগিয়ে চলার নিরলস প্রচেষ্টায় সংলাপ একসময় মাসিক থেকে উত্তরণ ঘটে সাপ্তাহিকে বর্তমানে প্রক্রিয়া চলছে দৈনিক হিসেবে আত্মপ্রকাশের

সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে নির্ভীক লেখনীর পাশাপাশি সেমিনার, মুক্ত আলোচনা প্রভৃতির মধ্যে দিয়েও সংলাপ কাজ করে যাচ্ছে লক্ষ্যকে সামনে রেখেসাংবাদিকতায় মিথ্যাচারিতার প্রভাব শিরোনামে দেশব্যাপী প্রেসক্লাব-ভিত্তিক ধারাবাহিক মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠান, ‘রাজনীতি না জননীতি’, ‘একুশে ফেব্রুয়ারী না ৮ ফাল্গুন শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান, ‘কুরআন দর্শন না বিধান’, ‘মুসলিম ঐক্য’, ‘ইসলামের দৃষ্টিতে ভাস্কর্য’, ‘ভাস্কর্য বাঙালি জাতির ঐতিহ্য শীর্ষক জরুরি জাতীয় বিষয় নিয়েও জাতীয় প্রেসক্লাব সহ বিভিন্ন শহরাঞ্চলে মুক্ত আলোচনার আয়োজন করেছে বর্তমান সংলাপ তুলে ধরেছে সত্য জাতির সামনে সত্য সন্ধানের ধারাবাহিকতায় আজকের আয়োজন- শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলার সাধককুল

 

আজকের এই তাৎপর্যপূর্ণ মুক্ত আলোচনায় উপস্থিত আছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় বিদ্যাপীঠসহ ধর্মীয় অঙ্গনে যাঁরা রেখে চলেছেন সত্য অনুসন্ধান ও জ্ঞান র্চচার নিরলস প্রচেষ্টা জাতি এই আলোচনা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁদের কাছ থেকে জানতে পারবে শান্তি অন্বেষণের পথ এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলার সাধককুলের অবদানের কথা এর সঙ্গে জড়িত আরও কিছু প্রাসঙ্গিক প্রশ্নের উত্তর উঠে আসবে আজকের আলোচনায় এটাই প্রত্যাশা

প্রশ্ন উঠবে শান্তি কি? কি হতে পারে শান্তির সংজ্ঞা? শান্তি কোথায় অবস্থান করে? কিভাবে? কখন? প্রশ্ন আসবে সাধকের সংজ্ঞা কি? সাধক হিসেবে চিহ্নিত হবেন কারা?

 

ওয়ারী-বটেশ্বর-এ সামপ্রতিক বছরগুলোতে যেসব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া গেছে তাতে বাঙালি জাতির সভ্যতার ইতিহাস সাড়ে তিন হাজার বছরে গিয়ে ঠেকেছে তা পাঁচ হাজার বছর হতে পারে চূড়ান্ত গবেষণা ও নিদর্শন সংগ্রহের শেষে। 

 

প্রশ্ন হচ্ছে এই তিন সহস্রাধিক কাল ধরে কি বাংলায় শান্তি ছিল না? কেমন ছিল সেই শান্তির স্বরূপ? সেই শান্তি বাঙালি কি কখনো কখনো হারিয়ে ছিল?

 

বাংলাদেশের রাজনীতির ভাষায় বলা হয়ে থাকে বাঙালির সভ্যতা হাজার বছরের অথচ চাপা ইতিহাসের পর্দা উন্মোচনে উঠে আসছে শান্তি আর সমৃদ্ধির এক অজানা বাংলার চিত্র

 

প্রশ্ন হচ্ছে বাঙালির এই চাপা ইতিহাসের পরতে পরতে কি কি রয়েছে আর? বাঙালির হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার স্বরূপ কি ছিল? বাঙালির আত্মপরিচয়ের স্বরূপ বুঝতে শিকড়ের সন্ধান ব্যতিরেকে শান্তির রূপ খোঁজা কি সম্ভব? প্রাচীন সভ্যতার সঙ্গে বর্তমান কৃষ্টি ও সংস্কৃতির মধ্যে শান্তির যোগসূত্র কোথায়?

প্রশ্ন উঠতে পারে বাংলায় কি আদৌ শান্তি ছিল? কিংবা এখনো কি এখানে শান্তি বিরাজমান? শান্তি কি বর্তমান? শান্তি কি নিধানযোগ্য?

 

এসব প্রশ্নের উত্তরই আমরা জানতে চাইবো আজকের মুক্ত আলোচনায় অংশ নেয়া বিজ্ঞ আলোকিত ব্যক্তিত্বদের কাছে তাঁদের জ্ঞানগর্ভ আলোচনায় এসব প্রশ্নের দিক নির্দেশনা থেকে শান্তির অন্বেষায় প্রাণাতিপাত করা কোটি কোটি মানুষ পাবে শান্তির দিশা - এটাই আজ মুক্ত আলোচনার প্রত্যাশা। 

 

ড. নারায়ণ চন্দ্র বিশ্বাস

অধ্যাপক, সংস্কৃত ও পালি বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

তিনি বলেন, আমি অতীত দিয়ে আমার আলোচনা শুরু করছি ভারত উপমহাদেশের ভূ-প্রকৃতিতে সাগর, পবর্তমালা ও বনানী প্রভৃতি সবই আছে এসব কারণে এখানে অবস্থানকারী মানুষের মধ্যে বিশেষ ধরনের একটি বৈশিষ্ট্য তৈরি হয় আমাদের বাংলাদেশের ভূখন্ডেও আমরা এ ধরনের বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করি এসব প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে এখানকার মানুষ একটু উদার ও মুক্ত এই কারণে আমাদের এখানে যেসব সাধকদের আমরা দেখি তাঁরা খুব মুক্ত চিন্তার অধিকারী আমাদের এই অঞ্চলে বৈষ্ণব ধর্ম, সূফীবাদ ও বাউলধর্মের প্রচার ও প্রসার ঘটেছে

পৃথিবীর ইতিহাসে দেখা যাবে সারা পৃথিবী জুড়ে কখনোই সম্পূর্ণ অশান্তি ছিলো না আবার শান্তিও ছিলো না শান্তি-অশান্তি মিলিয়েই এই পৃথিবী চলছে কোন সময় একটু ভালো ছিলো, কোনো সময় একটু মন্দ ছিলো এর মধ্যে কিছু মানুষ থাকে যাঁরা সবসময় মানুষের কল্যাণ কামনা করেন সেইসব কল্যাণকামী মানুষদেরই আমি সাধক বলতে চাই

বাংলার ইতিহাসে দেখা যায় যে নানা যুদ্ধ-বিগ্রহ হয়েছে তার মধ্য দিয়ে কিছু কল্যাণকামী মানুষ কল্যাণের কথা চিন্তা করেছেন মনুষ্যকুলে মানুষ কত বিনয়ী, মহান ও মানবিক গুণাবলীর অধিকারী হতে পারে - সেখানেই মানুষের মূল্যায়ন হয় এখানে যে প্রশ্নটা করা হয়েছে - প্রশ্নটা আমারওসাধক আমরা কাকে বলবো? ‘সাধক শব্দের আভিধানিক অর্থ - যিনি কার্য সাধন করেন তিনি সাধক আরেকটা অর্থ হলো - যিনি তন্ত্র, মন্ত্র, ধ্যানের মাধ্যমে সত্যের কাছে পৌঁছাতে চান বা পৌঁছান তাঁরাই সাধক আমাদের অবস্থান থেকে এ ধরনের মানুষকেই সাধক বলা হচ্ছে যাঁরা ধ্যানের মাধ্যমে কিছু করলেন না কিন্তু সামাজিকভাবে সংসারের মানুষের কল্যাণে নিবেদিত তাদেরকে কি আমরা সাধক বলবো না? আমি মনে করি তাঁরা সবচাইতে বড় সাধক অনেক সময় দেখা যায় তাঁরা ঈশ্বরে বিশ্বাসী ঠিকই আবার অনেক সময় এই বিশ্বাসকে অতিক্রম করে মানুষের সেবা করছেন এরা কি সাধক নন?

নিজের একটা উদাহরণ দিচ্ছি আমার বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলার কাসিয়ানী বিল অঞ্চল আমি আগেও বলেছি যেখানে বিল-নদী-নালা-সাগর-বনানী-পর্বত আছে সেখানে মানুষ একটু মুক্ত চিন্তার অধিকারী হয় সেই বিল এলাকা এখন আর নেই এই গ্রামে একজন মহাপুরুষের জন্ম হয়েছে আমি তাঁকে মহাপুরুষই বলছি তিনি অকৃতদার চন্দ্র নাথ বসু তিনি ১৯৪২ সালে আমাদের গ্রামে কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন সারাজীবন তিনি সবাইকে নিয়ে দশ-পনেরোটা কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি বহু স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন ও বহু কল্যাণমূলক কাজ করেছেন সারাজীবন এসব কাজেই তার সময় ব্যয়িত হয়েছে এ ধরনের মানুষ আমাদের সমাজে অনেক আছে - তাঁদেরকে কি আমরা সাধক বলবো না আমার দৃষ্টিতে এঁরাও সাধক

এখন আমি একটু পিছনের দিকে আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি আপনারা জানেন, যখন চৈতন্যদেবের আবির্ভাব ঘটে তখন বাংলার অবস্থা খুব খারাপের দিকে ছিলো বিশেষ করে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে জাত-পাতের দ্বন্দ্ব খুব বেশি ছিলো উচ্চবর্ণের হিন্দুরা নিম্নবর্ণের হিন্দুদের অছুৎ বলতো - ছুলে জাত যাবে এই অবস্থা ছিলো চৈতন্যদেব তখন আসলেন বৈষ্ণব ধর্ম নিয়ে তিনি বললেন সবাই সমান তিনি মানুষের সম অধিকারের কথা বললেন তিনি মুসলমানকে বুকে টেনে নিলেন, নিম্নবর্ণের ধোপাকে আলিঙ্গন করলেন - সবাইকে তিনি এক কাতারে আনার চেষ্টা করলেন বৈষ্ণব ধর্ম - মানব ধর্ম এই যারা মানুষের কথা বলছেন - মানব ধর্মের কথা বলেছেন তাদেরকে আমি বাংলার সাধক শিরোমণি হিসেবে দেখছি এই চৈতন্যদেবের ভাব আন্দোলনের ফলে মানবধর্মের প্রচার হলো এরপর আসে চন্ডীদাসের কথা -

শোনোরে মানুষ ভাই,

সবার উপরে মানুষ সত্য

তাহার উপরে নাই

এরপর আসে সূফীবাদের আন্দোলন - লালন সাঁইজি, পাঞ্জু শাহ্‌ ও হাসন রাজা এদের সাধনায় তাঁরা মানুষকে বড়ো করে দেখেছেন তারপর রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল ইসলাম এঁরাও কি সাধক নন আমি মনে করি এঁরাও বড়ো সাধক আমি বর্তমান সংলাপের গত একটি সংখ্যায় দেখেছি সাধক নজরুল বলা হয়েছে, আমি তা যথার্থ বলে মনে করি রবীন্দ্রনাথ সারা জীবন মানুষের কথা, অসামপ্রদায়িকতার কথা, মানুষের মঙ্গলের কথা গেয়ে গেছেন তাঁর দেশাত্মবোধক গান আমরা জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে বেছে নিয়েছি তিনি জানতেন বাংলায় সাহিত্য-সংস্কৃতি যতদিন বেঁচে থাকবে, তিনি অমর হয়ে থাকবেন নজরুল ইসলামও সারাজীবন মানুষের কথা বলেছেন - অসাম্যের গীত গেয়েছেন :

গাহি সাম্যের গান

মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই - নাহি কিছু মহীয়ান

নাহি দেশ কাল-পাত্রের ভেদ-অভেদ ধর্ম জাতি

সব কালে সব দেশে ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি

এঁরা বাংলারই সন্তান - বাংলার সাধক

আমাদের দেশে ইংরেজ আমল থেকে যে সঙ্কট শুরু হয়েছিল - সামপ্রদায়িক দ্বন্দ্ব সমপ্রতিক সমপ্রীতি না থাকার জন্যে শান্তি বেশি বিনষ্ট হয়েছে যাঁরাই আমাদের দেশে সাধক হয়ে আসছেন তাঁরাই এই সামপ্রদায়িকতার উর্ধ্বে কথা বলেছেন

এরপর আমরা দেখবো ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর - মানুষের জন্য তিনি বহু বড় কাজ করে গেছেন রাজা রামমোহন রায় তিনিও মানুষের কথা বলে গেছেন এঁরা সমাজে শান্তির চেষ্টা করে গেছেন রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ এঁরাও শান্তির কথা বলেছেন রামকৃষ্ণের কথা যত মত তত পথ একটি জায়গায় আমরা পৌঁছাবো - সেখানে পৌঁছানোর জন্য বিভিন্ন পথ আছে এবং সব পথই ভালো; কোনো পথই খারাপ নয় এখন সমস্যাটা হলো যিনি যে পথে আছেন তিনি মনে করছেন তার পথটাই বোধহয় শ্রেষ্ঠ গোলমালটা ওখানেই এ প্রসঙ্গে বিবেকানন্দের একটি গল্প বলি, শিকাগো সম্মেলনে গিয়ে তিনি এই গল্পটা বলেছিলেন যে আমাদের দ্বন্দ্বটা কোথায় তিনি বলেছিলেন, একটি ব্যাঙ কুয়োয় বাস করতো সেখানেই সে বহুকাল ধরে আছে এই পরিবেশের মধ্যেই তার সীমাবদ্ধতা এরপর একদিন একটি সমুদ্রের ব্যাঙ ওই কুয়োর কাছে এলো তখন কুয়োর ব্যাঙ জিজ্ঞেস করলো, ‘তুমি কোত্থেকে এসেছো?’ সমুদ্রের ব্যাঙ বললো, ‘আমি সমুদ্রে থেকে এসেছি কুয়োর ব্যাঙ বললো, ‘তোমার সমুদ্র কি আমার কুয়োর থেকে বড়?’ সমুদ্রের ব্যাঙ বললো, ‘অবশ্যই’ ‘এটা হতে পারে না’, বলে কুয়োর ব্যাঙ লাফ দিয়ে দেখালো, ‘এর থেকেও বড়?’ ‘হ্যাঁ, এর থেকেও বড় তখন লাফ দিয়ে পুরোটা কুয়ো ঘুরে এলো বললো, ‘এর থেকেও বড়ো?’ সমুদ্রের ব্যাঙ তখন বললো, ‘তোমার কোনো ধারণাই নেই সমুদ্র সম্পর্কে তখন কুয়োর ব্যাঙ বললো, ‘আমার এই কুয়ো থেকে বড় কিছু হতে পারে না কাজেই তুমি ভন্ড, তুমি মিথ্যে কথা বলছো, তুমি এখান থেকে বেরিয়ে যাও

আমাদের মধ্যে অসমপ্রীতির কারণই হলো আমরা যার যার কুয়োয় বসে আছি, আমরা সমুদ্রেকে দেখছি না এবং কাউকে জানতে-বুঝতে চাচ্ছি না গোলমালটা এখানেই বিবেকানন্দ এই গল্পটা বলে সেটা বুঝিয়েছিলেন বিকেকানন্দের দর্শনে তিনি সবসময় মানুষের কথা বলেছেন এসব কথা বলতে গিয়ে তিনি এমনও বলেছেন যে, দেবতাকেও আগে মানুষ হতে হবে অর্থাৎ দেবতা যদি দেবত্বে উন্নীত হতে যায় তাকে আগে মানুষ হতে হবে তিনি বলেছেন, ‘আমার দরিদ্র ভারতবাসী, আমার মজুর ভারতবাসী, আমার মেথর ভারতবাসী, এরা সকলেই আমার ভাই আমাদের বাংলা অঞ্চলে এ রকম অনেক সাধক এসেছেন

যাঁরা ঈশ্বরের সাধনা করছেন তাঁরাও সাধক, যাঁরা মানুষের কথা বলছেন, কল্যাণের কথা বলছেন তাঁরাও সাধক।  আমার নিজের বক্তব্যে যাঁরা ঈশ্বরের গন্ডি অতিক্রম করে মানুষের কল্যাণ করছেন তাঁরা শ্রেষ্ঠ সাধক মানুষকে বাদ দিয়ে যে সাধনা, তাকে আমি বড় সাধনা মনে করি না এই জায়গাটায় আমাদের সূফী সমপ্রদায়, বাউল সমপ্রদায় ও বৈষ্ণব সমপ্রদায় এ কথা বলেছেন আমাদের বাংলা ভূখণ্ডে মুলতঃ এই ধর্মেরই প্রতিষ্ঠা বেশি হয়েছে এঁদের কথাই আমরা গ্রহণ করেছি এই যে জলাভূমি এখানে সরল-সাধারণ মানুষেরই আগমন ঘটেছে এ প্রসঙ্গে বলি, মুক্ত-প্রশস্ত নদী না থাকলে ভাঁটিয়ালী গান হয় না।  মাঝি যখন নদীর মাঝ দিয়ে বৈঠা দিয়ে বয়ে যায় তখনই তার মনে একটা উদাস ভাব আসে সে ভাটিয়ালী গান গেয়ে ওঠে যিনি দিগন্ত বিস্তৃত ধানের ক্ষেত দেখেছেন, বিস্তীর্ণ বনভূমি দেখেছেন, উদার আকাশ দেখেছেন তার মনের মধ্যে খারাপ ভাব আসতে পারে না মুক্ত ভাবই তার মধ্যে আসার কথা এই এলাকাটা এই ধরনের - এই কারণেই এখানে বৈষ্ণববাদ, সূফীবাদ, বাউল এসেছে

এই হলো আমাদের দেশ এই দেশের পরিবেশকে নষ্ট করার বহু চেষ্টা হচ্ছে - তারপরেও দাঁড়িয়ে আছে বাংলার সূফীবাদ, বৈষ্ণববাদ, বাউলবাদের মানবতার কারণে পরিবেশ বিনষ্টের চেষ্টা করেও তারা পারছে না তবু আমাদের সতর্ক থাকতে হবে

আমরা অনেক সেমিনার করছি ধর্মীয় সভা হচ্ছে বিভিন্ন ধর্ম থেকে নানা উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে তারপরও কেন এতো অশান্তি-উগ্রতা আমার মনে হয় বক্তারা যা বলছেন তা নিজেরা বিশ্বাস করছেন না এ কারণেই এত মতভেদ এই যে আমি এখানে কথা বলছি - ভালো কথা বলছি এখন কেউ যদি আমাকে চেনেন তিনি বলবেন এই ব্যক্তি এখানে ভালো কথা বলছেন ঠিকই আসলে তো তাকে আমরা চিনি তাহলে আমার এই বক্তব্যে কোন কাজ হবে না এ জন্যে চৈতন্য চৈতন্মৃতির একটা কথা আছে - আপনি আচরি ধর্ম জীবেরে শেখায় সাধককুলকে দেখবেন তাঁরা যেভাবে বলছেন ঠিক সেভাবে তাঁরা নিজেরাও করেন এটা না হলে হবে না

আমার বক্তব্য শেষ করছি রবীন্দ্রনাথের প্রশ্ন কবিতাটা দিয়ে :

যুগে যুগে তুমি পাঠিয়েছো দূত

দয়াহীন সংসারে

তারা বলে গেল ক্ষমা করো সবে

বলে গেল অন্তরের বিদ্বেষ বিনাশও

আমরা তাঁদের কথা শুনিনি তাঁদের বাণী এখনও প্রাসঙ্গিক আমরা তাঁদের কথা নিয়ে সুন্দর সুন্দর কথা বলি, তাঁদের উপাসনা করি - নানা কিছু করি কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত তাঁদের সেই কথা আমাদের আচরণে আমরা না করবো ততদিন শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে না অশান্তি ছিলো, ভবিষ্যতেও থাকবে, তারপরেও আমাদের চেষ্টা করে যেতে হবে

 

ড. প্রণব কুমার বড়ুয়া

মহাসচিব, বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘ

 

তিনি বলেন, আমি একজন সমাজকর্মী আমি বৌদ্ধ ধর্মের মানুষ আমি একজন শিক্ষার্থী আমি এখানে এসেছি কিছু শেখার জন্য বিশেষ করে যারা আলোচক এখানে আছেন তাদের কাছ থেকে শিখতে এসেছি

আমরা প্রথমে বলতে পারি মনুষ্য জন্ম বড় দুর্লভ এটা একেবারে খাঁটি কথা এটা কেন দুর্লভ? মনুষ্য জীবন লাভ করা, শ্রেষ্ঠ জীবন লাভ করা অত্যন্ত কঠিন এই জন্মে জন্মগ্রহণ করার পর আমরা দেখি যে এই পৃথিবীতে আমরা নানা ভাগে ভাগ হয়ে গেছি নানা ভাবে বিভক্ত হয়ে গিয়ে আমরা আমাদের জীবনকে কখনো সুখের, কখনো দুঃখের, কখনো কলঙ্কময়, কখনো অত্যন্ত গৌরবময় করে যাচ্ছি এই দুর্লভ মানবজীবনে আমাদের কিছু করার আছে বৌদ্ধ ধর্মে বলা হচ্ছে স্বর্গের দেবতারা এমন সুখে থাকে যে স্বর্গের অস্পসরা নারীদের দ্বারা পরিবেশিত হয়ে তারা চিন্তা-ভাবনার কথা ভুলে যায় আবার যারা নরকে থাকে, তারা এত কষ্টে থাকে যে দুঃখ পেতে পেতে এরাও চিন্তার কথা ভুলে যায় সেজন্য মনুষ্য জন্ম হচ্ছে শ্রেষ্ঠ জন্ম আমরা মানুষ - আমাদের মন আছে, হুঁশ আছে

বাংলার সাধককুল কারা? তারা কোত্থেকে এই আদর্শ পেলেন? কী করে সাধক হলেন? আমি মনে করি, কৃষ্ণ, বুদ্ধ, যিশু, মুহাম্মদ, ব্রহ্মসাহেব হলেন অনুপ্রেরণার উৎস এসব সাধককুলের জন্য গৌতম বুদ্ধকে বলা হয় সিদ্ধ পুরুষ বা সিদ্ধার্থ কেন সিদ্ধার্থ? তিনি পাঁচশত পঞ্চাশবার এই পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করার পরে জ্ঞানলাভ করার মধ্য দিয়ে তিনি সিদ্ধপুরুষ হয়েছেন যারা সাধক তাঁরা হলেন সিদ্ধপুরুষ এই সাধকের ব্যাখ্যা বা সংজ্ঞা বিস্তৃত অনেক ধরনের সাধনা আছে সাধক যেমন শান্তি প্রতিষ্ঠায় নিবেদিত তেমন অনেকে অশান্তি প্রতিষ্ঠায় নিবেদিত বৈজ্ঞানিক - বিজ্ঞানের সাধনা করেন বিজ্ঞানের সাধনায় এই পৃথিবীতে আমরা অভাবনীয় উন্নতিতে চলে গেছি অনেক কিছু আবিষ্কার হয়েছে আবার এই সাধনা যখন ভুল পথে চালিত হয় তখন এরা মারণাস্ত্র তৈরি করে সুতরাং যে সাধক মানব কল্যাণে শান্তির জন্য নিবেদিত তাঁদেরকে নিয়ে আমাদের আজকের এই আলোচনা তাঁরা কীভাবে সাধনা করেন মেডিটেশন বা সমাধি দুইটা পথে আমরা জ্ঞানার্জন করতে পারি একটা হচ্ছে গ্রন্থ পাঠ করে, আরেকটা হচ্ছে সমাধির মাধ্যমে প্রাচীন কালে এত বিশ্ববিদ্যালয় ছিলো না মুনি-ঋষিরা এত স্কুল-কলেজে যেতেন না তারা কী করে জ্ঞানী হলেন, তারা কী করে সাধক হলেন, কী করে এতো দক্ষতা অর্জন করলেন ধ্যানের মাধ্যমে আমাদের যাঁরা ধর্ম প্রবর্তক তাঁরা কেউ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন না তাঁরা সাধনার মাধ্যমে পরিশুদ্ধ হয়ে আমাদের জীবনে, আমাদের সমাজে মানবের কল্যাণে বিভিন্ন বাণী দিয়ে গেছেন বিভিন্ন জ্ঞানলব্ধ কথা আমাদের শুনিয়ে গেছেন

আমরা দেখেছি বাংলাদেশে আউল-বাউল-দরবেশ-ফকির-হিন্দু সন্ন্যাসী-বৌদ্ধ ভিক্ষু-লোককবি এঁরা সকলে হচ্ছেন সাধক এই সাধকদের লক্ষ্য হচ্ছে মানব কল্যাণ এঁরা আত্মহিতে নয় পরহিতে নিজেকে বিলিয়ে দেন তাই এঁরা হচ্ছেন সিদ্ধাচার্য এখানে শুধু বৈষ্ণব সাধনা হয়নি, শুধু সূফী সাধনা হয়নি, শুধু বাউল সাধনা হয়নি - এখানে সিদ্ধাচার্য, বৌদ্ধ ভিক্ষুরাও সাধনা করেছিলেন মহাজান শাখায় সাধনতন্ত্র অত্যন্ত উন্নতভাবে এই দেশে একসময় একাকার হয়ে গিয়েছিলো এই সাধনার লক্ষ্য অত্যন্ত বিশাল বৌদ্ধ মহাজান তন্ত্রে সাধনা অত্যন্ত ব্যাপক ব্যাপ্তি অসম্ভব বিশাল তাঁরা বলছেন কি, পৃথিবীর সকল মানুষ মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত আমি মুক্ত হবো না বৌদ্ধধর্মের সাধনা হচ্ছে নির্বাণ লাভের লক্ষ্যে মহাজান ভিক্ষু বলছেন আমি নিজে মুক্ত হবো না যতদিন পর্যন্ত সকল মানুষ মুক্ত না হবে এই সাধনার প্রসারতা আরো গভীর বাংলাদেশে যারা এগুলো পড়েছেন তারা নিশ্চয়ই জানেন বাংলাদেশের আদি নিদর্শন চর্যাপদ, এর ভাষা কিছু বোঝা যায়, কিছু বোঝা যায় না এই ভাষার আড়ালে যে তত্ত্ব, চিন্তা ও আবেদন তা হচ্ছে পরহিতে নিজেকে বিলিয়ে দাও কবিরা বলেছেন :

পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি

জীবন মন সকলি দাও

তার মতো সুখ কোথাও কী আছে

আপনার কথা ভুলে যাও

বহুকাল আগে এইসব কথা উচ্চারিত হয়েছে আমাদের এই প্রাচীন ভারতবর্ষের নাম জম্বুদ্বীপ বৌদ্ধ সাহিত্য পাঠ করলে এগুলো জানা যায় এখানে ষোলশ জনপদ ছিলো তারমধ্যে বঙ্গ ছিলো না এই বঙ্গের উল্লেখ আমরা সেখানে পাই না তবে মহাভারতে এই বঙ্গ বলে একটি শব্দ আছে তাকে ঘৃণা করা হতো ভীমকে বলা হলো যা বঙ্গে চলে যা, ওখানে গিয়ে তুই পাত্রী খুঁজে পাস কি না দেখ তৎকালে ছিলো উজ্জ্বয়িনী, মগধ, অঙ্গ - এই অঙ্গের সঙ্গে বঙ্গ সম্পৃক্ত ছিলো আর এই অঙ্গ-বঙ্গের রাজধানী ছিলো চম্পক নগরী আমরা জানি বাংলার ইতিহাস শুরু হাজার হাজার বছর আগে থেকে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় তারপর ট্যাক্সিলা সহ অন্যান্য ঐতিহাসিক বিশ্ববিদ্যালয় এসব অঞ্চলে ছিলো শুধু ধর্ম নয়, সংস্কৃতি, দর্শন, প্রকৌশল এগুলো সবই সেখানে শিক্ষা দেয়া হতো এই বঙ্গের সাধক ছিলেন অতীশ দীপঙ্কর দশম শতকে তিনি যখন তিব্বত গেলেন, দেখলেন সেখানে চাষবাস হচ্ছে না পানির কারণে তিনি তখন বললেন যে এখানে বাধ দেয়া হোক এই বৌদ্ধ সন্ন্যাসী বাধ দেয়া কোত্থেকে শিখলেন? কাজেই আমাদের অতীত, আমাদের সাধনা মানব কল্যাণে নিবেদিত, মানব কল্যাণে উৎসর্গিত আমাদের এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আমরা দেখেছি যে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ শিক্ষা লাভ করছে যখন শুধু বৈদিক চর্চা হতো তা সীমাবদ্ধ ছিলো একটা গোষ্ঠীর মধ্যে কিন্তু বৌদ্ধরা এসে তা সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিলো এবং শুধু ধর্ম নয় বরং সব রকম বিষয়ে শিক্ষা দিতে থাকলো যাঁরা সাধক তাঁরা ধর্মের উর্ধ্বে উঠে যান সকলকে তাঁরা ভালোবাসেন তাঁরা সিদ্ধ হয়ে যান মন-প্রাণ দিয়ে সকলের প্রতি নিজেকে বিলিয়ে দেন তাঁকে করুণাময় হতে হয় অপরের সম্মানে সম্মানিত বোধ করা ও অপরের সুখে সুখী হওয়া এগুলো খুবই কঠিন এগুলো আমি পারি না কিন্তু এগুলো সাধক পারেন তিনি সাধনার দ্বারা গুণ অর্জন করেন তাঁকে উপেক্ষা গুণ অর্জন করতে হয় লাভ-অলাভ, যশ-অযশ, প্রশংসা-নিন্দা-অপমানে মোহিত না হওয়া আবার ভেঙ্গে না পড়ার গুণ অর্জন করতে হয় এই অবস্থায় তিনি চলে যান কাজেই এই সাধনার পথ বড় কঠিন কঠিন পথ অনেক প্রলোভন, বঞ্চনা, হাতছানি পথ থেকে সরিয়ে নিয়ে যেতে পারে তাঁরা লোভ-যৌবনকে জয় করেন

সাধককে আমরা প্রণাম জানাই তাঁদের দ্বারা এই বাংলার মাটি আজো পবিত্র আজো এই মাটিতে যে প্রেম-ভালোবাসা আছে তা এসব সাধককুলের অবদান সেই সাধকদের প্রতি আমার বিশেষ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি জ্ঞানমার্গ, শক্তিমার্গ, যোগমার্গ, সূফীমার্গ, মহাজান মার্গ, বৈষ্ণবমার্গ - বিভিন্ন পথে তারা সাধনা করেছেন কিন্তু সুর এক গঙ্গা-যমুনা-অচিরাবতী-স্বরস্বতী বিভিন্ন উৎস থেকে এ উৎসরিত আবার একই লক্ষ্যে নির্গত সাগর গিয়ে এক হয়ে যাচ্ছে বিভিন্নভাবে সাধনা করছেন তাঁরা, তাঁদের লক্ষ্য একটাই মানুষের কল্যাণ, মানব প্রেম, মানবশুদ্ধি, শান্তি প্রতিষ্ঠা তাঁরা ব্যক্তিগত সুখের মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেন না তাঁদের সাধনালব্ধ ঐশীজ্ঞানকে তাঁরা উচ্চশিখর থেকে মৃত্তিকায় নিয়ে আসেন মানুষের কাছে নিয়ে আসেন মানুষের মধ্যে যে অনন্ত সম্ভাবনা রয়েছে তাকে তাঁরা চেতনায়, সত্যে, ক্ষমায়, অনুপ্রেরণায় আলোকিত করেন এটাই হচ্ছে সাধকের কথা - সাধকের অবদান

আমরা শুনেছি আগেকার মুনি-ঋষিরা গিরিতে-গুহায় সাধনা করতেন শুনেছি, দেখিনি কখনো কিন্তু আজকের সাধককুলকে দেখলে আমরা তাঁদের ত্যাগের কথা বুঝতে পারি যেমন শঙ্খের ভিতর কান পাতলে সাগরের শব্দ শোনা যায় তেমন বর্তমান সাধকদের দিকে তাকালে আমরা অতীতের সাধকদের দেখতে পাই

এখানে সবাই সাধক একেকটা লক্ষ্য নিয়ে যারা এগিয়ে যাচ্ছেন তারা সবাই সাধক ভিশনটা হচ্ছে সাধনার উৎস বস্তু আমরা প্রত্যেকেই সাধক কিন্তু এঁরা হচ্ছেন অধ্যাত্ম সাধক মানব কল্যাণে নিবেদিত আমরা সংসারে থাকি - নানা সমস্যায় জর্জরিত কিন্তু এঁরা সমস্ত সমস্যার উর্ধ্বে, সংসারের উর্ধ্বে ব্রহ্মচর্য এঁরা এঁরা আমাদের নমস্য-প্রণম্য এঁরা ব্যক্তির উর্ধ্বে উঠে যান

এজন্য এঁরা জাতিভেদ-বর্ণভেদ ভুলে গিয়ে শুধু মানুষের জন্য উৎসর্গিত

এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই শান্তি কি আমরা লাভ করতে পেরেছি? তা কি পৃথিবীতে এসেছে? চরিত্রবান হও, শুদ্ধ হও, শান্তি আসবে বলা হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের কথা মনে পড়ে তিনি বলেছেন, মৃগ সুগন্ধে পাগল হয়ে ছুটছে এর উৎসের জন্য পাচ্ছে না, পাচ্ছে না ছুটতে ছুটতে এক সময় হয়রান হয়ে পড়ে গেল তখন দেখলো গন্ধটা তার নাভীর কাছ থেকে আসছে তখন সে বুঝতে পারলো গন্ধ তার ভিতর থেকেই আসছে আমাদেরকে বুঝতে হবে, আমরা শান্তির কথা বলে বেড়াই কিন্তু নিজের মধ্যে দেখি না নিজে শান্ত হও দেখবে পৃথিবী শান্ত হয়ে যাচ্ছে যেমন করে গৌতম বুদ্ধ অঙ্গুলি মালাকে শান্ত করলেন দস্যু অঙ্গুলি মালার ভয়ে মানুষ ঘর থেকে বের হতো না তিনি এক সময় পুরোহিত হওয়ার অভিপ্রায়ে তক্ষ্ণশীলায় পড়াশোনা করতে যান পড়ালেখায় তিনি খুব ভালো ছিলেন সহপাঠীরা তার বিরুদ্ধে কুৎসা রটাতে থাকে এক সময় তার শিক্ষকের কানেও যায় তিনি তার উপর ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে বলেন যতদিন না তুমি এক হাজার লোককে হত্যা করতে পারবে ততদিন তুমি নির্বাণ লাভ করবে না এভাবে শুরু হয় তার দস্যু জীবন তিনি একের পর এক লোক হত্যা করেন তাদের আঙ্গুল কেটে মালা গেঁথে গলায় পরেন আশেপাশের গ্রাম-নগর-মহানগর তার ভয়ে আতঙ্কিত একদিন গৌতম বুদ্ধ আসলেন সেই পথে যে পথে অঙ্গুলিমালা মানুষ হত্যা করার জন্য বসে থাকতেন অঙ্গুলিমালা তাকে দেখে হত্যা করতে উদ্যত হলেন তিনি তাঁর পিছনে দৌঁড়ালেন, বুদ্ধ সাধারণভাবে ধীর লয়ে হেঁটে যেতে লাগলেন কিন্তু অঙ্গুলিমালা তাকে ধরতে পারলেন না এভাবে ছুটতে ছুটতে এক সময় অঙ্গুলিমালা তাঁকে দাঁড়াতে অনুরোধ করলেন বুদ্ধ বললেন, ‘আমি তো অনেক আগেই থেমেছি, তুমি থামলেই হবে অঙ্গুলিমালা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন বুদ্ধের দিকে বুদ্ধ বললেন, ‘আমি জীবের প্রতি অনিষ্ট করা থামিয়েছি অনেক আগেই তুমি অশান্ত, তুমি অস্থির, এখন তোমাকেও থামতে হবে, তবেই নির্বাণ লাভ করবে

আমরাও সবাই অশান্ত-অস্থির; তাহলে শান্তি আসবে কোত্থেকে আমরা সবাই অঙ্গুলিমালা আমাদের ডাক দিচ্ছেন এই সাধকগণ তুমি সুস্থির হও, শান্ত হও, সুন্দর হও প্রেম দিতে হবে মানুষকে ভালোবাসতে হবে মানুষের প্রতি সহমর্মিতা আমাদের জাগাতে হবে এসব সাধক যে কর্ম করে গেছেন তা অনুসরণ করে আমাদের মধ্যে প্রেম জাগ্রত করতে হবে

আজ কে প্রভাতে রবির কর

কেমনে বসিল প্রাণের পর

কেমনে বসিল গুহার আঁধারে

মমতা শান্তির গান

না জানি আজ এতদিন পরে

জেগে উঠিল এ প্রাণ

এই শুদ্ধ চেতনা জাগ্রত করতে হবে আমাদের ভেতরের অন্ধকার গুহা আলোকিত করতে হবে তারপরেই গেয়ে উঠতে পারবো -

আমি ঢালিব করুণা ধারা

আমি ভাঙিব পাষাণ কারা

আমি জগৎ মাতিয়া বেড়াবো গাহিয়া

আকুল পাগল পারা

আমি প্রেম ও শান্তি দেবো - তবেই এই পৃথিবী শান্তি পাবে ও শান্ত হবে

 

ড. মোঃ আখতারুজ্জামান

অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

তিনি বলেন, এখানে যে প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে তার সরাসরি উত্তর আমি দিতে পারবো না তবে সাধকবৃন্দ পারবেন কারণ এই প্রশ্নগুলোর মধ্যে আধ্যাত্মিকতা রয়েছে বাংলাদেশ হচ্ছে অধ্যাত্মবাদ ও সাধকদের এলাকা বহুদিন পুরানো কথা এগুলো প্রাচীন ঐতিহাসিকরা বেঙ্গল ডেল্টাকে এভাবে দেখেছেন বঙ্গ ছিলো অঙ্গের সাথে যুক্ত অঙ্গ হলো বর্তমান বিহারের একটি অংশ মিথিলা, মগধ, অঙ্গ এগুলো সব বর্তমান বিহারের প্রাচীন ভৌগোলিক অংশের নাম যেগুলো একেকজন রাজার অধীনে একেকটি ক্ষুদ্র রাজ্য ছিলো সে রকম রাজ্য ছিলো অঙ্গ বঙ্গ অঞ্চলটা এ রকম ছিলো বলা হয়ে থাকে আধ্যাত্মিক সাধকদের ভূমি বলা হয়ে থাকে এর প্রতিটি জনপদে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের আবির্ভাব ঘটেছিল যাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিলো রহস্যময় আমরা যদি বাউল দিয়ে বা চৈতন্যদেব দিয়ে শুরু করি তাহলে একটু ভুল করবো আমাদের আরো আগে যেতে হবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সে সময় বৌদ্ধধর্মের একটি বিকশিত রূপ ছিলো আমি সেই অংশ দিয়ে শুরু করছি তের শতক থেকে শুরু করছি কারণ ঘটনাপঞ্জীর বিবরণ ইতিহাস থেকে পাওয়া যায় এর পূর্বের বিবরণ খুব কমবায়োগ্রাফী অব ধর্মস্বামী নামে সে সময়ের একটি বই আছে তিনি একজন বৌদ্ধ ভিক্ষু ১২৩০ সালের দিকে সম্ভবত তিনি এসেছিলেন বিহারে নালন্দায় তখন বিশাল বিশ্ববিদ্যালয় সেখানে গুরু রাহুলা সংকৃতায়ন ছিলেন ভারতবর্ষের প্রখ্যাত পন্ডিত এই পন্ডিতের কাছে লেখা পড়ার জন্য আসছেন তিনিও একজন বৌদ্ধ পন্ডিত তের শতকে মুসলমানরা যখন বিহারে আসলো, দেখলো সেখানে বই পুস্তকে ভরা তারা এটাকে নাম দিলো মাদ্রাসা মাদ্রাসা কেন বলছে? তারা দেখলো এখানে কিছু লোক আছে যাদের মাথা মোড়ানো থাকে, তারা  গেরুয়া সেলাইবিহীন কাপড় পরিধান করে এবং বইপুস্তক নিয়ে পড়াশোনা করে তাই তারা মাদ্রাসা বলেছে মুসলমান যে শাসকরা তরবারী হাতে এসেছিলেন তারা হত্যাযজ্ঞ থেকে তাদের রেহাই দিলো কারণ তারা দেখলো, যে লোকগুলো এখানে ছিলেন তারা একটু ব্যতিক্রমী চরিত্রের তারা কোন প্রতিরোধ গড়ে তোলেনি তাদের এলাকায় সব ধরনের মানুষের আনাগোনা ছিলো এবং তাদের জন্য খাবারের আয়োজন করা হতো তারা মানুষের প্রতি কখনো বিদ্বেষ মনোভাব পোষণ করেনি এগুলো শোনার পর তরবারী হাতে আসা মুসলমানদের দৃষ্টিভঙ্গিও পাল্টে গেল সে কারণে অনেককে তারা রেহাই দিলো

এ বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণা করলে আমরা কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাই

আশেপাশের রাজা যারা ছিলেন, তারা ছিলেন হিন্দু রাজা জয়া ছিলেন গয়া অঞ্চলের একজন হিন্দু রাজা তিনি মুসলমানদের আক্রমণের ভয়ে জঙ্গলে পালিয়ে গেলেন বিহারে মুসলমানরা তাদের ঘাঁটি গাড়লো রাজা জঙ্গল থেকে মাঝে মাঝে আসতেন আসতেন ওই বৌদ্ধ ভিক্ষুর কাছে এই মানুষগুলোর যে একটি বিচিত্র ধরনের বৈশিষ্ট্য! সেই চরিত্রে মহিমান্বিত হয়ে মানুষকে তাঁরা আকৃষ্ট করতে পেরেছিলেন তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো এই নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়

সাধক সবাই ভিন্ন ভিন্ন কিন্তু সাধারণ পরিচয় হলো যে তাঁরা সবাইকে মানুষ হিসেবেই বিবেচনা করেছেন এরপর আরেকটু সামনের দিকে অগ্রসর হলে আমরা দেখবো মুসলমানরা এসে লক্ষণাবতীতে রাজধানী বানালো তারপর সেখানে একটি মসজিদ বানালো সেই মসজিদে ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটলো আসাম অঞ্চল থেকে একজন ব্রাহ্মণ আসলেন তার কাছে একটি বই ছিলো যার নাম অমৃতখন্ড।  প্রাচীন ভারতের ধর্ম, সংস্কৃতি, দর্শন ও তান্ত্রিকতা সম্ব্বলিত একটি বই অমৃতখন্ড এই বইটি নিয়ে তিনি সেই মসজিদে আসলেন এসে সেখানকার প্রধান ব্যক্তি সমরকন্দের অধিবাসী রোকনউদ্দিন সমরকন্দীর কাছে বললেন, ‘তোমার ইসলাম ধর্মের দর্শন কী? তোমাদের নতুনত্ব কী? কী আছে তোমাদের? আমাদের ধর্মের আছে এই সংস্কৃত ভাষায় রচিত অমৃতখন্ড তখন এই মসজিদে বসে এই বইটিকে ফার্সী ও আরবীতে অনুবাদ করা হলো এগুলো হলো আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য এখানে ধর্মের বাধা নেই এখানে মানুষ তার জ্ঞানের বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়েছে মানুষকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করেছে ভাষা-ধর্ম সব একীভূত হয়ে গিয়েছে আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ মুসলমানরা ওই বইটিকে পাঠ্যসূচী করলো ওই বইটির মধ্যে প্রাচীন ভারতের দর্শন ও মরমীবাদী চিন্তা  সন্নিবেশিত ছিলো এ ধরনের প্রগতিশীল ঐতিহ্য সমন্বিত ধারা বিকাশ লাভ করা শুরু হলো এগুলো হলো আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য

মুসলমানদের দরবার থেকে একটি উদাহরণ দেবো মুসলমান ধর্মের সাথে হিন্দু ধর্মের যে একটি যোগ আছে তা বলা যায় শিব ও বিষ্ণু যখন থেকে আছেন সেই থেকে তাদের সাধকরাও আছেন সেটি বহু পুরাতন কিন্তু বাংলাতে এগুলো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার কৃতিত্বটি শ্রী চৈতন্যদেব-এঁর তাই শ্রী চৈতন্যদেবের বৈষ্ণব দর্শনকে কখনো কখনো গৌরীয় বৈষ্ণব দর্শনও বলা হয় এর কারণ শ্রী চৈতন্যদেব এই দর্শনকে একটি স্বতন্ত্র রূপ দিয়েছেন একটি নতুন ধর্মগোষ্ঠীর লোক এখানে এসেছে - তারা হলো মুসলমান মুসলমানদের সাথে ভাবের আদান-প্রদান হয়েছে এবং তাদেরকে তারা ধারণ করতে পেরেছেন মুসলমানদের পরিবেশে তারা লালিত-পালিত হতে পারছে শান্তি বিনষ্টের প্রয়াস চালানো হয়েছিলো কোনো কোনো কাজী-উলেমা সে চেষ্টা করেছিলেন সে কারণে তাদেরকে আমরা সাধক বলছি না কারণ তারা শান্তির বিপক্ষে ছিলো এই উদাহরণ আছে ইতিহাসে যে নবদ্বীপে শ্রী চৈতন্যদেবের জন্ম, সংকীর্তায়ন গাইতেন সেখানে গোড়া মুসলমানরা আপত্তি তুলেছিলো কাজী লোক পাঠিয়ে দিয়েছিলো শ্রী চৈতন্যকে বন্দী করার জন্য কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সুলতানের তরফ থেকে একটি আদেশও জারি করা হলো যে মন্দির পুনর্নির্মাণ করা হোক এবং শ্রী চৈতন্য যা করছেন তা সঠিক কাজ করছেন, তাকে কাজ করার অনুমতি দেয়া হোক কাজীকে পদচ্যুতি করা হলো, ওখানে নতুন কাজী দেয়া হলো যে কাজী বা প্রশাসক শ্রী চৈতন্যের এই কর্মকান্ডকে স্বাগত জানাবে এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে তাকে নিরাপত্তা দেবে কিছু ঘটনা লক্ষণীয় শ্রী চৈতন্যদেবের আবির্ভাব ঘটলো তাঁর মতাদর্শ অনুসরণ করে একশ্রেণীর লোক সেখানে আসলো তারা মানুষের বাড়িতে বাড়িতে গেলেন সাম্যের গান শুনালেন তারা ধনসম্পত্তির লোভ ছাড়লেন এ ধরনের ঐতিহ্য আমাদের আছে তাই বলা যায়, এক সমপ্রদায়ের মধ্য হতে যেমন শান্তি বিনষ্টের প্রক্রিয়া চালানো হয়েছে তেমন ওই একই সমপ্রদায়ের মধ্য হতে এক বিশেষ শ্রেণীর মানুষের আবির্ভাব ঘটেছে যারা শান্তির পক্ষে গান গেয়েছেন

সোনারগাঁয়ে একটি বিখ্যাত মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিলো যেটাকে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদায় উন্নীত করা হয়েছিলো সেখানে একবার একটা হৈচৈ ওঠালো মুসলমানরা তারা দেখলো বাঙালিরা শামুক থেকে তৈরি চুন দিয়ে পান খায় এটা বাঙালির অনেক প্রাচীন ঐতিহ্য মুসলমানরা একটি মসলা বের করলো যে এই চুন খাওয়াটা হালাল না হারাম এটা নিয়ে একটা বিশাল বিতর্ক তৈরি হলো ওখানে তখন জগৎ বিখ্যাত সাধু সরফুদ্দিন ম্যানেরি এসেছিলেন বিহার থেকে তাঁকে ডাকা হলো এবং সুলতানকে ডাকা হলো এখন সিদ্ধান্ত দিতে হবে এটা জায়েজ কিনা এক শ্রেণীর মধ্যে উগ্রতা দেখা দিয়েছে - তারা বলছে যে এটা খাওয়া যাবে না হিন্দুরা এটা খাচ্ছে, এটা উৎপাদনের সাথে বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষ জড়িত ও ব্যবসায় জড়িত এগুলো বন্ধ হয়ে যাবে যদি একটি আইনী মসলা দেয়া হয় সরফুদ্দিন ম্যানেরি একটি সিদ্ধান্ত দিলেন, যে বিষয়টিতে স্থানীয় মানুষরা দীর্ঘদিন ধরে অভ্যস্ত সেটাকে চালু রাখতে হবে প্রাচীন প্রচলিত ধারা, সংস্কৃতিকে লালন-পালন করা একটা বড় দায়িত্ব তার উপর গুরত্বারোপ করলেন এই সূফী সাধকরা সেই জন্য তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গিকে বলা হয় শান্তির পক্ষে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁরা মানুষকে কখনো আহত করতে চাননি মানুষ যে কাজ করতে অভ্যস্ত, যেটা স্বাভাবিক, প্রকৃতির সাথে যার সামঞ্জস্য, সব বিষয়গুলোকেই সাধক ধারণ করেন

সাধকদের প্রথম বৈশিষ্ট্য হলো তাঁরা মানুষ দ্বিতীয়ত সমাজের যা কিছু স্বাভাবিক, যা কিছু সাধারণ, যা কিছু প্রাকৃতিক তার অনুমোদন দেন এবং এই বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়েই তাঁরা মানুষ ইসলামের কথা হলো যেটা স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক তাকে সহজভাবে গ্রহণ বা ধারণ করতে হবে কখনোই বলা যাবে না আমারটা সবচাইতে ভালো, সবচাইতে বড় কোনো সূফী সাধকের আস্তানায়, খান্‌কায় কখনো এ ধরনের মত পোষণ করা হয় না এ কারণে মধ্যযুগ থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত একজন সূফী সাধকের আস্তানা বা খানকায় সব শ্রেণী-ধর্মের মানুষের আনাগোনা থাকে মধ্যযুগে খানকার  লঙ্গরখানায় বিনামূল্যে যখন খাবার পরিবেশন করা হতো তখন ধর্মীয় পরিচয় যাঁচাই করা হতো না যে ধারা সূফী সাধকদের আস্তানায় এখনো আছে জনসেবা দেয়ার ক্ষেত্রে ধর্ম পরিচিতি দিয়ে হয় না জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের জন্য উন্মুক্ত থাকেন এবং যা কিছু স্বাভাবিক-প্রাকৃতিক তা ধারণ করেন বলেই তাঁরা সাধক শান্তি ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য এই ধরনের ধারণা যারা পোষণ করবেন তাদের জন্য এই সকল উদাহরণই প্রয়োজন

 

ভাই পিয়ারা সিং

প্রধান গ্রন্থি, বাংলাদেশ গুরুদুয়ারা ব্যবস্থাপনা কমিটি

 

তিনি বলেন, আজকের এই সভার সাথে গুরু নানকের ধর্মীয় দর্শন ও প্রাথমিক চেতনার গভীর সম্পর্ক রয়েছে তিনি বিশ্বাস করতেন যে স্রষ্টা মাত্র একজন তিনিই সর্বশক্তিমান তিনিই পরমাত্মা তিনি জন্ম-মৃত্যুর গন্ডীর বাইরে অবস্থান করেন এবং তাঁর কোন অংশীদার নেই তিনি সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা আবার তিনি মৃত্যু দেন তাঁর কোন জাত-পাত নেই তিনিই মাতা-তিনিই পিতা-তিনিই সবকিছু পৃথিবীর সকল মানুষকে তিনিই সৃষ্টি করেছেন সকলেই তাঁর সন্তান তাঁর দয়া এবং করুণায় সবাই বেঁচে থাকে তাঁকে লাভ করার একমাত্র পথ হচ্ছে তাঁর প্রতি গভীর প্রেম ও ভালোবাসা এ প্রসঙ্গে বাণীতে লেখা আছে -

আজ কাহু শুনলেহু

সাভামে যেনহি প্রেম কিয়ো

তেনহি প্রভু পায়ো

সকল মানুষের সঙ্গে প্রেম ও ভালোবাসা করার মাধ্যমেই আল্লাহ্‌-পরমাত্মাকে পাওয়া যায় পাশাপাশি তাঁর সৃষ্টিকে ভালোবাসো তাহলেই মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ, হিংসা এবং ধর্মীয় পার্থক্য দূর হবে মানুষের মাঝে ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে উঠবে সৃষ্টি এবং মানুষের প্রতি দরদ-ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে

সব ধর্মই প্রেম ভালোবাসা শেখায় - কোন ধর্মের মানুষের জন্য ভেদাভেদ-হিংসা-লড়াই-ঝগড়া এ ধরনের কোন কিছু শেখানো হয় না

গুরু নানক আজ থেকে প্রায় ৫৪০ বছর আগে জন্মগ্রহণ করে সারা পৃথিবী ভ্রমণ করেছেন তিনি চীন, তিব্বত, জাপান, থাইল্যান্ডসহ অনেক দেশ ভ্রমণ করে ধর্ম প্রচার করে সবাইকে প্রেম-ভালোবাসার শিক্ষা দিয়েছেন

 

অধ্যাপক হীরেন্দ্র নাথ বিশ্বাস

সভাপতি, বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু সমাজ সংস্কার সমিতি

 

তিনি বলেন, আজ দুনিয়ার দেশে-দেশে জাতিতে- জাতিতে মানুষে-মানুষে বিদ্বেষ-বিভেদ সংঘাত-সংঘর্ষ আর যুদ্ধ-বিগ্রহ চলছে যেন দুর্যোগের কালো মেঘরাশি আচ্ছন্ন করে ফেলছে দিকচক্রপাল প্রমত্ত মেঘের গগনবিদারী গর্জন আর বজ্র বিদ্যুৎ সম্পাতে পৃথিবী আজ কম্পমান দুর্দমনীয় অশুভ শক্তির দুর্দান্ত প্রতাপে পাষাণ কঠিন পদভারে ত্রস্ত সভ্যতা দিকে দিকে অশান্তির কালোছায়া আত্মপীড়িতের আর্তবিদারী আর্তনাদ ধ্বনি শুভবুদ্ধির মানুষের হৃদয়কে ভারাক্রান্ত করে তুলেছে যেন সমাজ সভ্যতা শান্তি থেকে অশান্তির শৃঙ্খলে বাঁধা পড়েছে তার শৃঙ্খল থেকে রাতের আঁধার ঝরে পড়ে তেমনি শৃঙ্খলিত সমাজ ও সভ্যতার নিকট থেকে আজ অশান্তির আঁধার ঝরে পড়ছে পৃথিবীটা আজ পিছনে অন্ধকারের দিকে ছুটছে তাই কবি লেখনী উৎসারিত পঙতিমালায় -

উদ্‌ভ্রান্ত পৃথিবী তাই ছুটেছে পিছনে

আলোরে পশ্চাতে ফেলি দূরে বহু দূরে

যত দূরে দৃষ্টি যায় দেখি ঘিরেছে কুয়াশা

উড়ন্ত বাতাসে আজ কুমীর কঠিন

কোথা হতে নিয়ে এলা জড় অন্ধকার

এই কি পৃথিবী!

এই পৃথিবীটা দেখে আশ্চর্য হয়েছেন অনেক মানুষ আজো আমরা এই পৃথিবী দেখে প্রশ্ন করছি -

তাই তো আজ শুভকামী শান্তিপিপাসু মানুষ

শান্তি সন্নিধানে তৃষ্ণার্ত হয়ে উঠছে

শান্তি-অশান্তি শুভ-অশুভ চিরকাল থাকছে

এটা ছিল এবং থাকবে জাগতিক নিয়মে কখনো কখনো অশান্তি, দুর্দমনীয় অশুভ শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে সেই কারণে সে সময়ে শুভ শক্তিকে সম্মিলিতভাবে তা মোকাবেলা করতে হয় এটাই স্বাভাবিক

পৃথিবী তো আসলে একদিনের নয় সীমাহীন পরিব্যপ্ত অনন্ত দীর্ঘবয়স্ক এই মহাবিশ্ব মাঝে আমাদের এই পৃথিবীটা অত্যন্ত ক্ষুদ্র সেই পৃথিবীর মাঝে আমার মাতৃভূমি সেখানে ছোট্ট একটি গৃহে আজ আমরা একত্রিত হয়েছি আমাদের এই মহাবিশ্বটা দীর্ঘ বয়স্ক ও বিশাল এখানে যে আকাশ গঙ্গা আছে, যে ছায়াপথ আছে, যে ছায়াপথে আমরা আছি, আমাদের সৌরমন্ডলটি একেবারে ক্ষুদ্র অজস্র গ্রহ-নক্ষত্র ধূলিকণার সম একেকটি ছায়াপথে এটার নিকটতম নক্ষত্রটি পাঁচকোটি আলোকবর্ষ দূরে সেখানে আলো চলে এক লক্ষ ছিয়াশি হাজার মাইল বেগে পাঁচ কোটি বছরে যে আলোটি পৌঁছায় সেটি আমাদের নিকটতম নক্ষত্রের তাহলে দূরতমটি কোথায় এই যে মহাবিশ্ব তার মধ্যে এমন পৃথিবী কতগুলো আছে তার তো ইয়ত্তা নেই পৃথিবী নামে না থাকতে পারে কিন্তু যেখানে এমন মনুষ্য বা জীব বসবাস করছে আমরা দেখতে পাইনা আমাদের সীমাবদ্ধতার জন্য আমার সীমাবদ্ধতায় আমার জিজ্ঞাসার জন্যই বলছি একদিন বলা হয়েছিল, পৃথিবীটা স্থির সূর্যটা ঘুরছে আমরা স্বীকার করে নিয়েছি কিছুকাল পরে আরেক বিজ্ঞানী বললেন, তা ঠিক নয় তাহলে কী ঠিক পৃথিবীটা ঘুরছে, সূর্যটা স্থির তাই আমরা আর বেশি বুঝি না বলে স্বীকার করে নিলাম আবার একজন বিজ্ঞানী এসে বললেন না এও ঠিক নয় তাহলে কি ঠিক দুটোই আপন আপন অক্ষ ও কক্ষপথে ঘুরছে তাহলে দেখা যাচ্ছে আমি যা বলছি তা অভ্রান্তভাবে সত্য বা মিথ্যা নয় সুতরাং সত্যকে বলতে হবে এমন করে যে আমি যতটুকু জানতে পেরেছি, বুঝতে পেরেছি মনে হয় এটাই সত্য অথবা মিথ্যা

আমি আলোচনায় ওই জায়গাটায় যেতে চাই না যেখানে অবতার, ঈশ্বর, ভগবান, দেব-দেবী, ব্রহ্ম, পরব্রহ্ম, ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর, মুনি-ঋষি আসে এগুলো অনেক দীর্ঘ আলোচনার বিষয় আজকে যেহেতু তা আমার আওতা নয় তাই আমি এই আলোচনা করতে চাই না সত্যময়, নির্বিঘ্ন ও নিরুদ্রুপ একটি অবস্থানকে আমরা শান্তি বলতে পারি এই বাংলা ভূখন্ডে যে সাধকরা এসেছেন আমি তাদের সম্পর্কে বলতে চাই অশান্তির কারণটা কি অশান্তির কারণ আমার স্থূল দৃষ্টিতে যেটুকু ধরা পড়ছে তা হলো সম্পদ ও ধর্ম সম্পদটাকে আর্থিক বিষয় বলা যায় এই সম্পদের কারণে মানুষের ভিতরে শান্তি বিরাজমান থাকে এই একটি বিষয় আমরা সাধারণভাবে বলতে পারি অন্যদিকে ধর্ম আমরা যদি বুঝতে পারতাম তাহলে বুঝতাম যে একটি ধর্ম আমাদের তা হলো মানব ধর্ম কেননা পানির একটি ধর্ম আছে, বায়ুর একটি ধর্ম আছে, জীবের একটি ধর্ম আছে - মানুষের একটি ধর্ম আছেরিলিজিয়ানকে ধর্ম বলা হলে অনেক সমস্যার উদ্রেক ঘটে সুতরাং ওইটির বঙ্গানুবাদ ওইটি নয় পানিতে গেলে ভিজবে ও খেলে তৃষ্ণা নিবারণ হবে এটি পানির ধর্ম আগুনের দহন শক্তি না থাকলে সে আর অগ্নি থাকে না মানুষের মনুষ্যত্ব না থাকলে সে আর মানুষ থাকে না মনুষ্যত্ব তাকে অর্জন করতে হয় পশুর পশুত্ব সে নিয়েই জন্মগ্রহণ করে কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে এটি অর্জন করতে হয় সারা পৃথিবী জুড়ে একটি জাতি সেটি মানব জাতি।  এই মানব জাতি আমরা বিভিন্ন সমপ্রদায়ে বিভাজিত এটি আমাদের আরেক সীমাবদ্ধতা যাকে ঘিরে আমরা একেকটি ধর্ম সমপ্রদায়ের সৃষ্টি করেছি কিন্তু আমরা সকলেই মানুষ এরপরেও আমরা আরেকটি কথা বলতে পারি পটুয়াখালী থেকে একজন ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলো, আরেকজন চট্টগ্রাম থেকে রওয়ানা দিলো দুজনেই পৌঁছাবেন, পার্থক্য শুধু যানবাহনটা বেছে নেয়ার কেউ চট্টগ্রাম থেকে লঞ্চে  আসতে চাইলে ভুল হবে পটুয়াখালী থেকে ট্রেনে আসতে চাইলে ভুল হবে সুতরাং যার যা যানবাহন সেটাকে বেছে নিয়ে সেটায় চড়ে যেতে হবে সুতরাং এটি একটি পার্থক্য এবং সেই সাথে তার সম্বল অর্থাৎ ভাড়া গুণে নিতে হবে আর ইচ্ছা থাকতে হবে তার ঢাকায় আসার সবাই ঢাকায় আসতে পারবে পথ যতই হোক না কেন -

স্রোতধারা যতো মিলে যাবে সব

এক সাগরের মোহনায়

তারাই সাধক আমি যাদের বলতে চেয়েছি আমি সাধকের সংজ্ঞার জন্য ওইভাবে তৈরি নই স্বাভাবিক কারণে ইতোমধ্যে যে আলোচনা শুনেছি তাতেও আমি বুঝতে পেরেছি যে সাধক বিভিন্ন রকমের কিন্তু আমি একটি ক্ষুদ্র পরিসরে সাধককে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছি আজকে সেটি হলো অধ্যাত্ম সাধনা

সাধ্য-সাধনা-সাধক বা সাধু, আরাধ্য-আরাধনা-আরাধক যিনি সাধ্যের সৃষ্টিকর্তা তাঁকে পাওয়ার জন্য আমরা বিভিন্নভাবে অনুসন্ধান করেছি কখনো ভীত-বিস্মিত-আনন্দিত হয়ে তাঁকে খুঁজেছি একটি মহাসমুদ্র থেকে বিস্মিত হয়েছি একটি প্রকান্ড সর্প দেখে ভীত হয়েছি এর মধ্য থেকে মানুষ খুঁজতে চেয়েছে তাঁকে তাতে সাধনার প্রণালী বিভিন্ন রকম হয়েছে সুতরাং তাঁর এই অনন্ত পথে যে যেমন করে খোঁজে তাঁকে তেমনি করে পাওয়া যাবে কেউ যদি ভাবেন তিনি নাই তাহলে নাই কেউ যদি ভাবেন তিনি আছেন তাহলে আছেন খুঁজে নিতে হয় অনেক সময় কার কাছ থেকে খুঁজে নেবো? একজন নির্ভরযোগ্য মানুষের কাছ থেকে খুঁজে নেবো

যিনি সৃষ্টিকর্তাকে খুঁজতে চেয়েছেন তিনি তাঁর সাধনা করছেন তাহলে তিনি নিজের জন্য করছেন অর্থাৎ নিজে সিদ্ধ হবেন, তাঁকে পাবেন, তাঁর অনুগ্রহ পাবেন এ তাঁর নিজের বিষয় যখন তিনি সিদ্ধ হলেন অথবা প্রাপ্তি হলো তাঁর সেই মুহূর্তে তাঁর আর কিছু বাকি আছে কিনা এরপর তিনি যদি জীবের জন্য মানুষের জন্য তাঁর সিদ্ধ জীবনের কিছু ব্যয় করতে চান, কিছু দিতে চান দিতে পারেন এই দেয়াটার ক্ষেত্রে কেউ কখনো গন্ডীবদ্ধ থাকেন অর্থাৎ তাঁর যে পরিমন্ডল, তা থেকে তিনি মানুষকে দিচ্ছেন আবার কোন কোন মহাসাধক গন্ডী ছাড়িয়ে তার বাইরে চলে গিয়েছেন তিনি তাঁর ক্ষেত্রটি প্রসারিত করেছেন যেমন বাউল সম্রাট মহাসাধক লালন সাঁইজী তিনি তাঁর গন্ডী উৎরে গিয়ে শান্তির পথ আরো প্রসারিত করেছেন শান্তিটা কীভাবে হয়? ওই যে সম্পদের জন্য কামনা-বাসনা, সেই তীব্র আকাঙ্খার জন্য আমাদের শান্তি বিঘ্ন হয় সুতরাং যাঁরা তাঁর সাধনা করছেন, তাঁরা কেবলি সৎ হতে চাইছেন, ভালো হতে চাইছেন - তাঁরাতো এই কাজটি করবেন না তাঁর শান্তি তিনি করছেন এখন মানুষের জন্য ও সভ্যতার জন্য তাঁরা কিছু অবদান রেখেছেন আমি ভেবেছিলাম এখানে বিভিন্ন সমপ্রদায় থেকে জমায়েত হয়েছেন - সবাই হয়তো যার যার সমপ্রদায় থেকে এই সমপ্রদায়ের যাঁরা মূলত সাধনা করেছেন এই সমস্ত সাধক কী অবদান রেখেছেন সে জন্য আমি সেদিক থেকে কিছু উল্লেখ করতে চাইছি

ঈশ্বর, ভগবান ও অবতার নিয়ে অনেক সময় ভ্রান্তির সৃষ্টি হয় আমি একটু বলার চেষ্টা করছি ভগবান - ভগ অর্থ গুণ’, ‘বান অর্থ যার আছে ছয়টি গুণ - ঐশ্বর্য, বীর্য, তেজ, জ্ঞান, শ্রী, বৈরাগ্য এই ছয়টি গুণ যাঁর মধ্যে পূর্ণ মাত্রায় আছে তাঁকে পূর্ণাবতার, যাঁর অংশমাত্র আছে তাঁকে অংশাবতার, যাঁর কিছু আছে তাঁকে কলাবতার বলা হয়ে থাকে অবতারের আবার অনেক বিশ্লেষণ আছে যখন তিনি অবতীর্ণ হন তখন তাঁকে অবতার হিসেবে বলা হয় ঈশ্বর আর তাঁর মধ্যে পার্থক্য এটুকু তিনি চলে এলেন জীবের মধ্যে তাঁদেরকে অনেকে অনেক সময় ভগবান বলেন যাঁরা বলেন তাঁরা এভাবে বলেন

বাবা লোকনাথ বলেছেন, ‘আমি সারা বিশ্ব পরিভ্রমণ করে দেখলাম, সারা বিশ্বে ব্রাহ্মণ দুজন বৈ আর পেলাম না ব্রাহ্মণ অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তাকে যিনি চিনেছেন, দেখেছেন - সেই জ্ঞান যাঁর হয়েছে অর্থাৎ ব্রহ্মজ্ঞান যাঁর হয়েছে সেক্ষেত্রে আরবের আব্দুল গফুর তাঁকে দেখেছেন, আর ভারতে ত্রৈলঙ্গ স্বামী তাঁকে দেখেছেন নিজের কথাটা তিনি হয়তো উহ্য রেখেছেন

সনাতন ধর্মাবলম্বী থেকে যাঁরা এসেছেন তাঁর মধ্যে আমি ওই অবতারদের বাদ দিয়ে এ পর্যায়ে যাঁরা সাধক সিদ্ধ হয়েছেন তাঁদের কথা কিছু বলছি যেমন শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব এর আগে অবতার পর্যায়ের প্রভু জগৎবন্ধু সুন্দর বলেছেন, ‘তোরা সকলে আমার, আমি তো তোদের দেহ-মন-প্রাণ এই তোরা কারা? তিনি তো কাউকে আলাদা করে বলেননি তাঁর কাছে যারা ছিলো তারা হয়তো মনে করতে পারে এ শুধু তাদের জন্য কিন্তু এঁরা কখনো কাউকে আলাদা করে দেখেন না সাধক সিদ্ধি লাভ করার পর তাঁর বাণী বা তাঁর শিক্ষা সকলের জন্য দেন শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব বলেছেন, ‘যত মত, তত পথ বিভিন্ন মতে তিনি সাধনা করে দেখেছেন, দেখলেন একই তো সব স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, ‘জীবে প্রেম করে যেইজন, সেইজন সেবিছে ঈশ্বর এখানে ঈশ্বর সৃষ্টিকর্তা ১৮৯৩ সালে শিকাগো শহরে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্ব ধর্ম মহাসম্মেলনে তিনি বক্তব্য রাখেন এবং বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি এই উপমহাদেশের বৈজন্তী উড্ডীন করেন ওই মহাসম্মেলনে তারপর শ্রী শ্রী অনুকূল চন্দ্র ঠাকুর তাঁর অনেক কথা আছে তিনি বলেছেন, ‘বুদ্ধ-ঈসায় বিভেদ করিস, শ্রীচৈতন্য নতুন কৃষ্ণে, জীবতধারে আবির্ভূত একই ওরা তাও জানিসনে?’ অর্থাৎ এঁরা সবাই ভিন্ন নন অখন্ড মন্ডলেশ্বর স্বামী স্বরূপানন্দ বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব ও নৈতিকতার উদ্বোধন ও উন্মেষের জন্য অনেক কিছু বলেছেন, তার মধ্যে ছোট্ট একটি কবিতা -

আমার যেদিন জন্ম হলো

সেদিন থেকেই জানি

সবার তরে আমার ক্ষুদ্র জনমখানি

নৈ কো আমি সমপ্রদায়ের

গন্ডীতে নই বাঁধা

কণ্ঠ আমার নির্বিচারে সবার সুরে সাধা

সবাই এক বক্ষে টেনে

জনম ধন্য মানি

বিশ্ব শান্তির অভীক্ষায় তিনি বলেছেন, লাভ ফর অল, গ্রেট এন্ড স্মল

অল ফর ইচ, ইচ ফর অল

শ্রী শ্রী বাবা লোকনাথ সম্পর্কে আমি একটু আগে বলেছি এরপর শ্রী মা আনন্দময়ী রমনার রেসকোর্স ময়দানে কালি মন্দিরের কথা আপনারা শুনেছেন পাঁচশত বছর আগে এখানে গহীন অরণ্যের মতো ছিলো এখানে শ্রী মা আনন্দময়ীর একটি আশ্রম ছিলো কী করে সারা ভূখন্ডে তিনি পরিভ্রমণ করেছেন এবং বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী তাঁর কাছে শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছেন অথবা তাঁর দ্বারা অনুগৃহীত হয়েছেন সাধক কবি মনমোহন দত্ত-এঁর অনেক সাধনার বিষয় আছে মলআ সঙ্গীত নামে তাঁর সঙ্গীতমালা প্রকাশও হয়েছে মনমোহনের ’, লবচন্দ্রের ’, সুর সম্রাট আলাউদ্দিন খাঁর বংশধর আফতাবউদ্দিনের ’ - এই তিনের সমন্বয়ে মলআ সঙ্গীতমালা এই সমন্বয় হিংসা-বিদ্বেষ ভুলতে ও আন্তঃধর্মীয় সহমর্মিতায় সমপ্রীতির সেতুবন্ধন রচনায় প্রলুব্ধ করেছেন জগৎগুরু শঙ্করাচার্য, ঋষি অরবিন্দ, শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর, বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টিকারী শ্রী প্রভুপাদেস্বী ভক্তিবেদান্ত স্বামী ভোলানন্দ গিরি, স্বামী প্রণমানন্দজী, শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর, শ্রী প্রজানন্দ স্বরস্বতী, ভবা পাগলা, স্বামী নীলানন্দ স্বরস্বতী, শ্রী দূর্গাপ্রসন্ন পরমহংসদেব, শ্রীমদ জ্যোতিস্বরানন্দ, নিরিমারাজ - এঁরা প্রত্যেকেই বিভিন্নভাবে মনুষ্যত্বের জাগরণের জন্য ও আন্তঃধর্মীয় চেতনার জন্য এবং সমপ্রীতি ও সৌহার্দ্যের সেতুবন্ধন রচনার জন্য বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেছেন অশান্তির বিরুদ্ধে লড়েছেন অশান্তিকে প্রশমিত করে শান্তির উদ্বোধনের জন্য তাঁরা চেষ্টা করেছেন নজরুল ইসলাম আমাদের জাতীয় কবি তিনি সাধক হিসেবে বিবেচিত হয়েছেন সকলের বিবেচনায় রবীন্দ্রনাথ তাঁর লেখনীর ছোট্ট পঙতিমালায় বলেছেন -

এসো হে আর্য, এসো হে অনার্য

হিন্দু-মুসলমান,

এসো এসো ইংরাজ, এসো এসো খ্রিষ্টান,

এসো হে ব্রাহ্মণ, সূচি করি মন

ধরো হাত সবার

এসো হে পতিত, হও কপলিত

সব অপমান-ভার

মার অভিষেকে

এসো হে তোরা

মঙ্গলঘট হয়নি যে ভরা

সবার পরশে পবিত্র করো তীর্থনীড়ে

আজ হে বিশ্বমানবীর সাগরতীরে

সম্ভবত এখানে একটু বিচ্যুতি আছে যাই হোক সংঘাত-সংঘর্ষ আর যুদ্ধ-বিগ্রহে অশান্ত এ বিশ্ব শান্তির অন্বেষায় যে সাধ্য-সাধনা লিপ্ত সাধককুলের অপার অবদানে নৈতিকতা ও চরিত্র উন্নয়নের সে মহাপ্রয়াস অবিস্মরণীয় তাঁদের সেই অবদানে শান্তি বারিধারায় সৃষ্টি হবে অনন্ত বাড়িটি যা দূর করে দেবে অশান্তি তাই জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কথা দিয়ে শেষ করতে চাই -

রথের বাধা পাষাণ হটাও

হিমাচলের মতো বজ্র দৃঢ় হলেও

শত সাধকের পদাঘাতে ত্রিভূবন কম্পিত হবেই হবে

অমৃতের সন্ধানী ভগবৎ শক্তি

যার শিরায় শিরায় অমিত বীর্যের অক্ষয় ভান্ডার সঞ্চিত তা ঘোষ কটাক্ষের সঞ্চারে

অবিদ্যা জনিত সব বাধার বিন্দাচল অপসৃত হবেই হবে

সত্য মুক্তির জয় রথের যাত্রা পথ রোধ করতে পারে এমন শক্তি যক্ষরক্ষ দানবের নেই

 

ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন

অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

তিনি বলেন, বাংলার সাধককুল নিয়ে আজকের আলোচনা সাধককুল শান্তির পথনির্দেশনা দিয়েছিলেন এমন একটি স্বতঃসিদ্ধ ধারণার উপরই আমরা আলোচনা করছি আলোচনার শুরুতেই আমি বড়ো রকমের একটি বাধার মুখে দাঁড়িয়ে আছি এখানে আসার সঙ্গে সঙ্গে আমার হাতে চলে এলো একটি ধারণা পত্র এখানে বিশেষভাবে চিহ্নিত তিনটি এলাকা আছে এবং তিনটি এলাকাতেই খুব কঠিন কঠিন কিছু প্রশ্ন আলোচকদের জন্য নির্ধারণ করা আছে এখন শান্তির মতো প্রচন্ড কাঙ্খিত একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে এসে কী এক অশান্তিতে পড়লাম কঠিন কঠিন প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে তবে আয়োজকরা এটি ঠিকই বুঝে নিয়েছেন যে প্রশ্নগুলো যতই অশান্তিমূলক হোক না কেন উত্তর পেলে শান্তির দিক-নির্দেশনা পাওয়া সম্ভব হবে কাজেই, আমি একটা নৈতিক দায়বোধ থেকে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজের মতো করে দেবার চেষ্টা করবো

প্রথমেই প্রশ্ন করেছেন, শান্তি কী? পৃথিবীর প্রাচীনতম প্রশ্ন সভ্যতা যতো পুরনো এই প্রশ্নটিও ততো পুরনো তারপরে পরিপূরক প্রশ্ন, কী হতে পারে শান্তির সংজ্ঞা? আরো কঠিন যদি টলস্টয় বেঁচে থাকতেন, তাকে যদি জিজ্ঞেস করা হতো শান্তি কী? তাহলে তিনি নিশ্চিতভাবে বলে দিতেন, ‘যুদ্ধহীন পরিবেশ-পরিস্থিতির নামই শান্তি কারণ তিনি ওয়ার এন্ড পিস লিখেছিলেন

আজ সকালে একটি প্রাইভেট চ্যানেলের সংবাদে দেখছিলাম আদিবাসীদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করেছে একজন ভূমিদস্যু খুব দুঃখ লাগলো এই মানুষগুলোকে যদি জিজ্ঞেস করি তোমাদের জন্য শান্তির সংজ্ঞা কী? এরা চট করে বলে দেবে আমাদের ঘরবাড়িগুলো তৈরি হয়ে যাক, মাথার উপরে ছাঁদ হোক ও পেটে খাবার আসুক তাহলেই শান্তি হয়ে যাবে আবার যদি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জিজ্ঞাসা করি আপনার জন্য শান্তি কী তিনি এক কথায় বলে দেবেন, যদি বাংলাদেশের মানুষের দিনবদল হয় তাহলেই আমার শান্তি খালেদা জিয়াকে যদি জিজ্ঞাসা করি আপনার জন্য শান্তি কী? আরেকবার প্রধানমন্ত্রী না হওয়া পর্যন্ত আমার শান্তি নাই কাজেই শান্তির সংজ্ঞার কত রকমফের হতে পারে এটা আমাদের বুঝিয়ে দিতে হবে আরকি একেকজনের শান্তি একেকরকম আবার প্রশ্ন, শান্তি কোথায় অবস্থান করে এটা একটু সহজতর প্রশ্ন আমার জন্য শান্তি তো অন্তরে যার শান্তি তার অন্তরেই শান্তি ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য শান্তি অন্ন অন্ন উদরপূর্তির পরে মনের যে ভাবটি সেটি মনেই আছে কাজেই সে শান্তি পায় কীভাবে? ওই তো প্রক্রিয়ার কথা বললাম কেউ আবার প্রচুর বিত্তবৈভবের অধিকারী যার অধিকাংশ কালো টাকা খুব শান্তি পেয়েছে যখন শুনতে পেলো মাত্র দশভাগ কর দিলে তার কালো টাকা সফেদ সাদা হয়ে যাবে আর যারা কষ্ট করে অর্জন করেছে সামান্য পয়সা তাকে দিতে হবে পঁচিশভাগ কর কাজেই কালো টাকার শান্তি আছে বাংলাদেশে তেমনিভাবে ওই টাকার মধ্যে শান্তি, অন্তরে শান্তি তারপরের প্রশ্ন সাধকের সংজ্ঞা কী? বুঝতেই পারছেন পৃথিবীর সাড়ে ছয়শ কোটি মানুষ প্রায় সব মানুষই সাধক তবে কে কীসের সাধক তার মধ্যে তারতম্য আছে কেউ রাজনীতির সাধনা করছেন, কেউ ব্যক্তির সাধনা করছেন, কেউ চিত্তের সাধনা করছেন, কেউ ক্ষমতার সাধনা করছেন, কেউ খ্যাতি-প্রতিপত্তির সাধনা করছেন, কেউ জীবনের মৌলিক চাহিদা পূরণের সাধনা করছেন কাজেই আমরা সবাই কম-বেশি সাধক তবে আজকের সভায় উর্ধ্বকমার মধ্যে অবস্থান করবেন এক বিশেষ ধরনের সাধক যে সাধক সব মানুষের সামগ্রিক কল্যাণের জন্য সাধনা করছেন ব্যক্তি স্বার্থের জন্য সাধনা করেননি সুতরাং সামগ্রিক কল্যাণমুখী সাধক ও  সামগ্রিক কল্যাণ সাধনা - সেই সাধক ও সাধনা, আমার মনে হয় আমাদের আলোচনার প্রতিপাদ্য বিষয় ৩৮ বছরের বাংলাদেশে জাতীয় প্রেসক্লাবে এমন একটি গভীর বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে দেখিনি এটি অবশ্যই একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ মাফ করবেন আমি একটি খোলামেলা কথা বলতে পছন্দ করি আজকে যে সংলাপ পত্রিকাটি দেয়া হয়েছে, তার শুরুতেই কুরআনের আয়াত, ‘তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশিয়ো না, আর জেনেশুনে সত্য গোপন করো না আজকের আলোচনার বিষয়টি আমাদের চেতনা ও অস্তিত্বলগ্ন একটি বিষয় আলোচনায় অনেকে কথা দিয়েও আসতে পারেননি কোন কারণে হয়তো এখানে উপস্থিত বেশিরভাগই আমার চেনামুখ যে বুদ্ধিজীবীদের নির্দেশনায় বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়া বা পিছিয়ে যাওয়া তাদের কাউকে এখানে দেখছি না কেন তারা নিশ্চয়ই আছেন, তাদের সাধনা ভিন্নতর কাজেই এ সাধনা তাদের কাছে কাঙ্খিত হয়নি বলেই দুপুরের সুন্দর নিদ্রাটি ত্যাগ করতে তারা রাজী হননি আমি এটা বাঙালি মননের একটি সীমাবদ্ধতা হিসেবে চিহ্নিত করতে চাচ্ছি আমরা বড় বেশি অগভীর, বড় বেশি অসচ্ছ এবং বড় বেশি জীবনমুখী কিন্তু প্রাত্যহিক জীবন ছাড়িয়ে আরও বিশাল জীবন এই ব্যাপারটি ভুলে যাই আমরা সেইজন্য তাৎক্ষণিকতা প্রসুত আমাদের ভাবনা এর ব্যাখ্যা আমি এমনভাবে খুঁজে পাই অজিত পান্ডার কবিতায় -

বিবেককে প্রশ্ন করি, বিবেক তুমি কোথায়?

বিবেকের উত্তর, কফিনের পেরেকের মাথায়

মানুষ আবার প্রশ্ন করছে, তুমি ওখানে কেন? বিবেক উত্তর দিচ্ছে, তোমরাই আমাকে বসিয়েছো ওখানে

বিবেকহীন মানেই মনুষ্যত্বহীন মানুষহীন আমাদের এই সমাজ  পৃথিবী তার একটি দিক-নির্দেশনা পাচ্ছি, অনেক আগেই বলে গেছেন হাসন রাজা -

এদেশে মানুষ নাইরে,

প্রায় অহুঁশ   

ভবের মায়ায় ভুলিয়া আছে,

হইয়া বেহুঁশ

সুতরাং আজকের এই আলোচনায় ক্ষীণকায় উপস্থিতি আমাদের বৃহদাকার একটি ঘাটতি এবং সীমাবদ্ধতা নির্দেশ করে বলে আমার একটি বক্রক্তি থেকে যাচ্ছে

আরো কিছু প্রশ্ন আছে, প্রশ্ন শেষ হয়নি এখনো এই তিন সহস্রাব্দিকাল অর্থাৎ আমাদের সভ্যতার ইতিহাস নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে যে বাংলায় শান্তি ছিলো কি না? হ্যাঁ বা না দুটোই হতে পারে যেমন ধরুন, ১৩৯২ থেকে ১৪০৮ পর্যন্ত স্বাধীন সুলতানী আমলে বাংলায় সুলতান ছিলেন গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ্‌ আমাদের সোনারগাঁয়ে তার সমাধি আছে সেই সময়ে চীনা রাষ্ট্রদূতরা বাংলাদেশে এসেছিলো এবং তা গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ্‌র উদ্যোগেই তিনি বাংলা থেকেও চীনে রাষ্ট্রদূত পাঠিয়েছিলেন তখন ইউরোপেও রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে দূত পাঠাবার প্রক্রিয়াটি গড়ে ওঠেনি আমরা সেটা করেছিলাম এই বাংলার ইতিহাসে চীনারা ফিরে গিয়ে তাদের বেশ কিছু আত্মজীবনী রেখে গেছে বাংলাদেশের বসবাসের অভিজ্ঞতা নিয়ে, যে অভিজ্ঞতাগুলোর কিছু অনুবাদ সমপ্রীতিকালে হয়েছে তার থেকে আমার প্রাপ্ত তথ্য হচ্ছে, তারা বলেছেন, ‘এদেশের মানুষ মিথ্যা কথা বলে না অর্থাৎ ১৫ শতকের শেষ ১৬ শতকের শুরু ১৫৪০ পর্যন্ত তারা এদেশে এসেছেন-গেছেন গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ্‌ লোকান্তরিত হয়েছেন ১৫০৮ সালে তারপরেও দূত বিনিময়ের কার্যক্রমটি বহাল ছিল তারা আরেকটা কথা বলেছেন, ‘এদেশের মানুষ কেউ কাউকে প্রতারণা করে না কী চমৎকার দুটো সনদ আমাদের সম্পর্কে মানুষ কখন মিথ্যা বলে না কখন প্রতারণা করে না একে অপরকে যখন মানুষ, প্রতিটি মানুষ, নিজের ভিতরে শান্তি খুঁজে পায়, নিজের আকাঙ্খা ও নিজের প্রত্যাশা-প্রাপ্তি নিয়ে আত্মতৃপ্ত হয় তখন কিন্তু প্রয়োজন হয় না মিথ্যা কথা বলার বা কাউকে প্রতারণা করবার আজকে আমি বাজারে গেলে যে মুদি দোকান থেকে আমার সওদা নেবো বা যে তরকারীর দোকান থেকে আমি সবজিটা কিনে নেবো ওরা যে দাড়িপাল্লাটা ধরবে, আমরা তো সবাই জানি দাড়িপাল্লা ধরবার কারুকার্যের মধ্য দিয়েই সে প্রতারণা করে যাচ্ছে কিন্তু আমি ধরতে পারবো না আপনার এক কেজি পণ্য এক কেজি নাও হতে পারে কিছুক্ষণ আগেও স্নেহভাজন সঞ্চালক যে রাষ্ট্রীয় একুশে পদকের কথা বললেন, আমি শুনেছিলাম প্রয়াত শওকত ওসমান তার রাষ্ট্রীয় পদক পাবার পরে তিনি সোনার দোকানে নিয়ে গিয়ে ওজন করেছিলেন ওজন করিয়ে তিনি যা পেয়েছিলেন, যে পরিমাণ সোনা থাকবার কথা তা ছিলো না এটা কাগজে প্রকাশিত হয়েছিলো তার কারণ হলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এই পদকটি তৈরি করবার কাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে বেশ কিছু কারুকাজ করে নিয়েছেন অন্তরালে এই হচ্ছে আমাদের বাংলাদেশ ওইসময় এরকম ছিলো না চীনারা সহজে কিন্তু বাগাড়ম্বরে বিশ্বাস করে না দ্বিকথনে বিশ্বাস করে না আমাদের মতো আবার অযথা কথা বলতে রাজি নয় তারা মোটামুটিভাবে অন্যান্য ঐতিহাসিক তথ্য থেকে আমরা বুঝে নিতে পারি সে সময়ে সমাজ এখনকার চাইতে অনেক স্থিত ছিলো।  সেটি শাসনের কারণেই হোক, আর্থ-সামাজিক পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণেই হোক তবু ওই সময়টাতে শান্তি ছিলো এমন একটি ধারণা করতে পারি শায়েস্তা খাঁর আমলে টাকায় ১ মণ চাল পাওয়া যেত এমন একটি ঐতিহাসিক তথ্য আছে যদি তাই হয়, তাহলে বলতে হবে তখন শান্তি ছিলো আসলে ব্যাপারটা তা নয়, তখন টাকাই ছিলো কম প্রচন্ড দারিদ্র্যের দেশ বাংলাদেশ বাংলাদেশ সে অর্থে কোনোদিনই সোনার বাংলা ছিলো না ওটা রাজনৈতিক বুলি - ঐতিহাসিকদের প্রবচন সত্যি এ কথা নয়

১৮ শতকের মাঝামাঝি, গোলাম হোসেন সেলিম লিখলেন সিয়ারুল মোতাখ্‌খারীন তিনি মুর্শিদাবাদ থেকে এদেশে এসেছিলেন সিয়ারুল মোতাখ্‌খারীনে দেখেছি তিনি বাঙালিদের সম্পর্কে বলেছেন, ‘বাঙালিরা ভাত খায় বেশি, ঘুমায় বেশি, নোংরাভাবে কাপড়-চোপড় পরে, ঋণ করে অকাতরে কিন্তু ফেরত দেয় না কখনো’ - এই যে ঋণখেলাপি সংস্কৃতি এর ইতিহাসের শেকড় আছে তাহলে এই যে ঋণ করে বাঙালি এতো অশান্তির লক্ষণ দারিদ্র্য অশান্তির লক্ষণ তাহলে তথ্যের ভিত্তিতে আমাকে ধরে নিতে হবে ওই সময়টা শান্তি ছিলো না কাজেই প্রাচীন বাংলায় শান্তি ছিলো কি না বা তার স্বরূপ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হতে পারে

তারপরে আবার প্রশ্ন আছে বাঙালির এই চাপা ইতিহাসের পরতে পরতে কী কী রয়েছে আর? বাঙালির হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার স্বরূপ কী ছিল? ... শান্তি কি বর্তমান? শান্তি কি নিধানযোগ্য বাঙালির ইতিহাস সত্যি চাপা আছে চেপে রাখা হয়েছে এ যাবৎ বাঙালির ইতিহাস নিয়ে যা কিছু চর্চিত হয়েছে আমার বিনম্র বিশ্বাস যে বাঙালির গৌরবের ইতিহাসটিকে তুলে আনা হয়নি যার ফলে এখনকার বাঙালি নিয়ে তো আরো সমস্যা হচ্ছে গত পরশুদিন একটি টেলিভিশন প্রোগ্রাম রেকর্ড করেছি অনুষ্ঠানটির নাম ইতিহাসের খেরোখাতা কবে প্রচারিত হবে জানিনা বিটিভিতে তবে আমার সঙ্গে আরেকজন ছিলেন অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তিত্ব মাননীয় সাংসদ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত কথা প্রসঙ্গে আলোচনায় টেলিভিশনের ক্যামেরার সামনে তিনি যখন বলছিলেন যে আমাদের সবাইকে ইতিহাস সচেতন হতে হবে আমাদের শেকড় জানতে হবে আমি শুরুতে কিছু কথা বলেছিলাম তারই পাল্টা কথা হিসেবে তিনি এগুলো বলেন ক্যামেরার সামনে আমি করজোড়ে তার কাছে প্রার্থনা করলাম, ‘আপনারা মাননীয় সাংসদ-নীতিনির্ধারক, আপনারা কি জানেন বাংলাদেশে ২৪২টি সরকারী কলেজের মধ্যে মাত্র ৩৮-৩৯টিতে ইতিহাস পড়ানো হয় বাকী কলেজগুলোতে ইতিহাস পড়ানো হয় না বাংলাদেশের ইতিহাস তো দূরের কথা কোনো ইতিহাসই পড়ানো হয় না তারপরেও আপনি কীভাবে বলছেন যে আমরা ইতিহাস সচেতন হবো ইতিহাস অসচেতন জাতি হিসেবে আমরা যদি চিত্রিত হই তার সবচেয়ে বড় দায়-দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে - প্রথম থেকে আজ পর্যন্ত সবকটি সরকারকে তিনি বললেন, ‘তাহলে ব্যবস্থা করতে হয় ক্যামেরার সামনে বলে গেছেন তিনি বাইরে কী হবে আমি জানি না এবং কোনো লাভ হয় না কিছু বলে ইতিহাস সচেতনতা আমাদের মধ্যে খুবই কম শেকড় নেই বলেই আমার বিশ্বাস গৌরবের কথা অসংখ্য বলা যেতে পারে কিন্তু আপনারা খুঁজে দেখুন নিহার রায় - আর সি মজুমদারের বই, ইতিহাসের উপর সবচাইতে নির্ভরযোগ্য বই সেখানেও নেই এই কথাটি যে, ‘গোপাল ৭৫০ সালে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এবং যাকে আমরা নাগরিক সমাজ বলি তাদের দ্বারা নির্বাচিত হয়েছিলেন তথ্য আছে প্রকৃতিপুঞ্জ গোপালকে মনোনয়ন বা নির্বাচন করেন এখানেই ইতিহাস শেষ কিন্তু একথাটি বলা নেই যে এর গভীরতর তাৎপর্য কি? যখন ইউরোপে চলছিল মধ্যযুগ, রাজা গীর্জার অধীন, রাষ্ট্রকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে গীর্জা, সে সময় বাঙালি পরিপূর্ণভাবে আজকের যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তাদের শাসক নির্বাচন করেছিল আরো পিছনে যাই, খ্রিষ্টপূর্ব ৬শতক থেকে নিয়ে দুশ অব্দ পর্যন্ত আমাদের এই বাংলা অঞ্চলের বিভিন্ন প্রান্তে ছোট ছোট বৌদ্ধ প্রজাতন্ত্র ছিলো এগুলোকে বলা হতো গণরাজ্য প্রত্যেকটি বৌদ্ধ গণরাজ্য এখানে একটি মনোনীত পর্ষদ রাজা নির্বাচন করতো এবং রাজার ক্ষমতা ততদিনও থাকতো যতদিন তিনি এই পর্ষদের আস্থাভাজন রাজার সামনে তার প্রশাসন কাজের সব ত্রুটি-বিচ্যুতি যে কেউ তুলে ধরতে পারতো যে আপনার এই কাজটি ঠিক হয়নি এই কথা বললে তাকে কখনো রিমান্ডে নেয়া হতো না তাকে সেকশন ৫৪-এ গ্রেফতার করা হতো না সরকার বিরোধিতা - রাষ্ট্রদ্রোহিতা নয় এমন চেতনা বাঙালির সেই সময়ে ছিলো এটি উজ্জ্বল গৌরবের বিষয় কিন্তু ইতিহাসের উপর আমাদের শিক্ষার্থীকে পড়াবার জন্য এ ধরনের কোনো বই আমরা এখনো লিখিনি এমনি অসংখ্য গৌরবের কথা আছে এগুলো সবই শান্তির নির্দেশক বলে আমি মনে করি যারা এই শান্তি নিশ্চিত করেছিলেন তারাও সাধক ছিলেন তবে বর্তমান সংলাপের দৃষ্টিতে বর্তমান সময়ের কী চালচিত্র এটি আমরা সবাই জানি শান্তি যে নির্বাসিত এটি আমাদের সবারই জানা এ নিয়ে বলার কিছু নেই তবে শান্তি আসতে পারে - মানুষের যদি হুঁশ থাকে মানুষ যদি মানুষ হয় এই কথা দিয়ে কিন্তু বলে গেছেন আমাদের সাধককুল যাদের কথা এতক্ষণ আমরা শুনে এলাম প্রত্যেকে অভিন্ন একটি বিষয় আলোচনা করেছেন বিষয়ের দুটো দিক আছে প্রত্যেক সাধক সৃষ্টি এবং স্রষ্টার মধ্যে সেতু বন্ধন তৈরি করার চেষ্টা করেছেন প্রত্যেক সাধকই সৃষ্টিকে অর্থাৎ মানুষকে যথার্থ মানুষ করবার চেষ্টা করেছেন সেই বার্তাটা দেবার চেষ্টা করেছেন এই যথার্থ মানুষের মধ্য দিয়ে যথার্থ শান্তি নিশ্চিত হবে এমন একটি বার্তা স্পষ্ট ও জোড়ালোভাবে আমাদের কাছে পৌঁছে দেয়া হয়েছে অসংখ্য উদ্ধৃতি  বিজ্ঞ-প্রাজ্ঞ আলোচকরা আমাদের দিয়ে গেছেন সেগুলোতে আর না যাওয়াটাই বোধহয় ভালো। 

ইউরোপে যখন রেনেসাঁ বা পুনর্জন্ম হচ্ছিল সেই সময় এক লাতিন কবি উচ্চারণ করেছিলেন লাতিন ভাষায় -

আমি মানুষ, মানুষ সংক্রান্ত কোন কিছুই আমার কাছে অবজ্ঞার বিষয় নয় এটিই হচ্ছে আসল কথা জীবনদর্শনই বলি আর জীবনবিধি বলি তার পাটাতন হচ্ছে এমন একটি চেতনা এই পাটাতন বা এই চেতনা আমাদের সাধককুলের প্রত্যেকের মধ্যে ছিল তারা ভেবেছিলেন যে এদেশে মানুষ আছে অবয়বে-কায়ায় কিন্তু যথার্থ মানুষের যথেষ্ট অভাব যেমন ঠাকুর অনুকূল চন্দ্র একবার বলেছিলেন, ‘আমরা যেমন করি মাছ এবং সব্জী চাষ করি তেমন করে মানুষের চাষ করা দরকার এদেশে মানুষের চাষ হচ্ছে কি না আমি জানি না আমাদের মানুষ কিন্তু চাষ করছে অনেকটা উচ্চ ফলনশীল বীজ বপনের মধ্য দিয়ে অতিরিক্ত পরিমাণ ধান যেমন পেয়ে যাচ্ছে মানুষও তৈরি হচ্ছে ওই ধরনের উচ্চফলনশীল বীজের মধ্য দিয়ে মানুষের সংখ্যা বাড়ছে কিন্তু যাদের হুঁশ নেই - বেহুঁশ, সেকারণেই শান্তি নির্বাসিত, শান্তি মায়ামৃগের মতো হয়ে আছে

আজকের আলোচনার অনেকটাই জুড়ে রয়ে গেছে ধর্মীয় পরিপ্রেক্ষিত কিন্তু ব্যাপারটি হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষের ধর্মচেতনা একটু ভিন্নধর্মী আপনারা লক্ষ্য করে দেখবেন, এদেশের মাটিতে কোন ধর্মের জন্ম হয়নি, সৃষ্টি হয়নি আমরা যতোগুলো ধর্মাচরণ করছি এদেশে সব বাইরে থেকে আসা এটি একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য বাংলাদেশের আমরা কোনো ধর্ম তৈরি করিনি বরং প্রথাসিদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করবার ক্ষেত্রে  আমাদের আদি প্রজন্ম যথেষ্ট অনীহ ছিলো যেমন সনাতম ধর্ম, ব্রাহ্মণ্য ধর্ম, বেদের ধর্মটি সেটি কিন্তু অনেক কষ্টে এদেশে এসেছে যখন ব্রাহ্মণ্য ধর্ম ছড়িয়ে দেবার চেষ্টা করা হয়েছিলো মৌর্য যুগের শুরুতে তখন বাঙালিরা তা প্রত্যাখ্যান করেছিল যার কারণে ঋগবেদে আমরা দেখছি যে একজন ব্রাহ্মণ দেবরাজ ইন্দ্রের কাছে প্রার্থনা করছেন, ‘হে ইন্দ্র, এই ভূখন্ডে বসবাসকারী মানুষেরা মানুষ নয় এরা অসুর এদেরকে তুমি জ্বর রোগে আক্রান্ত কর অর্থাৎ সেই সময়ে জ্বরই ছিলো সবচেয়ে বড় রোগ সেই রোগে যেমন আক্রান্ত হয় এদেশের মানুষ এ ধরনের একটি অভিশাপ বাণী একজন ব্রাহ্মণের মুখ থেকে উচ্চারিত হচ্ছে মহাবীর জৈন যখন জৈন ধর্ম প্রচার করবার জন্য এদেশে এসেছিলেন বাঙালিরা তার পিছনে কুকুর লেলিয়ে দিয়েছিল যার ফলে তাকে সবসময় হাতে লাঠি নিয়ে ঘুরতে হতো এদেশের মানুষ প্রথাসিদ্ধ আচারসর্বস্ব ধর্মে কখনো আস্থাশীল ছিলো না একটা সহজিয়া ভাব তার মধ্যে ছিলো তার কারণটি হচ্ছে এদেশের প্রকৃতি ও পরিবেশ মানুষ তখনই ধর্মের প্রতি নির্ভর করে, বিশেষ করে আচরণগত বাহ্যিক ধর্মে যখন সে বিশেষ কোনো অসুবিধায় পড়ে এটা স্বাভাবিক ঘুষখোর কর্মকর্তা যখন ধরা খেয়ে যান তখন দেখা যাবে হঠাৎ নামাজ পড়তে পড়তে তার কপালে দাগ পড়ে গেছে সারাজীবন তিনি নামাজ পড়েননি আগে দাড়ি ক্লিনশেভ থাকতো এখন মাথায় টুপি, মুখে দাড়ি এটা আমার নিজের চোখে দেখা আপনারাও কমবেশি দেখেছেন মানুষ যখন বৈরি পরিবেশ পরিস্থিতিতে থাকে তখন হয় সে অতিমাত্রায় বিকৃত হয়ে যায় অথবা অতিমাত্রায় বিকৃত ধর্মাচরণে সে লিপ্ত হয়ে যায় স্বাভাবিক অবস্থায় ধর্মাচরণ খুব কমই দেখা যাচ্ছে আজকাল প্রকৃতি-পরিবেশের কারণে বাঙালির আদি প্রজন্মের এক ধরনের অনীহা ছিলো কিন্তু অন্তরিন নৈতিকতা, ভালত্ব তাকে সবসময় আকর্ষণ করেছে ভিতরের একটা বার্তা সবসময় সে তৈরি করেছে এই যে চন্ডীদাসের   কথা -

সবার উপরে মানুষ সত্য

তাহার উপরে নাই

এটা আদিকাল থেকে এদেশের মানুষেরই বার্তা মানুষকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে এদিক থেকে চীনের সাথে আমাদের বাংলার আদিম একটা সাদৃশ্য আছে চীনও নতুন কোন ধর্ম তৈরি করেনি চীন সবসময় ধর্মীয় মতবাদ দিয়েছে চীনে যেমন ধরুন কনফুসিয়াস, লাওস, মেনসিয়াস এরা কেউ নতুন ধর্ম আনেননি ধর্মভিত্তিক মতবাদ তৈরি করেছেন বেহুঁশ মানুষ কে হুঁশে তৈরি করবার জন্যই এই তিনজন কাজ করেছেন বাংলার সাধককুল ওই কাজটিই করেছেন তারা কোনসময় সুনির্দিষ্ট আচারভিত্তিক ধর্মের কথা বলেননি লালন সাঁইজি তো তার জাত-পাত নিয়েই কাউকে প্রশ্ন করতে নিষেধ করে গেছেন লালন সাঁইজি স্রষ্টার সাথে সৃষ্টির সেতুবন্ধনমূলক যে গানগুলো রচনা করে গেছেন তা খুব সহজেই আমাদের স্রষ্টার কাছাকাছি ও মানুষের কাছাকাছি নিয়ে যাবে যখন ওই সঙ্গীত আমরা শুনবো আমাদের সাধকরা ওই দুটো কাজই করেছেন স্রষ্টার নৈকট্যের নির্দেশ করে গেছেন আর মানুষলগ্ন হবার কথা বলে গেছেন এই দুটোর মধ্য দিয়ে আত্মিক শান্তি, পরিবেশ-পরিস্থিতিগত শান্তি ভিন্ন ব্যাপার কিন্তু মানুষের ভেতরের শান্তি, অন্তরের  শান্তি, সেটি স্পষ্ট করে বলা আছে সাধককুলের মধ্যে ইসলামে বলা আছে, ‘তোমার ঈমান তোমার নিয়তের মধ্যে এখন আমার নিয়তটা শান্তির কিনা প্রথমেই আমাকে আমার নিজের মধ্যে শান্তি স্থাপন করতে হবে সেটি যদি না হয় তাহলে শান্তির বার্তাটি বায়বীয় বার্তা হয়ে যায় আসলে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষকে এক্ষেত্রে  শান্তির সন্ধান করতে হবে শান্তি সন্ধানের পথনির্দেশ বা রোডম্যাপ আছে সাধককুলের বিভিন্ন গান ও কথনে সেজন্য এগুলো নিয়ে আমাদের ভাবনার দরকার আছে আমাদের প্রতিনিয়ত কাঞ্চন-কৌলিন্যের সাধনা, বিত্ত-বৈভবের সাধনা, জাগতিক-বৈষয়িক সমৃদ্ধির কামনার বাইরে গিয়ে নিজের সমান্তরালে দাঁড়িয়ে একটু নিজের ঐতিহ্যের শেকড়ে ফিরে গিয়ে একটু  নতুন করে ভাবা দরকার বিশেষ করে এই সময়টি একটু অস্থির উত্তাল যে সময়টি বিবেকবর্জিত সময় বিবেকবর্জিত মানে মনুষ্যত্ব বর্জিত পৃথিবী ও সমাজ যতদিন না মানুষ তৈরি হবে ততদিন শান্তির আকাঙ্খা বিফল হতে বাধ্য

 

আল্লামা মোহাম্মদ সাদেক নূরী

নির্বাহী উপদেষ্টা, আশিক্কীনে আউলিয়া ঐক্য পরিষদ বাংলাদেশ

 

তিনি বলেন, দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে অনেক পন্ডিত শ্রদ্ধেয় বিজ্ঞ-প্রাজ্ঞজন আলোচনা করেছেন ইতিহাস-তত্ত্ব-তথ্য-উদ্ধৃতি কিছু বাকী নেই আমি এই বিষয়ে আমার কয়েকটি বিশ্বাস ও বোধের কথা বলবো আমি যা উপলব্ধি করি তাই আমি ব্যক্ত করার চেষ্টা করছি এখানে স্বাগত ভাষণে কিছু প্রশ্ন এসেছে আমি আমার মতো করে একটু হালকাভাবে এই বিষয়ে কিছু কথা বলতে চাই

প্রথম প্রশ্ন, শান্তি কী? আমার কাছে শান্তি একান্তই ব্যক্তিক বিষয় সামগ্রিকভাবে শান্তির নির্দেশ করা খুবই কঠিন এজন্য একান্ত ব্যক্তিক বিষয় হিসেবে শান্তির কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা দেয়া সম্ভব নয় বলে আমি মনে করি ব্যক্তির আকাঙ্খা এবং প্রয়োজন থেকে বঞ্চনার পরিপ্রেক্ষিতে তার মধ্যে হতাশা, দুঃখবোধ ও যন্ত্রণা সৃষ্টি হয় সেই দুঃখবোধ, হতাশা ও যন্ত্রণার উপস্থিতিটাই তার জন্য অশান্তি অশান্তি না বুঝলে শান্তি বোঝা যাবে না সরাসরি শান্তি অনুভব করা তখনি যাবে যখন আমি বুঝবো অশান্তি আমার মধ্যে নেই সুতরাং শান্তি বোঝার জন্য অশান্তি বোঝা খুব জরুরি এটা যার যার তার তার

এখানে সাধকের সংজ্ঞার কথা বলা হয়েছে আমি মনে করি সাধক শান্তির প্রতীক সাধক তিনিই যিনি কোন বিষয় বা বস্তুর হাকীকাত বা মূলকে জানার এবং চেনার জন্য সাধনায় লিপ্ত থাকেন কোন সাধক যখন কোন বিষয় বা বস্তুর মূলকে জানতে পারেন তখন তিনি জ্ঞানের যে মার্গে অবস্থান করেন সেই মার্গ থেকে দেখলে সারা পৃথিবী তাঁর কাছে সমান বোধ হয় তাই তিনি শান্ত হন তার বর্তমান তার পরিবেশ শান্ত হয় সুতরাং শান্তির জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নিজে শান্তি হওয়া শান্ত লোকের দরকার যে সমাজে শান্ত লোক পাওয়া যাবে সে সমাজে শান্তি হবে শান্তি পাওয়ার জন্য প্রধান শর্তই এটা

একটি প্রশ্ন এসছে শান্তি কি নিধানযোগ্য? অবশ্য অবশ্যই না।  শান্তিকে নিধানযোগ্য, বিধানযোগ্য, শরিয়তযোগ্য, আইনযোগ্য, রীতি নীতিযোগ্য, রীতি-নীতি নির্ভর করতে গিয়ে পৃথিবীতে যত অশান্তি এই বাংলায় শান্তি ছিলো কি না প্রশ্ন এসেছে আমি বিশ্বাস করি ছিলো কারণ এই বাংলায় প্রথম থেকেই রাষ্ট্র গড়ে ওঠে নাই এই সমাজ গড়ে ওঠে নাই এই নেতৃত্ব গড়ে ওঠে নাই এই মতবাদ গড়ে ওঠে নাই ধীরে ধীরে যখন সাধকরা তৈরি হলেন - এই একেকজন সাধকের অনুসারীরা এই সাধকদের একেকটি কূপে বা কুয়োয় পরিণত করলো অনুসারীরা মনে করেছেন এইভাবেই শান্তি হবে, এইভাবেই কল্যাণ হবে, এই ভাবেই মুক্তি হবে, এই ভাবে নির্বাণ হবে, এই ভাবেই আমরা ফানা পাব, এই ভাবেই স্রষ্টা পাবো আর বাকী যারা আছে সবাই ভ্রান্ত এই চিন্তা যেদিন শুরু হয়েছে সেদিন থেকে অশান্তি শুরু হয়েছে এর আগে পৃথিবীতে অশান্তি ছিলো না আমরা ধর্মকে গ্রহণ করার কথা বলি, একজন বলেছেন ধর্ম গ্রহণ করার বিষয় আমি বিনীতভাবে বলবো আমরা কোনো ধর্ম গ্রহণ করি নাই ধর্ম গ্রহণের বস্তু নয় ধর্ম আমরা গ্রহণ করি নাই পানি তার ধর্ম গ্রহণ করেনি, আগুন তার ধর্ম গ্রহণ করেনি, বায়ু তার ধর্ম গ্রহণ করেনি এবং পশু-পক্ষী তার ধর্ম গ্রহণ করেনি - যে যার নিজের ধর্ম পালন করছে মানুষ হিসেবে তার ধর্ম গ্রহণের বিষয় নয় - মানুষ তার নিজের ধর্ম পালন করছে প্রত্যেক ব্যক্তির ধর্ম তার নিজের মধ্যেই রয়েছে আমরা যেটা গ্রহণ করেছি সেটা হলো আচার-অনুষ্ঠান এই আচার-অনুষ্ঠান গ্রহণ করে আমরা মানুষে মানুষে বিচ্ছিন্ন-বিভক্ত হয়ে পড়েছি বিভেদে লিপ্ত হয়েছি এবং যার যার অনুষ্ঠানকে সেরা বলে মনে করেছি এবং তারই ফলে আজকে অশান্তি পৃথিবীতে আদিতে শান্তি ছিলো, অশান্তি শুরু হয়েছে আবার শান্তি আসতে পারে যখন আমরা বুঝতে পারবো সকল মানুষ একটি জাতি, সকল মানুষের একটি ধর্ম শ্রী রামকৃষ্ণ বলেছেন, ‘যত মত তত পথ পথ আলাদা হতে পারে এই পথের বিভিন্নতাকে স্বীকৃতি দিতে হবে পথের বিভিন্নতাকে মেনে নিতে হবে যার যার পথ তার তার আরেকজনের পথকে ভ্রান্ত-ভুল বলা একটা মহা ভুল সাধকরা ততক্ষণ হিন্দু থাকেন যতক্ষণ তিনি হিন্দু রীতিনীতি অনুযায়ী সাধনা করেন, যখন তিনি সিদ্ধ হন তখন তিনি আর হিন্দু থাকেন না তিনি সেই রীতিনীতির উর্ধ্বে চলে যান একজন মুসলিম সাধক তিনি সেই মুসলিম রীতিনীতি অনুযায়ী সাধনা শুরু করতে পারেন এবং তিনি যখন সিদ্ধি লাভ করেন তখন তিনি তার রীতিনীতির উর্ধ্বে চলে যান হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান, কোন সাধক যতক্ষণ পর্যন্ত হিন্দু থাকেন, যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি খ্রিষ্টান থাকেন, যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি বৌদ্ধ থাকেন, যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি জৈন থাকেন - ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি সিদ্ধপুরুষ না বুদ্ধ যখন সিদ্ধ হয়েছেন তিনি কার ধর্ম অনুসরণ করে সিদ্ধ হয়েছেন কি রীতিনীতি অনুসরণ করে সিদ্ধ হয়েছেন বুদ্ধতো কারোটা অনুসরণ করেননি আমরা একটা বুদ্ধেরটাকে মনে করেছি শ্রেষ্ঠ বৌদ্ধ রীতি অনুসরণ না করলে শান্তি আসবে না বৌদ্ধ রীতি অনুসরণ না করলে নির্বাণ আসবে না বুদ্ধ নিজেরটা করেছেন বুদ্ধ-এঁর কাছ থেকে আপনি শিখেন, সরফুদ্দিন ম্যানেরী-এঁর কাছে শিখেন, শ্রী অনুকূল ঠাকুর-এঁর কাছে শিখেন, আপনি সূফী সাধক আনোয়ারুল হক-এঁর কাছে শিখেন - যে যার কাছ থেকে পারেন শিখেন তাঁরা গুরু তাঁদের কাছে শিখবো কিন্তু লক্ষ্য আমাদের একটাই যে, ‘আমরা মানুষ, আমাদের ধর্ম এক, আমাদের লক্ষ্য এক, আমরা এই লক্ষ্যে যাবো, শান্তি সকলের কাম্য আমার শান্তির জন্য আরেকজনের শান্তি ভঙ্গ করা অধর্ম’ ‘অহিংসা পরম ধর্ম, সর্ব জীবে দয়া’ - এটা ধর্মের কথা নয় - এটা বুদ্ধের উপলব্ধি এটা শাশ্বত সত্য ও প্রাকৃতিক সত্য এটা মানলে মানেই আমি বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করলাম তা নয় এখানেও শুনেছি, কিন্তু শুনলে আমি বড় কষ্ট পাই - ইসলাম ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম, খ্রিষ্টান ধর্ম, হিন্দু ধর্ম - এগুলো তো ধর্মের নাম না এগুলো তো বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানের নাম, এগুলো বিভিন্ন রীতিনীতি-পদ্ধতির নাম এগুলো মতের নাম - পথের নাম পথ ও পদ্ধতিকে আমরা ধর্ম মনে করছি এই বোধটাই আমাদেরকে অশান্তির দিকে নিয়ে যাচ্ছে আমরা সাধকদের থেকে দূরে চলে যাচ্ছি সাধককে যদি আমরা বুঝি, সাধককে যদি আমরা অনুসরণ করি - সাধক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে পৃথিবীতে আমাদের সর্বক্ষেত্রে সাধক কবিতায়, সাধক সাহিত্যে, সাধক শিল্পে, সাধক গানে, বিজ্ঞানের সাধক, দর্শনের সাধক সাধক আধ্যাত্মিকতায় আছেন আমরা শুধু আধ্যাত্মিকতার সাধককেই সাধক মনে করি বিজ্ঞানের সাধক যখন সিদ্ধি লাভ করেন তখন তিনি কোন জাতিরও থাকেন না ধর্মেরও থাকেন না এখন এই বিজ্ঞানের আবিষ্কার দিয়ে যদি কেউ বোমা বানায় সেটা যিনি আবিষ্কার করলেন তিনি বানান নাই বোমা বানাচ্ছি আমি এ্যাটম যিনি আবিষ্কার করেছেন তিনি তো বোমা বানাননি সুতরাং আমাদের বুঝতে হবে সাধক কি এবং সাধনালব্ধ ফল ও ব্যবহার কী এই ব্যবহারকারীকে আমরা সাধক বলি, তা ঠিক নয় সাধক কোন ধর্ম-গোষ্ঠীর না এই সাধককে অনুসরণ করে আমরা শান্তি পেতে পারি কারণ সাধক মানেই শান্ত সাধক মানেই শান্ত নির্বিকার শান্ত যিনি তার সাথে থাকলেই শান্তি পাওয়া যায় অশান্ত লোকের কাছে শান্তি নাই তার কাছে যাবেন আরো অশান্তি ভোগ করবেন সাধক যিনি তিনি শান্তির দূত সাধক যতক্ষণ পর্যন্ত সকল তন্ত্র-মন্ত্রের উর্ধ্বে ও সকল সংকীর্ণতার উর্ধ্বে, ছোট ছোট কূপ ছোট ছোট কুয়ো অতিক্রম করে ঊর্ধ্বে যেতে না পারছেন ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি সাধক নন সাধকের ধর্ম এক মানুষের ধর্ম এক - রীতিনীতি আলাদা

 

ড. মুহাম্মদ মেজবাহ্‌-উল-ইসলাম

সহযোগী অধ্যাপক

তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

মুক্ত আলোচনায় সঞ্চালকের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। আলোচনা শেষে তিনি বলেন, এই প্রশ্নগুলো যেমন গভীর চিন্তা ও ভাবনার বিষয় তেমনি এসব প্রশ্ন দাবি করে আরো ব্যাপক আলোচনার সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপ এ নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা চালিয়ে যাবে আমরা এই জনপদে এই দেশে শান্তি চাই বলেই এর উত্তর খোঁজার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবো এবং চালিয়ে যাবে অব্যাহত থাকবে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সাধককুলের ভূমিকা